প্রকৃতির নীরব প্রতিশোধ

রক্তবীজ ও অরণ্যের অধিকার

১.
বালিগঞ্জের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করপোরেট অফিস। বাইরে কলকাতার চেনা কোলাহল। ফাইলের ওপর ঝুঁকে থাকা ঋষিকেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, কিন্তু সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানোর তাড়না তাঁর আজও কমেনি। আদিপুরুষের ছোট ব্যবসাটাকে নিজের আগ্রাসী দক্ষতায় এক বিশাল কংগ্লোমারেটে রূপ দিয়েছেন তিনি। তাঁর ব্যবসার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে গাছ কেটে কাঠ ও আসবাবপত্র তৈরি করে দেশে-বিদেশে চালান দেওয়া। অর্থ আর ক্ষমতার লোভে প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর অন্তরের বন্ধন কবেই ছিন্ন হয়ে গেছে।

তার পরবর্তী টার্গেট—সুন্দরবন। সেখানকার ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্যের সুন্দরী কাঠ দিয়ে তৈরি হবে নৌকা ও বিলাসবহুল আসবাবপত্র।

অফিসের বিশ্বস্ত কর্মচারী সরজিৎ এসে খবর দিল, "স্যার, ওখানের সুন্দরবনের দিকে গাছগুলো কাটা হয়েছে কিনা খোঁজ নিলাম। কিন্তু লোকাল মানুষজন তো বড্ড ঝামেলা করছে, গাছ কাটতেই দিচ্ছে না। আমার মনে হয় আমাদের একবার যাওয়া উচিত।"
ঋষিকেশ বাবু ফাইলটা সশব্দে বন্ধ করে বললেন, "হুম, চলো তবে।"

পরদিন সকালেই ঋষিকেশ বাবুর ব্যক্তিগত লঞ্চ এসে থামল সুন্দরবনের এক গহীন ঘাটে। সেখানে তাঁর সুন্দরবন ব্রাঞ্চের লোকাল ম্যানেজার অসিত বাবু অপেক্ষা করছিলেন。
লঞ্চ থেকে নামতেই ঋষিকেশ বাবু চড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "এখানকার কী অবস্থা অসিত?"
অসিত বাবু মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বললেন, "অবস্থা ভালো নয় স্যার। এমনিতেই এখানে জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘ। মানুষ এখানে ঘুরতে আসে, সেই পর্যটন দিয়েই স্থানীয়দের সংসার চলে। জঙ্গল কেটে দিলে তো আর কেউ ঘুরতে আসবে না। তাই গ্রামবাসীরা বড্ড ঝামেলা করতাছে।"

ঋষিকেশ বাবু গর্জে উঠলেন, "তোমাকে কি আমি মাইনে দিয়ে এমনি পুষেছি? সামান্য ঝামেলা সামলাতে পারো না? আমায় কলকাতা থেকে এখানে আসতে হচ্ছে এই ফালতু ঝামেলা মেটাতে! চলো, জঙ্গলে যাব।"
অসিত বাবু আর কথা না বাড়িয়ে নীরবে মাথা নিচু করে বসের পিছু নিলেন।

জঙ্গলের সীমানার কাছে পৌঁছাতেই দেখা গেল এক বিশাল জটলা। গ্রামবাসীরা কুঠার ও কাটারি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ঋষিকেশ বাবুকে দেখেই তারা আরও উত্তেজিত হয়ে এগিয়ে এলো。
একজন চেঁচিয়ে বলল, "এই জঙ্গল কাটা চলবেনি! আমরা এতগুলা মানুষ না খেতে পেয়ে মরব!"
আরেকজন সায় দিয়ে বলল, "ঠিক কথা! এই জঙ্গল দেখনের লিগে মানুষ শহর থেকে এইখানে আসে। এরপর আর আসবে কিডা?"

ঋষিকেশ বাবু অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, "দেখো, এই জঙ্গলের কিছুটা অংশ আমি আইনিভাবে কিনে নিয়েছি। আমি আমার জমিতে গাছ রাখব না কাটব, তাতে তোমরা কিছু বলতে পারো না।"
উত্তেজিত জনতা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। এক যুবক কুঠার উঁচিয়ে বলল, "না, এসব কথা আমরা জানিনে। এই জঙ্গল আমাদের! আজ এই জঙ্গলের গাছ কাটি দিলে আপনারেও আমরা পুঁতে দেবা!"

পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাচ্ছে দেখে পোড় খাওয়া ব্যবসায়ী ঋষিকেশ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর চিরাচরিত মোক্ষম চালটি চাললেন। তিনি হাত তুলে বললেন, "বেশ, ঠিক আছে। আমি তোমাদের বিকল্প চাকরি দেব। তোমরা জঙ্গল থেকে মধু আর ঘি বিক্রি করে কত টাকা পাও? তার দ্বিগুণ টাকা তোমরা আমার কাছ থেকে প্রতি মাসে মাইনে পাবে। রাজি?"

টাকার প্রলোভন আর প্রতিশ্রুতির মুখে গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো কিছুক্ষণ একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। অবশেষে তারা নতি স্বীকার করল, "হ, আমরা রাজি। তবে আপনার অংশ ছাড়া আর কোথাও গাছ কাটা যাবেনি।"

মনে মনে এক পৈশাচিক জয়ের হাসি হাসলেন ঋষিকেশ বাবু। প্রকৃতিকে কেনা এতই সহজ!

২.
রাত তখন তিনটে বেজে সতেরো মিনিট।
সুন্দরবনের এক বিলাসবহুল হোটেলের নরম বিছানায় শুয়েছিলেন ঋষিকেশ বাবু। হঠাৎই শরীরের ভেতর এক তীব্র, দমবন্ধ করা অস্বস্তিতে তাঁর ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ মেলতেই ভয়ে তাঁর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এলো। কোথায় গেল সেই বিলাসবহুল ঘরের এসি-র নাতিশীতোষ্ণ আরাম? চারপাশ নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে আছে।

আর সেই অন্ধকারের বুক চিরে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত, একটানা ফিসফিসানি শব্দ। যেন হাজার হাজার কণ্ঠস্বর একসঙ্গে ফিসফিস করে কিছু বলে চলেছে। ঘরের পরিবেশটা অদ্ভুত আদিম আর স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা। বাতাসে পচা পাতা, ভেজা মাটি আর বন্য পশুর গায়ের গন্ধের সাথে মিশে আছে রক্তের মতো একটা ধাতব সোঁদা গন্ধ।

ঋষিকেশ বাবু বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই টের পেলেন, তিনি কোনো নরম তোশকে নেই। তিনি শুয়ে আছেন শক্ত, খসখসে কোনো কিছুর ওপর। হাতড়ে বুঝলেন, ওটা বিছানা নয়—গাছের শিকড় বিছানো এক আদিম বেদী! ভয়ে তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। তবে কি গ্রামবাসীরা তাঁকে অপহরণ করেছে? কিন্তু সুন্দরবনের এই ঘন জঙ্গলে বাঘের আনাগোনা প্রবল, এখান থেকে তিনি বেরোবেন কী করে?

চারপাশের ফিসফিসানি ক্রমশ বাড়তে লাগল। আতঙ্কে ঋষিকেশ বাবু চিৎকার করে উঠলেন, "কে? কে ওখানে? অসিত? সরজিৎ?"
কিন্তু কোনো উত্তর এলো না। বনের অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে তাঁর বুকে চেপে বসল। ঠিক তখনই বাতাসে ভেসে এলো এক মায়াবী, অতিপ্রাকৃতিক মিষ্টি সুবাস। পারফিউম বা চেনা কোনো ফুলের গন্ধ নয় ওটা। এ যেন কোনো সম্মোহনী വിഷ, যা সরাসরি মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করছে। চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসতে চাইল তাঁর, কিন্তু ভেতরের আদিম ভয়টা তাঁকে ঘুমাতে দিল না।

হঠাৎই তিনি অনুভব করলেন পায়ের ওপর দিয়ে ঠাণ্ডা, আঁকাবাঁকা কিছু একটা হেঁটে বেড়াচ্ছে। সাপ?
আতঙ্কে চিৎকার করে পা দুটো ঝাড়া দিতে গিয়েও পারলেন না। নিমেষের মধ্যে চারপাশের মাটি ফুঁড়ে তীরের মতো উঠে এলো সুন্দরী গাছের সুতীক্ষ্ণ, তলোয়ারের মতো শ্বাসমূলগুলো! সেগুলো কোনো অদৃশ্য জাদুতে সাপের মতো মোচড় দিয়ে জড়িয়ে ধরল তাঁর গোড়ালি, তারপর তরতরিয়ে বেয়ে উঠতে লাগল তাঁর হাঁটু আর উরুর ওপর দিয়ে।

শিকড়গুলোর ধারালো অগ্রভাগ তাঁর ধবধবে সাদা দামি পাঞ্জাবি আর পাজামা ফুটো করে সরাসরি চামড়ায় গিয়ে বিঁধল। চামড়া ভেদ করে মাংসের গভীরে ঢুকে যেতে লাগল সেই ক্ষিপ্র শিকড়গুলো। তীব্র যন্ত্রণায় ধনুকের মতো বেঁকে গেলেন ঋষিকেশ বাবু。
"উফ! বাঁচাও! কেউ আছ? প্লিজ হেল্প মি! আমি টাকা দেব! যত চাও টাকা দেব! এখান থেকে বাঁচাও!"—গলার স্বর বুজে এলো তাঁর। আরও চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে আর কোনো শব্দ বেরোলো না।

ক্রমশ চারপাশের অন্ধকার ভেদ করে দূর থেকে এক নীলাভ আলো ছড়িয়ে পড়ল। সেই নীল আলোর ফাঁক থেকে বেরিয়ে আসছে এক বিশাল হাত। চারপাশের গাছগুলো যেন নড়াচড়া করছে, তাদের ডালপালাগুলো মানুষের কঙ্কালের হাতের মতো তাঁর দিকে প্রসারিত হচ্ছে।

আর তাঁর নিজের শরীরের ওপর চেপে বসা শ্বাসমূলগুলো তাঁর শরীরের সমস্ত রক্ত শুষে নিচ্ছে! সাদা পাঞ্জাবিটা ধীরে ধীরে তাজা রক্তে লাল হয়ে উঠল। ঋষিকেশ বাবু স্পষ্ট অনুভব করতে পারলেন, শিকড়গুলো শুধু বাইরে থেকে তাঁর শরীর বাঁধেনি, তাঁর ত্বকের তলা দিয়ে, শিরার ভেতর দিয়ে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করছে। তাঁর মনে হলো তাঁর পেটের ভেতর, ফুসফুসের ভেতর অজস্র ছোট ছোট বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে, শিকড় ছড়াচ্ছে।

মুহূর্তের মধ্যে তাঁর নাসিকাগহ্বর, চোখের কোটর, মুখগহ্বর ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে লাগল। আর অলৌকিক উপায়ে, সেই ক্ষতের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল ছোট ছোট সবুজ চারা গাছ! বাকশক্তিহীন প্রকৃতির এ কেমন নীরব প্রতিশোধ?

ঠিক তখনই সেই অলৌকিক নীল আলোর বুক চিরে একটা অতিকায় হাত তাঁর গলার দিকে এগিয়ে এলো। না, ওটা মানুষের হাত নয়, শত শত গাছের শ্বাসমূল একসঙ্গে পেঁচিয়ে তৈরি হয়েছে এক আসুরিক থাবা। সেই থাবাটা পরম আক্রোশে চেপে বসল ঋষিকেশ বাবুর গলায়। চোখের জ্যোতি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে তাঁর। চারপাশের ধূসর ফিসফিসানি ভরাট কণ্ঠস্বরের রূপ নিয়েছে। ঠিক যেন মাটির تলা থেকে একটা গভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এ কোনো মানুষের গলা নয়, মনে হচ্ছে সুন্দরবনের প্রকৃতি যেন আবৃত্তি করছে তাঁর ছেলেবেলায় দাদুর কাছে শোনা এক চেনা কবিতা:
"পালাবার পথ নাহি
দূর হতে দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়
হে বন্ধু, বিদায়"

৩.
পরদিন সকালের টেলিভিশনের পর্দায় ফুটে উঠল ব্রেকিং নিউজ:
"গতকাল মধ্যরাতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু ঘটেছে ধনী ব্যবসায়ী ঋষিকেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সম্প্রতি তিনি সুন্দরবন এসেছিলেন ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে। তবে সেখানে এসে গাছ কাটা নিয়ে সাময়িক বচসা হয় স্থানীয়দের সাথে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট নতুন মোড় এনেছে ওনার রহস্যজনক মৃত্যুতে। বাস্তবে শুনতে অসম্ভব মনে হলেও ময়নাতদন্তে ওনার পেটের ভেতর তাজা চারাগাছের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলেই জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার লালবাজারের সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। কীভাবে জন্মালো চারাগাছ? কিসের রহস্য লুকিয়ে আছে মিস্টার ব্যানার্জীর মৃত্যুতে? সত্যিই কি এ কারোর ষড়যন্ত্র নাকি অলৌকিক ঘটনা?..."

হাসপাতালের মর্গে সাদা চাদরে ঢাকা ঋষিকেশ বাবুর নিথর দেহ। ডাক্তার চাদরটা সরাতেই চমকে উঠলেন। মৃতদেহের বুক আর পেটের ক্ষত চিরে সদর্পে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে একটি তরতাজা সবুজ চারাগাছ।

মানুষ প্রকৃতির সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও লোভী জীব। বুদ্ধি ছাড়া তার আর কিছুই নাই। কিন্তু সে ভুলে যায়, প্রকৃতির ওপর সীমাহীন অত্যাচার করলে প্রকৃতিও ছেড়ে কথা বলে না। মানুষকে মারার অজস্র উপায় প্রকৃতির কাছে আছে—কখনো মহামারী, কখনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, আর কখনো বা এমন কোনো অতিপ্রাকৃতিক রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ, যার উত্তর বিজ্ঞানের কাছেও অধরাই থেকে যায়।


সংগৃহীত