নীরবতার শেষ সীমানা (পর্ব ১)

হাসপাতালের একটানা চৌদ্দ ঘণ্টার ক্লান্তিকর শিফট শেষ করে যখন ফ্ল্যাটের দরজায় এসে দাঁড়ালাম, শরীরটা তখন আর চলছিল না। মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল, পা দুটো যেন মাটির সাথে লেপ্টে আসছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, বাসায় ঢুকেই প্রথমে এক চিলতে ঠান্ডা জলে গোসল করব, তারপর একটু চুপচাপ বিছানায় শুয়ে শান্তি খুঁজব。

কিন্তু চাবি ঘুরিয়ে দরজাটা খুলতেই আমার সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তির আশা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই চোখে পড়ল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফাস্টফুডের খালি বাক্স, মিল্কশেকের কাপ, শপিং ব্যাগ আর নতুন কিছু ইলেকট্রনিকসের প্যাকেট। টিভির ভলিউম এত জোরে দেওয়া যে, আমার দরজা খোলার বা বন্ধ করার আওয়াজটুকুও কারও কানে পৌঁছাল না。

সোফায় আধশোয়া হয়ে আমার দুই ছোট বোন মগ্ন হয়ে মোবাইলে ভিডিও দেখছিল। আর মা, অর্থাৎ আলিয়া বেগম, পরম আরামে বসে স্মুদি খাচ্ছিলেন। ঘরের এই ছন্নছাড়া অবস্থার মাঝেও কারও চোখে-মুখে ক্লান্তির লেশমাত্র নেই, নেই কোনো দায়িত্ববোধের বালাই। যেন এই বিশাল সংসারটা কোনো জাদুবলে নিজে নিজেই চলে যাচ্ছে! অথচ মাসের পর মাস মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এই সবকিছুর বিল আমি একাই চুকিয়ে আসছি。

জুতোজোড়া খুলতে খুলতে চারদিকে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "অলিভিয়া কোথায়?"

ছোট বোন ফোন থেকে চোখ না তুলেই চরম উদাসীনতায় উত্তর দিল, "সম্ভবত রান্নাঘরে। পরিষ্কার করছে।"

ওর কণ্ঠস্বরে এমন একটা অবহেলা আর বিরক্তি মাখানো ছিল, যা শুনে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। মনে হলো, আমার গর্ভবতী স্ত্রী এই বাসার পুত্রবধূ নয়, বরং কোনো কেনা গোলাম বা কাজের মেয়ে! মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর রাগ নিয়ে আমি দ্রুত রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালাম。

সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তা হয়তো আমি এই জন্মেও ভুলতে পারব না。

অলিভিয়া রান্নাঘরের সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—খালি পায়ে। ওর দশ মাসের গর্ভবতী ভারী শরীরটা কোনোমতে কষ্টের সাথে সামলে নিয়ে এক হাত দিয়ে পেটটা চেপে ধরে রেখেছে, আর অন্য হাতে ধীরে ধীরে এঁটো প্লেটগুলো ধুচ্ছে। চারপাশের সিঙ্ক আর স্ল্যাব জুড়ে বাসনের পাহাড় জমে আছে। দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, রাতের খাবারের পর কেউ একটা গ্লাস পর্যন্ত ধুয়ে রাখার সৌজন্যতা দেখায়নি। অলিভিয়ার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটাও ওর জন্য এক মহাসংগ্রাম。

আমি ওর একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ও চমকে উঠল। চটজলদি চোখের কোণের জলটুকু মুছে মুখে একটা মিথ্যে হাসির আস্তর টেনে বলল, "তুমি চলে এসেছ? আমি... আমি ঠিক আছি।"

কিন্তু ওর কাঁপা কণ্ঠস্বর ওর ভেতরের কষ্টটাকে আড়াল করতে পারল না। আমি এগিয়ে গিয়ে ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিতেই শিউরে উঠলাম। হাত একদম বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলে ভিজে আঙুলগুলো কুঁচকে গেছে。

বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। আমি আলতো করে ওর হাত থেকে বাসন মাজার স্পঞ্জটা কেড়ে নিলাম। তারপর মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, "অলিভিয়া... তুমি এভাবে কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছ?"

ও প্রথমে মাথা নিচু করে রইল, কিছু বলতে চাইল না। তারপর অপরাধীর মতো ফিসফিস করে বলল, "সবাই খাওয়া শেষ করার পর একটু পরিষ্কার করছিলাম।"

ওই ‘একটু’ শব্দটার পেছনে যে কতটা নীরব যন্ত্রণা আর অবহেলা লুকিয়ে ছিল, তা তখনো আমি পুরোপুরি আঁচ করতে পারিনি। আমি আর দেরি না করে একটা চেয়ার টেনে ওকে বসালাম, এক গ্লাস জল এনে ওর মুখে ধরলাম। জলটুকু খেয়ে ও যখন একটু শান্ত হলো, তখন ওর মনের অবরুদ্ধ কথাগুলো ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে লাগল。

গত কয়েক মাস ধরে সংসারের খরচ টানতে আমি যখন দিন-রাত ওভারটাইম ডিউটি করছিলাম, তখন অলিভিয়া একাই এই পুরো বাসার পাহাড়সম দায়িত্ব সামলাচ্ছিল। সকালের সবার নাস্তা তৈরি থেকে শুরু করে দুপুরের রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘরদোর পরিষ্কার করা, বাজারের জিনিস গুছানো—এমনকি আমার দুই সাবালিকা বোনের ঘরের বিছানা-পত্র পর্যন্ত ওকেই গুছিয়ে দিতে হতো。

আমি স্তম্ভিত হয়ে বললাম, "মা কিছু বলে না?"

অলিভিয়া কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে চুপ করে রইল। তারপর চোখ নিচু করে বলল, "উনি বলেছিলেন, পরিবারের বউ হতে হলে সবাইকে আপন করে নিতে হয়... আর সংসারের কাজ না করলে নাকি কেউ আপন মনে করবে না।"

কথাটা বলতে বলতে ওর চোখ দুটো আবার জলে ভরে উঠল। এরপর ও এমন একটা কথা বলল, যা শুনে আমার শরীরের রক্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে হিম হয়ে গেল। ও জানাল, বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওর পায়ে অস্বাভাবিক ফোলা দেখা দিয়েছে, সাথে তীব্র মাথা ঘোরা আর পিঠের যন্ত্রণা সহ্য করছে ও। কিন্তু এত কিছুর পরও ও আমাকে কিচ্ছুটি জানায়নি。

কারণ জানতে চাইলে ও ম্লান হেসে বলল, ও ভয় পেয়েছিল। ভয় পেয়েছিল এই ভেবে যে, আমার পরিবার হয়তো ভাববে ও কাজ ফাঁকি দেওয়ার জন্য ‘নাটক’ করছে!

আমার মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। আমি আর একটা সেকেন্ডও অপচয় করলাম না। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে ফোন বের করে ওর গাইনোকোলজিস্টকে কল করলাম। ফোনের ওপাশ থেকে সব উপসর্গ শোনার পর ডাক্তারের গলা গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি কড়া ভাষায় বললেন, "ওকে এখনই সম্পূর্ণ স্ট্রেসমুক্ত রাখতে হবে। এই মুহূর্তে ওর প্রপার বেড রেস্ট দরকার। এই শারীরিক অবস্থায় অতিরিক্ত কাজের চাপ আর মানসিক চাপ মা এবং বাচ্চা—দুজনের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ!"

ফোনটা কেটে আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নিজের ওপরই তীব্র ঘৃণা হচ্ছিল। তারপর অলিভিয়াকে আলতো করে ধরে ধীরে ধীরে আমাদের ওপরের ঘরের বেডরুমে নিয়ে গেলাম। ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গায়ের ওপর নরম কম্বলটা টেনে দিলাম। ও তখনো ক্লান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বারবার বলছিল, "সব ঠিক হয়ে যাবে..."

আমি ওর কপালে হাত রেখে শক্ত গলায় বললাম, "না, এবার আমি সব ঠিক করব।"

ও শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি একরাশ জ্বলন্ত ক্ষোভ নিয়ে নিচে নেমে এলাম। ড্রয়িংরুমে তখনো একইভাবে হাসাহাসি আর আড্ডা চলছে। টিভির শব্দ আগের মতোই বিকট আওয়াজে বাজছে। যেন এই বাসায় কোনো মানুষ বাস করে না, কিংবা কারও কোনো সমস্যাই নেই!

আমি সোজা গিয়ে টিভির মেইন প্লাগটা ধরে এক টান মেরে খুলে দিলাম。

মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। টিভির রঙিন পর্দা কালো হয়ে যেতেই মা অত্যন্ত বিরক্ত মুখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "এটা কী ধরনের আচরণ?"

আমি কোনো উত্তেজিত চিৎকার করলাম না। অত্যন্ত শান্ত, শীতল আর দৃঢ় চোখে একে একে মা এবং আমার দুই বোনের দিকে তাকালাম। তারপর বরফশীতল গলায় বললাম—

"আজ থেকে এই বাসায় একটা জিনিস বদলাবে।"

**পর্ব - ১**

**দ্বিতীয় পর্ব খুব শীঘ্রই আসছে...**

**তাড়াতাড়ি পড়তে চাইলে দ্রুত কমেন্ট করে জানান!**

সংগৃহীত