খুদে গোয়েন্দা ও আঁকিয়ের কাণ্ড

দুপুরের মিষ্টি রোদে ব্যাকগ্রাউন্ডে পাখিদের কিচিরমিচির। কমিক্স আর্টিস্ট অনির্বাণবাবু (বাচ্চাদের প্রিয় বাওয়া) তখন তাঁর স্টুডিওর জানলার ধারে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে স্কেচপ্যাড আর পেন্সিল নিয়ে লড়াই করছেন। কিন্তু তাঁর এই মনঃসংযোগে বারবার ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল জানলার বাইরের বাগান থেকে আসা দুটি বাচ্চার অবিরাম চিৎকার আর হাসির শব্দ।

টিকু আর মুনু—এই দুই পিঠোপিঠি ভাইবোনের যেন কোনো ক্লান্তি নেই। স্কুল ছুটি থাকলেই হলো, সারাদিন বাগানে হুটোপুটি আর ধুলোবালি মাখা।

বিরক্ত হয়ে অনির্বাণবাবু জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ডাকলেন, "স্কুল না থাকলেই সারাদিন বাগানে দাপাস কেন? আমার কাছে এসে একটু ছবি টবি আঁক না? আমিও নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারি।"

টিকু এক গাল মাটি মেখে বাগানের গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ঠোঁট উল্টে বলল, "ছবি টবি এঁকে কী হবে?"

অনির্বাণবাবু নিজের আঁকা রঙিন কমিক্সের পাতাগুলো দেখিয়ে হাসিমুখে বললেন, "এই আমি যেমন কমিক্স করছি, তোরা দেখছিস। একদিন তোরাও করতে পারবি।"

পাশ থেকে ছোট বোন মুনু বড় বড় চোখ করে জিজ্ঞেস করল, "আর তুমি দেখবে?"
"হ্যাঁ, নিশ্চয়ই দেখব!" অনির্বাণবাবু উৎসাহ দিলেন।

কিন্তু টিকুকে এত সহজে ভোলানো মুশকিল। সে ভ্রু কুঁচকে, বেশ বিরক্ত হয়ে বলল, "তুমি তো তোমার বাচ্চাদের নিয়ে কমিক্স করছ। আমাদের কি বাচ্চা আছে যে আমরা কমিক্স করব?"

অনির্বাণবাবু হেসেই আকুল। তিনি সামলে নিয়ে বললেন, "আজ নেই, একদিন হবে।"
টিকু ছাড়ার পাত্র নয়, সে বুক ফুলিয়ে বলল, "আগে হোক, তখন করব।"

অনির্বাণবাবু এবার একটু গুরুগম্ভীর হওয়ার ভান করে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, "ওরে এখন থেকে না আঁকলে তখন পারবি কী করে? আমি কতদিন ধরে আঁকছি জানিস? তাও খালি মনে হয় ঠিকঠাক হচ্ছে না।"

এই কথা শুনে টিকু যেন এক মস্ত বড় সুযোগ পেয়ে গেল। সে হাত নেড়ে টিপ্পনী কেটে বলল, "আরে, এতদিন এঁকেও যদি ঠিক করে আঁকতে না পারো, তাইলে আঁকো কেন? অ্যাঁ? আঁকা ছেড়ে দিয়ে আমাদের সঙ্গে বাগানে খেলবে চলো। দেখবে অনেক বেশি মজা। বুঝলে?"

অনির্বাণবাবু কপালে হাত দিয়ে বললেন, "ছবি আঁকা ছেড়ে দিলে খাব কী? আঁকি বলেই তো লোকে পয়সা দেয়। এটাই তো আমার কাজ।"

ব্যস! এই কথা শোনামাত্রই টিকুর মাথায় যেন কোনো এক রহস্যের জট খুলে গেল। সে এক ভয়ানক ভ্রুকুটি করে অনির্বাণবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, "আ-চ -চা! অব সমঝা (এবার বুঝেছি)। তুমি আঁকা শিখিয়ে আমাদের দিয়ে কাজ করাতে চাও, তাই না?"

মুনু এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। 'কাজ করানো' শব্দটা শুনতেই সে হঠাৎ মস্ত বড় এক পন্ডিতের মতো গম্ভীর হয়ে বলল, "বাওয়া, তুমি জানো না বাচ্চাদের দিয়ে কাজ করাতে নেই? এইটা একটা ক্রাইম!"

অনির্বাণবাবু তো অবাক! তাঁর চোখ ছানাবড়া। তোতলানো গলায় বললেন, "কা - ক্রাইম!!"

টিকু এবার চূড়ান্ত হুমকি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, "ইয়েছ। আর কোনোদিন যদি আমাদের আঁকা করতে বলেছ না, তাইলে স্কুলে প্রিন্সিপালকে বলে দেব বাওয়া আমাদের দিয়ে কাজ করায়। তখন বুঝবে! চলে আয় মুনু। বাগানে কাজ আছে।"

এই বলে অনির্বাণবাবুর দিকে কটমট করে চোখ পাকিয়ে, মুনুর হাত ধরে টিকু আবার বীরদর্পে বাগানের দিকে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। আর ঘরের ভেতরে বোকা বনে বসে রইলেন বেচারা কমিক্স আর্টিস্ট, যিনি ভাবতেও পারেননি—বাচ্চাদের আঁকা শেখানোর ভালো উদ্দেশ্যটা শেষমেশ 'শিশু শ্রমের ক্রাইম' আর 'প্রিন্সিপালের ওয়ান্নিং'-এ গিয়ে ঠেকবে!


সংগৃহীত