কন্যা দায় নয়, কন্যা আমার অহংকার

১. কৃষ্ণকলি ও এক 'দায়গ্রস্ত' বাবার গল্প

সমাজ তাকে চেনে একজন সাধারণ অটোচালক হিসেবে। উচ্চমাধ্যমিকে বেশ ভালো নম্বর পেয়েছিলেন ভদ্রলোক, কিন্তু সংসারের নির্মম চাপে পড়াশোনার পাট ওখানেই চুকে যায়। গায়ের রং কালো, লম্বা চেহারা, কাঁচা-পাকা চুলে ভরা মাথা, আর পরনে সস্তা কিন্তু অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড়। আমাদের এই চেনা সমাজ তাকে আর পাঁচটা মেয়ের বাবার মতোই তকমা দিয়েছে—'কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা'।

কথা বলতে বলতে জানা গেল, তাঁর একটিই মাত্র মেয়ে। মেয়ে পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী, সমস্ত কাজে পারদর্শী, এবং ইতিমধ্যেই বি.এড সম্পন্ন করে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ভদ্রলোক হেসেই বললেন, —*"আমার মা যখন আমার বিয়ে দিয়েছিলেন, তখন ফর্সা বউ এনেছিলেন। আশা ছিল নাতি-নাতনি যেন ফর্সা হয়। কিন্তু মায়ের সেই ইচ্ছেতে জল ঢেলে দিয়ে আমার মেয়ে আমার গায়ের রংটাই পেল। আমিও ভালোবেসে ওর নাম রেখেছি— কৃষ্ণকলি।"*

২. চামড়ার মেলানিন বনাম সমাজের করুণা

মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছেন বাবা। কিন্তু সমাজের চোখে মেয়ে তো 'কালো'! তাই মনের মতো পাত্র মেলা ভার। চামড়ার মেলানিনের পরিমাণের হেরফেরে একটা মেয়ের সমস্ত গুণ যেন চাপা পড়ে যায়, সে হয়ে যায় সস্তা বা 'কম দামি'।

লেখক যখন সহানুভূতি দেখিয়ে বললেন, —*"চিন্তা করবেন না, আপনার মেয়ের এত গুণ, খুব ভালো বিয়ে হবে।"* তখনই বোঝা গেল, এই আত্মবিশ্বাসী বাবা কারও করুণা বা সহানুভূতি চান না।

তিনি হেসে একটা চমকে দেওয়ার মতো সত্যি প্রকাশ করলেন। মেয়েটির একটি খুব ভালো সম্বন্ধ এসেছিল, বিয়েও প্রায় পাকা। পাত্র সরকারি গ্রুপ-ডি চাকরি করে, দেখতে-শুনতে ভালো, পরিবারও বেশ নামী। কিন্তু বাবা নিজেই সেই বিয়ে ভেঙে দিয়েছেন!

৩. "এক পয়সাও পণ চায়নি, তবুও বিয়েটা আমিই ভেঙে দিলাম..."

পণ চেয়েছিল? না, এক পয়সাও নয়। তাহলে কেন ভাঙলেন?

বাবা বুক চিতিয়ে বললেন, —*"আমার মেয়ে প্রতি মুহূর্তে অপমানিত হচ্ছিল, তাই!"*

বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই আত্মীয়-স্বজনরা মেয়েটিকে বলতে শুরু করে, —*"তুই খুব ভাগ্যবতী রে! তোর মতো কালো মেয়ের এমন ফর্সা, সুদর্শন বরের সাথে বিয়ে হচ্ছে!"* এমনকি ছেলের বাড়ির লোকও কৃষ্ণকলিকে শুনিয়ে দেয়, —*"তুমি খুব লাকি, নাহলে তোমার এমন গায়ের রঙে এমন ছেলে পাওয়া দুষ্কর।"*

হবু বরও মেয়েটিকে ফোন করে অহংকারের সুরে জিজ্ঞেস করে, —*"ケমন লাগছে তোমার আমার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে? নিজেকে নিশ্চয়ই খুব লাকি মনে হচ্ছে?"*

অপমানের এই সূক্ষ্ম চাবুকে মেয়েটি একদিন কেঁদে ফেলে বাবার কাছে এসে বলে, —*"বাবা, আমি লোকের দয়ায় এতটা ভাগ্যবতী হতে চাইনি।"*

৪. দায় নয়, কন্যা আমার অহংকার!

মেয়ের চোখের জল আর আত্মসম্মান দেখে বাবা সিদ্ধান্ত নেন, বাড়ির সবার অমতে গিয়েই এই বিয়ে তিনি ভাঙবেন। যারা মনে করে বিয়ে করে তারা মেয়েটির ভাগ্য ফিরিয়ে দিচ্ছে, তাদের কাছে তিনি মেয়ে দেবেন না। 'ভাগ্যবতী' শব্দের এই বিষাক্ত ভার বহনের কোনো প্রয়োজন নেই কৃষ্ণকলির।

তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, —*"যদি চাকরি পায় ভালো, নাহলে ওকে আরেকটা অটো কিনে দেব, ও নিজেই চালাবে। নিজের ভাগ্য নিজে তৈরি করবে, কারও দয়া লাগবে না ওর।"*

বিয়ে ভেঙে দেওয়ার পর সমাজের মানুষ যখন টিপ্পনী কেটে বলছে, —*"কন্যাদায়গ্রস্ত বাবার এত তেজ ভালো নয়!"* তখন এই সিংহহৃদয় বাবা বুক ফুলিয়ে জবাব দেন:

"কন্যা আমার কাছে দায় নয়, আমার অহংকার! অকারণে ও লোকের করুণার পাত্রী হতে যাবে কেন? কি নেই ওর? সব আছে ওর। আমি ওকে সবটুকু দিয়ে মানুষ করেছি।"

সবশেষে মেয়ে যখন বাবার কানে কানে এসে বলে, —**"আমার বাবা বেস্ট!"**—তখন একজন বাবার জীবনের সব লড়াই সার্থক হয়ে যায়।

গল্পের মূল শিক্ষা: সমাজের তথাকথিত রূপের মাপকাঠি আর করুণার চেয়ে নিজের আত্মসম্মান অনেক বড়। প্রতিটি কৃষ্ণকলি এভাবেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, নিজের চেষ্টায় নিজের পরিচয় গড়ে তুলুক! ✊🌸

সংগৃহীত