এক পায়ে জুতো, অন্য পায়ে রক্তের দাগ—কোন অজানা অতীতের টানে এই পলায়ন?
কুসুমপুরের রাজকন্যা
এক রক্তাক্ত অতীত ও অজানা গন্তব্য
🩸 অধ্যায় ১: কালরাতের অন্ধিসন্ধি এবং এক রক্তাক্ত পলায়ন
গ্রামের আলোআঁধারি মেঠো রাস্তা দিয়ে কোনোরকমে পা ঘষটে ঘষটে এগিয়ে চলেছে মেয়েটি। ধুলো আর অন্ধকারের বুক চিরে সে এগিয়ে চলেছে বলার চেয়ে, পিশাচদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে পালিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে বলাটাই বোধহয় শ্রেয়। তার পেছনে লেগেছে এক মস্ত গুন্ডাবাহিনী, যাদের হিংস্র চিৎকার আর ভারী বুটের আওয়াজ একটু দূর থেকেই বাতাসে ভেসে আসছে। তাদের লোলুপ দৃষ্টি আর ধারালো অস্ত্র থেকে নিজের সম্ভ্রম আর প্রাণ বাঁচাতে কোনোরকমে লুকিয়ে কুসুমপুরের এই নির্জন, পরিত্যক্ত প্রান্তে এসে পৌঁছেছে ও। এই তল্লাটে সাধারণত গ্রামের মানুষজন দিনের বেলাতেও আসে না, ঘরবাড়িও তেমন একটা নেই—চারপাশে শুধু প্রাচীন বটগাছ আর হাড়হিম করা নিস্তব্ধতা।
দৌড়াতে দৌড়াতে কখন যে তার এক পায়ের জুতো খুলে ধুলোয় হারিয়ে গেছে, মেয়েটি টেরই পায়নি। আর টের পেলেও সেই জুতো আবার কুড়িয়ে পায়ে গলিয়ে নেওয়ার মতো বিলাসিতা কি এই মুহূর্তে তার ছিল? বিন্দুমাত্র দেরি হলে ওই নরপিশাচগুলো তাকে ছিঁড়ে খেত, তারপর লাশটা কোথাও গুম করে দিত। ওদের হাতে থাকা ধারালো, চকচকে ছুরি আর মোটা লাঠিগুলো সেই নির্মম সত্যটাই বারবার জানান দিচ্ছিল। অন্য পায়ের জুতোটার অবস্থাও বড্ড শোচনীয়। এইভাবে এক পায়ে জুতো পরে ভারসাম্য রেখে দৌড়াতে বড্ড অসুবিধা হচ্ছিল তার, তাই এক ঝটকায় অন্য পা থেকে অক্ষত জুতোটাও খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল ও।
হঠাৎ করে মেয়েটির গা গুলিয়ে উঠল বড্ড, মাথাটাও যেন বনবন করে ঘুরতে লাগল। দীর্ঘক্ষণের ধকল আর আতঙ্কে রাস্তার একপাশে থমকে দাঁড়িয়ে হড়হড়িয়ে বমি করে ফেলল ও। পেটের ভেতর খিদের জ্বালা, আর অন্যদিকে তৃষ্ণায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে। এরই মধ্যে অন্ধকারের মাঝে ডান পায়ের তলায় কিছু একটা ধারালো কাঁচ বা পাথর ফুটে গেল সজোরে; গলগল করে তাজা রক্ত ঝরতে শুরু করল ধুলোমাটি মেখে। কিন্তু থামার উপায় নেই। নিজেরই রক্তমাখা পায়ের ছাপ পেছনে ফেলে, এক অন্তহীন যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে মেয়েটি কোনোরকমে এগিয়ে চলল এক অজানা, অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে...
🔱 অধ্যায় ২: কুসুমপুরের শিবরাত্রি ও বাঁড়ুজ্যে বাড়ির ঐশ্বর্য
এই রোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনার সূত্রপাত কিন্তু আজকের নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে প্রায় ষোলো-সতেরো বছর আগের এক জটিল ইতিহাস। চলুন, সময়ের চাকা ঘুরিয়ে ফিরে যাওয়া যাক অনেকগুলো বছর আগের সেই শান্ত, স্নিগ্ধ কুসুমপুর গ্রামে।
সেদিন ছিল মহাপবিত্র শিবরাত্রি। কুসুমপুরের ঘরে ঘরে তখন উৎসবের আমেজ, চরম ব্যস্ততা। এই গ্রামে বহু শতাব্দীর পুরোনো এবং অলৌকিক একটা শিবমন্দির আছে, যা লোকমুখে ‘ঈশানেশ্বর মন্দির’ নামে পরিচিত। ঈশানেশ্বর হলেন স্বয়ং ভগবান শিবের এক রুদ্র অথচ শান্ত রূপ। গ্রামের প্রতিটি মানুষের মনে এক অটল বিশ্বাস ছিল যে, ঈশানেশ্বরের দরবারে এসে যদি কেউ মনপ্রাণ দিয়ে কিছু প্রার্থনা করে, তবে দেবদেবীর মহাদেব তাকে কখনোই খালি হাতে ফেরান না।
মন্দিরের পুজোর সেই ব্যস্ততার ছোঁয়া লেগেছিল গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী ‘ব্যানার্জী’ বাড়িতেও, যাকে গ্রামের সাধারণ মানুষ একডাকে ‘বাঁড়ুজ্যে বাড়ি’ বলে চিনত। বাঁড়ুজ্যেরা ছিলেন বংশানুক্রমিক পুরোহিত। এই গ্রামে এককালে যখন জমিদারি প্রথার রমরমা ছিল, তখন এই বাঁড়ুজ্যে পরিবার থেকেই বংশানুক্রমিক কুলপুরোহিত বেছে নেওয়া হতো কুসুমপুরের প্রতাপশালী জমিদার ‘মিত্রবাড়িতে’। নিয়ম ছিল, ব্যানার্জী পরিবারের প্রতি প্রজন্মের বড় ছেলেকে কুলপুরোহিত হিসেবে বরণ করে নিতেন স্বয়ং জমিদার বাবু। জমিদারদের দেওয়া মোটা মাসমাইনে, পুজোআচ্চার সময় দামী রেশমি পোশাক, অলঙ্কার, দক্ষিণা এবং খাঁটি স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা পেয়ে পেয়ে কালক্রমে ভালোই ফুলেফেঁপে উঠেছিল এই বাঁড়ুজ্যে পরিবার। তাদের বিশাল সিংহদুয়ারওয়ালা বাড়িটা দূর থেকে দেখলে কোনো রাজপ্রাসাদ বা জমিদার মহলের চেয়ে কম মনে হতো না, আর পরিবারের সদস্যরাও রাজকীয় হালে দিন কাটাত।
👑 অধ্যায় ৩: মিত্র বাড়ির জমিদারি ও কলকাতার বালিগঞ্জের বৈভব
কালক্রমে রাজতন্ত্র ও জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলো। আইনের বেড়াজালে মিত্র পরিবারের জমিদারি চলে গেল এবং একসময় তারা এই অজ পাড়াগাঁ ও ভাঙা রাজবাড়ি ছেড়ে শহরের দিকে পাড়ি জমাল। মিত্র বংশের শরিকেরা যে যাঁর মতো করে ঘাঁটি গাড়ল কেউ বর্ধমানে, কেউ বা খোদ কলকাতায়, আবার কেউ বা পাড়ি দিল ভিনরাজ্যে। তবে জমিদারি প্রথা চলে গেলেও মিত্র পরিবারের আভিজাত্য আর রক্তের তেজ কমেনি বিন্দুমাত্র। আধুনিক যুগেও তারা প্রত্যেকেই সমাজের উঁচুতলায় সুপ্রতিষ্ঠিত এবং নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যে অত্যন্ত সফল।
এদের মধ্যে সবচেয়ে অবস্থাপন্ন এবং প্রভাবশালী হলেন অভিমন্যু মিত্র। বর্তমানে কলকাতার অভিজাত এলাকা বালিগঞ্জে তাঁর এক বিশাল আলিশান রাজপ্রাসাদোপম বাড়ি। সোনা এবং হিরের রত্ন ব্যবসায় তাঁর ভারতজোড়া খ্যাতি, নামডাক। তাঁর তৈরি গয়নার একটা বড় অংশ প্রতি বছর এক্সপোর্ট হয় দেশের বাইরে, ইউরোপ-আমেরিকায়। সব মিলিয়ে তিলোত্তমা কলকাতার প্রথম সারির ধনকুবেরদের মধ্যে একজন হলেন এই অভিমন্যু বাবু। তাঁর স্ত্রী শ্রীমতী মিত্রও কোনো সাধারণ ঘরের মেয়ে নন, তিনি শহরের এক নামী ও বনেদি বস্ত্র ব্যবসায়ী পরিবারের একমাত্র কন্যা।
ঐশ্বর্য আর আভিজাত্যে মোড়া এই দম্পতির কোল আলো করে এসেছে দুটি পুত্রসন্তান—বড় ছেলে অম্লান আর ছোট ছেলে ইমন। দুই ভাইয়ের মধ্যে বয়সের পার্থক্য খুব একটা বেশি নয়, মাত্র দু'বছরের। বালিগঞ্জের সেই চোখধাঁধানো বৈভবের মাঝে বড় হতে থাকা এই দুই ভাই এবং কুসুমপুরের সেই প্রাচীন পুরোহিত পরিবারের সাথে কীভাবে জড়িয়ে গেল আজকের এই রক্তাক্ত পলায়নরত মেয়েটির ভাগ্য? কী এমন ঘটেছিল সেই শিবরাত্রির রাতে, যার মাশুল আজ ষোলো বছর পর এই মেয়েটিকে নিজের রক্ত দিয়ে দিতে হচ্ছে?
...চলবে...
সংগৃহীত