দ্য শ্যাডো অব এম্পায়ার

ষড়যন্ত্রের ছায়া ও পলাশীর প্রেক্ষাপট

পলাশীর যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়---এটি ছিল গুপ্তচর, বিশ্বাসঘাতকতা ও আন্তর্জাতিক শক্তির দাবা খেলা। ১৭৫৬–১৭৫৮ সালের কথা যখন বাংলা, কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, চন্দননগর---আর দূরে ছিল লন্ডনের ইস্ট ইন্ডিয়া হাউস। সে সময় ব্রিটিশ ছায়া কী ভাবে বাংলায় ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছিল সে কথাই আজ প্রকাশ করব।

কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের ভেতরে, মানচিত্রে ভরা একটি টেবিলে বসে ছিলেন বিশাল চেহারার এডওয়ার্ড হ্যামিল্টন--ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গোপন গোয়েন্দা। হ্যামিল্টন কোনো সৈনিক ছিল না, সে ছিল গোপন তথ্যের শিকারি। তার রিপোর্ট সরাসরি পৌছে যেত British East India Company--এর বোর্ডে। হ্যামিল্টনের প্রধান কাজ ছিল--- “বাংলার ভিতরের শিরা-উপশিরা ধরে তথ্য টেনে আনা”---সেই সূত্রেই তার নজরে পড়ে এক তরুণ লেখক--- আরিফকে।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা হ্যামিল্টন ও লেখক আরিফ

আরিফ ছিল নবাবের গোপন দফতরের নিম্নপদস্থ লেখক। এক রাতে সে এমন এক চিঠির নকল দেখে ফেলে, যেখানে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে, সেনাপতি মীর জাফর যুদ্ধের দিনে নিষ্ক্রিয় থাকবে। আরিফ বুঝতে পারে--- এটা কেবল দরবারের ষড়যন্ত্র হতে পারে না, এতে বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে। কিন্তু সে জানতেও পারেনি যে ইতিমধ্যে হ্যামিল্টনের লোকেরা তাকে নজরে রাখতে শুরু করেছে।

সে দিনের রাতটা ছিল অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। মুর্শিদাবাদ–এর আকাশে চাঁদ উঠেছিল, কিন্তু যেন আলো দিতে ভয় পাচ্ছে। আরিফ তার ছোট্ট কক্ষে বসে কাঁপা হাতে নকল করছিল সেই চিঠির শেষ লাইন--- “যুদ্ধের দিন সেনাপতি নিষ্ক্রিয় থাকিবেন…”

তার কলম থেমে গিয়েছিল। শব্দগুলো যেন কালি নয়, রক্ত দিয়ে লেখা। মীর জাফর নিষ্ক্রিয় থাকবেন? তাহলে যুদ্ধের ফলাফল কি আগেই ঠিক হয়ে গেছে!

আরিফ জানত--- এ চিঠি সাধারণ দরবারি চক্রান্ত নয়। কাগজের কোণে অচেনা এক সিলমোহর—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়তে লাগল। সে বুঝল, বিদেশি শক্তির ছায়া পড়েছে সিংহাসনের ওপর। কিন্তু সে জানত না, দফতরের বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন ছায়ামূর্তি যারা ছিল হ্যামিল্টনের লোক। ব্রিটিশ গুপ্তচরের জাল ইতিমধ্যেই তাকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছে।

তাড়াতাড়ি সেই রাতেই আরিফ চিঠির নকলটা কাপড়ে জড়িয়ে লুকিয়ে বাইরে বেরোল। সরু গলি, মশালের আলো, দূরে প্রহরীদের পায়ের শব্দ---সব যেন তার পিছু নিয়েছে।

হঠাৎ--- “এই থামো!” একজন সিপাহি তার পথ আগলে দাঁড়াল।

আরিফের বুকের ভেতর রক্ত জমে গেল। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ভয়ের শিহরণ বয়ে গেল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সে কাঁধে থাকা নকল দস্তাবেজের বাণ্ডিলটা খুলে দেখাল—সাধারণ হিসাবের খাতা। চিঠির নকল সে আগেই কোমরবন্ধে লুকিয়ে ফেলেছিল। সিপাই সন্দেহের চোখে তাকালেও তাকে যেতে দিল। কিন্তু বিপদ তখনও কাটেনি। পেছনে কাদের যেন ছায়া নড়ছে। কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি! আরিফ দ্রুত পা চালাল। ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ কানে এল। সে বুঝল---আর সময় নেই।

চন্দননগরের গঙ্গার ধারে ফরাসি সংযোগ

এর বেশ কয়েক দিন পরে, চন্দননগর–এর গঙ্গার ধারে এক নির্জন গুদামঘরের মাথায় ফরাসি পতাকা হাওয়ায় দুলছে। বাইরে থেকে মনে হয় সাধারণ বণিকের আস্তানা কিন্তু ভিতরে ছিল গুপ্তচরদের আস্তানা। ধরে আনা আরিফের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘদেহী মানুষটি নিজেকে পরিচয় দিল, “ভয় পেয়োনা আমি আঁরি দ্যুভাল।” আঁরি দ্যুভাল ছিলেন ফরাসি বণিকের ছদ্মবেশে থাকা এক গুপ্তচর।

দ্যুভালের চোখ স্থির, কণ্ঠস্বর নিচু--- “তুমি যে চিঠির কথা জানো, সেটাই ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তুমি কি জানো যদি এটা লন্ডনে পৌঁছে যায়, যুদ্ধের মানচিত্র বদলে যেতে পারে।”

আরিফ সন্দেহের দৃষ্টিতে আঁরি দ্যুভালের দিকে তাকাল। “ফরাসিরা কেন সাহায্য করবে আমাদের?”

দ্যুভাল মৃদু হাসল। “কারণ ব্রিটিশদের জয় মানে আমাদের পরাজয়। আমরা চাই, ওদের পরিকল্পনা ভেস্তে যাক।”

হঠাৎ বাইরে ঘোড়ার খুরের শব্দ। দু’জন প্রহরী ছুটে এল--- “সাহেব! ইংরেজ সিপাহিরা নদীপথে আসছে!”

দ্যুভাল এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে টেবিলের নিচ থেকে পিস্তল বের করল। “এখন সিদ্ধান্ত নাও, আরিফ। তুমি কি কেবল লেখক হয়ে থাকবে, না ইতিহাস বদলাবে?”

মুহূর্তে গুলির শব্দ শুরু হয়ে গেল, গুলি পাল্টা গুলিতে কয়েকজন লুটিয়ে পড়ল। গুদামঘরের দরজা ভেঙে ঢুকল ইংরেজ সিপাহিরা। প্রথম গুলিটা ছুটল। কাঠের খুঁটি ভেঙে চূর্ণ হল। আরিফ কাঁপছিল, কিন্তু পালাল না। দ্যুভাল তাকে টেনে নিয়ে গেল পেছনের গুপ্ত সরু সিঁড়ি দিয়ে। সিঁড়ির নিচে নৌকা বাঁধা ছিল। আরেক দফা গুলি চলল। দ্যুভাল পাল্টা গুলি ছুড়ল। একজন সিপাহি পড়ে গেল। বাকিরা ধাওয়া করছে।

নৌকায় লাফ দিয়ে উঠতেই দ্যুভাল দড়ি কেটে দিল। গঙ্গার কালো জলে নৌকা ভেসে চলল। আরিফ দেখল দূরে আগুন জ্বলছে---গুদামঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে ইংরেজরা।

দ্যুভাল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল--- “এই চিঠি যদি নিরাপদে পৌঁছায়, তাহলে শুধু যুদ্ধ নয়—এক সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ বদলাবে।”

আরিফ নীরবে আকাশের দিকে তাকাল। সে এখন আর নিম্নপদস্থ লেখক নয়, সে এখন এক গোপন যুদ্ধের সৈনিক।

আর অন্ধকারের ওপারে--- ব্রিটিশ গুপ্তচর হ্যামিল্টন দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে কঠিন হাসি। তার চোখে একটাই সংকল্প--- আরিফকে বাঁচতে দেওয়া যাবে না। গঙ্গার ঢেউয়ের শব্দে মিশে গেল আসন্ন বিশ্বাসঘাতকতার পূর্বাভাস। যুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি--- কিন্তু গুপ্তযুদ্ধে ইতিমধ্যেই রক্ত বইছে।

ভাগীরথীর বুকে রক্তের নৌকা

হ্যামিল্টন বুঝে যায়, আরিফ বেঁচে থাকলে চিঠির সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে। সে গোপনে নির্দেশ দেয় তার অনুচরদের--- যে করেই হোক ওকে খুঁজে বের করে “চিঠি উদ্ধার করো। দরকার হলে ছেলেটাকে … ভাগীরথীর জলে ফেলে দাও। হারিয়ে যাক সে।”

২৩ জুন, ১৭৫৭। Battle of Plassey শুরু হয়। কিন্তু মীর জাফরের বাহিনী যুদ্ধ না করে দাঁড়িয়ে থাকে। এদিকে আরিফ নৌকা থেকে নেমে খুব সন্তর্পণে নবাব সিরাজউদ্দৌলা-এর তাঁবুর দিকে ছুটতে থাকে। আর ঠিক তখনই--- ব্রিটিশ ছায়া তাকে অপহরণ করে।

ভাগীরথীর মাঝখানে একটি ছোট নৌকা। আরিফ বাঁধা অবস্থায় নৌকার খোলে পড়ে আছে। অমানবিক অত্যাচারে তার সারা শরীর রক্তে ভেজা। অনেক হুমকি অনেক অত্যাচারের পরও সে চিঠিটা লুকিয়ে রেখেছিল কোমরবন্ধে, যা ছিল রক্তে ভেজা।

হ্যামিল্টন নিজে সেখানে উপস্থিত হয়ে শান্ত গলায় বলে, “ওহে ছোকড়া শোন ইতিহাস বাঁচে না, বাঁচে সাম্রাজ্য।” এই বলে সে লাথি মেরে নৌকাটি গভীর জলের দিকে ঠেলে দেয়।

কিন্তু প্রকৃতি কখনও সাম্রাজ্যের পক্ষে থাকে না। তাই বোধহয় প্রকৃতি দেবতা সেদিন প্রবল ঝড়ের আলোড়ন তুলেছিল। হ্যামিল্টন সহ যাঁরা আরিফকে বেঁধে এনেছিল তারা সবাই ঝড়ের দাপটে পালিয়ে যায়। ঝড়ের দাপটে নৌকাটি কিছুদূর গিয়ে ভেঙে পড়ে। বহু কষ্টে ফরাসী গুপ্তচর দ্যুভালের সাহায্যে আরিফ বেঁচে যায়। হ্যামিল্টন ভাবে--- সব শেষ। কিন্তু সব ভাবনা কি সত্যি হয়?

লন্ডনের ভুল হিসাব ও আন্তর্জাতিক প্রতিশোধ

সাল ১৭৫৮। লন্ডনে ইস্ট ইন্ডিয়া হাউসে একটি গোপন নথি ছাপা হয়--- “বাংলা নিরাপদ।” কিন্তু তারা জানে না যে আরিফ এখনও বেঁচে আছে। ফরাসি গুপ্তচর দ্যুভালের সাহায্যে সুস্থ হয়ে সে কলকাতায় একটি গোপন ছাপাখানা চালু করে।

“পলাশীর অন্তরালে”-- লেখকহীন একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। তাতে লেখা ছিল--- কী ভাবে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা দরবারে ঢুকেছিল, কী ভাবে মীর জাফরকে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং কী ভাবে যুদ্ধের আগেই ফল নির্ধারিত হয়েছিল। এই লেখা পৌঁছে যায়--- কলকাতা, মাদ্রাজ, প্যারিস এবং লন্ডনে। হ্যামিল্টনের কেরিয়ার ভেঙে পড়ে। সে বুঝে যায়—একজন অনামী অচেনা বাঙালি লেখক তাকে হারিয়ে দিয়েছে।

"ইতিহাস বলবে---বাংলা হারল।
কিন্তু এই গল্প জানায়--বাংলা চুপ করে হারেনি।
কারণ কামান সাম্রাজ্য গড়ে, কিন্তু গুপ্ত শত্রু সাম্রাজ্য ভাঙে।
আর ভাগীরথীর বুকে যে নৌকাটি রক্তে ভেসেছিল--সেই নৌকাই একদিন ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।"

কাঞ্চন চক্রবর্তী