অচেনা আলো

মধ্যরাতের ক্যাব, অচেনা চালক আর এক অদ্ভুত সত্যি— রাতের শহরের বুকে এক মেয়ের টানটান উত্তেজনার গল্প!

রাত তখন ঠিক এগারোটা পাঁচ। অফিসের কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে পা রাখতেই মৌমিতার মনে হলো, চোখের পলকে শহরটার যেন বয়স বেড়ে গেছে। সকাল থেকে যে রাস্তাটা হর্ন, চিল-চিৎকার আর চেনা-অচেনা মানুষের ব্যস্ততায় থরথর করে কাঁপছিল, সেই শহরটাই এখন ক্লান্ত, অবসন্ন। বড় বড় কর্পোরেট অফিসের আলো একে একে নিভে আসছে। ফুটপাথের দু-একজন চায়ের দোকানদার চটজলদি দোকান গুটিয়ে বাড়ি ফেরার তাড়া দেখাচ্ছে। দূরে একটা নেউটো কুকুর ডাস্টবিনে মুখ গুঁজে খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত।

আজ কাজের ডেডলাইন শেষ করতে করতে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে ইতিমধ্যেই তিন-তিনবার ফোন চলে এসেছে।
"কোথায় আছিস?"
"রওনা দিলি?"
"একা ফিরছিস নাকি রে?"

মোবাইলের স্ক্রিনে মায়ের নম্বরটা ভেসে উঠতেই মৌমিতা সংক্ষেপে শুধু বলেছিল, "হ্যাঁ মা, রওনা হচ্ছি। আর দশ-পনেরো মিনিট।"

ফোনটা কেটেই অ্যাপে একটা ট্যাক্সি বুক করতেই দেখাল, গাড়িটা মাত্র ২ মিনিট দূরেই আছে। ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে ঠিক দু'মিনিট পরেই একটা পুরনো, সাদা রঙের অ্যাম্বাসেডর গাড়ি এসে দাঁড়াল ওর সামনে। মৌমিতা গাড়ির দরজাটা খুলতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা ছ্যাঁত করে উঠল। ড্রাইভারকে প্রথম দেখায় যে কারওরই একটু ভয় লাগা স্বাভাবিক। লোকটার মুখের ডানদিকটা পুরো পোড়া— যেন বহু বছর আগের কোনো ভয়াবহ আগুনের ক্ষতচিহ্ন এখনও শুকিয়ে বসে আছে চামড়ায়। ঘন কাঁচাপাকা দাড়িতে মুখের অর্ধেকটা ঢাকা, কপালে একটা গভীর কাটা দাগ। পরনে একটা পুরনো ছেঁড়া সোয়েটার, যদিও এই রাতে তেমন কোনো শীত নেই।

লোকটা মৌমিতার দিকে তাকিয়ে কোনো কৃত্রিম হাসি হাসল না। শুধু যান্ত্রিক গলায় বলল, "OTP ম্যাডাম।"
মৌমিতা একটু থতমত খেয়ে বলল, "হ্যাঁ, ৪৩২১।"
"উঠুন।"

গাড়ি চলতে শুরু করল। মৌমিতা অভ্যাসবশত প্রথমেই ফোনে নিজের লাইভ লোকেশনটা বাবার নম্বরে শেয়ার করে দিল। তারপর ফোনটা ব্যাগে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই সামনে থেকে ড্রাইভারের ভারী গলা ভেসে এল, "বাড়িতে লোকেশন পাঠিয়ে দিলেন?"

মৌমিতার আঙুলগুলো ফোনের স্ক্রিনেই জমে গেল। মাথাটা ধীরে ধীরে ওপরে তুলল ও। লোকটা দেখল কী করে? সে তো সামনের দিকে তাকিয়েই সোজা গাড়ি চালাচ্ছে! নিজের ভয়টা আvarlakরে মৌমিতা কোনোমতে বলল, "হ্যাঁ।"

লোকটা এবার রেয়ার ভিউ মিররে একবার মৌমিতার চোখের দিকে তাকাল। ঠান্ডা গলায় বলল, "এখন সবাই পাঠায়। ভালো অভ্যাস। এত রাতে একা ফিরলে বাড়ির লোক অন্তত বুঝতে পারে কোথায় আছেন।"

মৌমিতা কোনো উত্তর দিল না। গাড়ির ভেতরের অস্বস্তিটা আরও একটু চেপে বসলো ওর বুকে। লোকটা কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে আবার বলল, "তবে একটা সমস্যা আছে।"
Mৌমিতার বুক এবার ধক করে উঠল, "কী সমস্যা?"
"যদি মাঝ রাস্তায় দেরি হয়ে যায়... এত রাতে বাড়ির লোক চিন্তা করে নিশ্চয়ই?" একটু থেমে লোকটা কথাটি যোগ করল।

এরপর ড্রাইভার আর একটা কথাও বলল না। কিন্তু তার বলা কথাগুলো যেন বন্ধ গাড়ির এসির হাওয়াতেই ঘুরপাক খেতে লাগল। মৌমিতা অজান্তেই ফোনের জরুরি হেল্পলাইন নম্বরটা স্ক্রিনে খুলে রাখল। পাঁচ মিনিট কেটে গেছে নিস্তব্ধতায়। হঠাৎ লোকটা অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসল, "আমার একটা প্রশ্ন ছিল... উত্তর না দিলেও চলবে।"
মৌমিতা কিছুটা বিরক্তি আর ভয় মিশিয়ে বলল, "বলুন।"
"মেয়েরা যখন সাজে... সেটা কি অন্যের জন্য, না নিজের জন্য?"

মৌমিতা এবার সত্যিই বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ হলো। এই মাঝরাতে একজন অচেনা ড্রাইভারের কাছ থেকে এরকম প্রশ্ন আশা করা যায় না। সে রুক্ষ গলায় বলল, "এই প্রশ্নটা করার মানে?"
লোকটা খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে বলল, "অনেক বছর ধরে উত্তরটা খুঁজছি।"

মৌমিতার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। রাতে একা একটা মেয়েকে গাড়িতে পেয়ে এসব কী ধরণের প্রশ্ন? সে নিজেকে শক্ত করে ছোট করে বলল, "আপনি গাড়ি চালান। আমার ইচ্ছে, নিজের ভালো লাগে তাই সাজি।"
লোকটা আয়নায় চোখ রেখেই মাথা নাড়ল, "হুম..." তারপর এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন আরও কিছু বলতে চায়। মৌমিতা এবার সত্যিই মনে মনে কুঁকড়ে গেল।

অন্ধকার রাস্তা ও রহস্যময় লক

হঠাৎ করেই রাস্তার দু'পাশের দোকানপাট শেষ হয়ে এল। এখন শুধু চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা নির্জন মোড়ে এসে লোকটা আচমকা গাড়ির সবকটা দরজার লক টিপে দিল। 'ঠক!'

শব্দটা শুনেই মৌমিতার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে প্রায় চিৎকার করে বলল, "দরজা লক করলেন কেন?"
লোকটা প্রথমে কোনো উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, "এই এলাকাটা ভালো না।"

মৌমিতা আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। হাতের মোবাইলে জরুরি নম্বরটা তখনও জ্বলজ্বল করছে। সাধারণত রোজই রাত সাতটা-আটটা নাগাদ আরও দু-একজন সহকর্মীর সাথে গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরে সে। রাস্তাটা যে এত দীর্ঘ আর এতটা খাঁখাঁ ফাঁকা হতে পারে, তা কোনোদিন ওর ধারণাতেই ছিল না। ট্যাক্সির ভেতর এসি চলছে, তবুও যেন মৌমিতার গরম লাগছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে।

ঠিক তখনই লোকটা ড্যাশবোর্ডের রেডিওটা চালিয়ে দিল। এফএমে তখন আরজের ভারী গলা ভেসে এল— "যাঁরা এখনও পথে আছেন, সাবধানে বাড়ি ফিরুন।"

মৌমিতার অস্বস্তি চরমে পৌঁছাল। সে গলা ঝেড়ে একটু জোর গলায় জিজ্ঞেস করল, "এই এলাকা ভালো না? কীসের ভালো না? আমরা তো রোজই এই রাস্তা দিয়ে যাই!"

রাস্তার দু'পাশে এখন আর কোনো আলো নেই, মাঝে মাঝে দু-একটা বন্ধ ওষুধের দোকান আর একটা নির্জন এটিএম কাউন্টার ছাড়া শুধুই অন্ধকার। ঠিক তখনই রেয়ার ভিউ মিররে একটা সাদা আলো বারবার ঝলসে উঠতে লাগল। একটা মোটরবাইক পিছন থেকে ধাওয়া করছে。

প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি মৌমিতা। কিন্তু মিনিটখানেক পরেও বাইকটা ঠিক ট্যাক্সির পিছনেই লেগে রইল। ড্রাইভার একবার আয়নায় দেখল, তারপর গাড়ির গতি একটু বাড়াল। আশ্চর্যের বিষয়, বাইকটাও নিজের স্পিড বাড়িয়ে দিল! মৌমিতার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে আসছিল। হঠাৎ বাইকটা ডান দিক দিয়ে এসে ট্যাক্সির একেবারে সমান্তরালে চলতে শুরু করল।

বাইকে দুজন ছেলে বসে আছে। পেছনে বসা ছেলেটা জানালার ভেতর উঁকি দিয়ে কুৎসিতভাবে হাসল, তারপর ঠোঁট কামড়ে একটা অশ্লীল ইশারা করল মৌমিতার দিকে। মৌমিতা ঘৃণায় আর ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু তার চেয়েও বড় ধাক্কাটা লাগল যখন সে দেখল ড্রাইভার কিছুই বলছে না! বরং আয়নায় একবার ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে আবার রাস্তার দিকে চোখ ফেরাল।

ড্রাইভার কি ওদের চেনে? এরা কি একসঙ্গেই আছে? — মৌমিতার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে নিঃশব্দে ব্যাগের চেইন খুলে ফোনটা বের করতে যাবে, ঠিক তখনই ড্রাইভার আচমকা গিয়ার নামিয়ে জোরে এক্সিলারেটরে চাপ দিল! ইঞ্জিন গর্জে উঠল এক তীব্র শব্দে। ট্যাক্সিটা মুহূর্তের মধ্যে অনেকটা এগিয়ে গেল। বাইকটাও হাল ছাড়ল না, পিছু নিল। দুই-তিনশো মিটার ধরে যেন এক মরণপণ দৌড় শুরু হলো রাতের ফাঁকা রাস্তায়।

তারপর সামনে একটা বড় ট্রাককে ওভারটেক করে ট্যাক্সিটা সজোরে বাঁদিকে সরে যেতেই বাইকটা ট্রাফিকের ফাঁদে আটকে গেল। ট্রাকটা মাঝখানে চলে আসায় বাইক আর ট্যাক্সির মাঝখানে এখন বড় একটা ব্যবধান। ড্রাইভার তখনও কিছু বলছে না, শুধু দুই হাতে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে।

আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সে খুব আস্তে বলল, "এখন আর ওরা আসতে পারবে না।"
মৌমিতা চমকে তাকিয়ে বলল, "কারা?"
লোকটা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, "ওরা।"
"আপনি ওদের চেনেন?"
"না।"
"তাহলে জানলেন কী করে?"

লোকটা একটা হালকা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল, "পঁচিশ বছর ধরে রাতে গাড়ি চালাই, ম্যাডাম। কিছু মুখ চেনার জন্য নাম জানতে হয় না।"

আবার নীরবতা। কিন্তু মৌমিতার মনে তখনও সন্দেহ। লোকটা সত্যিই কি ওকে বাঁচাল? নাকি ওদের সঙ্গে কোনো পরিকল্পনা ভেস্তে গেল বলেই এই নাটক? উত্তরটা তার জানা ছিল না। ও জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল বাইকটা সত্যিই আর কোথাও নেই।

সে তড়িঘড়ি বাড়িতে ফোন করল। মা ধরলেন, "কি রে কতদূর? এত চিন্তা হচ্ছে!! বাবার শরীরটা ভালো না, নয়তো বাবা নিজেই যেত তোকে নিয়ে আসতে।"
মৌমিতা ধীরে ধীরে নিজেকে শান্ত করে বলল, "আর দশ মিনিট মা।"

ভুল বোঝাবুঝি ও এক বাবার অনুশোচনা

হঠাৎ ট্যাক্সিটা মূল রাস্তা ছেড়ে ডানদিকের একটা অন্ধকার গলিতে ঢুকে গেল। এটা শর্টকাট, মৌমিতা জানে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সে প্রায় চিৎকার করেই বলল, "এই রাস্তা কেন?"
লোকটা শান্ত গলায় বলল, "সামনে জ্যাম।"
"অ্যাপে তো দেখাচ্ছে না!"
"অ্যাপ সব সময় সব জানে না, ম্যাডাম।"

পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। মৌমিতা চিৎকার করে বলল, "হোক জ্যাম, অ্যাপে যে রাস্তা দেখাচ্ছে, সেটা দিয়েই চলুন!"
"কি হয়েছে মৌ?"— ফোনের ওপারে মায়ের চিন্তিত গলা।
মৌমিতা মাকে বলতে গেল, "মা, ড্রাইভার অন্য রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে.....মা...মা!!" কিন্তু ঠিক তখনই নেটওয়ার্ক চলে গেল। ফোন কেটে গেল。

লোকটা একটা অন্ধকার জায়গায় গাড়িটা থামাল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, "ভয় পাচ্ছেন?"
মৌমিতা উত্তর দিল না। ব্যাগটা শক্ত করে বুকের ওপর চেপে ধরল। লোকটা নিজেই বলল, "পাওয়াই উচিত। ভয় না পেলে মানুষ ভুল মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলে। এই সময় কাউকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।"

ড্রাইভার গাড়িটা আবার রিভার্স গিয়ারে নিয়ে সোজা করে নিল। অ্যাপে দেখানো চেনা রাস্তায় ফিরে এসে বলল, "ঠিক আছে। আপনি যেটায় স্বস্তি পান, আমরা সেটাতেই যাব।"

একটু পরে লোকটা আপনমনেই বলতে শুরু করল, "সবাই যদি এরকম সাবধানী হতো! ও-ও সাজতে ভালোবাসত। আমি খুব বকাতাম। ওকে কোনদিন সাজতে দিইনি। মনে হতো... মেয়েরা কম সাজলে নিরাপদ থাকবে। পরে বুঝেছি... ভুল ছিল।"

মৌমিতা এবার প্রথমবারের মতো লোকটার গলায় এক অদ্ভুত কান্না আর অনুশোচনার সুর শুনতে পেল। তার মনে হলো, এই পোড়া মুখের পেছনে লুকিয়ে আছে এক বাবা, যে হয়তো কোনো এক রাতে তার নিজের মেয়েকে এভাবেই হারিয়েছিল। রাতের শহরটা যতটা ভয়ঙ্কর, কিছু মানুষ হয়তো তার চেয়েও অনেক বেশি সংবেদনশীল। মৌমিতা জলের বোতলটা বের করে এক চুমুক খেল, সামনের জ্যামের আলো এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

"ভয় না পেলে মানুষ ভুল মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলে। এই সময় কাউকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।"

সংগৃহীত