কর্মফল: এক অদ্ভুত নিয়তির খেলা

"অতীতের ভুল যখন বর্তমানের দীর্ঘশ্বাস হয়ে ফিরে আসে— কর্মফলের এক অমোঘ বাস্তবতার গল্প।"

নিঝুম রাত। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ছাড়া চারিদেকে আর কোনো শব্দ নেই। ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় বসে আছেন কমলা দেবী এবং তাঁর স্বামী স্বপন বাবু। কমলা দেবীর চোখ দুটি বারবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে চলে যাচ্ছে, এক বুক আশা নিয়ে তিনি বসে আছেন একটা ফোনের অপেক্ষায়।

"ছেলেটা আজ ও ফোন করলো না।" — একরাশ হতাশা আর অভিমান নিয়ে বলে উঠলেন কমলা দেবী।

স্বপন বাবু খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। মৃদু স্বরে বললেন, "এখনো আশা রাখো বাবু ফোন করবে?"

কমলা দেবী চিবুক শক্ত করে, গলা উঁচিয়ে বললেন, "হ্যাঁ রাখি, কারণ আমি আমার ছেলেকে চিনি। ও এরকম না, ওই মেয়েটাই যতো নষ্টের মূল। যেদিন ওর মোহ কাটবে, ঠিক আমাদের ফোন করবে।"

স্বপন বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বললেন, "পরের বাড়ির মেয়েকে দোষ দিয়ে কী হবে? তোমার ছেলে ঠিক থাকলে সব ঠিক থাকতো।"

কিন্তু কমলা দেবী তা মানতে নারাজ। তিনি চিৎকার করে বললেন, "ওই মেয়েকে দোষ দিচ্ছি কারণ ও আসার পরই বাবুর এই পরিবর্তন। বাবু তো আগেও বাইরে চাকরি করতো। আমাদের সাথে কথা না বলে কখনো ঘুমাতো না, সবসময় আমাদের আসার কথা বলতো। আর এখন আসতে বলা তো দূর, ফোনেও কথা বলে না।"

স্বপন বাবু এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। নিজের ভেতরের জমে থাকা কষ্টটা প্রকাশ করে বললেন, "আমার তো কোনো পরিবর্তন হয়নি, আমি তো ঠিকই ছিলাম কমলা। আমার মা-এর সাথে আমি সবসময় যোগাযোগ রেখেছি।"

"মানে কী বলতে চাইছো তুমি?" — কমলা দেবীর কণ্ঠে এবার কিছুটা অস্বস্তি।

স্বপন বাবু অতীতের সেইসব কালো দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, "একদিন এই ব্যবহার তুমি আমার মা-এর সাথেও করেছিলে। আমি কিছু করলেই তুমি অশান্তি করতে, সব ভুলে গেলে? যেইবার মা পড়ে গেলো, কোমর ভাঙলো, আমি এইখানে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। কারণ এখানে ভালো ডাক্তার আছে। তুমি আনতে দিলে না! কারণ তুমি কিছু করতে পারবে না। আমি বলেছিলাম আয়া রেখে দেবো, তাও তুমি রীতিমতো অশান্তি করে আনতে দাওনি।"

কমলা দেবী নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করে বললেন, "কেন অশান্তি করবো না? সব দায় আমাদের? আর তোমার ভাই, ভাইয়ের বউ— তারা কী করবে? হাওয়া লাগিয়ে উড়ে বেড়াবে?"

স্বপন বাবু ব্যথিত হৃদয়ে বললেন, "তারাই তো সব করেছে কমলা, আমরা কী করেছি?"

কমলা দেবী তড়িৎ উত্তর দিলেন, "কেন, রোজ গ্রামের বাড়ি যেতে সেটা কী হলো? ওখানে গিয়ে তোমার মা-এর সব দেখভাল করোনি?"

স্বপন বাবু এবার সোজা স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "রোজ যাওয়া-আসা আর নিজের কাছে এনে সেবা করার মধ্যে অনেক পার্থক্য কমলা, সেটা তুমি বুঝবে না। আর আজ সেই পাপের ফল দিচ্ছে ভগবান।"

এই 'পাপ' শব্দটা কমলা দেবীর অহংকারে আঘাত করলো। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, "পাপ কোনটা পাপ গো? আচ্ছা, আমি না হয় কিছু করিনি তোমার মা-এর জন্য, কিন্তু তোমার পাপ কোথায়? তুমি তো সর্বস্ব দিয়ে দিয়েছিলে। যখন যা চিকিৎসা লেগেছে, কোনো কার্পণ্য করোনি, সব দিক দিয়ে সুখে রেখেছিলে। তবে বাবু বা বৌমা তোমার কেন খোঁজ রাখে না? এ কেমন বিচার ভগবানের?"

স্বপন বাবুর চোখে তখন জল। তিনি গদগদ কণ্ঠে বললেন, "যদি শেষ কটা দিন এখানে আনতে পারতাম... মা-এর খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অশান্তির ভয়ে আমি আনতে পারিনি। আমি আনতেই পারতাম, কিন্তু এনে মা-কে শান্তির বদলে অশান্তিতে রাখতে চাইনি, কারণ তুমি তো মা-এর সাথে ভালো ব্যবহার করতে না। আর যেটুকু পূর্ণ করেছি তার ফল হয়তো আমার বাবুর প্রতি কোনো আশা কখনো ছিল না, তাই তোমার মতো ফোনের অপেক্ষা করিনি। আর নিশ্চয়ই তার মধ্যেও কোনো পাপ করেছি, তার এইটুকু ফল আজ পাচ্ছি। তাছাড়া তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী, অর্ধেকটা জুড়ে আছো, তোমার কর্মফল কিছুটা হলেও তো আমি পাবো।"

কমলা দেবী তবুও নিজের জেদ বজায় রেখে বললেন, "তোমার মা-এর দুটো ছেলে, একজন না হলে একজন দেখবে। কিন্তু আমার একটাই ও আমাকে দেখলো না।"

স্বপন বাবু শেষবারের মতো একটা গভীর সত্য উচ্চারণ করলেন, "ছিঃ কমলা! মা-রা যখন সন্তানদের মানুষ করেন তখন একটা দুটো দেখেন না। একজন সন্তানকে যেমন মানুষ করেন, দুইজনকেও তাই করেন, তাদের সর্বস্ব দিয়ে। কিন্তু আমরা সেই বিচার করি যে আমি কেন একা দেখবো! এই জন্যই আমাদের কর্মফল ভোগ করতে হয়। আর কথা বাড়িও না, বাবু ফোন করবে না, ঘুমিয়ে পড়ো।"

---

পরদিন সকাল: এক স্তব্ধতার সূচনা

বিছানায় শুয়ে তখনও স্বপ্ন দেখছিলেন স্বপন বাবু— হয়তো এক শান্তির পৃথিবীর স্বপ্ন। সকালে সূর্য ওঠার পর কমলা দেবী অনেকবার ডাকতে এলেন। কিন্তু স্বপন বাবু কিছুতেই উঠছেন না। কমলা দেবী ভাবলেন, আজ মর্নিং ওয়াকেও যাননি, হয়তো ক্লান্ত শরীরে একটু বেশিই ঘুমাচ্ছেন। বেলা গড়িয়ে গেলেও যখন স্বপন বাবুর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না, তখন কমলা দেবীর মনে ভয়ের এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।

তিনি চিৎকার করে পাড়ার ছেলেদের ডাকলেন। ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তারবাবু এসে পরীক্ষা করে অত্যন্ত ভারী গলায় বললেন, "স্বপন বাবু আর নেই। পিসফুল মৃত্যু।"

এই আকস্মিক আঘাতে কমলা দেবী একদম ভেঙে পড়লেন। ঘরের শূন্যতায় তাঁর কান্নার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। স্বামীর নিথর দেহের পাশে বসে তিনি বিলাপ করতে করতে বলতে লাগলেন:

"একেক বলে কর্মফল! কী সুন্দর কাউকে না ভুগিয়ে, নিজে না ভুগে চলে গেলে। আর আমাকে একা রেখে চলে গেলে! আমি কার সাথে থাকবো? পাপ কখনো বাপকেও ছাড়ে না, আজ প্রমাণ হলো। তুমি বলছিলে না নিশ্চয়ই কোনো পাপ করেছ? কিন্তু তুমি কোনো পাপ করোনি, যা করেছি আমি করেছি! তাই তো তুমি শান্তি ভাবে চলে গেলে। ছেলে-বৌমা কারও মুখাপেক্ষী হতে হলো না। আর আমার পাপের ফল আমাকে এই পৃথিবীতে থেকেই ভোগ করতে হবে।"

ঘরজুড়ে তখন শুধু অনুশোচনার স্তব্ধতা। কমলা দেবী বুঝতে পারলেন, নিয়তির বিচার কতটা নিখুঁত এবং কঠোর। (সমাপ্ত)


সংগৃহীত