অভিমানের আড়ালে লুকিয়ে
"অভিমানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক মিষ্টি শাসন, যা জীবনকে এক নতুন রঙে রাঙিয়ে তোলে।"

বিয়ের শপিং মলগুলোর নিয়ন আলোয় যখন চারিদিক ঝলমল করছিল, রিয়া তখন এক কোণায় দাঁড়িয়ে একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। আজ সে তার হবু বরের সাথে এসেছে বিয়ের কেনাকাটা করতে। বড় বড় কাপড়ের দোকান আর কসমেটিক্সের ভিড়ে রিয়া বরাবরই একটু গুটিয়ে থাকে। দামদর করার ব্যাপারে সে একেবারেই আনাড়ি। কোনো কিছুর দাম চাইতে গেলে তার গলা শুকিয়ে আসে。

একটা শাড়ির দোকানে এসে সে ফিসফিস করে হবু বরকে বলল, "আমি আসলে এই দামদর করতে পারি না। দোকানদাররা সবসময় আমায় ঠকায়। আগে তো বাবা সব কিনে দিতেন, তাই কখনো এসব ভাবতেই হয়নি।"

রিয়ার এই সরলতা দেখে হবু বর হেসেই ফেললেন। একটু মজার ছলে খোঁচা দিয়ে বললেন, "মেয়ে হয়ে দামদর করতে পারো না? তোমায় তো কোনো মিউজিয়ামে রাখা উচিত!"

কথাটা শুনে রিয়ার ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় আর কিছুটা অভিমানে আরও লাল হয়ে গেল। এক অদ্ভুত অনুভূতি তার মনে কাজ করছিল। তবে এর পর থেকে তাকে আর কিছু বলতে হয়নি। সেই ছেলেই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে রিয়ার জন্য সেরা কসমেটিক্স, জামা এবং শাড়ি বেছে নিতে লাগল। রিয়ার মনে হলো, ছেলেটি নিজের পছন্দের চেয়েও যেন রিয়ার ওপর কোনটা বেশি মানাবে, রিয়ার কোনটা ভালো হবে—সেদিকেই বেশি নজর দিচ্ছে。

কেনাকাটা শেষে দুজনে একটা চায়ের দোকানে বসল। রিয়া মৃদু স্বরে বলল, "চা খেতে আমার একটু অসুবিধা হয়, আসলে গরম চায়ে আমার ঠোঁট পুড়ে যায়।"
হবু বর জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে কী খাবে?"
রিয়া বাচ্চার মতো আবদার করে বলল, "আইসক্রিম খাবো।"
সঙ্গে সঙ্গে কড়া জবাব এলো, "সামনে বিয়ে। এই ঠাণ্ডার মধ্যে একদম আইসক্রিম খাওয়া যাবে না।"

রিয়া চুপ করে গেল। মনের গভীরে একটা ক্ষীণ ভয় আর সংশয় জেগে উঠল—"বিয়ের পর কি তবে সবকিছু ওর কথাতেই চলবে? আমার নিজের কি কোনো মতামতের দাম থাকবে না?"

নতুন জীবনের এক মাস পর...

বিয়ের পর দেখতে দেখতে একটা মাস কেটে গেল। একদিন রিয়া যখন তার পুরোনো কলেজে গেল, বান্ধবীরা তাকে দেখে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল।
সবাই একবাক্যে বলে উঠল, "কিরে রিয়া! তুই তো একদম অন্যরকম হয়ে গেছিস! তোর ড্রেসআপ, মুখের এই গ্লো—সবকিছু যেন অসাধারণ লাগছে!" বান্ধবীদের প্রশংসায় রিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করে হাসল。

শুধু কলেজেই নয়, রিয়া যখন বাপের বাড়ি বেড়াতে গেল, তার বাবা-মাও তাকে দেখে অবাক হলেন। মা জড়িয়ে ধরে বললেন, "এই প্রথম এতদিন ধরে তোর কোনো অসুখ-বিসুখ নেই, শরীরটাও বেশ ভালো হয়েছে দেখছি।"

রিয়া তখন কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে গাল ফুলিয়ে বলল, "অসুখ হবে কী করে শুনি? আইসক্রিম খেতে দেয় না, রাত জাগতে দেয় না, সারাক্ষণ শুধু এটা খাও, ওটা খাও বলে জোর করে!"

মেয়ের মুখে এই অভিযোগ শুনে মা হেসে ফেললেন। মা বললেন, "ঠিকই তো আছে। আমি যা পারিনি, জামাই যদি পারে তোর এই ঘাড়ত্যাড়ামিটা ঠিক করতে, তবে তো খুবই ভালো।"

রিয়া মায়ের ওপর রাগ দেখানোর ভান করে সবাইকে বলতে লাগল, "বিয়ে করে আমার নিজস্ব বলতে আর কিছুই নেই। উনি যা বলবেন, তাই শুনতে হয়। একেবারে বন্দি জীবন!"

বাস্তবতার মিষ্টি আলো

কিন্তু দিনের শেষে যখন রাতের নীরবতায় রিয়া নিজের ঘরে একা হয়, তখন তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে। আনন্দের আতিশয্যে চোখ দুটো ভিজে আসে। সে মনে মনে উপলব্ধি করে, বাবা-মায়ের পর এই প্রথম তার জীবনে এমন একজন মানুষ এসেছে, যে তার প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ের খেয়াল রাখে। সে কখন খাবে, কখন ঘুমাবে, কী পরলে তাকে ভালো দেখাবে—সবকিছু যে মানুষটা নিপুণভাবে খেয়াল রাখে। সে খুব ভালো করেই বোঝে রিয়ার কিসে ভালো আর কিসে মন্দ।

বাইরে রিয়া যতই কমপ্লেন করুক না কেন, মনে মনে সে চায়, সারাজীবন এই মানুষটা তাকে এভাবেই আদরের শাসনে আগলে রাখুক। এই শাসন তো কোনো বন্ধন নয়, এ তো এক মিষ্টি, মধুর এবং ভালোবাসায় ভরা খাঁটি শাসন।

--সমাপ্ত--


সংগৃহীত