নিয়তির কোলাজ
১. নন্দনের বিকেল এবং এক জোড়া বিষণ্ণ চোখ
কলকাতার রাজপথের সেই চিরচেনা হলুদ ট্যাক্সির তীব্র হর্ন, ট্রামের টুংটাং আর মিনিবাসের কন্ডাক্টরের অনবরত চিৎকারের মাঝেও বিপাশা আর আয়াশ যেন এক টুকরো স্থির ছবি। চারপাশের এই চলমান জনসমুদ্রে তারা দুজনে যেন একলা এক দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছে। এই ছবিতে রঙের অভাব নেই, আবেগের তীব্রতার অভাব নেই; অভাব কেবল একটি জিনিসের—স্থায়িত্বের।
বিপাশার পরনে গাঢ় নীল সালোয়ার আর লাল ওড়না, যা বিকেলের পড়ন্ত রোদে বড্ড বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ঠিক যেন বিদায়ের আগে আকাশের গায়ে শেষবারের মতো রাঙা আবির মেখে যাওয়া। আয়াশের কাঁধে ঝুলছে একটা সাধারণ ল্যাপটপ ব্যাগ, চোখে চশমা, আর ঠোঁটে লেগে আছে সেই চিরপরিচিত ম্লান হাসি—যা বিপাশাকে প্রথম দিন থেকেই এক তীব্র আকর্ষণে টেনেছিল।
তারা নীরবে হাঁটছে নন্দন থেকে রবীন্দ্র সদন মেট্রো স্টেশনের দিকে। দু’জনে দু’জনের দিকে চেয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু আয়াশের চোখের কোণে আজ এক আকাশ ক্লান্তির ছায়া, আর বিপাশার ঠোঁটের কোণের কৃত্রিম হাসিতে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ।
২. বদলানো শহর ও লুকানো মেসেজ
—"আয়াশ, তুই কি সত্যিই ভাবিস এই শহরটা একটুও বদলায়নি?"
বিপাশা হঠাৎ তাদের মাঝের দীর্ঘ নীরবতা ভাঙল। তার কণ্ঠস্বর কলকাতার এই ভ্যাপসা আর্দ্র বাতাসের মতো ভারী শোনাল। আয়াশ একটু থমকে দাঁড়াল। পিচঢালা রাস্তার একপাশে পকেটে হাত গুঁজে মৃদু হেসে বলল, —"শহর কি আর সহজে বদলায় রে বিপু? আসলে বদলাই আমরা। এই যেমন ধর, তুই এখন শারীরিকভাবে আমার পাশে হেঁটে কথা বলছিস ঠিকই, কিন্তু তোর মনটা অন্য কোথাও চলে গেছে। তোর ব্যাগ থেকে বারবার ফোনটা বের করছিস, আড়চোখে স্ক্রিনটা দেখছিস... কার মেসেজের অপেক্ষায় আছিস বল তো?"
বিপাশা কোনো উত্তর দিল গঠনমূলক দিল না। সে অপরাধীর মতো চোখ নামিয়ে নিল। সে জানে আয়াশ একটু বেশি বুঝে ফেলে। তার মনের ভেতরের প্রতিটি সূক্ষ্ম কম্পন আয়াশের চেনা। বিপাশা তার হাতের ছোট নোটবইটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। এই সাধারণ ডায়েরিটাতে তাদের দীর্ঘ তিন বছরের সম্পর্কের হাজারো ছোট-বড় হিসেব, খুনসুটি আর স্বপ্নের কথা লেখা আছে। কিন্তু আজকের হিসেবটা বড় বেশি নির্মম, বড় বেশি একতরফা।
৩. অর্ক, কানাডা এবং একটি 'সিকিউর ফিউচার'
—"তাহলে... বাড়ি থেকে পছন্দ করা পাত্রকে শেষমেশ পছন্দ হলো তোর! তা কে সেই ভাগ্যবান?" আয়াশ আবার প্রশ্ন করল। এবার তার গলায় কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগের সুর নেই, আছে শুধু একরাশ ঠান্ডা বিষণ্ণতা।
বিপাশা মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলল, —"অর্ক খুব ভালো ছেলে, আয়াশ। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, কানাডায় সেটলড। মা-বাবা অনেক আশা করে আছেন ওর ব্যাপারে। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে হয়ে আমি আর কতদিন একা একাই সমাজ আর ভাগ্যের সাথে লড়াই করব বল? তুই তো আমাদের রিলেশনটা নিয়ে কোনো ভবিষ্যৎ ভাবছিসই না! তোর ওই স্টার্ট-আপের চাকরিটা তো এখনো পার্মানেন্ট হলো না..."
বিপাশা কথা শেষ না করেই থেমে গেল। সামনের জনসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আয়াশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই তো সেই তিলোত্তমা কলকাতা, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার আয়াশ তাদের রঙিন স্বপ্ন আর খাঁটি ভালোবাসাকে ভালো কোনো ক্যারিয়ার বা একটা ‘সিকিউর ফিউচার’-এর অভাবে চোখের সামনে বিসর্জন দিতে দেখে।
৪. সস্তার চুড়ি বনাম দামি ঘড়ি
আয়াশ শান্ত গলায় বলল, —"জানি। অর্ক তোকে জীবনের সেই স্বাচ্ছন্দ্য আর নিরাপত্তা দিতে পারবে, যা আমি কোনোদিন পারব না। তোর হাতে আমার মেলা থেকে কিনে দেওয়া সস্তার কাঁচের চুড়ির বদলে তখন দামি ব্র্যান্ডেড ঘড়ি থাকবে। উত্তর আমেরিকার তীব্র শীতে তুই পিওর কাশ্মীরি শাল জড়িয়ে কফিতে চুমুক দিবি। আর আমি? আমি এই কলকাতার তীব্র গরমে মেয়ো রোডের মোড়ে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষায় ঘামব। এটাই তো বাস্তব, তাই না?"
বিপাশা অবাধ্য চোখের জল লুকাতে আয়াশের হাতটা ধরতে চাইল, কিন্তু পারল না। এক অদৃশ্য অথচ দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে তাদের মাঝখানে। সে কাঁপা গলায় বলল, —"তুই কি আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবি না, আয়ু?"
আয়াশ এবার পূর্ণদৃষ্টিতে বিপাশার দিকে তাকাল। তার চোখে জল ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা—যা কান্নার চেয়েও মারাত্মক। —"ক্ষমা করার কী আছে, বিপাশা? তুই তো কোনো অন্যায় করছিস না। তুই শুধু তোর ভালো থাকার, সুখে বাঁচার রাস্তাটা বেছে নিচ্ছিস। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস... ওই ঝকঝকে বিদেশের তুষারপাতের মাটিতে যখন খুব একা লাগবে, তখন এই ধুলোবালি মাখা তিলোত্তমার কথা বড্ড মনে পড়বে। মনে পড়বে এই সাধারণ আয়াশটাকে, যার তোকে কোনোদিন দামি রেস্তোরাঁয় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল না ঠিকই, কিন্তু তোর চোখের প্রতিটা ফোঁটা জল নিজের বুকে টেনে নেওয়ার ক্ষমতা রাখত।"
৫. শেষ পাতা ও বৃষ্টির পূর্বাভাস
মেট্রো স্টেশনের অন্ধকার সিঁড়িতে পা দেওয়ার ঠিক আগে বিপাশা হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। সে আয়াশের চোখের দিকে না তাকিয়েই তার হাতের সেই চেনা ডায়েরিটা আয়াশের অবশ হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল।
—"এটা যত্নে রাখিস। ভেতরের কবিতাগুলো শুধু তোর জন্যই লিখেছিলাম। আজ আর তোকে ওগুলো পড়ে শোনানোর মতো মানসিক ক্ষমতা আমার নেই। আসছি..."
বিপাশা আর দাঁড়াল না। সে দ্রুত মেট্রো স্টেশনের অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। ভিড়ের মধ্যে তার সেই লাল ওড়নার ঝলকটা কিছুক্ষণ দেখা গেল, তারপর সব ধোঁয়াশা আর ধূসরতায় মিশে গেল।
আয়াশ স্টেশনের মুখে একলা দাঁড়িয়ে রইল। সে কাঁপতে কাঁপতে ডায়েরিটা খুলল। পাতায় পাতায় তাদের কত স্মৃতি, শব্দের মেলা। তবে ডায়েরির একেবারে শেষ পাতায় কোনো ছন্দোবদ্ধ কবিতা ছিল না, ছিল নীল কালিতে লেখা কয়েকটা মাত্র রুক্ষ বাস্তবতার শব্দ...
"আমরা একে অপরকে ভালোবেসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমরা একে অপরের নিয়তি ছিলাম না। বাস্তব কোনো রূপকথা নয়, আয়াশ। বাস্তব হলো অভাব আর আপস।"
আয়াশ ঠোঁটের কোণে একটু হাসল। কলকাতার আকাশে তখন বিকেলের আলো মুছে গিয়ে ঘন কালো মেঘ জমছে। একটু পরেই হয়তো একটা প্রবল কালবৈশাখী বৃষ্টি নামবে। সে ডায়েরিটা পরম যত্নে নিজের ল্যাপটপ ব্যাগে পুরে নিল। তারপর মেট্রোর সিঁড়ির দিকে না গিয়ে, ভিড়ের একদম উল্টো দিকে, একলা কলকাতার রাজপথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।
পেছনে পড়ে রইল তাদের ভালোবাসার তিনটা বছর, কতগুলো না-বলা দীর্ঘশ্বাস আর একটা শহরের অসম্পূর্ণ রূপকথা।
সংগৃহীত