Jaanvi Royal Luxury - Durga Puja
মুক্ত ভালোবাসা

"সখী ভাবনা কাহারে বলে... সখী যাতনা কাহারে বলে..."

ব্যস্ত রাজপথের একধারে বসে গুনগুন করে গানটা গাইতে গাইতে বছর পাঁচেকের ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছিল কুসুম। কিন্তু দুষ্টু ছেলেটার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই; সে চোখ বন্ধ করার বদলে দিব্যি মায়ের সুরের তালে তাল মিলিয়ে নিজেই গুনগুন করে চলেছে। ছেলের এই কাণ্ড দেখে কুসুমের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে আদুরে গলায় বলল, "একটু ঘুমিয়ে নে না বাবা। এরপর আবার কখন একটু নিরিবিলি জায়গা পাব, তার তো কোনো ঠিক নেই।"

ছেলে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আবদার করল, "মা, গানটা বন্ধ কোরো না। খুব ভালো লাগছে। পরে ঘুমিয়ে নেব এখন।" "তা বললে কী করে হয় বল তো সোনা? ঠিকমতো না ঘুমালে শরীর খারাপ করবে যে।" "কিন্তু এখন আমার একদম ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না!" কুসুম ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলল, "বেশ, তবে ঘুমাতে হবে না। চোখ বন্ধ করে একটু জিরিয়ে নে।"

ওদের মা-ছেলের খুনসুটির মাঝেই সেখানে এসে হাজির হলো কানাই। তার হাতে দুটো প্লাস্টিকের প্যাকেট। সারাদিনের খাটুনির পর তার চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। খুব সাবধানে, শব্দ গঠন না করে কুসুমের পিছন দিকে এসে লম্বা হয়ে বসল সে। কানাইকে ওভাবে বসতে দেখে কুসুম মৃদু হেসে পরম ভরসায় তার চওড়া পিঠে নিজের শরীরটা হেলিয়ে দিল।

কানাই একটা প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলল, "এই নাও, আগে খোকাকে খাইয়ে দাও। খাবারটা এখনো একটু গরম আছে। নয়তো ঠান্ডা হলে রুটিটা শক্ত হয়ে যাবে, ও চিবোতে পারবে না।" কুসুম প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বলল, "হুম দাও। তুমিও খেতে শুরু করো। ওকে খাইয়ে দিয়ে আমি হাত ধুয়ে খেয়ে নেব।" কানাই মাথা নেড়ে বাধা দিল, "উহু, তা হবে না। আমি আর তুমি একসাথেই খাব, যেমন রোজ খাই।" কুসুম একটু কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, "উফ! তুমিও পারো বটে।"

কানাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চারপাশের অন্ধকারের দিকে তাকাল। বলল, "এইটুকুই তো আমাদের সম্বল কুসুম। যখন দুজনে হাত ধরে পথ চলা শুরু করেছিলাম, তখন তাও মাথার ওপরে অন্তত একটা ছাদ ছিল। দুবেলা দুমুঠো ভাত খাওয়ার মতো পকেটে সামান্য টাকাও ছিল। তবে সময় আর ভাগ্যের পরিহাসে আজ আমাদের সম্বল কেবল মাথার উপরের ওই নীল আকাশ আর রাস্তার পাশের এই খোলা ফুটপাত।"

কানাইয়ের গলায় ঝরে পড়া তীব্র হতাশা টের পেয়ে কুসুম তার হাতটা ছুঁয়ে সান্ত্বনার সুরে বলল, "এক জীবনে কি সবাই সবটা পায় গো? পায় না তো। ধরে নাও—একটা পাকা বাড়ি আর দুমুঠো নিশ্চিত খাবার আমাদের কপালে নেই। তা বলে কি আমরা বাঁচব না?"

"যতই ভাগ্যের উপর দোষ দিই না কেন কুসুম, দিনশেষে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে," কানাইয়ের গলাটা বুজে এল, "চেষ্টা তো কম করছি না। কিন্তু ওই বস্তিতে আগুন লাগার পরে আমাদের সব কাগজপত্র যেভাবে পুড়ে ছাই হয়ে গেল, তার সাথে সাথে সমাজ থেকে আমাদের পরিচয়গুলোও যেন একমুঠো ছাইয়ের মতো হয়ে গেছে। একটা ঝড়ো বাতাস আসবে আর আমাদের সমস্ত অস্তিত্ব উড়িয়ে নিয়ে যাবে।"

কুসুম তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, "আহা! ওসব আবার কী কথা? উড়ে যাবে মানে কী? আমরা যেখানে আছি, সেখানেই থাকব। সবকিছুই ঠিক থাকবে।"

কানাই অতীত হাতড়ে বলতে লাগল, "জানিস, ছোটবেলায় বাবা বারবার বলত—কাগজপত্রগুলোকে যত্ন করে রাখতে। তখন বড় হেলাফেলা করতাম। বলতাম, ওই তো সামান্য কাগজ, ওর আবার কিসের দাম শুনি! আজ হাড়ে হাড়ে বুঝি, ওই সামান্য কাগজগুলোই সমাজে আমার মূল্য নির্ধারণ করেছিল। অন্তত ওই পরিচয়টুকু থাকলে দুবেলা দুমুঠো পেট ভরে খাওয়ার মতো একটা ভালো কাজের সন্ধান তো পেতাম।"

কুসুম কানাইয়ের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় বিশ্বাসে বলল, "আমার মনে মনে একটা বিশ্বাস আছে, আমাদের একদিন সবটা ঠিক হয়ে যাবে।"

"আর কিছুই ঠিক হবার নেই কুসুম। এভাবেই দিনে দিনে সবটা আরো শেষ হয়ে যাবে," কানাই অপরাধী মুখে বলল, "আসলে আমি মানুষটা এতটাই স্বার্থপর যে এত কষ্টের পরও তোমাদেরকে আমার থেকে দূরে চলে যেতে বলতে পারছি না। মনে হয় সবই তো চলে গেছে, তোমরাও যদি চলে যাও, তাহলে আমি আর কী নিয়ে বাঁচব? কিন্তু তোমরাই বা কিসের জন্য আমার মতো এক হতভাগার সাথে এই ফুটপাতে পড়ে থাকবে বলো?"

কুসুম এবার একটু হেসে কানাইয়ের দিকে তাকাল, "তুমি বললেই বুঝি আমরা চলে যাব? আমি অনেকের মুখে বলতে শুনেছি—অভাবে পড়লে বা দুঃসময় এলে নাকি ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়। অথচ দেখো, আমাদের এই ফুটপাতের জীবনে কোনো দেওয়ালই নেই, কোনো জানালাও নেই যেখান দিয়ে আমাদের ভালোবাসাটা পালিয়ে যাবে! আমাদের মাথার ওপর আছে এক বিশাল খোলা আকাশ আর সামনে এই ব্যস্ত শহরের রাজপথ। এখানে আমাদের ভালোবাসাটা একদম মুক্ত, তাই তার পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই।"

কানাই মুগ্ধ হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কুসুম আবার বলতে লাগল, "যদি সত্যি ভালোবাসা পালিয়ে যেত, তবেই মনে হয় ভালো হতো নাকি? যে মানুষটা আমাকে এত ভালোবাসে, তাকে ভালো না বেসে, তাকে দুচ্ছাই করে তাড়িয়ে দিয়ে আমি কী এমন সুখে থাকতাম শুনি? তুমি এসব ফালতু বিষয় নিয়ে আর কখনো ভাববে fix না। আমাদের তিনজনের কপাল একই সুতোতে বাঁধা, যা এত সহজে ছিঁড়বে না। বাকিটা সময়ের হাতে ছেড়ে দাও। সে যেমন সবটা খারাপ করেছে, সেই আবার একদিন সবটা ঠিক করে দেবে।"

"কী জানি! হয়তো বা দেবে, হয়তো বা এমনভাবেই বাকি জীবনটা কেটে যাবে ফুটপাতে," কানাই স্বগতোক্তি করল。

"সময় থেকে বড় শত্রু যেমন নেই, ঠিক তেমনি সময় থেকে বড় মিত্র আর কেউ হয় না গো," কুসুম পরম মমতায় বলল, "সে নিজের হাতে যেমন ক্ষত তৈরি করে, ঠিক তেমনই ধীরে ধীরে সেই ক্ষতের ওপর প্রলেপও সেই দেয়। তাই সবটা সময়ের হাতে ছেড়ে দাও। আশা করি, দিন শেষে ভালো কিছু নিশ্চয়ই অপেক্ষা করে থাকবে আমাদের জন্য।" কানাই হাসল, "আমাদের এই মুক্ত ভালোবাসাই যেন একদিন আমাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে নিয়ে আসে।"

কথা বলতে বলতে কুসুম ছেলেকে খাইয়ে দিল। খোকা মায়ের কোলে মাথা রেখেই এবার শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। এরপর অবশিষ্ট খাবারটুকু কুসুম আর কানাই দুজনে ভাগ করে পরম তৃপ্তির সাথে খেতে লাগল।

রাতের সেই ব্যস্ত রাজপথের ওপর দিয়ে তখন বহু দামি দামি গাড়ি তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে। সেইসব গাড়ির কাঁচ ঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরা থেকে কেউ কেউ জানালা দিয়ে একবার মুখ বাড়িয়ে এই ফুটপাতে বসা পরিবারটির দিকে তাকাল। তারা মনে মনে ভাবল—বিশাল অট্টালিকায় অঢেল প্রাচুর্য দিয়েও যে ভালোবাসাকে বন্দী করা যায়নি, সেই ভালোবাসাই এই খোলা আকাশের নিচে কত সুন্দর, কত জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে!

আবার অন্য কোনো গাড়ির ভেতরে হয়তো তখন অনেক কিছু থাকার পরেও, আরও পাওয়ার অন্তহীন চাহিদা নিয়ে কোনো দম্পতি বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে একে অপরের থেকে মন তুলে নিচ্ছে, চিরতরে শেষ করে দিচ্ছে এক একটি সাজানো সম্পর্ক। অথচ এই ফুটপাতে, সব হারিয়েও দুটি মানুষ একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে বেঁচে থাকার এক নতুন রূপকথা লিখছে।

সংগৃহীত