মায়ের কথা
"মায়েদের ভালোবাসার কোনো মেয়াদ থাকে না, কিন্তু ছেলেদের ভালোবাসার একটা মেয়াদ থাকে। মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে মায়েরা শুধু স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকে..." 💔🥀
"মা, তুমি কারে বেশি ভালোবাসো? আমারে না বাবারে?"
ছোট্ট রায়হানের এই নিষ্পাপ প্রশ্নটা আজও আমার কানে বাজে। সেদিন ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, "আমি তোরেই বেশি ভালোবাসি বাপ।" ও-ও ওর ছোট ছোট দুটো হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল, "আমিও তোমারে বেশি ভালোবাসি মা।"
আজ ২২ বছর পর সেই ছেলেটার কাছে আমার সাথে দুটো কথা বলার সময়টুকুও নেই। সময় নেই বলা ভুল, আসলে আমাকে আর তার প্রয়োজনই নেই। তার সমস্ত পৃথিবী এখন তার বউ আর শ্বশুরবাড়িকে কেন্দ্র করে।
আমার নাম রওশন আরা, বয়স পঞ্চান্ন। সাত বছর আগে আমার স্বামী মারা যান। এই বাড়ির প্রতিটি ইটের সাথে আমার আর আমার স্বামীর হাজারো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কত কষ্ট করে আমরা দুজনে মিলে এই সংসারটা গড়ে তুলেছিলাম! রায়হান যখন ছোট ছিল, ওকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দিতাম না। জ্বর হলে সারারাত মাথায় জলপট্টি দিয়ে জেগে থাকতাম। ও স্কুলে গেলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পথ চেয়ে থাকতাম, কখন আমার খোকা ফিরবে!
ওর বাবা প্রায়ই বলতেন, "ছেলেটারে এত মাথায় তুলো না রওশন! বড় হলে কিন্তু এই আদরের দাম ও বুঝবে না।"
আমি হেসে বলতাম, "আমার ছেলে কোনোদিন এমন হবে না। ও আমার কলিজার টুকরো।"
আজ বুঝতে পারি, ভবিষ্যতে কী হবে তা নিয়ে নিশ্চিত থাকাটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। মানুষ যে এত দ্রুত বদলে যেতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
স্বামী মারা যাওয়ার পর রায়হানই ছিল আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। পড়াশোনা শেষ করে ও যখন প্রথম চাকরিটা পেল, আনন্দে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। প্রথম মাসের বেতন পেয়েই ও আমার জন্য একটা নীল রঙের সুতি শাড়ি কিনে এনেছিল। বলেছিল, "মা, এটা তোমার জন্য। আমার প্রথম উপার্জনের উপহার।"
শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরে সেদিন খুব কেঁদেছিলাম। মনে হয়েছিল, স্বামী না থাকলেও আমার দায়িত্ববান ছেলেটা ঠিকই তাঁর অভাব পূরণ করবে। আমার আর কোনো চিন্তা রইল না।
তারপর একদিন ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দিলাম। নিজের পছন্দ করা, শান্ত-শিষ্ট মেয়ে সুমিকে ঘরে নিয়ে এলাম। ভেবেছিলাম, এই শূন্য ঘরে আবার হাসির কলরোল ফিরবে। আমার কোনো মেয়ে ছিল না, তাই সুমিকে নিজের মেয়ের মতোই আগলে রাখব ভেবেছিলাম। প্রথম কয়েকটা মাস সত্যিই খুব দারুণ কেটেছিল। সুমি আমাকে ‘মা’ বলে ডাকত, বিকেলবেলা দুজন মিলে চা খেতে খেতে গল্প করতাম, রান্নাবান্নার তদারকি করতাম।
কিন্তু মানুষের জীবনে সুখ বোধহয় বেশি দিন স্থায়ী হয় না। সুমি ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করল, নাকি রায়হান নিজেই বদলে গেল—তা আজও আমি বুঝে উঠতে পারি না।
আগে অফিস থেকে ফিরে রায়হান জুতোটা খুলে সোজা আমার ঘরে চলে আসত। পাশে বসে বলত, "মা, সারাদিন কী করলে? কেমন আছো?"
এখন ও সোজা নিজের রুমে চলে যায়। আমি বারান্দায় কাঠের চেয়ারটায় বসে দরজার দিকে চেয়ে থাকি। রাত গভীর হয়। মনকে সান্ত্বনা দিই, হয়তো আজ ও আসবে... হয়তো একটু দরজায় টোকা দিয়ে বলবে, "মা, ঘুমিয়েছ?"
কিন্তু না। দরজায় সেই পরিচিত টোকা আর পড়ে না।
আজ শুক্রবার, রায়হানের ছুটির দিন। একসময় ছুটির দিন মানেই ছিল আমাদের ঘরে উৎসবের আমেজ। রায়হান বায়না করত, "মা, আজ তোমার হাতের খাসির মাংসের রেজালা আর পোলাও খাব।" আমি সকাল থেকে রান্নাঘরে লেগে থাকতাম।
আজও সকালে উঠে রায়হানের প্রিয় খাবারগুলো বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় সুমি নিজের ঘর থেকে বের হয়ে এসে ঠান্ডা গলায় বলল, "মা, আজকে দুপুরে রান্নার দরকার নেই। আমরা বাইরে যাচ্ছি।"
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, "কোথায় যাবা তোমরা? রায়হানের প্রিয় হাঁসের মাংসটা ভিজিয়ে রেখেছিলাম তো..."
সুমি আমার কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলল, "আজকে আমার বাবার বাড়িতে দাওয়াত আছে। ওখানেই দুপুর আর রাতের খাবার খাব। আপনি নিজের জন্য হালকা কিছু রান্না করে নিয়েন।"
কথাটা বলেই সুমি নিজের রুমে চলে গেল। আমি হাত গুটিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু পর রায়হান তৈরি হয়ে বের হলো। নীল রঙের শার্ট পরা, একদম ওর বাবার মতো লাগছে দেখতে। আমার বড্ড ইচ্ছা করছিল কাছে গিয়ে শার্টের কলারটা ঠিক করে দিই, বলি—"বাপ, একটু সাবধানে যাস।"
কিন্তু রায়হান আমার দিকে চোখ তুলে তাকালও না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, "সুমি, দেরি হয়ে যাচ্ছে। বের হও।"
"রায়হান..." আমি খুব মৃদু স্বরে ডাকলাম।
ও একটু থমকে দাঁড়াল, "বলো মা, কিছু বলবে? আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
"না রে বাপ... কিছু না। সাবধানে যাস।"
রায়হান আর কোনো কথা না বলে সুমিকে নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। দরজার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা এই বিশাল ফাঁকা বাড়িতে যেন এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠল। বাইরে তখন কড়া রোদ, অথচ পুরোটা বাড়ি নিশুতি রাতের মতো চুপচাপ।
আমি রান্নাঘরের থালাবাসনগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। একসময় এই সংসারে আমিই ছিলাম সব। ঘরের কোন জিনিসটা কোথায় থাকবে, দুপুরের মেনুতে কী রান্না হবে—সবকিছুর সিদ্ধান্ত দিতাম আমি। আর আজ আমি এই বাড়িরই এক অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র!
খাবার টেবিলে একা বসে এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট মুখে দিলাম। চা-টা গলায় যেন আটকে যাচ্ছিল। কত দিন হয়ে গেল রায়হান আমার পাশে বসে একবেলা ভাত খায় না! কত দিন হয়ে গেল ও আমার মাথায় হাত রেখে বলে না, "মা, তুমি এত চিন্তা করো না তো!"
সন্ধ্যা নেমে এল। ঘরের আলো জ্বালালাম না। আঁধারে বসে থাকতে ইদানীং বেশ ভালো লাগে। অন্ধকার অন্তত মানুষের মতো অভিনয় করে না, ও সত্যিটাই মেনে নিতে শেখায়।
হঠাৎ মনে পড়ল সেই ২২ বছর আগের কথা। পুঁচকে রায়হান যখন আমার কোলে শুয়ে বলেছিল, "আমিও তোমারে বেশি ভালোবাসি মা।"
নোনা জল গড়িয়ে আমার গাল ভিজে গেল। আমি বিড়বিড় করে নিজেকেই বললাম, "সত্যিই তো রওশন আরা... মায়েদের ভালোবাসার কোনো বয়স থাকে না, কিন্তু ছেলেদের ভালোবাসার একটা মেয়াদ থাকে। মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে মায়েরা শুধু স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকে।"
রাত ১১টা বাজে। বাইরে গাড়ি থামার শব্দ হলো। রায়হান আর সুমি ফিরল। আমি ঘরের ভেতর থেকে শুনলাম, ওরা হাসতে হাসতে নিজেদের রুমে ঢুকে গেল। ঘরের কপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দ হলো।
আমি শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বললাম, "ভালো থাক বাপ। তুই ভালো থাকলেই আমার সব।"
সংগৃহীত