মানুষজাতি বড়োই বিচিত্র

বারুইদের বাড়ির ছোট মেয়ের বিয়ে। আলোয় আলোকময় চারদিক, গমগম করছে নিমন্ত্রিত অতিথিদের কোলাহলে। বড়লোকদের যা হয়, উৎসবের টানে বাইরে থেকে সবাই এক জায়গায় এসে জড়ো হয়েছে। তবে এই আনন্দের আড়ালে বাড়ির পরিচারিকা মনির ওপর দিয়ে আজ এক চরম ধকল যাচ্ছে। সকাল থেকে তার খাটুনির কোনো শেষ নেই— একের পর এক বাসন মাজা, বন্ধ ঘরগুলো ঝেড়ে-পুঁছে পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে আরও কত শত কাজ!

সব কাজ শেষ করে মনি যখন ক্লান্ত শরীরে বাড়ির নিচের তলায় নেমে আসে, তখন তার সর্বাঙ্গ অবসন্ন। একটু জল খাওয়া বড্ড দরকার ভেবে সে পা বাড়ায় রান্নাঘরের দিকে। কিন্তু ভেতরে ঢোকার আগেই পথ আগলে দাঁড়ান বাড়ির মালকিন রাত্রি দেবী। তিনি তীব্র গলায় চিৎকার করে ওঠেন,

— "এই রান্নাঘরে কেন ঢুকছিস! বেরো, বেরো বলছি! সব অতিথিদের জন্য রান্না হচ্ছে, ছোঁয়াছুঁয়ি লেগে গেলে কি হবে?"

কাতর কণ্ঠে মনি মিনতি করে বলে ওঠে,

— "বৌদি, একটু জল খাবো, তাই যাচ্ছিলাম!"

রাত্রি দেবী বিন্দুমাত্র না গলে কর্কশ সুরে বলেন,

— "বাইরের কল থেকে খেয়ে নে!"

কথাটা বলেই তিনি মুখের ওপর রান্নাঘরের দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিলেন। স্তম্ভিত মনি একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। চরম অপমানে আর ক্লান্তিতে বাধ্য হয়ে সে বাইরের কলের দিকেই চলে গেল। জল খেয়ে বুকের ছাতি ঠান্ডা হলেও, পেটের ভেতরের খিদের আগুনটা কিন্তু শান্ত হলো না মনির। সকালবেলা সেই কোন্ ভোরে এসে দুটো বাসি রুটি আর একটু চা খেয়েছিল, তারপর থেকে পেটে আর একদানাও পড়েনি। অসম্ভব খিদে পেয়েছে ওর। তবে সে ভালো করেই জানে, এই বড়লোক বাড়িতে খাটুনি মিললেও খাবার মিলবে না। তাই আর কাউকে কিছু না বলে নিজের বাকি কাজগুলো শেষ করতে লেগে পড়ে।

সব কাজ শেষ করে মনি যখন বারুই বাড়ি থেকে বেরোয়, তখন ঘড়িতে বেলা একটা পার হয়ে গেছে। ওর এখনো আরও দুটো বাড়িতে কাজ বাকি। কিন্তু পেটে কিছু না পড়লে শরীর আর টানছে না, যেকোনো মুহূর্তে মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে যেতে পারে সে। তাই তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে মনি গিয়ে ঢোকে 'সেন গিন্নি'-র বাড়িতে। মনে মনে ও জানে, এই বৌদির বাড়িতে অন্তত খাবার আর জলের জন্য ওকে লাঞ্ছিত হতে হবে না। পাড়ার সবাই সেন গিন্নিকে ভালোবাসে— অত্যন্ত দয়ালু, শান্ত ও ভালো মনের মানুষ তিনি।

মনিকে ঘরে ঢুকতে দেখেই একগাল হাসেন সেন গিন্নি। পরম স্নেহে জিজ্ঞেস করেন,

— "কিরে মনি, মুখের এই অবস্থা কেন? শরীর ভালো আছে?"

বাড়ির দাওয়ায় বসে সেন গিন্নি রান্না করছিলেন, মনি ওঁর পাশেই একটু ঘেঁষে বসে। ক্লান্ত মুখে একটা ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলে,

— "আরে বারুইদের মেয়ের বিয়ে না, তাদের বড়ো ঝক্কি! কাজ করে করেও শেষ আর হয় না!"

সেন গিন্নি দরদ ভরা গলায় বলেন,

— "আহারে! তুই খাবার খেয়েছিস কিছু?"

মনি মলিন হেসে মাথা নাড়ে,

— "আমাদের কি আর খাবার দেবেন বারুই বৌদি! আমায় রান্নাঘরেই ঢুকতে দিলেন না একটু জল খেতে!"

শুনে সেন গিন্নির খুব কষ্ট হয়। তিনি তৎক্ষণাৎ একটি গ্লাসে জল গড়িয়ে মনির দিকে বাড়িয়ে দেন। মনি তৃপ্তি করে সেই জল খেয়ে হেসে বলে,

— "তোমার বাড়িতে আসবো বলেই তাড়াহুড়ো করে কাজ সেরেছি! তুমি বড়ো ভালো!"

সেন গিন্নি মৃদু হেসে চায়ের কাপটা মনির হাতে দেন, আর বিস্কুটের টিন থেকে দুটো বিস্কুট বের করে ওর হাতে দিয়ে বলেন, "আগে এটা খেয়ে নে।"

মনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হাসিমুখে বলে,

— "বৌদি, পাঁচ বাড়ি কাজ করার ফাঁকে তোমার সাথে দু দণ্ড বসে গল্প করতে করতে চা খাওয়াটাই সারাদিনের শান্তির সময়!"

সেন গিন্নিও ঘরের মানুষের মতো বলেন,

— "আমারও তো তাই রে, এই তোর সাথে যেটুকু গল্প। নাহলে তো কেউ থাকেই না বাড়িতে, আমাকেও মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হয়!"

কথা প্রসঙ্গে মনি জিজ্ঞেস করে,

— "তা বৌদি, মেয়ে আসবে কবে?"

— "তার এখন ঢের দেরী, office নিয়ে নাজেহাল ও!"

মনি একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

— "তাও ভালো দিদি, আমার তোমার মতো অন্তত ঘর, স্বামী নিয়ে নাজেহাল হচ্ছে না! এই সংসার বড়ো বাজে জিনিস গো! দাদা তো তাও ভালো, আমারজন তো যেদিন ভালো সেদিন ঠিক, যেদিন খেলো সেদিন গেল!"

সেন গিন্নি সান্ত্বনার সুরে বলেন,

— "কি আর করা বল, এই তো জীবন!"

— "হ্যাঁ গো বৌদি, তাই বটে!"

গল্প শেষে হেসে সেন গিন্নি আবার রান্নায় মন দেন। মনি বসে বসে লক্ষ্য করে, সে যে গ্লাসে জল খেল, সেন গিন্নি কোনো দ্বিধা বা ছুঁৎমার্গ না দেখিয়ে অত্যন্ত সহজ সরলতায় সেই গ্লাসটা ধুয়ে নিজেই ওটায় জল নিয়ে খেলেন!

মনির বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত বিস্ময়ে ভরে ওঠে। সে অবাক হয়ে ভাবে— একই সমাজের একই রকম দুটো মানুষ, অথচ তাদের ভাবনা-চিন্তা কত আকাশ-পাতাল তফাত! বারুই গিন্নি যেখানে জাত আর ছোঁয়াছুঁয়ির অজুহাতে মুখের ওপর রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে দেন, সেখানে সেন গিন্নি ওর খাওয়া গ্লাসটাই ভালো করে ধুয়ে নিজে জল খাচ্ছেন!

মনে মনে হেসে ফেলে মনি। ওর বাবার বলা একটা কথা আজ বড্ড সত্যি মনে হলো— "মানুষজাতি বড়োই বিচিত্র!"


সংগৃহীত