মায়াবিনী তিলোত্তমায় এক জোড়া হাতের স্পর্শ

প্রথম পরিচ্ছেদ: একটি মিথ্যে অভিনয় ও ভাঙা মনের আর্তনাদ

গল্পের শুরুটা হয়েছিল চরম এক ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে। রিনি সেদিন স্পর্শের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কেঁদে কেঁদে বলেছিল, "তোর যে ওই মেয়েটাকে ভালোলাগে, সেটা আগেই বলতে পারতিস... তুই এইভাবে চিট করলি আমার সাথে?" স্পর্শ নিজের আবেগ লুকিয়ে মিথ্যে অভিনয় করে উত্তর দিয়েছিল যে সে নিজেই বোঝেনি কবে অন্য মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছে। রিনি শেষবারের মতো তার হাতটা শক্ত করে ধরে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলে চলে যায়, আর কখনো পিছন ফিরে তাকায়নি।

কিন্তু আসল সত্যটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। স্পর্শ রিনিকে কোনো চিট করেনি, তার জীবনে অন্য কোনো মেয়েও আসেনি। গত দু-বছরে পর পর তিনটি সরকারি চাকরির ইন্টারভিউয়ের ফাইনাল লিস্ট থেকে সে বাদ পড়েছিল, যার মধ্যে শেষবার মাত্র ০.৫ নম্বরের জন্য চাকরিটা হাতছাড়া হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায়, বাবার রিটায়ারমেন্টের পর সংসারটা তাসের ঘরের মতো কাঁপছিল। বোনের পড়াশোনা, বাবার ওষুধ আর বাজারের খরচ মেলাতে গিয়ে মায়ের মুখের হাসি ফিকে হয়ে গিয়েছিল। নিজের এই অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে রিনিকে টেনে আনতে তার আত্মসম্মানে বাঁধছিল বলেই সে রিনির সামনে কুৎসিত 'চিটার'-এর অভিনয় করে তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। ময়দানের যে চেনা জায়গায় তারা বসত, সেখান থেকে এক চিমটে শুকনো মাটি পকেটে নিয়ে সে বাড়ি ফিরেছিল, যা প্রতি মুহূর্তে তার ভেঙে যাওয়া অস্তিত্বের কথা মনে করাত。

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: অন্ধকারের দিনলিপি ও বিদায়ের প্রস্তুতি

এরপর দীর্ঘ ছ-টা মাস কেটে যায়। এই সময়ে স্পর্শ নিজেকে চারপাশের জগত থেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছিল; ঘরের কোণে অন্ধকার করে বসে থাকা আর চেনা মানুষদের এড়িয়ে চলাই ছিল তার রুটিন। সে নিজেকে পরিবারের ওপর একটা বোঝা এবং বেঁচে থাকার অধিকারহীন এক অপদার্থ মনে করত।

অবশেষে মে মাসের এক গুমোট সকালে স্পর্শের আচরণে হঠাৎ এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিখুঁতভাবে শেভ করল, সেলুনে গিয়ে চুল কাটল। মাকে বলল বাবাকে বাজারে যেতে baran করতে এবং মায়ের রান্নাঘর থেকে ছুটি ঘোষণা করে সে নিজেই রান্না করার দায়িত্ব নিল। বাজার থেকে সে মায়ের পছন্দের ইলিশ মাছ, বোন টুপুরের প্রিয় মাটন আর বাবার প্রিয় মিষ্টি দই কিনে আনল। দুপুরের খাবার টেবিলে মায়ের পাতে ইলিশ মাছের টুকরো তুলে দিয়ে সে হাসিমুখে জানতে চাইল রান্না কেমন হয়েছে। ঠিক তখনই বাবা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করলেন, "আচ্ছা ভাবন, ওহ পিএসএস-এর মেহনসের রেজাল্টটা বেরোনোর কথা ছিল না রে?"

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ময়দানের নির্জনতা ও চরম সিদ্ধান্ত

বাবার এই প্রশ্নে স্পর্শের বুকের ভেতর তীব্র ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল, কিন্তু সে তাড়াতাড়ি জল খেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে উড়িয়ে দিল। কেউ বুঝতে পারল না যে, এই স্বাভাবিক হাসির আড়ালে সে সবার অলক্ষ্যে শেষ বিদায় নিচ্ছিল। নিজের ঘরের বালিশের নিচে সে একটা ছোট চিরকুট লিখে রেখেছিল, যেখানে লেখা ছিল তার অক্ষমতা, হেরে যাওয়ার গ্লানি এবং একমাত্র ভালোবাসার মানুষ রিনির কথা। বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ সে মাকে "একটু ঘুরে আসছি" বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা চলে গেল ময়দানের সেই চেনা গাছটার তলায়, যেখানে ছয় মাস আগে রিনি শেষবারের মতো তার হাত ধরেছিল।

সেখানে পৌঁছানোর পাঁচ মিনিট আগেই সে পকেটে রাখা ঘুমের ওষুধের পুরো পাতাটা এক নিঃশ্বাসে গিলে ফেলেছিল। যখন তার চারপাশটা ঝাপসা লাগছিল এবং মাথাটা অসম্ভব ভারী হয়ে আসছিল, ঠিক তখন ঘাসের ওপর শরীরটা এলিয়ে দিয়ে সে ভাবছিল রিনি তাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে কি না। হঠাৎ এক অতি পরিচিত গলার আওয়াজ ভেসে এল—"স্পর্শ... এই স্পর্শ?" স্পর্শ ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখল সামনে রিনি দাঁড়িয়ে আছে; পরনে সাধারণ তাঁতের শাড়ি, চোখে ক্লান্তির কালো দাগ, কিন্তু চাউনিতে এক অদ্ভুত জেদ আর অধিকারবোধ।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: সত্যের উন্মোচন ও বিষাক্ত ছোবল

জড়িয়ে যাওয়া গলায় স্পর্শ জিজ্ঞেস করল, "রিনি? তুই... তুই এখানে?" রিনি কোনো কথা না বলে তার পাশে ঘাসের ওপর বসে স্পর্শের অসাড়, ঠান্ডা হাতটার ওপর নিজের চেনা উষ্ণ হাতটা রাখল। রিনি ক্ষোভের সাথে বলল, "আমাকে তুই অন্য মেয়ের মিথ্যে গল্প সাজিয়ে তাড়িয়ে দিলি? ... তোকে আমি পাঁচ বছর ধরে চিনি স্পর্শ।" স্পর্শ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাকে চলে যেতে বললে রিনি ধমক দিয়ে ওঠে, "চুপ করবি একদম! আমি আছি তো! কেন এভাবে তাড়িয়ে দিস!"

এতদিনের জমে থাকা অপমান, রিজেকশন আর রিনিকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আনন্দে স্পর্শ দুই হাতে মুখ ঢেকে রিনির কাঁধে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। তিলোত্তমার বুকে তখন ম্লান সন্ধ্যা নামছে, আর বহুদিনের চেনা সেই দুটো ঠোঁট এক গভীর আশ্বাসে মিলিত হলো। কিন্তু সেই চুম্বনের রেণু বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই স্পর্শের চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। রক্তে মিশে যাওয়া ওষুধের তীব্র বিষক্রিয়া এবার তার স্নায়ুগুলোকে গ্রাস করে নিল। শরীর সম্পূর্ণ অবশ হয়ে আসার মুহূর্তে রিনির হাতটা নিজের বুকের ওপর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে অস্ফুট গলায় বলল, "রিনি... আমায় ক্ষমা করে দিস। আমি বড্ড বড় ভুল করে ফেলেছি রে..."

পঞ্চম পরিচ্ছেদ: মৃত্যুর সাথে লড়াই ও এক নতুন সকাল

স্পর্শ চোখ বন্ধ করতেই রিনির আর্তনাদ ময়দানের নিস্তব্ধতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। সেই গুমোট সন্ধ্যায় একা হাতে স্পর্শের নিথর শরীরটাকে ট্যাক্সিতে তোলা থেকে শুরু করে হাসপাতালের করিডোরে ডাক্তারদের হাত ধরে আকুতি-মিনতি করা—রিনির জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়ানক কয়েকটা ঘণ্টা কেটে গেল এক মরণপণ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।

পরদিন সকালে জানলা গলে এক ফালি সোনালী আলো যখন স্পর্শের মুখের ওপর পড়ল, সে ধীরে ধীরে চোখ মেলল। কড়া ওষুধের গন্ধের মাঝেও সে প্রথম টের পেল রিনির হাতের সেই চেনা ওম। রিনি হাসপাতালের টুলে বসেই তার হাতটা নিজের দু-হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল। স্টমাক ওয়াশ আর ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টায় যমরাজকে ফাঁকি দিয়ে সে এক নতুন জীবনে ফিরে এসেছে। স্পর্শ আলতো করে রিনির আঙুলে একটু চাপ দিতেই ও ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। সারারাতের হাড়হিম করা আতঙ্ক শেষে স্পর্শের এই ফিরে আসা চোখের দিকে তাকিয়ে রিনির ক্লান্ত চোখ দুটো পরম সুখের জলে ভেসে গেল। স্পর্শ কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু তার অপরাধী চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে হাসপাতালের সাদা বালিশে মিশে গেল। কিন্তু মনের ভেতর তখন এক নতুন প্রতিজ্ঞা জেগে উঠেছে—"না! কাল থেকে আবার পড়তে বসতে হবে।"

"ঘাসের বুকে ফুটে থাকা ছোট ছোট সাদা ফুলের মাঝে দুটি হাত যেভাবে এক হয়ে রইল, ঠিক সেভাবেই সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে তাদের ভালোবাসা জয়ী হলো। জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়, বরং প্রিয় মানুষের হাত ধরে জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন করে লড়াই শুরু করাই আসল সার্থকতা।"

সংগৃহীত