অনাগত সন্তানের হাহাকার, এক মায়ের রক্তক্ষরণ আর কত সইবে নৌশিন

আপনি মানুষ না, অমানুষ। আপনি পুরুষ না, কাপুরুষ। আপনি রাগের মাথায় বউকে ধরে পেটাতে পারেন, তাহলে মা-বোনকে ধরে পেটাতে পারেন না কেন? আমি কখনো কোনো অভিযোগ করি আপনার কাছে? করেছি কোনোদিন? বলেছি কিছু? এই বাড়িতে আসার পর কী পেয়েছি আমি? পেয়েছি শুধু আপনার মা'ইর, আপনার মায়ের অকথ্য ভাষার গালাগালি, আর আপনাদের অত্যা'চার নির্যা'তন। আপনি ভালো ছেলে, ভালো ভাই হলেও ভালো স্বামী, ভালো বাবা নন।

আপনি জালিম, সবসময় আমার উপর জুলুম করেছেন। আপনি আমার দুজন অনাগত সন্তানকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন। মা-বোনের কথা শুনে রাগ ওঠে তাহলে মা-বোনকে ধরে মা'রতে পারেন না? আমাকে কেন মা'রেন প্রতিবার? আমি আপনার বউ বলে? বউকে যখন তখন কোনো কারণ ছাড়াই মা'রা যায় তাই না? আমাকে মা'রার জন্যই এনেছেন তাই না? আমাকে ভালোবেসেছেন কখনো? বাসেননি তাই না? আমি আর থাকবো না আপনার কাছে? হয় জানে মে'রে ফেলুন নয়তো তালাক দিয়ে দিন। একা একা বাঁচতে পারলে বাঁচবো নয়তো গলায় দড়ি দিয়ে মর'বো তবুও আপনার সঙ্গে আর থাকবো না। আপনি তো জানতেন আমার পেটে বাবু আছে, জেনেও কীভাবে পেটে আঘাত করলেন?”

রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পাগলের মতন একনাগাড়ে কথাগুলো বলল নৌশিন। নৌশিনের কথাগুলো শুনে নৌশিনের স্বামী আরাফ নিচু কন্ঠে অপরাধীর ন্যায় বলল, “আমি ইচ্ছে করে করিনি, ভুলে গেলে গেছে।”

“বারবার ভুলে লেগে যায়? আগের বারও তো ভুলেই লেগে গিয়েছিল বলেছিলেন। পাঁচমাস হতে চলেছিল, বাবু একটু একটু নড়তো। আপনি কীভাবে পারলেন আবারও আমার সন্তানকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে? আপনি ইচ্ছে করেই এমন করেন তাই না? আমি তো অন্যের মেয়ে, আমার প্রতি মায়া নাই কাজ করল, বাবুরা তো আপনার সন্তান ছিল, ওদের প্রতি কী একটুও মায়া কাজ করেনি আপনার?”

আরাফ নৌশিনের হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে বলল,

“ওঠো এখান থেকে।”

নৌশিন ঝাড়া দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে শাসিয়ে বলল,

“একদম ছোঁবেন না আমাকে, দূরে সরুন। তালাক দিয়ে দিন আমি চলে যাব এখান থেকে। আমাকে ছাড়ুন বলছি। দূরে সরুন আমার কাছ থেকে, সরুন। আপনি খু'নি, আমার সন্তানদের খু'ন করেছেন আপনি। অমানুষ, বর্বর, কাপুরুষ আপনি। মা-বোনের কথা শুনে বউ পেটান।”

“নৌশিন, ওঠো এখান থেকে।”

“আমি আর ভয় পাই না আপনাকে। মা'রবেন? মা'রুন, মা'রতে মা'রতে মে'রে ফেলুন।”আরাফ নৌশিনের হাত ছেড়ে সামনে বসে বলল,

“এভাবে ঝড় বৃষ্টির মধ্যে বসে থাকলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। বাজও পড়ছে অনেক জোরে জোরে। ভেতরে চলো, যা বলার ভেতরে গিয়ে বলবে।”

নৌশিন রাগে ফেটে পড়ে আরাফকে ঠেলে ফেলে দিলো। তার দূর্বল শরীরে হঠাৎই অনেক শক্তি চলে এসেছে। তার ভীত চোখজোড়ায় আজ একফোঁটাও ভয়ের রেশ নেই। ভীত সন্ত্রস্ত চোখজোড়ায় আজ আগুন জ্বলছে। এক বছরে পর পর দুবার নিজের অনাগত সন্তানদের হারিয়ে সে পাগলের মতো আচরণ করছে আজ। আরাফের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,

“আমি যাব না আপনার সঙ্গে, আমি যাব না আর এই বাড়ির ভেতর। আপনি অনেক কষ্ট দিয়েছেন আমাকে, আমি আর কোনো কষ্ট সহ্য করব না। আপনি তো মায়ের বাধ্য সন্তান, যান গিয়ে মায়ের আঁচলের নিচে ঢুকে বসে থাকুন। আপনার মা যাই বলুক আপনি সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই প্রত্যেকবার আমার গায়ে হাত তুলেছেন। আপনি কাপুরুষ। আপনি স্বামী হওয়ার অযোগ্য, বাবা হওয়ার অযোগ্য। আমি কোনোদিন মাফ করব না আপনাকে। তালাক দিয়ে দিন আমাকে। একদম ছুঁতে আসবেন না আমাকে, দূরে সরুন আমার কাছ থেকে। আপনাকে ঘৃণা লাগছে, আপনার ছোঁয়া বিষাক্ত লাগছে। আপনার মতো জানো'য়ারদের বিয়ে করাই উচিত না, নাকি শুধু আমাদের মতো নৌশিনদের বেলায়ই আপনারা এমন জানো'য়ার?”

আহাজারি করে কাঁদতে লাগল নৌশিন। একজন মা-ই বোঝে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা। সে নিজের সন্তানকে হারিয়ে তখন থেকে কাদঁছে, পাগলের মতন আচরণ করছে। কই আরাফ তো এমন কিছু করছে না। আরাফের কী মায়া লাগছে না নিজের সন্তানের জন্য? তার সন্তানকে কোথায় নিয়ে মাটি চাপা দিয়ে এলো আরাফ? এই বৃষ্টির মধ্যে তার ছোট্ট সন্তানটা একা রয়েছে। মায়ের দেহের ভেতরে আরামে থাকার কথা ছিল তার, অথচ বাবার রাগ আর হিংস্রতার কারণে সে এখন ভেজা ঠান্ডা মাটির নিচে রয়েছে। সে তো অনাগত ছিল, তাকে যত্ন করে কবরও দেয়নি。

নৌশিন নিজের ব্যথা যন্ত্রণা ভুলে হাঁটুতে ভর করে আরাফের শার্টের কলার দুই হাতে খামচে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,

“বলুন আমার সন্তানকে কোথায় মাটি চাপা দিয়ে এসেছেন। আমাকে নিয়ে চলুন তার কাছে।”

আরাফ নৌশিনকে চেপে ধরল নিজের সঙ্গে তবে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারল না। ছোটাছুটি করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে নৌশিন। ব্যথাতুর দূর্বল শরীর টেনে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আরাফের হাত ধরে টানতে টানতে অস্থির হয়ে বলল,

“উঠুন, আমাকে নিয়ে চলুন বাবুর কাছে।”

রোবটিক ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল আরাফ। তার পরনে এখনো অফিসের ফরমাল শার্ট প্যান্ট। এখন রাত বাজে আড়াইটা। তুমুল ঝড়, ভারী বর্ষণ, আর জোরে জোরে বজ্রপাত হচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে বাজ পড়ার আলোয় আলোকিত হচ্ছে চারপাশ।সিঁড়ির গোড়ায় টর্চ লাইট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আরাফের মা আসমা বেগম গলার আওয়াজ বাড়িয়ে বললেন,

“বাবু, কই যাস ওইদিকে?”

আরাফ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি ভেতরে যাও।”

নৌশিনকে আগলে ধরে নিয়ে বাড়ির পেছন দিকটায় এলো আরাফ। নৌশিন আরাফের মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল সুরে বলল,

“বাবুকে কোথায় রেখেছেন?”

চারদিকে অন্ধকার, দেখা যাচ্ছে না কিছুই। বাজ পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আলোকিত হলো চারপাশ। আরাফের চোখের সামনে জায়গা টুকু স্পষ্ট হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। নৌশিন আবার জিজ্ঞেস করতেই হাত তুলে সম্মুখে দেখিয়ে বলল,

“ওই ডালপালার নিচেই।”

নৌশিন আরাফের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল। আগের চেয়েও বেশি পাগলামি করতে করতে বলল,

“ছাড়ুন! ছাড়ুন আমাকে! আমি আমার সন্তানের কাছে যাব। আপনি নির্দয়ের মতন ওই ডালপালার নিচে কেন রেখেছেন বাবুকে? আমাকে ছাড়ছেন না কেন?”

“নৌশিন, শান্ত হও। এমন কোরো না, তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন।”

“আমি ম'রব। আমি ম'রে যাব তারপর বিশ্রাম নিব। বেঁচে থাকা কালীন বিশ্রাম আমার জন্য হারাম করে দিয়েছে আপনার মা।”

নৌশিন আরাফের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ছুটে এলো ডালপালার কাছে। ডালপালা সরিয়ে মাটি খুঁড়তে আরম্ভ করতেই আরাফ ছুটে এসে তাকে আটকাল। সরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করে বলল,

“নৌশিন, পাগল হয়েছো? কী করছো এসব?”

“হ্যাঁ। আমি পাগল হয়ে গেছি। আমি বরাবরই পাগল সেজন্যই তো আপনাদের সকলের এত অত্যা'চার নির্যা'তন জুলুম মুখ বুঁজে সহ্য করে গেছি। আমি পাগল বলেই পর পর দুজন সন্তানকে হারিয়ে ফেললাম। আমি পাগল। আমি পাগল—”

অস্বাভাবিক আচরণ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ল নৌশিন। আরাফ তাকে ছেড়ে অন্ধকার হাতড়ে ডালপালাগুলো আগের জায়গায় এনে রাখল। ফিরে এসে নৌশিনকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে অগ্রসর হলো বাড়ির দিকে। স্মরণ হলো প্রথম সন্তান হারানোর দিনটার কথা。

চলবে.......

সংগৃহীত