সকালবেলাই চিকু তীরবেগে ছুটে এসে বসার ঘরে বাবার চেয়ারের পেছনে আশ্রয় নিল। হন্তদন্ত হয়ে পিঠ ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "বাওয়া, বাঁচাও!"
রোজ কম করেও বার ছয়েক বাবাকে এরকম পরিত্রাতার ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়। এখন ব্যাপারটা ক্রমশ প্রফেশনাল লেভেলে চলে এসেছে। তাই খবরের কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই নিরুত্তাপ গলায় বাবা জানতে চাইল, "আজ কী কেস?"
"আজ, অনেক কিছু করেছি। মা আর রাখী পিপি দুজনেই আসছে!" বলেই ঝড়ের বেগে চিকু নিজের সকালের দুষ্কর্মের দীর্ঘ স্বীকারোক্তি দিতে লাগল। সে ঘরে রাখা কেকের বাক্স ছিঁড়ে মেঝেতে আলপনা দিয়েছে, বিড়াল কাজুর লেজ ধরে বারকয়েক টেনেছে, জলের বোতল উল্টে বিছানা ভিজিয়েছে, সাধের টিভি স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে ছুঁচোর মতো হাতি এঁকেছে, আর শেষমেশ—রাখীদির ঘর মোছার বালতির জলে দোলের লাল রঙ মিশিয়ে দিয়েছে।
শেষ অপরাধটাই আসলে মারাত্মক। রাখীদি প্রথম দশ মিনিট বুঝতেই পারেনি কেন মার্বেলের সাদা মেঝেতে ন্যাতা বুলোনো মাত্র সেটা লালে লাল হয়ে যাচ্ছে। বার তিনেক বালতির জল পাল্টেও যখন কোনো লাভ হয়নি, তখন ভালো করে ন্যাতা পরীক্ষা করে আসল ব্যাপারটা ধরা পড়েছে। ন্যাতা বালতির জলে ডোবানো ছিল, আর চিকু মোক্ষম সুযোগ বুঝে তাতেই লাল রঙ ঢেলে রেখেছিল।
আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে চিকু বলল, "বাঁচিয়ে দাও বাওয়া! নাইলে আজ তোমার ছেলে গেল!" নিঃস্পৃহ গলায় বাবা বলল, "তবে যে বলিস, তুই মায়ের ছেলে?" "আর বলব না, সত্যি বলছি। এবার বাঁচিয়ে দা—ও! ওরা আসছে!"
বলতে না বলতেই রাগী মুখে ঘরে প্রবেশ করল রাখীদি আর চিকুর মা। পেছনে বেশ কিছুটা নিরাপদ দূরত্ব রেখে মুনু। তার শান্ত মুখ দেখে মনে হলো সে ইতিমধ্যেই সরকারি সাক্ষী হয়ে গেছে।
রাখীদি ঘরে ঢুকেই একটা অস্পষ্ট রাগী গর্জন করল। মুনু মায়ের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, "ওই যে চিকা, বাবার চেয়ারের পেছনে লুকিয়ে।" রাখীদি আর মায়ের সাড়া পেয়েই চিকু চেয়ারের পেছনে গুটিসুটি মেরে বসে পড়েছিল। এখন মুনুর এই আকস্মিক বেইমানিতে সে স্থানকালপাত্র ভুলে, তেড়ে উঠে বলল, "গদ্দার মুনু! নেহি ছোড়ুঙ্গা তুঝে!"
মুনু নিরীহ মুখে মায়ের দিকে চেয়ে বলল, "ওই দেখো মা, আবার সিনেমার ডায়লগ দিচ্ছে।"
মায়ের হাতে তখন একটা নিম গাছের সরু ডাল। তাড়াহুড়োয় আর কিছু না পেয়ে বাগান থেকেই কুড়িয়ে এনেছে মনে হয়। তাতে এখনো বেশ কয়েকটা পাতা লটরপটর করছে। চিকুর দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে মা ডাক দিল, "বেরিয়ে আয় চেয়ারের পেছন থেকে।" "না! তুমি মারবে," চিকুর গলা তখন কাঁদো কাঁদো। "নিজে বেরিয়ে এলে কম মারব। আমি টেনে আনলে কিন্তু বেশি খাবি।" চিকু একটু দমে গিয়ে বলল, "কত কম? হাত দিয়ে মারবে তো? ওই নিমগাছ দিয়ে নয় কিন্তু!" "তোকে আমি অত বলতে পারব fix না। তুই বেরোবি কি না বল?" চিকু উপায় না দেখে পরম ব্যাকুলতায় ডাকল, "বাওয়া!"
রাখীদি এবার তেড়ে উঠল, "অমনি বাবা নয়? বিপুদে পড়লেই বাবা! বাপের আদরেই তুমি মাথায় উঠেছ। বেরিয়ে আয় বাপের পেছন থেকে।" মুনু দূর থেকে একটু সাহস দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, "চলে আয় চিকা। মা কিচ্ছু বলবে না রে। শুধু একটু মারবে। তুই তো আয়রন ম্যান, তোর কিচ্ছু হবে না।"
মাঝে মাঝেই চিকু কোনো কারণ ছাড়াই নিজেকে 'আই অ্যাম আয়রন ম্যান' বলে মুনুর ওপর লাফিয়ে পড়ে। মুনু এখন সুযোগ বুঝে তারই শোধ তুলছে। তবে এখন চিকুকে দেখে মনে হলো তার আয়রনে বড্ড জং ধরে গেছে। সে কিছুতেই চেয়ারের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে নড়তে রাজি নয়। চেয়ারের পেছন থেকেই সে চেয়ারে বসা বাবার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
বাবা এবার পরিস্থিতি সামলাতে হাত তুলে রাখীদিকে বলল, "যাক গে, ছেড়ে দাও। তুমি অন্য ন্যাতা নিয়ে ঘরটা মুছে নাও না।" রাখীদি এবার চটে লাল হয়ে গেল, "এই দাদার জন্যই নয় চিকুটা এত বেড়ে গেছে! তুমি দেখলে বউদি? আমি বলেছিলুম না, দাদা ঠিক ওকে ছেড়ে দিতে বলবে। আগের দিন দু-দুবার আমার জলের বালতি উল্টে দিল। দিয়ে বলল—ভালো করে মোছো পিপি, নানালে ঘর পোস্কার হচ্ছে নে। এরকম করলে কাজ করা যায় বলো?"
মুনু এবার দল বদলে বাবার পক্ষ নিল। রাখীদিকে উদ্দেশ্য করে বলল, "এই পিপি, সেদিন তো বাবা চিকাকে বকছিল। তুই-ই তো বললি—যাক গে দাদা, ছেড়ে দাও, ছেলেমানুষ। এখন আবার আমার বাবার নামে দোষ দিচ্ছিস?"
চোখ পাকিয়ে রাখীদি মুনুকে ধমক দিল, "তুইও কম নোস। সেদিন চিকাকে কে বলেছেল বাগান থেকেন ব্যাঙ ধরতে? তুই তো! নিজের মুরোদ নেই, খালি ভাই কে দিয়ে অন্যায় কাজ করানো! তোকে আগে মারা দরকার।" মুনু অমনি মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "এই, আমি মায়ের বড় মেয়ে। আমাকে ওরকম বললে মা তোকে দেবে, জানিস?" রাখীদি আর গম্ভীর থাকতে পারল না, ফিক করে একটু হেসে ফেলল।
তারপর চিকুর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি বলছি দাদা, চিকাকে তুমি শাসন করো। খুব বেয়াড়া হয়েছে ও।" চিকু চেয়ারের আড়াল থেকে মুখ বাড়িয়ে বলল, "আমি নয়, তুই বেয়াড়া।" বাবা এবার চিকুকে চোখ পাকাল, "এভাবে কথা বলবে না চিকু। পিসি হয় ও। সরি বলো।" চিকু সঙ্গে সঙ্গে বাধ্য ছেলের মতো বলল, "সরি বেয়াড়া রাখী পিপি।"
রাখীদি কাঁই কাঁই করে উঠল, "শুনলে? শুনলে তো বউদি? ও ছেলে বাপকে এক হাটে বেচে অন্য হাটে কিনে আনবে।"
মা এবার শক্ত মুখে এগিয়ে এল। ঘাড় ধরে চেয়ারের পেছন থেকে চিকুকে টেনে বের করল। চিকু তারস্বরে চিৎকার শুরু করতেই মা বলল, "এখনো মারিনি। পরে চেঁচাস। আগে চল।" বাবা পেছন থেকে বলল, "মেরো না। ওকে একটু বুঝিয়ে বলো।" মা সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে রাখীদিকে বলল, "রাখীদি, তুমি তোমার কাজ করে নাও। আমি ওদের দেখছি।" রাখীদি আঙুল তুলে দু-ভাইবোনকে শাসাল, "এইবার বুঝবে! খালি শয়তানি?"
শাস্তিস্বরূপ দুজনকেই তৎক্ষণাৎ পড়তে বসতে হলো। মুনু যেহেতু রাজসাক্ষী ছিল, তাই তার সাজার মেয়াদ কম—দশটা যোগ আর ছটা বিয়োগ।
কিন্তু চিকুর অপরাধ গুরুতর। তার শাস্তি হলো—পাঁচ পাতা হাতের লেখা। চিকুর হাতের লেখা এমনিতে ভয়ংকর। কালিতে কাঁকড়া ডুবিয়ে খাতায় ছেড়ে দিলে বোধহয় ওর চেয়ে দেখতে ভালো হয়। তাই ওটাই তার জন্য যোগ্য শাস্তি বিবেচিত হলো।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে মুনু লক্ষ্মী মেয়ের মতো অঙ্কে মন দিল। চিকু খাতা আর পেনসিল নিয়ে খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকেই হাঁক ছাড়ল, "বাওয়া!" বাবা নিজের কাজে মগ্ন ছিল, একটু বিরক্ত হয়ে বলল, "আবার কী বলছিস? লেখ না।" "আরেঃ! কী লিখব সেটা তো বলে দাও?" "যে লিখতে বলেছে তাকে জিজ্ঞাসা কর। আমি বলেছি নাকি?" "আরেঃ, মা তো এখানে নেই। বাইরে রান্নাঘরে।" "বাইরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে আয়।"
চিকু উঠে গেল। একটু পরেই ফিরে এসে খুব মনোযোগ দিয়ে লিখতে বসল। মিনিট পাঁচেক পরেই দেখা গেল সে খাতা-পত্র ফেলে সানন্দে উঠে পড়েছে। মা ঘর মোছার তদারকি শেষ করে ভেতরে এসে জিজ্ঞাসা করল, "কী হলো? তোর লেখা শেষ?" "হো গিয়া।" "কই? নিয়ে আয় খাতা।"
চিকু বুক ফুলিয়ে খাতা নিয়ে এল। মায়ের খাতা খোলা, আর তার পরেই ঘরে যেন একটা পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটল। "এ কী লিখেছিস তুই? পাতা জোড়া একটাই শব্দ? পাঁচ পাতা ধরে শুধু 'বাবা' লিখেছিস কেন? কই কোথায় তুমি? এসে দেখে যাও তোমার গুণধরের কীর্তি!"
বাবা তটস্থ হয়ে নিজের কাজ ছেড়ে উঠে গিয়ে দেখল—চিকু এক পাতা জুড়ে বিরাট বড় করে লিখেছে 'বাবা'। পর পর পাঁচ পাতায় শুধু একটা করেই শব্দ। বিরাট বিরাট অক্ষরে লেখা—'বাবা'!
হতভম্ব হয়ে বাবা জিজ্ঞাসা করল, "এর মানে কী রে চিকু?" চিকু খুব সরল মুখে উত্তর দিল, "আরেঃ! মা-ই তো বলল, 'বাবা' লিখতে।"
বাবা অবাক হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকাতেই মা চিড়বিড়িয়ে উঠল, "আমার দিকে কী দেখছ অমন করে? আমি ওরকম বলতে পারি? আমি বলেছিলুম—'বাবা'। মানে, বাবা কে জিজ্ঞাসা কর কী লিখবি। আর তোমার এই পিতৃভক্ত ছেলে পুরো পাঁচ পাতা জুড়ে শুধু 'বাবা' লিখে বসে আছে!"
বাবা আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। হেসে ফেলে বলল, "যাক, তবু তো কিছু লিখেছে।" "হেসো না, সবেতে ওরম হেসো না তো তুমি," মা রাগ দেখাল, "এক পাতা জুড়ে শুধু একটা 'বাবা'! এর নাম হাতের লেখা? ওই করে পাঁচটা পাতা নষ্ট করেছে! এটা ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি? খাতা কি পয়সা দিয়ে কিনতে হয় fix না? এইভাবে কেউ পাতা নষ্ট করে? পাতা কি গাছে ফলে? কী রে বাঁদর? যা, আবার ঠিক করে নতুন করে লেখ।"
শেষ কথাটা চিকুর উদ্দেশ্যে বলে মা হনহন করে চলে গেল। বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে নিজের জায়গায় ফিরে গেল।
চিকু গোঁজ হয়ে মুখ হাঁড়ি করে খাতা পেনসিল নিয়ে বাবার টেবিলের পাশে এসে বসল। খাতার দিকে তাকিয়ে গজগজ করতে করতে বাবাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, "আচ্ছা বাওয়া, পাতা তো গাছেই হয়, না?" বাবা আলতো হেসে বলল, "হুঁ।" চিকু তখন খাতাটা টেনে নিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে গিয়ে বলল, "তাহলে মা কেন বলল—পাতা কি গাছে ফলে? মা কি বোকা নাকি ?"
সংগৃহীত