অবহেলা আর অধিকারের লড়াই (পর্ব - ১)

সংসারের সব কাজ মুখ বুজে সহ্য করলেই সে 'লক্ষ্মী বউ', আর নিজের অধিকার বা পেটের ক্ষুধার কথা বললেই সে 'চোর' বা 'পরের মেয়ে'? সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর ওপর শাশুড়ির নির্মম অত্যাচার আর কাপুরুষ স্বামীর অন্ধ অহংকারের এক মর্মান্তিক কাহিনী।


সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা নিশিতা। এই শরীরে যেখানে তার বাড়তি যত্ন আর পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন, সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সংসারের খাটুনিতেই তার দিন কেটে যায়। সেদিন দুপুরেও নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে কোনোমতে টেনে রান্না শেষ করেছিল সে। অনেকদিন পর শিং মাছ রান্না হয়েছিল। প্রচণ্ড ক্ষুধায় নিশিতাও নিজের পাতে একটু ভাত আর তরকারি নিয়ে কেবল খেতে বসেছিল।

ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে রান্নাঘরে ঢুকলেন তার শাশুড়ি রেহানা বেগম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিশিতার হাত থেকে ভাতের প্লেটটি কেড়ে নিয়ে সশব্দে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন তিনি। গরম ভাত আর তরকারি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এখানেই শেষ নয়, নিশিতার চুলের মুঠি ধরে রান্নাঘর থেকে টেনে-হিঁচড়ে তাকে বাইরের উঠোনে নিয়ে এলেন তিনি।

সেদিন বাড়িতে অনেক মেহমান এসেছিলেন। সবার সামনে রেহানা বেগম বুক চাপড়ে বিলাপ করতে লাগলেন, "খোদা সবার ঘরে ছেলের বউরা নাকি লক্ষ্মী হয়ে আসে, আর আমার ছেলের বউ আসছে চোর হয়ে! কী দুর্ভাগ্য কপাল আমার!"

মেহমানদের সামনে এমন চরম অপমানে নিশিতার মাথা হেঁট হয়ে গেল। চোখের পানি উপচে পড়ছিল তার। সে অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে বলল, "মা, দয়া করে চুপ করুন। মেহমানদের সামনে এসব কী কথা বলছেন?"

রেহানা বেগম আরও উগ্র হয়ে চিল্লিয়ে উঠলেন, "কী চুপ করব হ্যাঁ? আমার অসুস্থ মেয়ে সুমি একটু শিং মাছের তরকারি খেতে চেয়েছিল। আর তুই মাগি আমার মেয়ের ভাগের মাছ চুরি করে খাচ্ছিলি? রাক্ষস কোথাকার! আর কত খাবি তুই? আমার সংসারে যবে থেকে এসেছিস, তবে থেকে শুধু খেয়েই যাচ্ছিস নির্লজ্জের মতো হতচ্ছাড়ি।"

নিশিতা পেটে হাত দিয়ে অশ্রুভেজা চোখে বলল, "মা, আমার অনেক ক্ষুধা পেয়েছিল। তাই একটু ভাত-তরকারি নিয়ে খেতে বসেছিলাম। এটাই কি আমার ভুল? আমার গর্ভে তো আপনার ছেলেরই সন্তান, মা।"

ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে এসে দাঁড়াল নিশিতার স্বামী রাতুল। মায়ের এমন কাণ্ড দেখেও তার চোখে কোনো প্রতিবাদ ছিল না। উল্টো সে নিশিতার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, "নিশিতা, মায়ের কাছে এখনই ক্ষমা চাও।"

এতক্ষণ শাশুড়ির আচরণে নিশিতা যতটা না কষ্ট পেয়েছিল, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি আঘাত পেল স্বামীর এই মেরুদণ্ডহীন কথা শুনে। বিয়ের এই নয় মাসে সে ভালো করেই চিনে নিয়েছে তার এই কাপুরুষ স্বামীকে। কিন্তু আজ তার ধৈর্যের বাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে গেল। সামান্য একটু খাবারের অপরাধে এত মানুষের সামনে তাকে চোর অপবাদ দেওয়া হবে, আর সে মুখ বুজে সইবে? না, আজ আর নয়।

নিশিতা মুখ শক্ত করে সরাসরি উত্তর দিল, "ক্ষমা চাইব না আমি।"

কথাটা শেষ হতেই প্রচণ্ড জোরে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল নিশিতার গালে। রাতুল নিজের রাগ সামলাতে পারল না। কিন্তু নিশিতা আর আগের মতো কেঁদে ভেঙে পড়ল না। সে শক্ত মুখে দৃঢ়ভাবে বলল, "চাইব না ক্ষমা। কী দোষ আমার হ্যাঁ? আমি গর্ভবতী। অথচ তোমার মা সকালে আমাকে কালকের রাতের বাসি ভাত আর বাসি কাকরোল ভাজি খেতে দিল। আমিও মুখ বুজে খেয়ে নিলাম। কিন্তু আমার স্বামী হয়ে তুমি ঠিক গরম গরম তেলে ভাজা পরোটা খেলে। একবারও ভাবলে না তোমার স্ত্রী কী খেয়েছে? অথচ ওই পরোটা আমিও বানালাম, ভাজলাম—কিন্তু আমার খাবারই অধিকার নেই!"

সে মেহমানদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, "এই যে যেই শিং মাছ নিয়ে এত কথা বলা হলো, সেই শিং মাছ আমি কুটেছি, ধুয়েছি, রান্না করেছি এই সাত মাসের ভারী পেট নিয়ে। অথচ দেখো আমার মুখের সামনে থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে মাটিতে নিষ্ঠুরভাবে ছুঁড়ে ফেলা হলো। এর কী উত্তর দেবে তুমি রাতুল?"

রাতুল একেবারেই নির্বাক হয়ে গেল। নিশিতার এই রূপ সে আগে কখনো দেখেনি।

রেহানা বেগম মুখ বাঁকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বললেন, "আমার রান্নাঘরে আমার অনুমতি ছাড়া তুমি খাবারে হাত দেবে, আর আমি চুপ করে থাকব? শোনো বউ, এই বাড়ি আমার, এই সংসার আমার। আমার সংসারে ভুলেও মাতব্বরি করতে আসবে না। পরের মেয়ে তুমি, ভুলে যেও না।"

নিশিতা তিতা হাসল, "বাহ মা! ভালো বলেছেন। সংসারের কাজ করার সময় এটা আমার সংসার, আমার পরিবার। আর নিজের অধিকার চাওয়ার বেলা আমি পরের মেয়ে?"

পাশ থেকে রাতুলের বোন সুমি রাগ দেখিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল, "এত খাই-খাই করো কেন ভাবি? আর ভাইয়া তুইও চুপ করে আছিস। ভাবি এতগুলো মানুষের সামনে বলল আম্মা নাকি তাকে খেতে দেয় না, বাসি খাবার দেয়। আম্মা কতটা ছোট হলো একবারও ভাবছিস?"

রেহানা বেগম আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, "তোর ভাই আর কী হবে। সে কি আমাকে সম্মান করে? না হলে আমার বিরুদ্ধে গিয়ে এই ফকিন্নির ঘরের মেয়েকে বিয়ে করত? আমার সংসারটা খাওয়ার জন্য আসছে এই রাক্ষসী। জাহান্নামেও জায়গা হবে না তোর।"

নিশিতা এবার শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য ভরা হেসে বলল, "আমার কথা বাদ দেন আম্মা। আপনি জান্নাতে যাবেন তো? মনে তো একদমই হয় না।"

রাতুল গর্জে উঠল, "নিশিতা, থামো! আম্মার সাথে এসব বেয়াদবি আমি কখনোই মোটেও সহ্য করব না।"

নিশিতা শেষবারের মতো রাতুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তোমাকে আর সহ্য করতে হবেও না রাতুল। জোর করে আমাকে বিয়ে করেছ সত্যি, কিন্তু স্ত্রীর মর্যাদা দিতে কখনোই পারোনি। শুধু শুধু নিজের সাময়িক জেদের বশে আমার জীবনটা সম্পূর্ণ নষ্ট করলে। জানতে তোমার মা আমাকে পছন্দ করেন না, তবু তুমি আমাকে বিয়ে করলে। কী লাভ হলো বলো? যেই স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি হওয়া অত্যাচার নীরব চোখে দেখে, সেই স্বামীর ঘর করার ইচ্ছে নেই আমার। তোমার আম্মা তোমার গর্ভবতী স্ত্রীকে না খাইয়ে রাখে, সারাদিন বাসায় দাসীর মতো খাটায়... আর তুমি শুধু নীরবে চুপচাপ দেখো। তুমি একটা ভয়ঙ্কর কাপুরুষ রাতুল।"

বাসায় উপস্থিত এত আত্মীয়ের মাঝে নিজের স্ত্রীর মুখে 'কাপুরুষ' শব্দটা রাতুল কোনোভাবেই নিতে পারল না। তার পুরুষতান্ত্রিক অহংকারে আঘাত লাগল। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সে এক অমানুষের মতো প্রহার করতে শুরু করল তার নিজের গর্ভবতী স্ত্রীকে। উপস্থিত কেউ তাকে থামাতে এলো না। এক পর্যায়ে রাতুল নিশিতাকে প্রচণ্ড জোরে একটা ধাক্কা দিল।

নিশিতা ভারসাম্য হারিয়ে উল্টো হয়ে শক্ত মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। মুহূর্তের মাঝেই ঘরের মেঝেটা লাল রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল। পেটের তীব্র যন্ত্রণায় নিশিতা এক বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল, "আমার সন্তান..."

মেঝেতে রক্তের স্রোত দেখে হঠাৎ করেই রাতুলের মাথার রক্ত নেমে গেল, তার হুশ ফিরল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে...

**(চলবে...)**


সংগৃহীত