লাল সুতোর অভিশাপ

১. অভিশপ্ত সকাল

কলকাতার বুকে এক মর্মান্তিক ঘটনা। শহরের নামজাদা সংস্থা ‘মালহোত্রা ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা মি. মালহোত্রা আজ সকাল ঠিক নয়টায় ১৩ তলা বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। হুট করে কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, তা পুলিশ বা পরিচিতজনদের কাছে স্পষ্ট নয়।

ビルディングয়ের সিকিউরিটি গার্ড ঘটনাটি দেখতেই তত্পরতার সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে খবর দেয়। তবে নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়ার পথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মালহোত্রা। মৃত্যুর ঠিক আগে অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে তিনি শুধু বলছিলেন— "লাল সুতো... লাল সুতো..."।

একই সময়ে নিজের আলিশান ফ্ল্যাটের লম্বা ধূসর সোফায় বসে টিভিতে এই ব্রেকিং নিউজ দেখছিলেন মি. মালহোত্রার বিজনেসম্যান পার্টনার মি. ছাবড়া। খবরটা শোনামাত্রই হাত থেকে দামি কাঁচের গ্লাসটা পড়ে মুহূর্তে চুরমার হয়ে গেল। সোনাালী পানীয় ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসেও মি. ছাবড়া কুলকুল করে ঘামতে লাগলেন।

গতকাল রাতেই তো মালহোত্রার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে! আগামী উইকএন্ডে মান্দারমণি যাওয়ার সমস্ত প্ল্যান রেডি। সুইমিং পুলের জলে ক্লান্তি দূর করা আর চার বন্ধুর আমোদপ্রমোদ—সবই প্রস্তুত ছিল। রিসোর্ট বুকিংও শেষ। এমনকি ওদের আরেক বন্ধু মি. নুড়ি এক খামখেয়ালী ‘মেয়ের’ সন্ধানও এনেছিলেন।

কিন্তু এসবের মাঝেই এ কী হয়ে গেল! আর মৃত্যুর মুখে মালহোত্রার ওই ‘লাল সুতো’ বিড়বিড় করার রহস্যটাই বা কী?

হাঁটু কাঁপতে কাঁপতে মি. ছাবড়া নিজের আইফোন তুলে মি. নুড়ির নম্বর ডায়াল করলেন।


২. একের পর এক মৃত্যু

মি. নুড়ির ফোন সুইচড অফ। তীব্র আতঙ্ক ও বুক ধড়ফড়ানির (Palpitation) মধ্যে ছাবড়া ডায়াল করলেন তাঁদের চতুর্থ বন্ধু মি. সিঙ্ঘানিয়াকে। কিন্তু কল করার আগেই হঠাৎ মাথা ঘুরে বুকে হাত দিয়ে সোফাতেই গড়িয়ে পড়লেন তিনি। তড়িঘড়ি ডাক্তার এসে প্রেসার মেপে কড়া নির্দেশে জানিয়ে দিলেন—সম্পূর্ণ বেডরেস্ট, কোনো রকম উত্তেজনা শরীরের জন্য মারাত্মক।

পরদিন সকালে আবার এক চাঞ্চল্যকর খবর। নিজ অ্যাপার্টমেন্টের বাথটাবে হাতের শিরা কাটা অবস্থায় উদ্ধার হলো মি. সিঙ্ঘানিয়ার নিথর দেহ!

হাই-সোসাইটির কেস হওয়ায় পুলিশি তদন্ত জোরকদমে শুরু হলো। অকুস্থলে কোনো প্রামাণ্য ক্লু না মিললেও, বাথটাবের ঠিক পাশেই পাওয়া গেল একগোছা রক্তবর্ণ লাল সুতো—যেকোনো সাধারণ বাঙালি বিপদমুক্তির জন্য বা নজর কাটানোর জন্য হাতে বেঁধে থাকে। কিন্তু সিঙ্ঘানিয়ার বাথটাবে এই সুতো এলো কোত্থেকে?

পরপর দুই বন্ধুর অস্বাভাবিক মৃত্যুতে দেহ দুটো ময়নাতদন্তে পাঠানো হলো। তবে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে কোনো অ্যালকোহলের উপস্থিতি পাওয়া গেল না। অর্থাৎ নেতিবাচক ঘোরে আত্মহত্যা করার কোনো সুযোগ ছিল না।


৩. অতীতের ভূত ও কুস্বপ্নের রাত

বিছানায় শুয়ে শুয়ে জানলার বাইরের খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন মি. ছাবড়া। তাঁর ভুরুতে গভীর ভাঁজ। দু-দুটো ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে এভাবে হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। আবার সেই লাল সুতো! ধোঁয়াশার মতো কিছু স্মৃতি কি তাঁর মনে পড়ছে?

সকালে মি. নুড়িকে আবারও না পেয়ে তাঁর পার্সোনাল সেক্রেটারি রাজভীরকে ফোন লাগান ছাবড়া।

ছাবড়া: "হ্যালো রাজভীর, তুমহারা সাব কিধার গ্যায়া? ফোন ভি সুইচড অফ আ রাহা হ্যায়।"
রাজভীর: "জী সাব, ও তো গাঁও মে পুরানা হাভেলি গ্যায়া হ্যায়।"
ছাবড়া: "কব গ্যায়া? হম মে সে কিসিকো তো পতা নেহি!"
রাজভীর: "জী, পুরা এক হপ্তা হোনে কো হ্যায়। সাব নে মানা কিয়া থা বাতানে সে..."

এক সপ্তাহ ধরে নুড়ি নিখোঁজ, অথচ কাউকে জানানোর প্রয়োজনবোধ করেনি! শুনেই চরম গালাগালি দিলেন ছাবড়া। তবে নুড়ির এই খামখেয়ালী স্বভাব নতুন নয়। কিন্তু বাকি দুজন মারা যাওয়ার পর নুড়ির এই গায়েব হয়ে যাওয়া ছাবড়াকে চরম দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল।

সেদিন রাতে ঘুমাতে গিয়ে এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখলেন মি. ছাবড়া।
একটি পরিত্যক্ত জমি... পাশে অর্ধনির্মিত এক কন্সট্রাকশন সাইট... সামনে একটা ভাঙাচোরা হোর্ডিং। আর সেখানে একগোছা রক্তরাঙা লাল সুতো হাতছানি দিয়ে তাঁকে ডাকছে!

ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে গেল ছাবড়ার। গলা কাঠ। টেবিলের গ্লাস থেকে এক নিঃশ্বাসে জলটুকু খেয়ে নিলেন। স্থানটা খুব চেনা চেনা লাগছে... কোথায় যেন দেখেছেন আগে?

জানলা দিয়ে আসা একঝলক ঠান্ডা বাতাস ছাবড়াকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। জানলার দিকে চোখ পড়তেই ভয়ে আঁতকে উঠলেন তিনি—ঘরের আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে আছে এক ভীতিকর অবয়ব! এই মুখটা তো বড্ড চেনা! তবে কি সে ফিরে এলো?

পনেরো বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতটা আচমকা স্মৃতিতে ভেসে উঠলো...


৪. পনেরো বছর আগের পাপকাল

তখন ছাবড়া, মালহোত্রা, সিঙ্ঘানিয়া আর নুড়ি—চার বন্ধু মিলে সবে ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলেন।

মি. নুড়ির গ্রামের বাড়ি থেকে তাঁদের ঘরে কাজ করার জন্য এসেছিল ‘লালি’ নামের এক সহজ-সরল গাতি-ঘরের মেয়ে। গরিব ঘরের মেয়ে হলেও দেখতে ছিল ভারী সুশ্রী, চঞ্চল। লালিকে কাজ ও আশ্রয়ের জন্য এনেছিলেন নুড়ির স্ত্রী দরিয়া দেবী। লালি দরিয়া দেবীকে খুব ভালোবাসত, ‘দিদিয়া’ বলে ডাকত। পরম ভক্তিতে পুজোআচ্চা করত আর প্রতিদিন সকালে মায়ের বেঁধে দেওয়া লাল সুতোর রক্ষাকবচ হাতে দিয়ে কাজে নামত।

লম্পট নুড়ির নজর ছিল লালির ওপর। কিন্তু স্ত্রী দরিয়া দেবীর ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারত না।

ঘটনার দিন এক তুমুল বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় লালির তীব্র জ্বর আসে। দরিয়া দেবী পাড়ার দোকানে ওষুধ কিনতে গিয়ে মুষলধারে বৃষ্টিতে আটকে পড়েন। ঘরে একা জ্বরের ঘোরে বেহুঁশ লালি, আর মদ্যপ নুড়ি। পশুপ্রবৃত্তি জেগে ওঠে নুড়ির। ফোন করে ডেকে নেয় বাকি তিন বন্ধু—মালহোত্রা, সিঙ্ঘানিয়া আর ছাবড়াকে。

বৃষ্টির সুযোগে চারজন মিলে সংজ্ঞাহীন লালিকে তুলে নিয়ে যায় শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এক জনমানবহীন পরিত্যক্ত কন্সট্রাকশন সাইটে।

সেখানে পশুর মতো চিরে ফালাফালা করা হয় মেয়েটির শরীর। জ্ঞান ফিরলে অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে নিজেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখতে পায় লালি। সামনে দাঁড়িয়ে চারটে নারোলোভী দানব, নুড়ির হাতে এক প্রকাণ্ড পাথরের চাঁই।

লালি: "ছেড়ে দিন আমায়, দয়া করুন! খুব ব্যথা লাগছে আমার..."
নুড়ি: "চুপ শালি! বহুত মস্তি কর লিয়া আজ, আব কাম কি বাত।"
লালি: "দিদিয়া যদি জানতে পারে আপনারা আমার এই অবস্থা করেছেন, কাউকে ছাড়বে না..."
নুড়ি: "বহুত বকবক কর লিয়া তুনে ছোকরি! আব তেরা কাম তামাম করনা হি পড়েগা।"

মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে, অসহায় মেয়েটা রক্তের ভেজা হাতে কবজির লাল সুতোয় মাথা ঠেকিয়ে তীব্র আক্রোশে প্রতিজ্ঞা করেছিল—

"ফিরে আসব আমি! তোমাদেের মতো দানবদের শাস্তি দিতে... আমার ঠাকুরের দিব্যি!"

পাথরের ঘায়ে থেঁতলে দেওয়া হয় লালির মুখ। পরদিন যখন লালিদের ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ উদ্ধার হয়, দরিয়া দেবী কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যান। চেনার উপায় ছিল না মুখটা, শুধু পরনের ছেঁড়া জামা আর হাতের সেই ‘লাল সুতো’ দেখেই চেনা গিয়েছিল লালিকে।

দরিয়া দেবী কোনোদিন জানতে পারেননি আসল সত্য, তবে নুড়ির চালচলন আর চার বন্ধুর আচমকা চুপ মেরে যাওয়া নিয়ে মনে মনে এক অপরাধবোধ বয়ে বেড়াচ্ছিলেন।


৫. চূড়ান্ত প্রতিশোধ ও পাপের হিসাব

সেই পনেরো বছর আগের পাপ আজ ছাবড়ার দরজায় এসে কড়া নাড়ছে! লালির সেই অতৃপ্ত আত্মাই কি প্রতিশোধ নিচ্ছে?

দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বিকৃত, রক্তাক্ত চেহারার লালির দু-চোখে জ্বলছে প্রতিহিংসার আগুন। ছাবড়ার আর সহ্য হলো না। আতঙ্কে বুক খামচে ধরে বিছানাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন মি. ছাবড়া!

পরদিন সকালে জোড়া ব্রেকিং নিউজ:

১. মি. ছাবড়ার মৃত্যু: নিজের ঘরে আতঙ্কে ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখে বুক চেপে মারা গেছেন বিজনেসম্যান মি. ছাবড়া।

২. মি. নুড়ির দুর্ঘটনাস্থল: দূর রাস্তায় উদ্ধার হয়েছে মি. নুড়ির দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি। গাড়ির ভেতরে নুড়ির দেহাংশ এমনভাবে আটকে ছিল যে শনাক্ত করাই অসম্ভব।

সংবাদ পেয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন দরিয়া দেবী। পুলিশ তাঁর বয়ান নিতে এলে, শূন্য দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে তিনি বিড়বিড় করে বলতে থাকেন—

"ইয়ে তো হোনা হি থা। লালি আপনা বদলা লে লিয়া হ্যায়... আব উসকো শান্তি সে সোনে দো।"

পুলিশের চেপে ধরা প্রশ্নের মুখে দরিয়া দেবী প্রকাশ করে দেন পনেরো বছর আগের সেই নৃশংস অতীত আর নিজের সন্দেহের কথা। বিজনেসম্যানদের মৃত্যুর তদন্তের পাশাপাশি আবারও নতুন করে রিওপেন হয় ‘লালি হত্যা ফাইল’। দরিয়া দেবী জানতেন, প্রকৃতির নিয়মেই কর্মফল একদিন সবাইকে ভোগ করতেই হয়।

আজ ঘোর অমাবস্যা। চারদিক নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা। বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দে ভেসে আসছে এক অবলা মেয়ের কান্না ও গোঙানির শব্দ... আর হাওয়ায় দোল খাচ্ছে লাল সুতো...


সংগৃহীত