নীরবে সহ্য করার

সমাজের চোখে যিনি ভদ্র, দয়ালু আর পরোপকারী সরকারি কর্মকর্তা, ঘরের ভেতরে তাঁর রূপটা কেমন ছিল? আর যে মানুষটি পঁচিশটি বছর নীরবে সব সহ্য করে গেলেন, তাঁর মনের ভেতরে কী ঝড় চলছিল? অনামিকার চোখে দেখা তার আব্বু-আম্মুর সংসারের এক অদ্ভুত, থমথমে সত্য। এক নিপুণ নীরবতার গল্প, যা আম্মুর পঞ্চাশতম জন্মদিনে এসে এক ধাক্কায় বদলে দিল সবকিছু। শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল সেদিন? পড়তে ভুলবেন না এই রোমাঞ্চকর পারিবারিক উপাখ্যান—"ছায়া ঘর"


📖 ছায়া ঘর (প্রথম পর্ব)

আমার আব্বু আমাদের সামনের ফ্ল্যাটের এক আন্টিকে লুকিয়ে বিয়ে করে প্রায় পঁচিশ বছর সংসার করেছে... শুধু তাই না, সেই সংসারে দুইটা মেয়েও ছিল। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় কী জানেন? আম্মু সব জানতো। তবুও কখনো ঝগড়া করেনি, কাউকে কিছু বুঝতেও দেয়নি। কিন্তু আম্মুর পঞ্চাশতম জন্মদিনে... সে এমন একটা কাজ করেছিল, যেটার পর আমাদের পুরো পরিবারটাই বদলে গিয়েছিল।

আমার নাম অনামিকা। বয়স সাতাশ। ঢাকায় একটা বড় ল' ফার্মে কাজ করি। আম্মু— রোকোয়া বেগম, বাংলা শিক্ষিকা। আর আব্বু... আব্দুল মতিন। সরকারি চাকুরিজীবি। বাইরে থেকে ভীষণ সম্মানিত মানুষ। মানুষ তাকে ভদ্র, দয়ালু, পরোপকারী বলেই চিনতো। কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই বুঝতাম, আমাদের বাসার ভেতরে কিছু একটা অদ্ভুত নীরবতা আছে।

আমার যখন দশ বছর বয়স, তখনই প্রথম আব্বু আর আম্মু আলাদা রুমে ঘুমানো শুরু করে। আমি ছোট ছিলাম, তাই কারণ বুঝিনি। জিজ্ঞেস করলে আম্মু হেসে বলতো,

— “তোর আব্বুর নাকি ঘুমে নাক ডাকার অভ্যাস হয়েছে। আমি ঘুমাতে পারি না।”

তখন বিশ্বাস করতাম। এখন বুঝি, ওটা ছিল একটা সুন্দর মিথ্যে।


🔹 নতুন ভাড়াটে ও 'পরোপকারী' প্রতিবেশী

আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে তখন নতুন ভাড়াটে আসে। সেলিনা আন্টি। সাথে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে নীলা, আমার থেকে দুই বছরের ছোট। আর ছোটটা নীহা, তখন একদম বাচ্চা। সেলিনা আন্টির স্বামী নাকি মারা গেছে— এই গল্পটাই সবাই জানতো। ওরা আসার তিনদিনের মাথা থেকেই আব্বু যেন তাদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেল। কখনো গ্যাসের চুলা ঠিক করছে, কখনো বাজার করে দিচ্ছে, কখনো দুই মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছে।

পাড়া-প্রতিবেশীরা বলতো,

— “মতিন সাহেবের মতো মানুষ এখন আর হয় না।”

আম্মু তখন শুধু মুচকি হাসতো। বলতো,

— “ও ছোটবেলা থেকেই এমন। মানুষের উপকার করতে ভালোবাসে।”

কিন্তু সেই হাসির ভেতরে যে কী ছিল... সেটা বুঝতে আমার অনেক বছর লেগেছে।


🔹 নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্য

নীলা যখন কলেজে উঠলো, আব্বু তাকে একটা দামি ল্যাপটপ কিনে দিল। আমাকে কখনো এত দামি কিছু দেয়নি। আম্মু একদিন খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করেছিল,

— “তুমি তো নিজের মেয়ের জন্যও এত ভাবো না।”

আব্বু তখন খবরের কাগজ পড়তে পড়তেই বলেছিল,

— “আরে, মেয়েগুলোর তো বাবা নাই। একটু দেখাশোনা করলে সমস্যা কী?”

কথাটা এমনভাবে বলেছিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যাপার। আম্মু আর কিছু বলেনি।

সেদিন রাতে আমি দেখেছিলাম, আম্মু রান্নাঘরে একা দাঁড়িয়ে মাছ কাটছে। অদ্ভুত নিয়মিতভাবে বঁটি নামাচ্ছিল। টাক... টাক... টাক... তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি ছিল না। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

আমার বয়স যখন পনেরো, তখন প্রথমবার আব্বুর চোখের ভাষা বুঝতে শিখি। সেলিনা আন্টির দিকে তাকানোর সময় সেই চোখ আর “সহানুভূতি”র চোখ ছিল না। সেটা ছিল অন্য কিছু। সেদিন খুব ইচ্ছে করছিল আম্মুকে বলি। কিন্তু পারিনি। ভয় লাগছিল... যদি ভেঙে পড়ে? এখন বুঝি, আম্মু অনেক আগেই সব বুঝে গিয়েছিল।


🔹 উপহারের নেপথ্যে অন্য গল্প

নীলার আঠারোতম জন্মদিনে আব্বু তাকে একটা সোনার চেইন উপহার দিল। আম্মু সেটা আলমারিতে দেখে খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করেছিল, “কত দাম?” আব্বু এক সেকেন্ডও দেরি না করে বলেছিল,

— “অফিসের এক কলিগের জন্য কিনছি।”

আম্মু মাথা নেড়েছিল শুধু। কিছু বলেনি। কিন্তু আমি জানতাম, আম্মু বিশ্বাস করেনি। কারণ চেইনটা যেই ব্র্যান্ডের ছিল, সেই ব্র্যান্ডের জিনিস আম্মু নিজেও জীবনে ব্যবহার করতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একবার ছুটিতে বাসায় এসে দেখি, আম্মুর রুমে নতুন তালা লাগানো। আব্বু ড্রয়িংরুমের পাশের ছোট ঘরে ঘুমায়। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে?” আম্মু হেসে বললো,

— “বয়স হইছে মা। এখন আলাদা থাকলেই শান্তি লাগে।”

ওই কথা বলার সময় সে শসা কাটছিল। এমন নিখুঁতভাবে কাটছিল যে মনে হচ্ছিল, হাত কাঁপলে আঙুলটাই কেটে যাবে। তারপরও তার হাত একবারও কাঁপেনি।

নীলা চাকরি পেল আব্বুর পরিচয়ে। নীহা ভালো কলেজে ভর্তি হলো আব্বুর তদবিরে। সবাই বলতো,

— “মতিন সাহেব না থাকলে ওদের পরিবার দাঁড়াতেই পারতো না।”

আম্মু প্রতিবারই মাথা নেড়ে সহমত হতো। একদিন খালামণি মজা করে বলেছিল,

— “তোর জামাই তো দেখছি ওদের আসল অভিভাবক!”

আম্মু সেদিন হেসে বলেছিল,

— “ওর মনটা খুব বড়।”

এই কথা বলতে বলতেই সে আব্বুর জন্য একটা সোয়েটার বুনছিল। তিন মাস ধরে। শীত শেষ হয়ে গেল, আব্বু একদিনও সেটা পরেনি। বলেছিল, “ডিজাইনটা পুরোনো।” আম্মু কোনো রাগ করেনি। চুপচাপ পুরো সোয়েটার খুলে আবার উল গুটিয়ে রেখেছিল। অনেক পরে আলমারি গোছাতে গিয়ে আমি সেই উলগুলো দেখেছিলাম। সযত্নে রাখা। একটা ছোট কাগজও ছিল পাশে— “ভালো উল। হাতে ধুতে হবে।” আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল。


🔹 মেসেজ এবং একটি উৎসবের রাত

সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল নীলার বিয়ের সময়। আম্মু নিজের হাতে তাকে পাঁচ হাজার টাকা উপহার দিয়েছিল। আর নীহার এনগেজমেন্টে দিয়েছিল আরো বেশি। আব্বু অবাক হয়ে বলেছিল, “এত টাকা দেওয়ার কী দরকার?” আম্মু খুব শান্ত গলায় বলেছিল,

— “এত বছরের সম্পর্ক। কিছু দায়িত্ব তো থাকেই।”

ঠিক তখনই আব্বুর ফোনে মেসেজ আসে। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছিল—

“আব্বু, কালকে পর্দার কাপড় কিনতে যাবো। তুমি না গেলে কিছুই পছন্দ হয় না।”

আমার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। আম্মু ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ছিল। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে আব্বুর হাতে ফোনটা দিয়ে বলেছিল,

— “তোমার মেয়ে ডাকতেছে।”

আব্বুর মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গিয়েছিল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আম্মু ইতিমধ্যে রান্নাঘরে চলে গেছে। তারপর আবার সেই শব্দ— টাক... টাক... টাক...

সেদিন আম্মু এত আয়োজন করে রাতের খাবার বানিয়েছিল যে মনে হচ্ছিল বাসায় ঈদ। গরুর রেজালা, কাচ্চি, চিংড়ি মালাইকারি, পোলাও... কিন্তু আব্বু ঠিকমতো খেতেই পারেনি। আম্মু বারবার বলছিল,

— “খাও না, তোমারে কেমন শুকনা লাগতেছে।”

তার মুখে হাসি ছিল। কিন্তু আমি দেখেছিলাম, ভাত বাড়তে গিয়ে তার হাত সামান্য কাঁপছিল। আমি এতদিন ভাবতাম, আম্মু হয়তো সব মেনে নিয়েছে। হয়তো সে কিছু বোঝেই না। অথবা বুঝেও চোখ বন্ধ করে আছে। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম。


🔹 পঞ্চাশতম জন্মদিনের সেই মোড়

সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল আম্মুর পঞ্চাশতম জন্মদিনে। সেদিন আম্মু পুরো বাসা সাজিয়েছিল নিজের হাতে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, আব্বুর অফিসের মানুষ— সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিল। এমনকি সেলিনা আন্টি আর তার দুই মেয়েকেও।

আম্মুকে সেদিন অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। গাঢ় নীল শাড়ি, মাথায় খোঁপা, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। আব্বুও অনেক খুশি ছিল। তার মুখে সেই আত্মতৃপ্তির হাসি— যেন সে জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ জিতে গেছে। দুইটা পরিবার... পঁচিশ বছরের গোপন সম্পর্ক... কোনো ঝামেলা ছাড়া সামলে রাখার বিজয়ী হাসি।

কিন্তু সে জানতো না— আম্মু সেদিন এত সুন্দর করে সব সাজিয়েছে শুধু একটা মুহূর্তের জন্য। একটা এমন মুহূর্ত... যেটার পর আমাদের জীবনে আর কিছুই আগের মতো থাকেনি...

(চলবে...)


সংগৃহীত