অবহেলার মায়াজাল

"অবহেলার মায়াজাল: আর কতদিন সম্ভাবনার প্রেমে পড়ে থাকা?" 🌿✨


মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল নীলার। ঘরের অন্ধকারটা যেন বুকের ভেতরের শূন্যতাটার চেয়েও ভারী। পাশের টেবিলে রাখা ফোনটা জ্বলে উঠতেই নীলা এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

কোনো মেসেজ নেই।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীলা ফোনটা বালিশের পাশে রেখে দিল। চোখ দুটো আবার ভিজে উঠল। কেন বারবার এমন হয়? কেন সে বারবার এমন একজন মানুষের প্রতিই মায়ায় জড়ায়, যে কখনোই তার জন্য তৈরি ছিল না?

আকাশের প্রতি নীলার অনুভূতিতে কোনো খাঁদ ছিল না। সে আকাশকে মন থেকেই ভালোবেসেছিল। আকাশের একটা ছোট মেসেজ, একটা সামান্য ফোনকলের জন্য নীলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে থাকত। যেদিন আকাশ একটু হেসে সুন্দর করে কথা বলত, নীলার পুরো দিনটাই যেন আলোয় ভরে উঠত। আবার যেদিন আকাশ একটু অবহেলা করত, রুক্ষ আচরণ করত, নীলার রাতের ঘুম উবে যেত।

কিন্তু কিছু সম্পর্ক চেষ্টা কম হওয়ার কারণে ভেঙে যায় না। নীলা তো চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি! সে বারবার ছাড় দিয়েছে, নিজের অভিমানগুলোকে বুকের গভীরে চেপে রেখেছে, নিজের প্রয়োজনগুলোকে বলি দিয়েছে—শুধু সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার জন্য। তবুও সম্পর্কটা টিকছিল না। কারণ, ভালোবাসাটা যে শুধুই নীলার দিক থেকে ছিল!

আসলে নীলা আকাশের বর্তমান রূপটার প্রেমে পড়েনি, সে প্রেমে পড়েছিল আকাশের 'সম্ভাবনার'। নীলা বারবার নিজেকে বোঝাত, "আকাশ হয়তো একদিন বদলে যাবে। একদিন ও আমার অনুভূতির কদর করতে শিখবে। আর একটু সহ্য করি, আর একটু চেষ্টা করি... সব ঠিক হয়ে যাবে।"

আমাদের মন খুব দুর্বল। মানুষের ছোট ছোট যত্নেই তা আটকে যায়। আকাশ যখন মাঝেমধ্যে হঠাৎ নীলার খোঁজ নিত, একদিন খুব গুরুত্ব দিয়ে কথা বলত, নীলার মনে হতো আকাশ হয়তো আসলেই তাকে ভালোবাসে। কিন্তু পরদিনই আবার আকাশ দূরে সরে যেত। এক মুহূর্তে আপন করে নেওয়া, পরমুহূর্তেই এমন ভাব করা যেন নীলার কোনো অস্তিত্বই নেই—এই অনিশ্চয়তাই নীলাকে আরও বেশি আটকে রাখছিল। নীলা প্রতিদিন আকাশের পরিবর্তনের আশায় বসে থাকত, নিজের কষ্ট লুকিয়ে একতরফা ভালোবাসা প্রমাণ করে যেত। কিন্তু এই চেষ্টা তাকে শান্তি দিচ্ছিল না, বরং ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল।

নীলা খেয়াল করল, ইদানীং সে আর হাসে না। তার আত্মবিশ্বাস বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকেই নিজের অচেনা লাগে। সবসময় একটা ভয়, দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা তাকে তাড়া করে বেড়ায়।

হঠাৎই এক রাতে নীলার ভেতরের বিবেকটা জেগে উঠল। সে নিজেকে কঠিন কিছু প্রশ্ন করল:

উত্তরগুলো নীলা আগেই জানত, শুধু স্বীকার করার সাহস পাচ্ছিল না। ভুল মানুষকে ভালোবেসেছে বলে তার অনুভূতিটা কিন্তু ভুল ছিল না। নীলা বুঝতে পারল, যে সম্পর্ক তাকে নিজের চোখে ছোট করে দেয়, তা ভালোবাসা নয়—তা কেবলই একটা মায়াজাল।

ভুল মানুষকে ছেড়ে দেওয়া সহজ নয়। চাইলেই সব ভুলে যাওয়া যায় না। কিন্তু নীলা ঠিক করল, সে আর পুরোনো মেসেজ পড়ে নিজেকে কষ্ট দেবে না, বারবার তার প্রোফাইল ঘেঁটে নিজের ক্ষত তাজা করবে না।

হালকা ভেজা চোখে নীলা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। নিজেকে শুধাল, "আমি কি সত্যিই আকাশকে মিস করছি? নাকি তার সঙ্গে কাটানো অসম্পূর্ণ কোনো সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নকে মিস করছি?"

উত্তরটা এসে গেল এক মুহূর্তে। নীলা আকাশকে নয়, মিস করছিল সেই কল্পনাকে, যা কখনোই সত্যি হওয়ার ছিল না। অন্ধকার কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটছিল। নীলা বুঝতে পারল, এবার তাকে নিজেকে সময় দিতে হবে, নিজের ক্ষত নিজেকেই সারাতে হবে। অবশেষে সে একটা নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা বন্ধ করে দিল—নিজের হারিয়ে যাওয়া শান্তি আর আত্মসম্মানকে ফেরত পাওয়ার উদ্দেশ্যে।


সংগৃহীত