স্মৃতির ঘাটে ভোরের নদী
"মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা ও স্মৃতি রয়ে যায় নদীর চিরন্তন স্রোতের মতো..."
নদীর ঘাটের প্রতিটি ভোরে লুকিয়ে থাকে কত শত না-বলা কথা, কিছু অমলিন ভালোবাসা, আর রয়ে যায় ভালোবাসার মানুষকে হারানোর নিঃশব্দ হাহাকার। সময় হয়তো মানুষকে 'আমরা' থেকে 'আমি'-তে পরিণত করে, কিন্তু কিছু স্মৃতি আর অভ্যাস সারা জীবন বাঁচার রসদ হয়ে থাকে। 🖤🌅✨
ভোরের নরম আলো তখন ধীরে ধীরে নদীর বুক ছুঁয়ে ফুটছে। নদীর বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে হালকা কুয়াশার চাদর, আর বাতাসে মিশে আছে ভেজা মাটির এক সোঁদা গন্ধ। বহুদূর থেকে ভেসে আসছে শঙ্খ আর কাঁসরের মৃদু সুর। শহরটা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, কিন্তু এই নদীর ঘাটের সকাল যেন তার নিজস্ব ছন্দে ও মিষ্টি সুরে শুরু হয়ে গেছে।
এই ঘাটে প্রতিদিন কত নতুন মুখ আসে, আবার সময়ের নিয়মে হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু মুখ সময়ের সাথে সাথে যেন এই ঘাটেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
ঠিক তেমনই এক প্রবীণ দম্পতি প্রতিদিন ভোরে এসে বসেন নদীর ধারে। নদীর ঘাটের সিঁড়িতে পাশাপাশি বসাটা যেন তাঁদের দীর্ঘদিনের এক অলিখিত নিয়ম...
বৃদ্ধা নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ স্বামীকে প্রশ্ন করলেন,
— "আচ্ছা, আমি যদি কোনোদিন না থাকি... তুমি কী করে থাকবে বল তো?"
বৃদ্ধ একটু হেসে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "আরে, ভোরবেলায় এসব কী অলক্ষুণে কথা! যত বয়স বাড়ছে, ততই তোমার মাথায় আজেবাজে চিন্তা ঘুরছে।"
— "আচ্ছা, আজেবাজে বলেই না হয় ধরলে... তবু উত্তরটা দাও না?"— বুড়ি আবদার করলেন।
বৃদ্ধ শান্ত সুরে বললেন,
— "ভালোবাসার মানুষ কি কোনোদিন পুরোপুরি ছেড়ে চলে যেতে পারে?"
— "কিন্তু একদিন তো এই হাতটা ছেড়েই দিতে হবে, তাই না?"— স্ত্রীর চোখে কিছুটা মলিনতা।
বৃদ্ধ স্ত্রীর হাতটি শক্ত করে ধরে বললেন,
— "হাত ছাড়বে, কিন্তু সঙ্গ তো নয়। তুমি থাকবে এই নদীর মিষ্টি হাওয়ায়, এই স্নিগ্ধ আলোর সকালে, আর আমার প্রতিটা অভ্যাসে।"
— "যদি কোনোদিন খুব একা লাগে তোমার?"
— "তখন আমি একাই এই ঘাটে চলে আসব। নদীর স্রোত যেমন থামে না, তেমনি তোমার স্মৃতিও আমার অন্তরে আজীবন বয়ে চলবে।"
— "তাহলে আমি চলে গেলেও, আমাদের এই সকালগুলো বেঁচে থাকবে?"
— "যতদিন এই নদী বইবে, ততদিন আমাদের ভালোবাসাও বেঁচে থাকবে।"
ঠিক তাঁদের উল্টোদিকেই প্রতিদিন বসে থাকেন আর এক একাকী বৃদ্ধা। সামনে সাজানো তাঁর সামান্য কিছু জিনিসের ছোট্ট পসরা। চোখে তাঁর দিনের প্রথম ক্রেতার প্রতীক্ষা।
এক তরুণ দাদুভাই এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল—
— "দিদা, এক প্লেটের দাম কত?"
— "ত্রিশ টাকা দাদুভাই,"— মিষ্টি হেসে বললেন বৃদ্ধা।
তরুণটি একটি একশো টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে বলল,
— "এই নাও, আমার কাছে তো খুচরো নেই... বাকিটা রেখে দাও।"
— "আরে না না! তা কী করে হয়!"
— "আহা, রাখো তো! দিন দিন যেন তুমি কেমন শুকিয়ে যাচ্ছ দিদা! একটু নিজের খেয়াল রাখা দরকার।"
বৃদ্ধা একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— "বয়স হলে শরীর আর কারও কথা শোনে না দাদুভাই। তবু যতদিন পারি, শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলছি..."
তরুণটি জিজ্ঞেস করল,
— "আগে তো তোমার সঙ্গে দাদুকে আসত দেখতে পেতাম। এখন আর আসেন না কেন দিদা?"
বৃদ্ধার চোখে মুহূর্তের জন্য বিষাদের ছায়া নেমে এল। ম্লান মুখে বললেন,
— "আর আসবে না বাবা... দু-তিন মাস হলো, মানুষটা আমাকে একা ফেলে রেখে চলে গেছে।"
তরুণটি লজ্জিত হয়ে বলল,
— "ইশ!! খুব কষ্টের কথা বললে দিদা... আমি সত্যি জানতাম না।"
— "কষ্ট তো আছেই বাবা। তাই তো রোজ এই নদীর ঘাটে এসে বসি। মনে হয়, ওর সঙ্গে কাটানো সুন্দর সকালগুলো আজও এই ঘাটের বাতাসে ছড়িয়ে রয়েছে।"
কথা বলতে বলতে বৃদ্ধা একটু দূরে পাশাপাশি বসে থাকা সেই প্রবীণ দম্পতির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বৃদ্ধার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসির আড়ালেই যেন লুকিয়ে ছিল তাঁর বহু বছর আগের ফেলে আসা একেকটা মধুর সকাল।
তরুণটি আবার জিজ্ঞেস করল,
— "কী দেখছ ওদিকে, দিদা?"
— "দেখছি... সময় কত সহজে মানুষকে 'আমরা' থেকে 'আমি' করে দেয়,"— এক গভীর সত্যি উচ্চারণ করলেন বৃদ্ধা。
— "তোমার খুব কষ্ট হয়, তাই না দিদা?"
— "কষ্টটা এখন আর নতুন নয় বাবা। শুধু ভোর হলেই মনে হয়, আজও বুঝি ও ডেকে বলবে, ‘চলো, ঘাটে যাই!’ তারপর ভুল ভেঙে মনে পড়ে... এখন তো একা একাই আসতে হয়।"
— "একা থাকতে ভয় লাগে না তোমার?"
— "ভয় না দাদুভাই... তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় তখন, যখন সারাদিনের ভালো-মন্দ কোনো কথাই আর ওকে বলা যায় না। সারাদিনে কত কথা জমে থাকে ভেতরে... কিন্তু সেগুলো শোনার মানুষটাই তো আর নেই।"
— "দিদা, তুমি কালও আসবে তো?"
— "যতদিন এই দুটো পা চলবে, ততদিন আসব বাবা। মানুষ তো একদিন থেমে যায়... কিন্তু আমাদের অপেক্ষাগুলো তো এত সহজে থামে না।"
কথা শেষ করে বৃদ্ধা ধীরে ধীরে তাঁর পসরাটা গুছিয়ে নিলেন। শেষবারের মতো নদীর দিকে আর সেই পাশাপাশি বসে থাকা প্রবীণ দম্পতিটির দিকে তাকালেন। তারপর লাঠিতে ভর দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় তাঁর অবয়বটা ধীরে ধীরে নদীর ঘাটের মানুষের ভিড়ে মিলিয়ে গেল।
নদীর ঘাটে কালও ভোর হবে, নদীও তার আপন নিয়মে বয়ে যাবে। থেকে যাবে শুধু কিছু চিরগত অপেক্ষা, কিছু মায়াময় অভ্যাস, আর চিরন্তন ভালোবাসা।
মানুষ চলে যায় সত্যি, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া ভালোবাসা কখনোই হারিয়ে যায় না।
সংগৃহীত