স্বপ্নের মুখোমুখি বাস্তবতা: ভেঙে যাওয়া গণ্ডি ও এক প্রতিবাদের গল্প
"যে হাত স্বপ্ন বুনেছিল বাঁচবার, আজ সেই হাতই রক্তাক্ত রাজপথে হকের দাবিতে সোচ্চার। একপাশে কর্তব্যের অযুহাতে মেরুদণ্ড বিক্রি করা ব্যবস্থার দাসত্ব, অন্যদিকে পাজর দিয়ে দুর্গ গড়ার অদম্য লড়াই! লাঠি আর টিয়ার গ্যাসে স্বপ্ন ভাঙা যায়, কিন্তু প্রতিবাদের রক্তকে মোছা যায় না। তরুণ সমাজ হার মানতে শেখেনি, লড়াই চলবে!"* ✊🔥
첫번째 দৃশ্য: স্বপ্নের সূচনা
একই টেবিলে বসে পড়ালেখা করছিল দুই বন্ধু—সৌমা ও অদ্র। দুজনেই সাধারণ ঘরের ছেলে, কিন্তু চোখে ছিল আকাশছোঁয়া স্বপ্ন।
সৌমাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে দেখে অদ্র জিজ্ঞেস করল,
— “কী রে সৌমা, এত কী পড়ছিস বল তো? কিসের পরীক্ষা?”
সৌমা হাসিমুখে বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে বলল, — “তুই তো জানিস অদ্র, আমার একটাই স্বপ্ন—পুলিশ হয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের একটু সাহায্য করা! তারই প্রস্তুতি নিচ্ছি আর কী!”
অদ্র একটু মৃদু হেসে বলল, — “স্বপ্ন সবাই মনে রাখে সৌমা, কিন্তু কথা ক'জন রাখে?”
— “মানে? আমি কথা কেন রাখব না, অবশ্যই রাখব! বাই দ্য ওয়ে, তোর কী প্ল্যান? এইবারে NEET লাগবে?” সৌমা জানতে চাইল।
অদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, — “মনে তো হয় না! মনে হচ্ছে নেক্সট ইয়ার অব্দি লাগবে! ক্লিয়ার করে আগে তোর থানাতেই যাব সুসংবাদটা দিতে!”
সৌমা পিঠ চাপড়ে বলল, — “বেশ, বেশ!”
দ্বিতীয় দৃশ্য: এক বছর পর... ঝড় ও রাজপথ
এক বছর কেটে গেছে। কিন্তু দৃশ্যপটের ধরন বদলে গেছে সম্পূর্ণভাবে।
রাজধানী জুড়ে এখন উত্তাল পরিস্থিতি! রাজপথে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর তীব্র প্রতিবাদের স্লোগান। যে ছেলেটা একসময় কুঁড়ে ঘরে বসে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তার ভাগ্যে জুটেছে পুলিশের লাঠি, কারণ সে নাকি 'দেশদ্রোহী'!
সমগ্র দেশে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র লিক! রাজস্থান, মহারাষ্ট্রসহ একাধিক রাজ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। আদালত নির্দেশ দিয়েছে—যেহেতু প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, তাই এই পরীক্ষা বাতিল এবং পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে।
কিন্তু ওই যে দরিদ্র ছেলেটি, যে ভেবেছিল এবার সে পাস করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে? কিংবা গ্রামে থাকা ওই মেয়েটি, যে অনেক কষ্টে লড়াই করে নিজের বিয়েটা আটকে রেখেছিল, ভেবেছিল পরীক্ষা পাস করে গ্রাম থেকে বেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে—তাদের নিয়তি আজ বড় কঠিন হয়ে দাঁড়াল।
তা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের দমানো যায়নি। যাদের 'জেন জি' (Gen Z) বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো, আজ তারাই রাজপথে নেমে দেখিয়ে দিল আসল প্রতিবাদ কাকে বলে! সোনম ওয়াংচুক ছাত্র-ছাত্রীদের হকের দাবিতে ২১ দিন অনশন করেছেন, তাঁর সাথে যোগ দিয়েছে অসংখ্য তরুণ-তরুণী। কিন্তু এই ক্ষমতালোভী ব্যবস্থার কি তাতেও মায়া হলো?
তৃতীয় দৃশ্য: প্রতিবাদের গর্জন ও মুখোমুখি দুই বন্ধু
মিছিলের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছিল অদ্র ও তার সাথে থাকা বন্ধু দ্বীপ।
— “Please save our future! এভাবে খেলবেন না আমাদের সাথে! আর কত? আর কত?”
অদ্রর কাঁধে হাত দিয়ে দ্বীপ বলল, — “ভাই জল খা! তোর গলা ভেঙে গেছে!”
জল না ছুঁয়ে অদ্র বলে উঠল, — “ভাঙুক ভাই! কতজনের জীবন চলে গেল আর সামান্য গলা; ভাঙুক! কতজন সুইসাইড করল তবুও এরা ভাবল না দুবার! বলে নাকি আমরা আরশোলা!”
দ্বীপ তিক্ত হেসে বলল, — “হ্যাঁ, আরশোলাই তো! সারা রাস্তা জুড়ে দেখ কত শত আরশোলা গজিয়ে উঠেছে! পরীক্ষায় বসার জন্য কত রুলস! ঢিলে জামা পরতে হবে, প্লাস্টিক বোতল আনতে হবে! অন্যদিকে নিজেদের সিস্টেমে একজন প্রশ্ন লিক করে দিল!”
— “ক্ষমতা পুরো সিস্টেমকে কিনে নেয় দ্বীপ!” অদ্রর চোখ দিয়ে ক্ষোভ ঝরে পড়ে, — “তুই ভাব তো মহারাষ্ট্রের ওই অনিতা মেয়েটার কথা! কত লড়াই করেছিল, স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার! তাকে কি একটা সুযোগ দেওয়া যেত না!! অকালে সে ঝরে গেল! সুইসাইড নোটে লিখে গেছে—যে দেশে সন্তানকে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয় না, সেখানে থাকা দায়!! এরকম কত শত প্রাণ হারিয়ে গেল!”
— “একদম ভাই, একটা দুর্নীতি কীভাবে লাখ লাখ ভবিষ্যৎ শেষ করে দেয়, তা এরা বোঝে না! এই দেশের স্বাধীনতার জন্য নেতাজি লড়েছিলেন, গান্ধীজি অনশন করেছিলেন! কোথায় গেল সেই ডেমোক্রেসি? হক চাইলেই নাকি আমরা বাংলাদেশি বা পাকিস্তানি!”
অদ্র চারিদিকে দেখিয়ে বলল, — “দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে রে দ্বীপ, তাই এত ভিড়! দেখ তাকিয়ে—কারোর দাদা, কারোর বয়ফ্রেন্ড, সবাই আজ এই মিছিলে সামিল!”
হঠাৎ সামনে হইচই শুরু হলো। ব্যারিকেড ভেঙে ধেয়ে আসছে খাকি পোশাকের সারি।
দ্বীপ চিৎকার করে বলল, — “এই এই এই! ওদিকে ওরা ওভাবে ছুটে আসছে কেন?”
অদ্র উত্তর দিল, — “মনে হচ্ছে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করেছে আবার! আচ্ছা, ওদের ছেলে-মেয়েরাও তো একদিন পরীক্ষা দেবে বা হয়তো দিয়েছে, তা-ও এরা কীভাবে পারে?”
দ্বীপে চোখমুখে আতঙ্ক, — “এ উত্তর আমার কাছে নেই অদ্র! ভাই, পুলিশ তো এদিকেও আসছে..!”
চতুর্থ দৃশ্য: লাঠির আঘাত ও না-ভাঙ্গা মনোবল
পুলিশ তেড়ে আসতেই অদ্র হাত জোড় করে চিৎকার করে বলল, — “স্যার! স্যার প্লিজ এটা করবেন না! আমরা স্টুডেন্ট!”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চওড়া চেহারার পুলিশ অফিসার গম্ভীর গলায় বলল, — “হ্যাঁ, ওইজন্যই তো সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে মিছিল করছ!”
বলতে বলতেই পুলিশ অফিসারের চোখ স্থির হয়ে গেল। মুখ থেকে বেরিয়ে এল, — “এই! এক মিনিট... সৌমা না?”
অদ্রও চমকে তাকাল। খাকি পোশাক, হাতে কঠিন লাঠি—কিন্তু মুখের অবয়বটা অত্যন্ত চেনা।
— “সৌমা?! তুইও ওই লাঠিধারীদের দলে?” অদ্র একপ্রকার হাহাকার করে উঠল, — “তুই তো বলেছিলি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবি, আর আজ হাতে লাঠি নিয়ে তাদের ওপরই নামলি?! হা হা, তুইও বিক্রি হয়ে গেলি সৌমা!”
সৌমার চোখ দুটো অপরাধবোধে নিচে নেমে গেল, গলাটা ধরে এল, — “ভাই, অনেক কষ্ট করে চাকরিটা পেয়েছি! এখন যদি ডিউটি না করি...”
— “ডিউটি? হ্যা! এটাই তো তোর ডিউটি—স্টুডেন্টদের গায়ে হাত তোলা!” অদ্র চিৎকার করে উঠল।
সৌমা কাঁপানো গলায় বলল, — “ভাই ক্ষমা করিস, বাট আমার কিছু করার নেই! এখান থেকে এসব সরিয়ে যা, নইলে আমি... আমি কিন্তু...!”
— “হ্যাঁ বল! বল যে বন্ধু হয়ে বন্ধুর পিঠে লাঠি ভাঙবি, কারণ সে নিজের হকের প্রতিবাদ করেছিল! কারণ সে দেশদ্রোহী!”
সৌমা অসহায়ভাবে বিড়বিড় করল, — “আমার কিছু করার নেই!”
অদ্র ধিক্কার দিয়ে বলল, — “না না, তুই যা যা! ওদিকে সবাই ২২ দিন ধরে না খেয়ে রাস্তায় পড়ে আছে, তুই সেখানে গিয়েও ডিউটি কর! চাকরিটা বাঁচাতে হবে তো তোর! দেশের ছাত্র-ছাত্রী মরুক, ওরা তো কিট-পতঙ্গ সব! ওদের স্বপ্ন দেখতে নেই!”
কথাটা শেষ হতে পারল না। পিছন থেকে ওত পেতে থাকা বিশাল পুলিশ ফোর্স এসে অদ্রদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে রক্তারক্তি করে ফেলল। কিন্তু এত আঘাতের পরও তরুণ প্রজন্মকে দমিয়ে রাখা গেল না। শত শত ক্ষত নিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী বুক চিতিয়ে রাজপথে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ওরা আজ চিনে গেছে—ভয় কী, ক্ষমতা কী! চোখে জল আর রক্ত মেখে, গর্জে উঠে একসুরে গাইতে লাগল:
"আমরা হারবো না, হারবো না,
তোমার মাটির একটি কণাও ছাড়বো না,
আমরা পাঁজর দিয়ে দুর্গ-ঘাঁটি গড়তে জানি,
তোমার ভয় নেই, মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি..."
সংগৃহীত