১. নতুন আকাশ, নতুন শিক্ষক
বিয়ের পর নতুন আকাশটার নিচে নিজেকে বড্ড অচেনা লাগছিল। রান্নাবান্নার 'র' অক্ষরটাও তখন ভালো করে বুঝতাম না। রান্নাঘরে গিয়ে যখন আনাড়ির মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম, আমার শাশুড়ি মা তখন পরম মমতায় হাত ধরে ধরে সব শিখিয়ে দিতেন। মাঝেমধ্যে উনি হেসেই বলতেন,
"এই ইউটিউবের যুগের মেয়ে হয়েও রান্নাটা শিখতে পারলা না মা!"
আমি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যেতাম। কী উত্তর দেব খুঁজে না পেয়ে শুধু ঠোঁট টিপে হাসতাম। শাশুড়ি মা আমার দ্বিধাটা বুঝতেন। পরম নির্ভরতায় বলতেন, "সমস্যা নাই। আস্তে আস্তে শিখে যাবা। আমিই তোমার ইউটিউব, তোমার রান্নার শিক্ষক। তবে হ্যাঁ, মাস শেষে কিন্তু বেতন দিও!"
বলেই তিনি ঘরের দেওয়াল কাঁপিয়ে হাসতেন। আমি তো এ বাড়ির নতুন বউ, তখনও অতটা ফ্রি হতে পারিনি যে ওনার সঙ্গে রসিকতায় মেতে উঠব, গলা ছেড়ে হি হি করে হাসব কিংবা কথার পিঠে পাল্টা কথা বসিয়ে দেব। তবে আমি মনে মনে ঠিকই বুঝতে পারতাম—আমার শাশুড়ি মা আমার সঙ্গে সহজ হতে চাইছেন। আমার মনে জায়গা করে নিতে চাইছেন, আর ওনার নিজের মনেও আমায় পরম যত্নে জায়গা করে দিচ্ছেন। আমি শুধু লাজুক হেসে বলতাম, "अच्छा মা।"
২. একটি ভাঙা অতীত এবং নতুন নিয়মের জন্ম
শ্বশুরবাড়িতে আসার পর শাশুড়ি মায়ের তৈরি করা প্রায় সব নিয়মই আমায় ভীষণ অবাক করত। আর দশটা চেনা মধ্যবিত্ত পরিবারের চেয়ে এ বাড়ির নিয়মগুলো ছিল একেবারে আলাদা। একদিন কাজের ফাঁকে মা ওনার জীবনের গল্প শোনালেন:
"জীবনে অনেক কষ্ট করেছি মা। বাপের বাড়িতেও মেয়ে হিসেবে ছেলেদের তুলনায় ছোট হয়েই থেকেছি। সমাজ, পরিবার সবাই ছোট করে রেখেছিল। বিয়ের পর শাশুড়িও সেই একই আচরণ করলেন, ছোট করেই রাখলেন। তবে আমি তাকে কখনো ছোট করিনি। আমার শাশুড়ি যখন বয়সের ভারে ঘরে পড়ে গেলেন, তখন ওনার সব সেবাযত্ন আমি নিজের হাতে করেছি। তোমার শ্বশুরকে আমি নিজে তাগাদা দিয়ে দিয়ে মার সেবা করিয়েছি।
আমার শাশুড়ি শেষ বয়সে বিছানায়ই পায়খানা-প্রস্রাব করতেন। তোমার শ্বশুর নিজের হাতে ওনার মায়ের ময়লা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করত। আমিই তাকে বলে বলে এসব কাজে অভ্যস্ত করিয়েছিলাম। আমার শাশুড়ি বেঁচে থাকতে থাকতেই আমার ছেলে-মেয়েরা জন্মায়। ওনার সামনেই আমি আমার ছেলে-মেয়েদের ছোটবেলা থেকে ভিন্ন নিয়মে বড় করতে শুরু করি। তিনি নিজের চোখে দেখে গেছেন, এই বাড়িতে আগে যে নিয়মকানুন ছিল, ঠিক তার উল্টো নিয়মটা আমি চালু করেছি। ওনার মৃত্যুর আগে আগে তিনি আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন—'আমি তোমার ওপর খুশি মা। আগের মানুষ তো, এসব শিক্ষাদীক্ষা কোনোটিই আমার ছিল না। বুঝতাম না তেমন কিছুই। তুমি আমার চোখ খুলে দিছো মা। মরার আগে তোমার এসব দেখে মরতে পারতেছি, এটাই শান্তি।'"
৩. রান্নাঘর ও খাবারের অদ্ভুত সমতা
ওদের বাড়ির খাবারের ক্ষেত্রের নিয়মটা আমায় সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল। কারণ আমাদের সমাজে সাধারণত বাড়ির নারীরা সবাইকে খাইয়ে শেষে ঠান্ডা, পড়ে থাকা খাবারটুকু খায়। কিন্তু এ বাড়ির নিয়ম ছিল সম্পূর্ণ উল্টো—রান্না শেষ হবার পরপরই যে রান্না করেছে, সে হাত-মুখ ধুয়ে সবার আগে খাবে। তার সাথে খাবে সে, যে খাবার পরিবেশন করবে। আর বাকিরা সব একসাথে বসে গল্প করতে করতে পরে খাবে।
রান্না বেশিরভাগ সময় আমি আর আমার শাশুড়িই করতাম, আমাদের সাহায্য করত ননদেরা। মাঝেমধ্যে ননদদেরও রান্না করতে হতো। যেদিন ওরা রান্না করত, নিয়ম মেনে সেদিন সবার আগে ওরাই খেতে বসত。
শ্বশুরবাড়ি গিয়ে শাশুড়ির কাছ থেকে এত আদর-সোহাগ পাব, তা বাপের বাড়িতে বসে কখনো কল্পনাও করিনি। বিয়ের আগে নিজের বাড়িতে ভাইদের জন্য মাছের মাথা কিংবা ভালো টুকরোগুলো বরাদ্দ থাকত, আমরা মেয়েরা খুব কমই পেতাম। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম এক অদ্ভুত সমতা। শাশুড়ি মা খাবারের ক্ষেত্রে কাউকেই বাড়তি প্রাধান্য দিতেন না। ঘুরেফিরে বাড়ির সবাই সপ্তাহে অন্তত একদিন হলেও মাছের মাথা পায়। আমিও নতুন বউ হিসেবে কয়েকবার পেয়েছি, কোনো বৈষম্য ছাড়াই।
৪. ছুটির দিন ও স্বাবলম্বী পুরুষ
সবচেয়ে বেশি অবাক হতাম প্রতি মাসের একটা নির্দিষ্ট সময়ে, যখন আমার পিরিয়ড হতো। ওই দিনগুলোতে আমাকে কিচ্ছু করতে হতো না। আমার একমাত্র কাজ ছিল বিছানায় শুয়ে থাকা, গল্পের বই পড়া আর সবার সাথে খোশগল্প করা। মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন,
"রেস্ট নেও মা। এই সময়ে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাও তার কাজ করা থেকে তোমায় ছুটি দিয়েছেন। এটা তোমার বিশ্রামের সময়।"
এই নিয়মটা শুধু আমার জন্য নয়, আমার ননদদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল।
পাশাপাশি এ বাড়ির পুরুষদের জন্য নিয়ম ছিল—তারা নিজেদের কাপড়চোপড় নিজেরাই ধুবে এবং ইস্ত্রি করবে। তবে আমার শ্বশুরমশাই বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ছিলেন বলে ওনার কাপড়চোপড় আমার স্বামী, দেবর কিংবা ননদেরা ধুয়ে দিত। ওনার কাজ করে দেওয়ার জন্য ছেলে-মেয়েরা কেমন যেন মুখিয়ে থাকত! বাবার কোনো কাজ করে দিতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করত তারা। শ্বশুরমশাই কিছু করতে বলেছেন আর কেউ মুখ মলিন করেছে—এমন দৃশ্য আমি চার বছরেও দেখিনি।
তবে শাশুড়ি মায়ের কাজ করার সুযোগ এদের কেউই কোনোদিন পায়নি, এমনকি আমিও না। মা সব সময় বলতেন, "আমি যেন কারোর ওপর নির্ভর না করে, কারোর সহযোগিতা না নিয়ে জীবন পার করতে পারি!"
ছেলে-মেয়েরা আফসোস করে বলত, "মা, তুমি আমাদের জান্নাত লাভের উসিলা। তুমি যদি সুযোগই না দাও, তবে আমরা সওয়াব কামাব কী করে?" মা হাসতেন, বলতেন, "মাকে খুশি করলেই জান্নাত পাবা। তোমাদের মা তখনই খুশি হবে, যখন তোমরা সবাই নিজেরা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারবা। কারোর ওপর নির্ভরশীল হবা না।"
৫. বিদায় এবং অলিখিত সংবিধানের উত্তরাধিকার
আল্লাহ শাশুড়ি মায়ের সেই ইচ্ছে পূরণ করেছিলেন। ওনার ছেলে-মেয়েরা যেমন আত্মনির্ভরশীল হয়েছে, তেমনি ওনাকে মৃত্যুর আগে কখনো বিছানায় পড়ে থাকতে হয়নি। কারোর সেবার প্রয়োজন হয়নি ওনার। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন।
সেদিন আসরের আজান হলে তিনি বাথরুমে গিয়ে ওজু করে এলেন। নামাজ পড়বেন বলে জায়নামাজ বিছালেন। কিন্তু নামাজে আর দাঁড়াতে পারলেন না। মৃদু স্বরে বললেন, "শরীরটা বড় দুর্বল লাগছে। মাথাটা নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।"
বলতে বলতেই তিনি জায়নামাজের ওপর শুয়ে পড়লেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি চিরদিনের মতো চোখ বুজলেন। জায়নামাজটাই হলো ওনার শেষ শয্যা।
দিনগুলো কীভাবে যেন লাগামহীন ঘোড়ার মতো দৌড়ে চলে যায়। মা মারা গিয়েছেন আজ চার বছর হয়ে গেল। এরিমধ্যে আমার ঘর আলো করে টুইন বাবু এসেছে—একটা ছেলে, একটা মেয়ে। ওদের বয়স এখন দুই বছর। মাত্র কথা বলতে শিখেছে, হাঁটতে শিখেছে, ঘরজুড়ে দৌড়াতেও জানে।
আমি আমার শাশুড়ির শিক্ষায় সম্পূর্ণ দীক্ষিত হয়েছি। ওনার রেখে যাওয়া সুন্দর আদর্শগুলোর সবকিছুই আমি মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছি। এর উল্টো কিছু আমি নিইনি, নেওয়ার প্রয়োজনও হয়নি, আর কখনো নিবও না।
আমি মনে মনে শক্ত প্রতিজ্ঞা করেছি—আমার সংসারেও আমার শাশুড়ির তৈরি করে যাওয়া সেই 'অলিখিত সংবিধান' আজীবন বলবৎ থাকবে। আর এর চর্চা আমি শুরু করব আমার এই দুই বছরের ছেলে আর মেয়েকে একেবারে সমানভাবে বড় করে তোলার মধ্য দিয়েই।
গল্পের মূল সুর: একটি পরিবারে শাশুড়ি যদি একনায়ক না হয়ে একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক হন, তবে সেই সংসারটি নরক না হয়ে পৃথিবীর বুকেই এক টুকরো জান্নাত হয়ে ওঠে।
সংগৃহীত