কাঁচের দেয়াল
(অবিশ্বাসের চোরাবালি ও একটি পারিবারিক সার্কাস)
১. ভোরের আলো এবং বিষাক্ত খোঁচা
"এ কী পদ্ম! এমন অপবিত্র অবস্থায় রান্নাঘরে কেন এলে তুমি? তা-ও এত ভোরে! মা দেখতে পেলে খুব বকাঝকা করবে।"
মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে রাতে এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি পদ্মর। তার মধ্যে নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশ এবং প্রথম রাতেই দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত এক মারাত্মক ঝড়... যা তাকে রীতিমতো আতঙ্কের অতল সাগরে ডুবিয়ে রেখেছিল। সে সারারাত ইফরাদের মুখের কথা, আচরণ আর বেনামী মেসেজে আসা সেই ছবির মানুষের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল। সে জানে, মাত্র একদিনে এসব রহস্যের জট খোলা সম্ভব নয়, তবুও বোবা মনে কত প্রশ্ন, কত নীরব আঘাত যে অনবরত আঁচড়ে পড়ছিল, তা যদি কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারত, হয়তো বুকের ভেতরটা একটু হালকা লাগত।
খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা দীর্ঘদিনের অভ্যাস পদ্মর। ঢাকার একটা নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করে সে। তাই প্রতিদিন ভোরে উঠে মর্নিং শিফটের ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হয়। বিয়ের জন্য স্কুল থেকে ক'দিনের ছুটি নিয়েছে। কিন্তু অভ্যাসের কারণে আজ ফজরের আযান শোনার পরপরই বিছানা ছেড়েছে সে। সেটা অবশ্য পাশে ঘুমানো মানুষটা টেরই পায়নি। ইফরাদের গভীর আর নিস্পন্দ ঘুম দেখে বোঝা যাচ্ছিল, সে গত কয়েকদিনের ধকলে যথেষ্ট ক্লান্ত।
নামাজ শেষ করে পদ্ম নিচে এসেছিল রান্নাঘরে। ভেবেছিল এককাপ কড়া চা বানিয়ে ভোরের এক চিলতে ঠান্ডা বাতাস গায়ে মাখবে, আর পছন্দের বইয়ে মুখ ডুবিয়ে মনের ভেতর জমে থাকা খারাপ ভাবটা দূরে সরাবে। নতুন জায়গায় যেহেতু সে কোনোকিছু খুঁজে পাচ্ছিল না, আবার এত সকালে বাড়ির কাউকে ডেকে বিরক্ত করতেও ইচ্ছে করছিল না। তবুও বেশ ধৈর্য্য নিয়ে কেবিনেটগুলো খুঁজে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বের করছিল সে।
ঠিক সেই মোক্ষম সময়ই মেজো জা মারজিয়া এসে পেছন থেকে বিষাক্ত খোঁচাটা দিল। পদ্ম চিনির বয়ামটা খুঁজে পেয়ে জায়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলল, —"আমি অপবিত্র অবস্থায় আছি, সেটা আপনি এত নিশ্চিত করে জানলেন কী করে, মেজো ভাবী?"
মারজিয়া ফের বাঁকা হেসে খোঁচা দিয়ে বলল, —"দেখতে হবে কেন? বাসররাতে বর কি তোমায় অমনি ছেড়ে দিয়েছে? এমন ভাব করছ, যেন কিচ্ছুটি হয়নি।"
পদ্ম চায়ের জলটা কেটলিতে বসাতে বসাতে শান্ত গলায় বলল, —"কিছু হলেই কী? আর না হলেই বা কী? আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের কথা কি আমি আপনার সাথে শেয়ার করব?"
—"শেয়ার করতে হবে কেন? এভাবে সাতসকালে না ধুয়ে রান্নাঘরে আসাটা মা একদম পছন্দ করেন না। তাই বললাম, পরবর্তীতে যেন খেয়াল থাকে তোমার।" মারজিয়ার গলায় স্পষ্ট তাচ্ছিল্য।
পদ্ম ফুটন্ত পানিতে চায়ের পাতা ছেড়ে দিয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলল, —"আমার চিন্তাটা আমার মধ্যেই থাকুক ভাবী। আপনাকে আমাকে নিয়ে এত না ভাবলেও চলবে।"
মারজিয়া নাকমুখ কুঁচকে নিয়ে বলল, —"দেখি সরো তো। সম্পূর্ণ রান্নাঘর এখন আবার পরিষ্কার করতে হবে। নয়তো রান্না বসানো যাবে না।"
২. চার দেয়ালের আড়াল ও রাগের বহিঃপ্রকাশ
পদ্মর এবার সত্যিই খুব রাগ হলো। মুখে যা আসছে তা-ই বলে যাচ্ছে লোকটা! এই মারজিয়ার মধ্যে সমস্যাটা কী আসলে? কেন সে সকাল-সকাল অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত নোংরা কথা বলছে? কেনই বা গতকাল রাতে দেবরের প্রথম প্রেমের কথা বানিয়ে বলে নতুন বউয়ের মনে তীব্র সন্দেহ আর ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল?
এমনিতে ঝগড়া করার কোনো স্বভাব নেই পদ্মর। তবে ফালতু আর অন্যায় কথা শুনে মুখ বুজে সেটা হজম করে নেওয়ার মতো দুর্বল মেয়েও সে নয়! তাই সে দুটো কাপে চিনি ও দুধ মিশিয়ে লিকার চা ঢালতে ঢালতে বলল,
—"শুনুন মেজো ভাবী, দুটো মানুষের একদম ব্যক্তিগত বিষয়টাকে চার দেয়ালের ভেতর থেকে টেনে বাইরে আনার এই বাড়তি নোংরা চেষ্টাটা করবেন না। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, পুরো রাত আপনি আমাদের ঘরের দরজার সামনে আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি পবিত্র নাকি অপবিত্র সেটাও আপনি ওখান থেকেই দেখেছেন! এভাবে অন্যের ঘরে আড়িপাতা কিন্তু দণ্ডনীয় অপরাধ! ভবিষ্যতে এমন জঘন্য কাজ আর করবেন পণ্ডিত করবেন না। ঠিক আছে?"
মারজিয়া রেগে আগুন হয়ে চিৎকার করে বলল, —"কী বললে তুমি? আমি আড়ি পেতেছি? এত বড় সাহস তোমার!"
—"তা না হলে আমাকে নিয়ে আপনার এত মাথা ব্যথা কেন?" পদ্ম শান্ত চোখে তাকাল।
—"তুমি বড্ড বেশি বেশি ভাবছ, পদ্ম! আমি তো জাস্ট এমনিই কৌতুক করে বললাম। বিয়ের রাতে বর তার নতুন বউকে ছোঁবে না, এমনটা তো বাপের জন্মেও হতে দেখিনি কখনও।"
—"আমি কি একবারও মুখে বলেছি মেজো ভাবী যে আমার বর আমাকে ছোঁয়নি?"
এই পাল্টা প্রশ্নটা ঠিক হজম করতে পারল না মারজিয়া। সে কেমন এক চরম বিস্ময় আর আক্রোশ নিয়ে তাকিয়ে রইল। পদ্ম মৃদু হেসে ট্রের মধ্যে চায়ের কাপ ও বিস্কুট তুলে নিয়ে বলল, —"চিন্তা করবেন না। এটা আধুনিক যুগ। এই যুগে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েকে এসব শেখাতে হয় না। আবার খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ঘরের ভেতরের খবর বাইরে বের করতে হয় না। এসব সস্তা কাজ তারাই করে, যারা নিজেদের দাম্পত্য জীবন নিয়ে নিজেরা সুখী নয়!"
৩. ছ'টি আঙুলের রহস্য ও ভাঙা চায়ের কাপ
আর কোনো কথার খোঁচাকে কানে না নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে এলো পদ্ম। আলগোছে ঘরের ভারী দরজাটা আটকে দিয়ে চায়ের ট্রে-টা টেবিলের ওপর রাখল। বুকশেলফে তার পছন্দের লেখকের বই খুঁজল সে। ইফরাদ যে প্রচুর বই পড়ে, সেটা তার বিশাল ঘরের কাঠের শেলফ দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছে। বাংলা, ইংলিশ ক্ল্যাসিক নোবেল দিয়ে ঠাসাঠাসি করা শেলফ। এই লোক বছরের বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকে, বাড়িতে আসেই না প্রায়, তাহলে এত বই কেন এখানে জমিয়ে রেখেছে?
খুঁজে খুঁজে নিজের পছন্দের একটা বই হাতে নিল পদ্ম। চায়ের কাপটা তুলতে এসে হুট করেই বিছানায় ঘুমে অচেতন ইফরাদের ডানহাতের দিকে তার চোখ পড়ল। পদ্মর পুরো শরীর যেন জমে বরফ হয়ে গেল!
ইফরাদের ডানহাতে ছ'টা আঙুল! বুড়ো আঙুল দুটো সমান্তরালভাবে জোড়া লাগানো। একদম বলিউডের ঋত্বিক রোশানের মতো। এটা তো বিয়ের পিঁড়িতে বা কাল রাতে আগে খেয়ালই হয়নি তার! সে-ই হাত দিয়েই হুড়মুড়িয়ে ঘরের জানালা গলে আসা ভোরের নরম আলো ঠেকানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে চরম ঘুমে ডুবে আছে সে।
পদ্ম কাঁপতে কাঁপতে নিজের ফোনটা বের করল। গতকাল রাতে যে অচেনা নাম্বার থেকে ইফরাদের একটা মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থার ছবি পাঠানো হয়েছিল, সেই ছবিটা আবার দেখতে বসল সে। খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, জুম করে দেখতে গিয়ে সে এক নতুন সত্য আবিষ্কার করল। ছবিতে থাকা মেয়েটির কোমর জড়িয়ে ধরা ছেলেটির হাতে বুড়ো আঙুলটা একদম দেখা যাচ্ছে পণ্ডিত যাচ্ছে না। মেয়েটির পিঠের কাপড়ে কোমর জড়িয়ে ধরেছে দেখে শুধু চারটে আঙুল স্পষ্ট ক্যামেরায় এসেছে। বাকি জোড়া বুড়ো আঙুল অ্যাঙ্গেলের কারণে ক্যামেরায় ওঠেনি!
ফোনটা রেখে আবারও বিছানার দিকে চোখ ফেলতেই নজরে এলো ইফরাদের গলার ডানদিকের সেই গাঢ় কালো তিলটা। তাতেই এই ছবির সাথে আসা সেই হুমকিস্বরূপ মেসেজের সত্যতা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারল সে। আর সাথে সাথে যত তীব্র রাগ, অপমান আর তীব্র ঘৃণা মনে জমা হলো, সেটুকু তার এই সুন্দর সকালটা বিষাদময় করে দিতে যথেষ্ট ছিল।
খুব ভদ্রতা দেখিয়ে সে এই প্রতারক ইফরাদের জন্য চা বানিয়ে নিয়ে এসেছিল। এখন তার চরম ইচ্ছে করল, সে-ই ফুটন্ত বিষাক্ত চা-টা ওর ঘুমে থাকা মুখের ওপর ঢেলে দিক! পদ্ম রেগে গেলে নিজের হুঁশে থাকে না। একটু বেহুঁশের মতো ক্ষ্যাপাটে আচরণ করে। এজন্য বাপের বাড়ির সবাই তাকে আদর করে কিংবা ভয়ে 'তারছেঁড়া' বলে ডাকত। রেগে গেলে সামনে যা থাকে সেটা সে ভেঙে চুরমার করে ফেলে। এখন ঠিক কীভাবে নিজের এই চরম রাগটা প্রকাশ করবে, সেটা বুঝতে পারল না। একসময় চায়ের কাপটা হাত থেকে ধুম করে পাথরের ফ্লোরে আছাড় মেরে ছেড়ে দিল সে।
কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ শোনে হকচকিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসল ইফরাদ। চোখেমুখে আঙুল ঘষতে ঘষতে আতঙ্কিত গলায় জানতে চাইল, —"কীসের শব্দ হলো? কী ভাঙল?"
পদ্ম নিজের ভেতরের হিংস্রতা চেপে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, —"চায়ের কাপ পড়ে গেছে ফ্লোরে!"
৪. চাপা কান্না ও অতীতের ছায়া
ইফরাদ বিছানা ছেড়ে চট করে নেমে ফ্লোরে ভাঙা কাপের ধারালো টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখে বলল, —"ওহ! তা এত সকালে চা নিয়ে এলো কে ঘরে?"
—"কেউ নিয়ে আসেনি। আমি নিজে নিচে গিয়ে বানিয়েছি।" পদ্মর গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা।
—"তাই? কিন্তু এটা হাত থেকে পড়ল কীভাবে?" ইফরাদ ভীষণ অবাক হয়ে তাকাল নতুন বউয়ের দিকে।
পদ্ম কোনো কথা না বলে অনবরত বুক ফুলিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইল, কিন্তু কোনোভাবেই সম্ভব হলো না। ফোনের ওই বিচ্ছিরি নোংরা ছবিটা আর মেসেজের লেখাগুলো তার চোখ থেকে কিছুতেই সরছে না। তার মধ্যে সকাল-সকাল মেজো জা মারজিয়ার অমন অসভ্যতামো মনে পড়তেই তীব্র রাগে তার মাথা যেন ফেটে যাচ্ছে।
কোনো উত্তর না পেয়ে ইফরাদ নরম গলায় বলল, —"আপনি ওই ভাঙা কাঁচের কাপ তুলতে যাবেন না প্লিজ। হাত কেটে যাবে পরে। আমি জবার মাকে ডাকছি, উনি পরিষ্কার করে দেবেন।"
দরজা খুলে বাইরে গিয়ে জবার মাকে ডেকে এনে ইফরাদ তোয়ালে হাতে ওয়াশরুমে ঢুকল।
জবার মা এই চৌধুরী বাড়ির পুরনো বিশ্বস্ত মানুষ, সবকিছু একা হাতে দেখাশোনা করেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে কার কী পছন্দ, কে, কখন কী খাবে, সবকিছু নিখুঁত বুঝেশুনে করেন। ইফরাদের ডাক শুনে তিনি দ্রুত নতুন বউয়ের ঘরে ছুটে এলেন। ঝাড়ু দিয়ে সম্পূর্ণ ঘর পরিষ্কার করে কাঁচের কাপের টুকরো টুকরো অংশ ডাস্টবিনে তুলে পরম মায়ায় বললেন, —"নতুন বউমনি, আমি তোমার জন্য আর এক কাপ গরম চা বানিয়ে নিয়ে আসি?"
জবার মার এমন নরম ও মায়াভরা গ্রামীণ কণ্ঠস্বর শুনে পদ্মর ভেতরের রাগটা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে শান্ত স্বরে বলল, —"না খালা। আপনি যান। আমি এখন আর কিচ্ছু খাব না।"
—"চা তো এক চুমুকও খাওনি মা।"
—"আজ আর ভালো লাগছে না খালা।"
—"রাদ বাজান ভোরে উঠেই বকেছে বুঝি তোমায়? তুমি একদম মন খারাপ করো না মা। আমি ওকে একটু পর আচ্ছা করে বকে দেব। এমন লক্ষ্মী নতুন বউয়ের সাথে কেউ সাতসকালে রাগারাগি করে?"
জবার মায়ের কথাবার্তাতেই স্পষ্ট, তিনি এই বাড়ি এবং এই বাড়ির মানুষদের নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। খুব সহজে মানুষকে আপন করে নিতে পারেন তিনি।
পদ্মর রাগ ততক্ষণে পুরোপুরি জল হয়ে গেছে। সে ঠোঁটে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল, —"আপনি ভুল ভাবছেন, খালা। উনি আমাকে একটুও বকেননি।"
—"আচ্ছা তাহলে ওসব বাদ দাও। আমি দেখি গে, নিচে সবার নাশতা কতদূর হলো!"
জবার মা চলে যাওয়ার পর পদ্ম অনেকক্ষণ চুপচাপ স্থির হয়ে বসে রইল বিছানার এক কোণে। এই বাড়ির কারও সাথে এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তার। এক অদ্ভুত প্রতারণার যন্ত্রণা তাকে ভেতর থেকে জীবন্ত গিলে খাচ্ছে।
আধঘণ্টা পর ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো ইফরাদ। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়াতে আঁচড়াতে আড়চোখে একবার বিছানার দিকে দৃষ্টি রাখল সে। পদ্ম আগের মতোই একই ভঙ্গিতে বসে থাকলেও তার ফর্সা চোখ বেয়ে অনবরত নোনতা পানি গড়িয়ে পড়ছে। হুট করে এই কান্নার কারণ কী, সে ভেবে পেল না। টি-শার্টের কলারটা ঠিক করে হাতে ঘড়ি পরতে পরতে ইফরাদ জানতে চাইল, —"কোনো সমস্যা, পদ্ম? কাঁদছেন কেন?"
পদ্ম সামনে থাকা মানুষটির ওই কপট সুন্দর মুখের দিকে বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, —"কেন? সত্যি কোনো সমস্যা থাকলে কি আপনি তার সমাধান করে দেবেন?"
—"চেষ্টা করে অবশ্যই দেখতে পারি।" ইফরাদ শান্ত গলায় বলল।
—"তাহলে আমার একটা মাত্র প্রশ্নের একদম সঠিক উত্তর দিন।"
ড্রেসিংটেবিলের কাঠের বডির সাথে হেলান দিয়ে, এক পায়ের পাতার উপর অন্য পা তুলে ক্রস করে দাঁড়িয়ে ইফরাদ বলল, —"বেশ, বলুন।"
—"আপনার মেজো ভাবীর সাথে আপনার ভেতরের সম্পর্কটা ঠিক কেমন? ভালো নাকি খুব খারাপ?"
ইফরাদ হালকা হেসে বলল, —"খারাপ হতে যাবে কেন? যথেষ্ট ভালো।"
—"উনি কেমন মানুষ বলুন তো?"
ইফরাদ এবার জোরে হেসে বলল, —"হঠাৎ সকালবেলা মেজো ভাবীকে নিয়ে এই প্রশ্ন কেন?"
সকালের রান্নাঘরের সেই নোংরা অপবিত্রতার ঘটনাটা মুখে বলতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে জিভ চেপে থামল পদ্ম। মারজিয়া যদি কৌতুক করে এভাবে তাকে অপমান করে থাকে, তাহলে এই নিয়ে এক্ষুণি বরের কাছে কথা বাড়ানো ঠিক হবে না। এখনও সে এই বিশাল বাড়ির ভেতরের কোনো মানুষকে ঠিকঠাক চিনে উঠতে পারেনি। এত তাড়াতাড়ি চেনা সম্ভবও নয়। অনেক সময় লাগবে। তাই এমন একটা সস্তা ঘটনা নিয়ে এক্ষুণি কোনো পারিবারিক ঝামেলার দরকার নেই। আগে পরিস্থিতি ভালো করে বুঝুক সে, মানুষগুলোকে ভালো করে চিনুক, তারপর তিরের মতো প্রশ্নগুলো রাখবে সবার সামনে।
ভেবেচিন্তে চট করে কথা ঘুরিয়ে পদ্ম বলল, —"না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। উনি বোধহয় একটু বেশিই কৌতুকপ্রিয় মানুষ।"
ইফরাদ ঠোঁট উল্টাল। এরপর গম্ভীর হয়ে বলল, —"আজ কিন্তু আমাদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন অনেক মেহমান আসবে। পারলে একটু ভালো করে শাড়ি পরে সেজেগুজে থাকবেন।"
—"কেন? ছেলেদের কাছে কি মেয়েদের বাহ্যিক সাজগোজ খুব বেশি পছন্দের জিনিস? আপনার সেই প্রাক্তন প্রেমিকা বুঝি খুব বেশি সেজেগুজে থেকে সবসময় আপনার মনোরঞ্জন করত?"
পদ্ম যে তাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে একটা পুরোনো ক্ষত নিয়ে খোঁচা দিল, এটা খুব ভালো করে বুঝতে পেরেও কোনো ধরনের তর্কে গেল না ইফরাদ। সে শুধু শান্তভাবে বলল, —"পিছনের ফেলে আসা কথা ছাড়ুন না পদ্ম। আপনি এখন এই বাড়ির নতুন বউ। আর আমাদের সমাজে নতুন বউদের একটু সেজেগুজে পরিপাটি থাকতে হয়।"
—"তাই নাকি? জানতাম না তো। এর আগে তো কখনো অন্য কারও বউ সাজিনি। এই কারণে এমন কোনো অভিজ্ঞতা আমার জীবনে হয়নি। আচ্ছা, সেজেগুজে রঙ মেখে থাকলে মেয়েদের দেখতে পুরুষদের কাছে খুব বেশি আকর্ষণীয় লাগে?"
ইফরাদ পুরোপুরি থতমত খেয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল, —"এটা... এটা কেমন অদ্ভুত প্রশ্ন, পদ্ম?"
—"ওমা! খারাপ বা ভুল কী বললাম আমি?"
—"পদ্ম, আপনি কি কোনো বিশেষ কারণে খুব বেশি আপসেট হয়ে আছেন?" ইফরাদের চোখে এবার গভীর উদ্বেগ।
—"না তো, একদমই না। আমি আপসেট হব কেন শুনি? আমার তো এখন খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে। আমি এই বাড়ির নতুন রাজবধূ না?"
ইফরাদ ক্লান্তভাবে দু'হাতে নিজের মুখ মুছে নিয়ে বিছানায় পদ্মর একদম পাশে এসে বসল। তাকে শান্ত করার চেষ্টায় বলল, —"আমার মন বলছে, আপনি কোনো কারণে একদম ঠিক নেই!"
—"আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি।"
—"ঠিক থাকলে আপনি বারবার এভাবে অতীতের মরা কথা টেনে আনতেন না। আমি আপনাকে গতকাল রাতেই স্পষ্ট বলেছি, যে মানুষটা আজ আমার জীবনে বা বাস্তবে নেই, তাকে নিয়ে ভেবে অযথা নিজের বর্তমান সময়টা নষ্ট করবেন না। পদ্ম, আমরা বর্তমানে বাঁচি। এটাই একমাত্র পরম সত্য। এটাই আমাদের নিয়তি।"
পদ্ম নিজের কপালটা দুহাতে চেপে ধরল। কেন যে তার বোবা মনে এত কথার জটিল প্যাঁচ জন্মাচ্ছে সে নিজেই জানে না! ছবির সেই কুৎসিত সত্যিটা কি এখন ইফরাদকে সরাসরি মুখে বলবে, নাকি আরও কয়েকদিন আড়ালে থেকে সব নোটিশ করবে? এই লোকটা আসলেই কি অনেক ভালো নাকি মুখোশধারী কোনো খারাপ মানুষ, এটা বুঝতে হলে তাকে ঠিক কোন পথ ধরতে হবে? ঠিক কোথায় গেলে সে এই গোলকধাঁধার সঠিক উত্তর খুঁজে পাবে?
৫. ডাইনিং টেবিলের তাণ্ডব ও পশুর মতো আচরণ
ঠিক তখনই নিচতলার বিশাল ড্রয়িংরুম থেকে সবার সাথে নাশতা খাওয়ার জন্য জোরে ডাক ভেসে এলো। পদ্মর বড় জা তাসনীমের তিন সন্তান। একটি মেয়ে ও দুটি ছেলে। তার মধ্যে বড় মেয়ে জুহি তার দুই ছোট ভাইয়ের চেয়ে বেশ বড়। এ বছর সে ঢাকার একটা ভালো স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে।
ডাকতে ডাকতে জুহি চট করে তাদের ঘরের দরজার সামনে এসে মিষ্টি গলায় বলল, —"ছোটো চাচ্চু, ঠাম্মি সহ সবাই তোমাদের ডাইনিংয়ে ডাকছে। নাশতা পুরোপুরি তৈরী।"
ইফরাদ অনেকদিন পর তার প্রিয় ভাতিঝিকে দেখল। সে দ্রুত দরজার সামনে গিয়ে জুহির মাথায় হাত রেখে জানতে চাইল, —"তোমার নিজের খাওয়া হয়েছে রে মা?"
—"হ্যাঁ চাচ্চু, আমি তো ছোট ভাইদের সাথে সকাল সকাল নাশতা করে নিয়েছি। তোমরা জলদি যাও। ছোটো মা কোথায়?"
—"ওই তো, ঘরের ভেতরে আয়নার সামনে। তুমি তাকে ডেকে নিয়ে এসো।"
—"ঠিক আছে।" জুহি ঘরের ভেতর ঢুকল。
চৌধুরী বাড়ির একটা অলিখিত কঠোর নিয়ম আছে—সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবার, সবার আগে বাড়ির ছোটো ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে বসে করবে। এরপর যাদের অফিস আছে, জরুরি কাজকর্ম আছে, তারা খাবে। আর সবার শেষে বাড়ির সব বউরা মিলে একসাথে বসে খাবে, সাথে ঘরের কাজের লোক যতজন আছে তারাও সেই টেবিলেই সমানভাবে বসবে।
জুহি ভেতরে এসে প্রথমে মিষ্টি করে নতুন ছোটো মাকে সালাম দিল। এরপর নিজের দুই গালে হাত দিয়ে মুগ্ধ চোখে বলল, —"ছোটো মা, তুমি দেখতে সত্যি কী যে সুন্দর! একদম পরীর মতো!"
আদুরে বাচ্চার মুখে এমন অকপট খাঁটি কথা শুনে ঘরের ভেতর শব্দ করে হেসে ফেলল পদ্ম। মনের ভেতর জমে থাকা সব কালো রাগ যেন এক নিমেষে উবে গেল। মেজাজটাও এক লহমায় ফুরফুরে হয়ে গেল তার। সে জুহির কচি গালে আলতো হাত দিয়ে আদর করে জিজ্ঞেস করল, —"সত্যিই তো রে জুহি? নাকি নতুন ছোটো মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিস?"
—"একদম সত্যি ছোটো মা! ছোটো চাচ্চুর সাথে তোমাকে না ভীষণ মানিয়েছে। কাল রাতে যখন তোমরা একসাথে গাড়ি থেকে নেমে ঘরে এলে, আমি তো দূর থেকে মায়ের ফোনে তোমাদের একটা দারুণ ছবি তুলেছি। দেখবে?"
—"ওরে দুষ্টু মেয়ে! আমাদের না জানিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি তোলাও হয়ে গেছে এর মধ্যে?"
জুহি খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, —"হ্যাঁ, মায়ের ফোনে তুলেছি। পরে একসময় ভালো করে দেখাব তোমাকে। এখন চলো না ছোটো মা, নিচে ঠাম্মি সহ সবাই টেবিলে অপেক্ষা করছে তো আমাদের জন্য।"
যেহেতু পদ্ম এই বাড়ির একদম নতুন বউ, তাই আজ ডাইনিং টেবিলে তাকে বসিয়ে বাড়ির সব পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়মনীতি গম্ভীর মুখে শিখিয়ে দিচ্ছেন শাশুড়ি সেলিনা খানম। এ বাড়িতে কে, কখন বাইরে থেকে আসে; কার, কোন সময়ে কী লাগে, সব যেহেতু পুরনো কাজের মানুষ মতির মা একাই দেখে, তাই বাড়ির তিন বউদের শুধু কাজ একটাই—প্রতিদিন সকালে উঠে দুপুরের আর রাতের খাবারের মেন্যু সিলেক্ট করে দেওয়া। আর যখন যার স্বামী অফিস থেকে ফিরে খেতে বসবে, তখন স্বামীর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। এটা-সেটা বাটি এগিয়ে দেওয়া।
পদ্ম সব মাথা নিচু করে শুনল। তার শাশুড়ি সেলিনা খানম গম্ভীর গলায় বললেন, —"বসো পদ্ম। আজ নতুন বউ হিসেবে নাশতাটা রাদের সাথেই এক টেবিলে বসে করো। কাল থেকে নিয়ম মেনে আমাদের সাথে নিচে করবে।"
এমন কড়া আদেশ শুনেও লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় ডাইনিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে রইল পদ্ম। জুহি হাসতে হাসতে তাকে জোরপূর্বক টেনে নিয়ে ইফরাদের পাশের খালি চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর পদ্মর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, —"উফফ ছোটো মা! তুমি সত্যি এত বেশি লাজুক!"
মেজো জা মারজিয়া তখন রান্নাঘর থেকে নাশতার ভারী রুপোলী ট্রে-টা এনে পরম যত্নে তুলে দিল ছোট জা লামিয়ার হাতে। জবার মা এই মুহূর্তে এখানে ডাইনিংয়ে নেই। হয়তো পেছনের বাইরের বড় বাগানটা সামলাতে গেছে। এদিকে চৌধুরী বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী নাশতা টেবিলে আসতে একমিনিট দেরী হলে ইফরাদ না খেয়েই টেবিল থেকে উঠে অফিসে চলে যাবে। কোনো ধরনের সময়ের অনিয়ম সে একদম পছন্দ করে না。
লামিয়া ভয়ে ভয়ে সবকিছু টেবিলে গুছিয়ে প্লেটে গরম পরোটা আর তরকারি তুলে ইফরাদের সামনে সাবধানে বাড়িয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই ঘটল সেই ভয়ংকর কাণ্ড!
হাতের এক তীব্র হিংস্র ধাক্কায় সম্পূর্ণ কাঁচের প্লেট ও নাশতাভরা ট্রে ডাইনিংয়ের পাথরের ফ্লোরে ফেলে দিল ইফরাদ! মুহূর্তের মধ্যে দামি সব কাঁচের প্লেট ভেঙে চুরমার হয়ে গুড়িয়ে গেল চারদিকে। সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে কাঠের ডাইনিং টেবিলে নিজের পুরো শক্তি দিয়ে একটা মারাত্মক ধাক্কা মেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ইফরাদ। তারপর পুরো ঘর কাঁপিয়ে এক পশুর মতো গর্জন দিয়ে চেঁচিয়ে ডাকল,
—"বড় ভাবী! বড় ভাবী কোথায় তুমি? তুমি খুব ভালো করে জানো, এই বাড়িতে যার-তার নোংরা হাতের খাবার আমি কোনোদিন মুখে নিতে পারি না! তাহলে আজ এই মেয়েটার হাত দিয়ে কেন আমার সামনে খাবার দেওয়া হলো?"
ইফরাদের এমন অমানুষিক চেঁচামেচি আর কাঁচ ভাঙার শব্দ শুনে নিজের ঘর থেকে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে ছুটে এলো বড় জা তাসনীম। তার ছোট ছেলেটা মাত্র ওয়াশরুমে ঢুকেছে, মা পাশে না থাকলে একটু পর সেও গলা ফাটিয়ে কাঁদবে। তাই ছেলের কারণে এতক্ষণ ডাইনিং টেবিলের সামনে আসতে পারেনি সে।
সবকিছু নিচে ফ্লোরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তাসনীম অবাক হয়ে বলল, —"খাবার তো যার-তার হাতের না ছোট ভাই, খাবার তো জবার মা নিজের হাতে বানিয়েছে।"
মারজিয়া নিজেও রান্নাঘর থেকে সবার সামনে এগিয়ে এসে একটু চড়া সুরে বলল, —"তোমার কীসের এত সমস্যা বল তো, ছোটো ভাই? সকাল-সকাল ডাইনিং টেবিলে সবার সামনে এসব কী ধরনের নোংরা আচরণ করছ তুমি?"
ইফরাদ নিজের রক্তচক্ষু রাঙিয়ে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, —"বুঝতে পারো না মেজো ভাবী? আমার সামনে দাঁড়িয়ে এখন আবার নাটক করছ? এই লামিয়াকে দিয়ে আমার প্লেট ছোঁয়ানোর পাকনামি করতে কে বলেছে তোমাকে শুনি?"
—"আরে সামান্য একটা নাশতা তো!" মারজিয়া আমতা আমতা করল।
—"তোমার বা তোমাদের কাছে এটা সামান্য সস্তা নাটক হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এটা চরম জঘন্য আর তীব্র ঘৃণ্য জিনিস!" ইফরাদের গলার রগগুলো রাগে ফুলে উঠেছে।
পাশে বসা পদ্ম এই পুরো দৃশ্য দেখে চরম হতভম্ব হয়ে বসে রইল। ঘরভরা এতগুলো মানুষের সামনে নিজের বরের এই আদিম পশুর মতো রাগ তার মাথার উপর দিয়ে গেল। সে কিছু একটা বলার জন্য মুখ খোলার আগেই হঠাৎ দেখল, ইফরাদের কোমরে গুঁজে রাখা সেই ডানহাতের জোড়া বুড়ো আঙুলের ফাঁক থেকে টপটপ করে তাজা লাল রক্ত পড়ছে ফ্লোরে! টেবিলের ওপরই একটা আধভাঙা কাঁচের জলের গ্লাস তখনও কাঁপছিল। একসাথে অনেকগুলো কাঁচের থালাবাটিতে সজোরে ধাক্কা দেওয়ার ফলে একটার ধারালো ভাঙা কাঁচে তার নিজেরও হাত মারাত্মকভাবে কেটে গেছে, অথচ সেইদিকে তার কোনো হুঁশই নেই! সে অনবরত বড় ভাবীর ওপর নিজের সমস্ত আক্রোশ আর রাগ দেখিয়ে যাচ্ছে।
তাসনীম ঘরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত নতুন বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, —"পদ্ম, তুমি প্লিজ ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে এক্ষুণি নিজেদের রুমে যাও তো মা। আমি তোমাদের ঘরের ওপরেই জবার মাকে দিয়ে নতুন নাশতা পাঠিয়ে দিচ্ছি।"
পদ্ম এক জিজ্ঞাসু আর বিভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে বড় জায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তাসনীম নিজে এগিয়ে এসে ওর একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করল যেন সে ইফরাদকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
কিন্তু এভাবে ঘরভরা মানুষের সামনে থেকে রাগে অন্ধ হয়ে যাওয়া ইফরাদকে সে ঠিক কী বলে ঘরে নিয়ে যাবে, সেটাও মাথায় ভেবে পেল না পদ্ম। বড়দের সামনে তার নিজের বড্ড লজ্জা আর সংকোচ হতে লাগল।
সেলিনা খানম তার নিজের ছোট ছেলের এমন গম্ভীর ও হিংস্র মুখের দিকে চেয়ে তীব্র ধমকের সুরে বললেন, —"এই বাড়িতে পা রাখলেই তুই এমন বুনো পশুর মতো আচরণ করিস কেন রাদ? তোর আসল সমস্যাটা কী বল তো আমাদের?"
ইফরাদ তখন টের পেল তার ডানহাতটা কাঁচের আঘাতে তীব্রভাবে জ্বলছে। বার দু'য়েক শূন্যে হাত ঝাড়া মেরে মায়ের কঠিন কথার উত্তরে এক পিশাচের মতো হেসে বলল, —"হ্যাঁ মা, আমি মানুষ নই, আমি একটা পশু! তাই আমি এমন জঘন্য কাজই করি। কেন, তোমাদের আভিজাত্যের চোখে সহ্য হচ্ছে না তো আমার এই রূপ? তাহলে স্পষ্ট করে মুখ ফুটে বলো, আমি এক্ষুণি এই বাড়ি ছেড়ে চিরকালের মতো চলে যাই! এমনিতেও তোমাদের এই চৌধুরী বাড়ির মেকি উচ্চবিত্ত ফ্যামিলি সার্কাস দেখার মতো ফালতু সময় আমার হাতে একদম নেই।"
তাসনীম পরিস্থিতি আরও বিগড়ে যাওয়ার ভয়ে পদ্মকে আবারও তাগাদা দিয়ে বলল, —"পদ্ম, দাঁড়িয়ে থেকো না মা, যাও তো জলদি। ওর ঘরে ড্রেসিংটেবিলে ফার্স্ট এইড বক্স আছে, ওর হাতটা ভালো করে ডেটল দিয়ে ধুয়ে কিছু একটা মলম লাগিয়ে দাও।"
ইফরাদ নিজের ক্ষ্যাপাটে আচরণের পর নিজেই আর এক মুহূর্ত ডাইনিংয়ে দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে দৌড় দিয়ে দোতলার নিজের ঘরে চলে গেল। তার পেছন পেছন এক রাশ আতঙ্ক আর রহস্যের কোলাজ বুকে নিয়ে পদ্মও নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
এদিকে নিচে ডাইনিংয়ের এক কোণে দাঁড়িয়ে রাগে কাঁপতে থাকা মারজিয়ার হাতটা নিজের দুই হাত দিয়ে খামচে ধরে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল মেজো বউ লামিয়া। তার ফর্সা মুখটা ভয়ে পুরোপুরি ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। কোনো সুস্থ স্বাভাবিক ঘরের শিক্ষিত মানুষ সকালবেলা ডাইনিং টেবিলে দাঁড়িয়ে এমন ভয়ংকর কাণ্ড ঘটাতে পারে, তা লামিয়া বা পদ্মর কল্পনারও বাইরে ছিল!
(চলবে...)
সংগৃহীত