সম্পর্কে ভালোবাসা ছাড়াও লাগে একটু বোঝাপড়া
সহাবস্থান
"মিহিকা, নামটা ভারী মিষ্টি... কিন্তু আমি তোকে মিহু বলে ডাকব, কেমন?"
শাশুড়ির গলায় এমন একটা চেনা মায়া ছিল, যেন বহুদিনের চেনা কোনো আপনজন। বরণডালার প্রদীপের আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে মিহিকা প্রথমবার তাকিয়েছিল তার শাশুড়ির দিকে। নতুন কনের চোখে ক্লান্তি থাকলেও ঠোঁটের কোণে লেগে ছিল এক চিলতে হালকা হাসি। সে লাজুক মুখে উত্তর দিয়েছিল, "যেমন খুশি ডাকুন..."
সেদিনই তাদের প্রথম দেখা। বিয়েটা যদিও ভালোবেসে হয়েছিল। একই অফিসে কাজ করতে করতে অচিন্ত্য আর মিহিকার সম্পর্কটা তৈরি হয়েছিল। তিন বছরের সম্পর্ক, অসংখ্য কফিশপের আড্ডা, অফিসের ক্যান্টিনে ভাগ করে খাওয়া লাঞ্চ, একসাথে ভবিষ্যতের সুন্দর স্বপ্ন দেখা— সবকিছুই ছিল নিখুঁত। কিন্তু অচিন্ত্যর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে বিয়ের আগে খুব বেশি মেলামেশা করার সুযোগ মিহিকার হয়নি。
মিহিকার মনে ধারণা ছিল, শাশুড়ি মানেই বুঝি একটু দূরত্ব, নিয়মের কড়াকড়ি আর একটা চাপা অস্বস্তি। এমনকি বিয়ের আগে তার নিজের মা-ও তাকে সাবধান করে বলেছিলেন, "দেখিস, সব বাড়ি একরকম হয় না। প্রথমে একটু মানিয়ে নিতে হয়। সব কথা মুখের ওপর বলবি না।" মিহিকা তখন শুধু মাথা নেড়েছিল। তবে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল— নিজেকে সে কারও জন্য বদলাবে না, কিন্তু আবার কাউকে অকারণ আঘাতও দেবে না।
বিয়ের পরের প্রথম সকাল। মিহিকার ঘুম ভাঙল চমৎকার এক চায়ের গন্ধে। চোখ মেলে তাকাতেই সে অবাক হয়ে দেখল, দরজার সামনে ট্রে হাতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং শাশুড়ি। মৃদুস্বরে বললেন, "উঠবি? চা ঠান্ডা হয়ে যাবে।" মিহিকা প্রচণ্ড অপ্রস্তুত হয়ে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল, "আপনি! আমি তো ভাবছিলাম আজ আমাকেই..."
শাশুড়ি হেসে বললেন, "প্রথম দিনেই বউকে রান্নাঘরে পাঠিয়ে দিলে লোকে বলবে আমি খুব নিষ্ঠুর শাশুড়ি।" দুজনেই একসাথে হেসে ফেলল। তাদের মধ্যকার জমানো একটা অদৃশ্য বরফ যেন গলে জল হয়ে গেল সেদিন।
কিন্তু জীবনের গল্প তো শুধু হাসির হয় না। এক সপ্তাহের মাথায় সম্পর্কে প্রথম ছোট ধাক্কাটা এল। মিহিকার অফিস ছিল বাড়ি থেকে বেশ দূরে। সকালে বেরোতে হতো খুব তাড়াতাড়ি, তাই আগের রাতেই সে নিজের আর অচিন্ত্যর জামাকাপড় গুছিয়ে রাখত। একদিন অফিস থেকে ফিরে সে আলমারি খুলতেই দেখল, কাপড়ের সব ভাঁজ বদলে গেছে। সব জামা অন্যভাবে সাজানো। নিজের গোছানো জিনিসে এমন রদবদল দেখে মিহিকা ভীষণ বিরক্ত হলো।
সে সোজা গিয়ে একটু গম্ভীর মুখে শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করল, "এগুলো কে করল?"
শাশুড়ি খুব সহজ গলায় বললেন, "আমি। তোর এত কষ্ট হয় দেখে ভাবলাম একটু গুছিয়ে দিই।"
মিহিকার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল। সে স্পষ্ট গলায় বলল, "কিন্তু আমার জিনিসে কেউ হাত দিলে আমি একটু অস্বস্তি বোধ করি।"
শব্দগুলো খুব স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু মিহিকার গলার সুরটা একটু কড়া হয়ে গিয়েছিল। শাশুড়ির মুখের হাসিটা হঠাৎ নিভে গেল। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি শুধু নিচু গলায় বললেন, "ও... ঠিক আছে। আর করব না।"
সেদিন রাতের খাবারের টেবিলে নেমে এল এক অদ্ভুত নীরবতা। অচিন্ত্য বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটেছে। রাতে শোয়ার ঘরে সে মিহিকাকে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে?"
মিহিকা পাশ ফিরে বলল, "আমি তো শুধু বলেছি আমার জিনিসে হাত না দিতে। এতে এমন কী অন্যায় করেছি?"
অচিন্ত্য একটু থেমে শান্ত গলায় বলল, "কথাটা ঠিক। কিন্তু মা হয়তো ভালোবেসেই করেছে। তোমার স্বাধীনতা যেমন দরকার, তাঁর ভালোবাসা দেখানোর ভাষাটাও তো আলাদা, সেটা বুঝতে হবে।" মিহিকা আর কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল।
পরদিন সকালে রান্নাঘরে গিয়ে মিহিকা দেখল শাশুড়ি একা বসে আলু কাটছেন। সে একটু ইতস্তত করে এগিয়ে গিয়ে বলল, "চা বানাব?"
শাশুড়ি না তাকিয়েই বললেন, "পারবি?"
"না পারলে শিখে নেব। আপনি শিখিয়ে দেবেন।"
শাশুড়ি এবার মুখ তুলে তাকিয়ে হেসে ফেললেন। চা বানাতে বানাতে মিহিকা নিজের অপরাধবোধ থেকে বলল, "কাল আমি একটু রুক্ষ হয়ে গিয়েছিলাম। সরি।"
শাশুড়ি এবার কাজ থামিয়ে মিহিকার দিকে তাকালেন, "সরি বলার দরকার নেই। তুই ভুল কিছু বলিসনি। আমাদের সময়ে নিজের আলমারি, নিজের ঘর— এসবের আলাদা ভাবনা ছিল না। সবকিছু সবাই মিলে ব্যবহার করতাম। কিন্তু তোদের সময়ে 'পার্সোনাল স্পেস' খুব জরুরি। আমাকেও সেটা শিখতে হবে।"
মিহিকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপনি এত সহজে মেনে নিলেন?"
শাশুড়ি মৃদু হেসে বললেন, "শোন মিহু, নতুন মানুষ এলে শুধু নতুন মানুষটাই বদলাবে কেন? পুরোনো মানুষটারও তো একটু বদলানো উচিত, তাই না? তবে বয়স হলে শেখার ইচ্ছা আর উৎসাহ দুটোই কমে যায়, তাই ভুলভ্রান্তি কিছু তো হবেই! একসাথে থাকতে থাকতে সেটাও একদিন ঠিক হয়ে যাবে..." কথাগুলো মিহিকার বুকের ভেতর খুব নরম সুরের মতো বাজল।
এরপর দিন গড়াতে লাগল। শাশুড়ি-বউয়ের রসায়নটা বদলে গেল। রবিবারে একসাথে বাজারে যাওয়া শুরু হলো। শাশুড়ি মিহিকাকে হাত ধরে শেখালেন, "মাছ কিনতে গেলে মাছের চোখ দেখতে হয়।" আর মিহিকা শাশুড়িকে শেখাল, "অনলাইনে কিছু কিনতে গেলে আগে রিভিউ দেখতে হয়।"
একদিন শাশুড়ি কৌতূহল নিয়ে বললেন, "তোদের ওই পাস্তা না পিৎজা... যেগুলো অর্ডার করে একলা একলা খাস, আমাকে একদিন খাওয়াবি?"
মিহিকা অবাক হয়ে বলল, "আপনি খাবেন?"
"বয়স হয়েছে বলে কি নতুন কিছু খেতে নেই?"
মিহিকা তখন কটমট করে বরের দিকে তাকাল, "বলেছিলাম না! তুমিই তো বলেছিলে মা বাইরের খাবার পছন্দ করেন না, এমনকি আমরা খাই সেটাও না!"
শাশুড়ি তখন ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "রোজ রোজ বাইরের খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালোবিধা ভালো না, তাই বারণ করতাম। তাই বলে মাঝে মধ্যে খেলেও লুকিয়ে খাওয়ার কি দরকার? আগে আমি সবরকম খাবার ঘরেই বানিয়ে দিতাম, এখন পারিনা। তোরা ব্যস্ত, তাই মন চাইলে কি খাবি না?"
সেদিন মিহিকা পাস্তা অর্ডার করল। শাশুড়ি প্রথমে দেখে নাক কুঁচকে বললেন, "এতো সাদা সাদা কেন?" তারপর মুখে দিয়ে বললেন, "মন্দ না। তবে একটু কাঁচালঙ্কা দিলে আরও ভালো হতো।" অচিন্ত্য হেসে বলল, "মা, তুমি ইতালিকেও বাঙালি বানিয়ে দিলে!"
কিন্তু সত্যিকারের সম্পর্কের গভীরতা পরীক্ষা হয় কঠিন সময়ে। একদিন অফিসে মিহিকার একটা বড় প্রেজেন্টেশন ছিল, প্রচণ্ড মানসিক চাপ। সকালবেলা তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে রান্নাঘরে শাশুড়ির সাথে তার তুমুল ঝগড়া হয়ে গেল।
"খাবার না খেয়ে বেরোচ্ছিস কেন?"
"কারণ আমি লেট হয়ে যাচ্ছি!"
"পাঁচ মিনিটে ভাত খাওয়া হয়ে যায়।"
"সবকিছু কি আপনার মতো ধীরে করা যায়?"
কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যেতেই মিহিকা থমকে গেল। শাশুড়ির মুখটা মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে গেল, তিনি আর একটি কথাও বললেন না। মিহিকা সারাদিন অফিসে এক তীব্র অপরাধবোধে কাটল। সন্ধ্যায় অপরাধী মুখে বাড়ি ফিরে সে দেখল, ডাইনিং টেবিলে তার প্রিয় লেবুর শরবত ঢাকা দেওয়া রাখা আছে। আর তার নিচে একটা ছোট্ট চিরকুট— "রাগ করলে করিস, কিন্তু না খেয়ে যাস না। - মা।"
"মা" শব্দটা পড়ে মিহিকার চোখের কোণ ভিজে গেল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে শাশুড়িকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, "আমি খুব খারাপ কথা বলেছি।"
শাশুড়ি শুধু শান্ত গলায় বললেন, "যাদের আপন ভাবি, তাদের ওপরেই তো রাগ করি।"
সেদিন রাতে দুজনে বসে অনেক কথা বলল। শাশুড়ি নিজের অতীত হাতড়ে বললেন, "জানিস, আমি যখন এই বাড়িতে এসেছিলাম, আমার শাশুড়ি খুব কঠিন ছিলেন। আমি অনেক কেঁদেছি। তখনই ঠিক করেছিলাম, আমার বোমা যেন আমাকে ভয় না পায়।"
মিহিকা ধীরে বলল, "আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো আমাকে বিচার করবেন।"
"করেছি।" শাশুড়ি হাসলেন。
মিহিকা চমকে উঠে বলল, "কী বিচার?"
"দেখেছি, আমার ছেলে তোকে দেখে বেশি হাসে। তোর সাথে বেশি সময় কাটায়। তাহলে তুই খারাপ হতে পারিস না।" দুজনেই একসাথে খিলখিল করে হেসে উঠল।
এরই মধ্যে একদিন নতুন একটা ঝামেলা হলো। সেদিন অফিস থেকে ফিরেই মিহিকা ড্রইংরুমে থমকে দাঁড়াল। পুরো ঘরের পর্দা বদলে গেছে, সোফার কভারও নতুন। পুরোনো হালকা ধূসর কভার সরিয়ে সেখানে শাশুড়ি ফুলের নকশার উজ্জ্বল কাপড়ের কভার লাগিয়েছেন। মিহিকা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল, তারপর রান্নাঘরে গিয়ে একটু ক্ষুব্ধ গলায় বলল, "মা, এগুলো আপনি বদলেছেন?"
শাশুড়ি খুশি গলায় বললেন, "হ্যাঁ! কেমন হয়েছে বল তো? ঘরটা কেমন প্রাণ ফিরে পেল, না?"
মিহিকার মুখে হাসি এল না। সে বলল, "কিন্তু আমাকে একবার জিজ্ঞেস করা যেত না?"
শাশুড়ি একটু থমকে গেলেন, "জিজ্ঞেস? কেন?"
"কারণ এটা আমারও বাড়ি। আমি কী চাই, সেটাও তো গুরুত্বপূর্ণ।"
শাশুড়ির গলায় এবার অভিমান ভর করল, "তা হলে কি এই বাড়িতে আমার কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই?"
মিহিকার গলাও একটু উঁচুতে চড়ল, "সবকিছু কি শুধু আপনার পছন্দেই চলবে? নিজের বাড়িতে নিজের মতো একটা পর্দা, একটা সোফার কভার পছন্দ করারও অধিকার থাকবে না আমার?"
কথাগুলো বাতাসে ভারী হয়ে ঝুলে রইল। অচিন্ত্য সেদিন বাড়ি ফিরেই বুঝল— ঘরে আবার ঝড় উঠেছে। কিন্তু এবার সে কোনো পক্ষ না নিয়ে চুপ রইল। সম্পর্কের জটিলতায় যখন তৃতীয় কেউ ঢোকে, কথা আরও জটিল হয়। কিছু কথা দুই মানুষের নিজেদের মধ্যেই মিটিয়ে নিতে হয়।
সেদিন গভীর রাতে মিহিকা জল নিতে গিয়ে দেখল, শাশুড়ি নিজের ঘরের আলো জ্বেলে বসে আছেন। হাতে একটা পুরোনো অ্যালবাম, আর তিনি আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন।
মিহিকা অপরাধী পায়ে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, "কী দেখছেন?"
শাশুড়ি ছবির দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বললেন, "তোর শ্বশুর এই পর্দাটা কিনেছিল। এই ফুলেল নকশা ওর খুব পছন্দ ছিল। প্রতি তিন-চার বছর অন্তর আমি একই রকম কিছু কিনে আনি... মনে হয়, ও এখনও এই ঘরে আছে।"
মিহিকা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার নিজের রাগটাকে খুব তুচ্ছ, খুব ছোট মনে হতে শুরু করল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে শাশুড়ির পাশে বসল, "আমি জানতাম না..."
শাশুড়ি মৃদু হেসে বললেন, "তুই জানবি কী করে? তুই তো নতুন। আর আমি ভুলে যাই, তুইও এই বাড়িতে নিজের ছাপ রাখতে চাস। শুধু আমার স্মৃতি দিয়ে তো আর সংসার চলে না!"
মিহিকা শাশুড়ির হাতটা জড়িয়ে ধরে বলল, "আমিও ভুল করেছি। আমি ভাবছিলাম, আপনি শুধু নিজের মত চাপিয়ে দিচ্ছেন। ভাবিনি, এর পিছনে একটা মানুষ লুকিয়ে আছে...একটা পবিত্র স্মৃতি।"
পরদিন সকালে সব অভিমান ধুয়ে মুছে গেল। দুজনে একসাথে বাজারে গেল নতুন পর্দা কিনতে। দোকানদার কাপড়ের রোল নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী রঙ দেখাব?"
মিহিকা বলল, "আমি হালকা ধূসর চাই।"
শাশুড়ি বললেন, "আমি একটু ফুলেল চাই।"
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। শেষে তারা যেটা কিনে বাড়ি ফিরল, সেটা হলো— সুন্দর ধূসর রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর ছোট ছোট ফুলেল নকশা করা কাপড়。
বাড়ি ফিরে সেই পর্দা দেখে অচিন্ত্য হেসে বলল, "বাহ! দুজনের কম্প্রোমাইজ?"
শাশুড়ি সঙ্গে সঙ্গে শুধরে দিয়ে বললেন, "না, এটা কম্প্রোমাইজ নয়।"
মিহিকা হেসে যোগ করল, "এটা সহাবস্থান।"
দুজনের পছন্দ একটু একটু করে মিশে ঘরটা সেদিন যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠল। কারণ, একটা বাড়ি শুধু ইট-সিমেন্টের দেয়াল নয়, সেখানে পুরোনো স্মৃতি আর নতুন স্বপ্ন— দুটোকেই জায়গা দিতে হয়।
কয়েক মাস পর মিহিকার মা বেড়াতে এলেন। তিনি রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন, শাশুড়ি আর মিহিকা একসাথে হাসিমুখে কাজ করছে। একজন ডাল নাড়ছে, আরেকজন ফোনে ইউটিউব দেখে নতুন রেসিপি শেখাচ্ছে। কাজের মাঝেই আবার খুনসুটিও চলছে—
"এতো নুন দিয়েছিস কেন?"
"আপনিই তো বললেন!"
তারপর আবার দুজনের একসাথে খিলখিলিয়ে হাসি।
মিহিকার মা মৃদু হেসে মেয়েকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, "ভালো আছিস তো রে?"
মিহিকা মায়ের দিকে তাকিয়ে পরম তৃপ্তির সাথে বলল, "খুব। কারণ এখানে আমাকে নিজেকে বদলে ফেলতে হয়নি। আমাকে ওরা একটু বুঝেছে, আমিও ওদের একটু বুঝেছি।"
দূর থেকে শাশুড়ি তাদের কথা শুনতে পেয়ে মুচকি হেসে বললেন, "সম্পর্কে ভালোবাসা লাগে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি লাগে— বোঝাপড়া।"
মিহিকার মা হেসে বললেন, "নিজের মেয়ে হলেও কি বলব দিদি, আমার কিন্তু মনে মনে ভয় ছিল। আজকালকার মেয়েরা তো শ্বশুরবাড়িতে থাকতে চায় না। আলাদা থাকলেই শান্তি।"
মিহিকা উত্তর দেওয়ার আগেই শাশুড়ি গম্ভীর ও পরিপক্ব গলায় বললেন, "শান্তি আলাদা থাকলে আসে না দিদি, শান্তি আসে মন বড় হলে। একসাথে থাকলে মতের অমিল হবেই। কিন্তু সম্পর্ক মানে তো জেতা নয়... একটু হারাও, একটু মানাও। কথাবার্তা না থাকলে বুঝব কী করে, কে কী চায়? তাই ওটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"
মিহিকার মা মেয়েকে আদর করে বললেন, "সম্পর্ক কেউ তৈরি করে দেয় না রে। সম্পর্ক বানাতে হয়, প্রতিদিন, একটু একটু করে। তুই সেটা পারবি, সেই বিশ্বাসটা আজ পাকা হলো।" মিহিকা শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "সব মা গুলো আসলে একই রকম।"
সব সংসার নিখুঁত হয় না। আজও কখনও মিহিকা অফিস থেকে দেরি করে বাড়ি ফিরলে শাশুড়ি বকেন। আজও শাশুড়ি মিহিকার ঘর গুছিয়ে দিলে মিহিকা মুখ বাঁকায়। কিন্তু এখন দুজনেই একটা মহাসত্য জেনে গেছে—
রাগের নিচে অভিমান আছে, আর অভিমানের নিচে লুকিয়ে আছে গভীর ভালোবাসা।
আর ভালোবাসা মানে সবসময় একরকম হওয়া নয়, ভালোবাসা মানে ভিন্ন হয়েও পরম শ্রদ্ধায় পাশাপাশি থাকা। আজকের সময়ে যখন সবাই বলে, "আলাদা থাকলেই ভালো..." হয়তো সত্যি, অনেক ক্ষেত্রে সেটাই প্রয়োজন। কিন্তু যদি দুপক্ষের কেউ একজন একটু কম জেতে, আর আরেকজন একটু বেশি বোঝে, তাহলে একই ছাদের নিচে দুটি ভিন্ন প্রজন্ম খুব সুন্দর করে বাঁচতে পারে।
কারণ, সংসার শুধু একসাথে থাকার নাম নয়, সংসার হলো একটু মানিয়ে নেওয়ার গল্প। পুরোনো হাতটা যখন নতুনের হাত ধরে পরম মায়ায় বলে— "চল... তুই একটু বদলাস, আমিও একটু বদলাই।"
সমাপ্ত
সংগৃহীত