মেঘমল্লারের গান: এক অপরাজিতার আত্মমর্যাদার আখ্যান
১. বজ্রপাত
ক্যাপশন: ত্রয়োদশ বিবাহবার্ষিকীর প্রাক্কালে যখন সুখের সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
নদী নামের মেয়েটির তেরো বছরের সাজানো সংসারটা এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে গেল তার ত্রয়োদশ বিবাহবার্ষিকীর ঠিক দুই সপ্তাহ আগে। একদিন সন্ধ্যায় রান্নাঘর থেকে ডেকে এনে স্বামী জয়নাল অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় নদীকে জানাল, আগামী সপ্তাহ থেকে তাদের ঘরে 'নিপা' নামের এক মেয়ে এসে থাকবে এবং নদীকে অন্য ঘরে চলে যেতে হবে। হতভম্ব নদী যখন জানতে চাইল নিপা কে, তখন জয়নাল শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে নির্লিপ্তভাবে জবাব দিল যে নিপা তার ছোট বউ এবং সোমবার থেকে নিপা আর তার ছেলে এই ঘরেই থাকবে।
নদী তখন রান্নাঘরের খুন্তি হাতে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। জয়নাল কথাটি বলেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু নদীর পিঠ বেয়ে ঘাম নামছিল, চুলায় তখন তার তরকারি পুড়ে যাচ্ছে। তেরো বছর ধরে সংসার সামলানো, চাকরি করা সবকিছুর আড়ালে যে জয়নাল গোপনে দুই বছর ধরে নিপার সাথে সম্পর্ক রেখে দ্বিতীয় বিয়েও করে ফেলেছে, নদী তার বিন্দুমাত্র টের পায়নি।
২. পুত্রসন্তানের লোভ ও শাশুড়ির রূপবদল
ক্যাপশন: কন্যাসন্তানের মায়ের অসহায়ত্ব যেখানে উপহাসের পাত্র হয়ে দাঁড়ায়।
নদীর শাশুড়ি জুলফা প্রথমে ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনে বিরক্ত হলেও, যখনই শুনলেন নিপার ঘরে জয়নালের একটি পুত্রসন্তান আছে, অমনি তিনি খুশিতে গদগদ হয়ে গেলেন। নদীর কোনো ছেলে নেই, কেবল দুটি মেয়ে (প্রাচী ও পর্ণা)। জয়নালের বিশাল সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য তো একজন পুরুষের দরকার! জুলফা পরম আনন্দে নতুন বউকে ঘরে তোলার সায় দিয়ে দিলেন এবং নিপার জন্য শাড়িও আনালেন।
নদীর কষ্ট দেখে শাশুড়ি উল্টো সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে বললেন, "আরে বড় বউ! মন খারাপ করো কা? বেডা মানুষ তো এমনই... আমার পোলা তোমারে ভালা পায় দেইখাই তালাক না দিয়া নিজের কাছে রাখতাসে।" সংসারের এই চরম পুরুষতান্ত্রিক এবং বৈষম্যমূলক আচরণ নদীর আত্মসম্মানে গিয়ে আঘাত করল।
৩. এক অসম লড়াই ও প্রত্যাখ্যান
ক্যাপশন: অধিকার ছেড়ে সম্মানের খোঁজে শূন্য হাতে যাত্রা।
যেদিন জয়নাল ধুমধাম করে লোক খাইয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীকে ঘরে তুলল, সেদিনই নদী শক্ত গলায় ঘোষণা দিল—সে আর এই সংসার করবে না, সে জয়নালকে তালাক দেবে। নদীর এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে বাড়ির সবার চোখ কপালে উঠল। শাশুড়ি জুলফা অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ভালো মেয়েরা নাকি কখনো তালাক নেয় না।
কিন্তু নদী কারো কথায় কান দিল না। তেরো বছরের ভালোবাসার মানুষটির প্রতারণা তাকে ভেতর থেকে শক্ত করে তুলেছিল। জয়নাল ভেবেছিল দেনমোহরের টাকা আর গয়নার লোভে নদী আটকে যাবে। কিন্তু নদী কাবিনের ছয় লক্ষ টাকা এবং চার ভরি স্বর্ণের গয়না অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করে দুই মেয়েকে নিয়ে শূন্য হাতে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।
যাওয়ার আগে জয়নাল তাকে তাচ্ছিল্য করে বলেছিল, "তোমাকে কে বিয়ে করবে নদী? এত তেজ দেখিয়ে যে বাপের ঘরে যাইতেছো, ওই তেজ থাকবো তো?... এখন আর কেউ তোমারে গুনবে না।" নদী সেদিন কোনো উত্তর দেয়নি, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল উপযুক্ত জবাব সে সময়মতোই দেবে。
৪. নতুন ভোরের সন্ধান
ক্যাপশন: অতীতের গ্লানি মুছে ফেলে আত্মপ্রত্যয়ী এক মায়ের নতুন জীবন গড়ার শপথ।
বাবার বাড়িতে আসার পর নদীর প্রচণ্ড জ্বর এলো। আটত্রিশ বছর বয়সী নদীর শরীরে ততদিনে সংসারের খাটুনি আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু ফজরের নামাজে দাঁড়িয়ে সে সিদ্ধান্ত নিল, সে অতীত নিয়ে আর কোনো হা-হুতাশ করবে না। নিজের জন্য, নিজের মেয়েদের জন্য এবং জয়নালকে একটি যোগ্য জবাব দেওয়ার জন্য সে আবার নতুন করে জীবন শুরু করবে。
নদী ফেসবুকের একটি গ্রুপে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জীবনের গল্প প্রকাশ করে একটি পোস্ট দিল, যার শিরোনাম ছিল— "একজন মেরুদণ্ডী স্বামী চাই।"
সেখানে সে স্পষ্ট আটটি শর্ত জুড়ে দিল:
- পাত্রকে অবিবাহিত হওয়া চলবে না (ডিভোর্সী বা বিপত্নীক হতে হবে)।
- পাত্রের সন্তান থাকলে ভালো, সে তাদেরও দেখাশোনা করতে চায়।
- নদীর দুই মেয়েকে অবশ্যই তার সাথেই রাখতে হবে।
- সে চাকরি করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে, স্বামী তাতে আপত্তি করতে পারবে না।
- তাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে বিয়ে করতে হবে।
- বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় পাত্রকে নদীর চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে।
- নদীর দুই মেয়ের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে।
- পাত্রকে কেবল রক্ত-মাংসের পুরুষ হলে চলবে না, তাকে হতে হবে মানবিক এবং মেরুদণ্ডী।
পোস্টের শেষে নদী তার সমস্ত সার্টিফিকেট, মেয়েদের জন্ম নিবন্ধন, চাকরির কাগজ এবং তালাকনামা সংযুক্ত করে দিল। সে লিখে দিল, সে আর কোনো অমেরুদণ্ডী প্রাণীর সাথে সংসার করতে চায় না, এবার সে একজন প্রকৃত পুরুষের ঘরনী হতে চায়।
সংগৃহীত