কর্মফল ও নাড়ির টান

"যে বৃদ্ধাবাসে একদিন নিজের মাকে রেখে এসেছিলেন অজিতেশ, আজ বহু বছর পর নিয়তির পরিহাসে সেখানেই তার স্থায়ী ঠিকানা। কিন্তু সন্তানের অবহেলা যেখানে শেষ হয়, মায়ের চিরন্তন ভালোবাসা ঠিক সেখান থেকেই আবার শুরু হয়।"

মূল গল্প: নাড়ির টান

"অমৃতবাস" বৃদ্ধাবাসের একটি নিভৃত ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন ষাঠোর্ধ্ব অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। চোখের সামনে দিয়ে সাদা চারচাকা গাড়িটি ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ওই গাড়িতেই চলে গেল তাঁর একমাত্র ছেলে ধ্রুবজ্যোতি। আজ থেকে এই বৃদ্ধাবাসই অজিতেশের স্থায়ী নিবাস।

ধ্রুবজ্যোতি কলকাতায় একটা নতুন দামী ফ্ল্যাট কিনেছে, কিন্তু সেই আধুনিক ফ্ল্যাটে বৃদ্ধ বাবার কোনো স্থান হয়নি। অজিতেশ অবশ্য ছেলের এই সিদ্ধান্তে কোনো প্রতিবাদ বা আপত্তি জানাননি। আজীবন তিনি নিজের একমাত্র সন্তানকে সুখে দেখতে চেয়েছেন। তা ছাড়া, শহরের ওই বদ্ধ খাঁচার মতো ফ্ল্যাট কালচারের গণ্ডিতে নিজেকে বন্দি রাখার চেয়ে গাছপালায় ঘেরা এই নিরিবিলি অমৃতবাসের ছোট্ট ঘরটিই তাঁর বেশি পছন্দের মনে হয়েছিল।

স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়া

সারাদিন আশ্রমে অন্যান্য বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সঙ্গে গল্পগুজব করে সময় কেটে গেল। কিন্তু রাতের বেলা যখন নিজের ঘরের বিছানায় শুয়ে একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করলেন, প্রথম দিন হওয়ায় চোখে সহজে ঘুম আসছিল না। বেশ কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পর অবশেষে তাঁর দুচোখ জুড়ে গভীর ঘুম নেমে এলো।

হঠাৎ মাঝরাতে এক অদ্ভুত, অপ্রাকৃতিক অনুভূতির সম্মুখীন হলেন অজিতেশ। ঘুমের ঘোরেই তিনি নিজের কপালে কার যেন একটা পরম স্নেহময়, কোমল হাতের স্পর্শ অনুভব করলেন। হাতটা যে কোনো এক নারীর, তা বুঝতে তাঁর বাকি রইল না। ঠিক তখনই এক বিষণ্ণ অথচ অত্যন্ত চেনা এক নারীকণ্ঠ ভেসে এলো তাঁর কানে—

"তুই আজ রাত্রে কিছু খেলিনা কেন বাবা? কতবার বলেছি রাত্রে অল্পকিছু হলেও খেয়ে ঘুমোবি, নাহলে শরীর খারাপ করবে। তুই না খেলে যে আমারও খাওয়া হয় না রে!"

"মা! মা তুমি কোথায়?" বলে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন অজিতেশ। ঘরের আলো-আঁধারিতে চারপাশ তাকালেন, কিন্তু কেউ কোথাও নেই। তবে কি তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন? কিন্তু কপালের সেই স্পর্শ তো মিথ্যে হতে পারে না! ব্যাকুল হয়ে তিনি জানালার ধারে রাখা ইজিচেয়ারটায় গিয়ে বসলেন। তাঁর মন পাড়ি দিল আজ থেকে অনেকগুলো বছর আগের এক অতীতে...

ফিরে দেখা সেই অতীত

সেদিনও একটা চাকরির ইন্টারভিউ শেষ করে ফিরতে অজিতেশের অনেক দেরি হয়েছিল। হাত-মুখ ধুতে ধুতে তরুণ অজিত মাকে বলেছিল, *"মা, তুমি এখনও বসে আছো? তোমাকে বলেছি না খেয়ে নিতে।"*

মা মনোরমা দেবী উত্তর দিয়েছিলেন, *"তুই না থাকলে খেতে ইচ্ছে করে না রে বাবা। ছেলেটা আমার না খেয়ে চাকরির জন্য ছুটে বেড়াচ্ছে, এই অবস্থায় তোকে ছাড়া এক গ্রাস ভাতও আমার মুখে উঠবে না।"*

সেই বছরের শেষেই অজিতেশ এক নামী কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থায় চাকরি পান। তারপর বিয়ে করেন নিজের প্রেমিকা চান্দ্রেয়ীকে। বিয়ের সাড়ে তিন বছর পর তাঁদের কোল আলো করে আসে একমাত্র পুত্র সন্তান ধ্রুবজ্যোতি। স্বামী মারা যাওয়ার পর যে ছেলেকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছিলেন মনোরমা দেবী, আনন্দের সাথে তিনি ছেলের জীবনের প্রতিটি শুভক্ষণের সাক্ষী রইলেন。

কিন্তু নাতি হওয়ার পর থেকেই সংসারের সমীকরণটা পাল্টে গেল। পুত্রবধূ চান্দ্রেয়ী নিজের মতো করে সংসার গুছিয়ে নিতে চাইল, যেখানে শাশুড়ি মাকে তার ভীষণ ভারী এক বোঝার মতো মনে হতে লাগল। অজিতেশও তখন স্ত্রীর সুরেই সুর মেলালেন। ভাবলেন, খামোখা শাশুড়ি-বউয়ের মনোমালিন্য বাড়িয়ে লাভ নেই, অফিস থেকে ফিরে রোজ রোজ এসব অশান্তি ভালো লাগে না।

তিনি মাকে সবটা খুলে জানালেন। মনোরমা দেবী সেদিনও মুখে মলিন হাসি ফুটিয়ে বলেছিলেন, *"তোরা ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকবো।"*

কিন্তু মায়ের হাসির আড়ালে লুকনো চোখের জল সেদিন দেখতে পাননি অজিতেশ। এই "অমৃতবাস" বৃদ্ধাবাসেই নিজের জন্মদাত্রী মাকে রেখে এসেছিলেন তিনি।

আশ্রমে চলে যাওয়ার শেষ মুহূর্তেও মা বলেছিলেন, *"রাত্রে কিন্তু একদম না খেয়ে থাকবি না বাবা। আমি চিন্তা করব। নিজের শরীরের যত্ন নিস আর ছেলে-বৌমাকে দেখিস। নাতিবাবুকে মাঝে মাঝে আমার কাছে নিয়ে আসিস।"*

অজিতেশ গাড়িতে বসে স্টার্ট দিতে দিতে বলেছিলেন, *"হ্যাঁ মা, তুমিও সাবধানে থেকো। নিয়ে আসবো।"*

কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে, আদরের নাতিকে আর শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাননি মনোরমা দেবী। বৃদ্ধাবাসে আসার মাত্র এক মাস পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঘুমের মধ্যেই পরপারে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।

অনুশোচনা ও নিয়তির বৃত্ত

আজ এত বছর পরে, ঠিক একই অমৃতবাসের ঘরে বসে মায়ের প্রতিটি কথা খুব মনে পড়ছিল অজিতেশের। আজ রাতে তাঁর বড় একা লাগছিল, তাই ইচ্ছে করেই কিছু খাননি তিনি। আর ঠিক তখনই, ঘুমের ঘোরে মায়ের সেই কণ্ঠস্বর... মায়ের সেই চিরন্তন উদ্বেগ!

আজ বহু বছর ধরে তাঁর নিজের ছেলেও তাঁকে একবারের জন্য বলেনি, *"বাবা, তুমি না খেলে আমি কীভাবে খাই?"*

এই অমৃতবাসের ঘরের চার দেওয়ালে বসে একদিন তাঁর মা মনোরমা দেবী যে তীব্র একাকীত্ব অনুভব করেছিলেন, যে নিঃশব্দ অপেক্ষায় প্রতিটা রাত কাটিয়েছিলেন—আজ যেন নিজের রক্তের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তা অনুভব করতে পারছেন অজিতেশ।

মা হয়তো আজও পরলোক থেকে তাঁর সন্তানের কথা চিন্তা করেন। তাই হয়তো এই চরম একাকীত্বের রাতেও সন্তানকে অদৃশ্য স্পর্শে আশ্বাস দিয়ে গেলেন যে, তিনি পাশে আছেন। পৃথিবী বদলে যায়, সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যায়, কিন্তু মায়ের নাড়ির টান যে কখনো ফুরিয়ে যায় না!


সংগৃহীত