কাঁচা মাটির পুতুল
(একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের গল্প)
১. ২৫ আর ১৪-এর সমীকরণ
"আমার বয়স ২৫।" তিমিরের মুখ থেকে নিজের বয়সটা শুনে শঙ্খ খাওয়া থামিয়ে বড় বড় চোখ করে তাকাল। তার চিবুকে লেগে থাকা এক ফোঁটা ভাতের কণা ঘরের মৃদু ল্যাম্পের আলোয় চকচক করছে। সে কিছুক্ষণ আঙুল গুনে হিসাব করার চেষ্টা করল, তারপর অবলীলায় বলে উঠল, —"ওমা! আপনি তো আমার চেয়ে অনেক বড়! তাহলে তো আপনাকে আপনি করেই বলতে হবে। মা বলেছে, নিজের চেয়ে বড়দের তুমি বলতে নেই, পাপ হয়।"
তিমির মনে মনে হাসল। যে মেয়েটা একটু আগে জাহিদের সাথে সুবর্ণার পালিয়ে যাওয়ার মতো একটা গুরুতর পারিবারিক বিপর্যয় নিয়ে খিলখিল করে হাসছিল, সে এখন 'তুমি' বললে পাপ হবে ভেবে চিন্তিত!
তিমিরের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সুবর্ণার সাথে। সব ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু বিয়ের ঠিক আগের রাতে সুবর্ণা তার প্রেমিক জাহিদের হাত ধরে গ্রাম ছেড়ে পালায়। দুই পরিবারের মান-সম্মান যখন ধুলোয় মেশার উপক্রম, তখন সুবর্ণার বাবা কেঁদে কেটে তিমিরের মায়ের পায়ে ধরেন। চৌধুরী বাড়ির সম্মান বাঁচাতে এবং ভাঙা আসর জোড়া লাগাতে শেষ মুহূর্তে সুবর্ণার ছোট বোন, এই ১৪ বছরের অবুঝ শঙ্খকে তিমিরের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
তিমির চিলমচিতে হাত ধুয়ে এসে বিছানার এক কোণে বসল। ঘরের কোণে রাখা নতুন কাঠের আলমারি আর তিমিরের মায়ের পুরোনো ট্রাঙ্কটা যেন এই অসম বিয়ের নীরব সাক্ষী।
২. টেলিভিশন আর এক রূপকথার জগৎ
শঙ্খ বিছানায় আরাম করে পা ছড়িয়ে বসল। তার পরনের ভারী বেনারসি শাড়িটা তার ছোট্ট শরীরের তুলনায় বড্ড বড় ঠেকছে। কপালে পরা টিকলিটা বারবার চোখের ওপর নেমে আসছে, আর সে বিরক্তি নিয়ে সেটা বারবার হাত দিয়ে ওপরে ঠেলে দিচ্ছে।
—"আচ্ছা তিমির বাবু, আপনাদের এদিককার মানুষ কি সারাদিন শুধু কাজই করে? কোনো আনন্দ-ফুর্তি নেই?" শঙ্খ জাদুকরী গলায় প্রশ্ন করল।
তিমির অবাক হয়ে বলল, —"আনন্দ মানে? আমাদের গ্রামে যাত্রা গান হয়, চৈত্র সংক্রান্তির মেলা হয়। এগুলোই তো আনন্দ।"
—"ধুর! ওসব তো পচা।" শঙ্খ নাক কুঁচকে বলল। —"আমাদের শহরের বাসায় যে রঙিন টেলিভিশন আছে, ওটার ভেতরে কত সুন্দর সুন্দর মানুষ দেখা যায়! সিনবাদ ডগলাস, আলিফ লায়লা... কত কী! আপনি কখনো আলিফ লায়লা দেখেছেন?"
তিমির মাথা নাড়ল। এই ১৯৯৭ সালেও তাদের রায়পুর গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি। হারিকেন আর কুপির আলোই চকচক করছে। শঙ্খের বাবা শহর থেকে আসা বড় ব্যবসায়ী, তার বিশাল প্রতাপ। সেই অহংকারেই তিনি তিমিরের মাকে টিভির গল্প শুনিয়েছিলেন। কিন্তু এখন এই অন্ধকার, নিঝুম গাঁয়ের একটা সাধারণ টিনের ঘরে এসে ১৪ বছরের মেয়েটা কীভাবে মানিয়ে নেবে, সেটাই তিমিরের বড় চিন্তা।
শঙ্খ এক হাত দিয়ে তার ভারী গয়নাগুলো খুলতে চেষ্টা করতে করতে বলল, —"উফ! এগুলো বড্ড লাগছে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। একটু খুলে দেবেন?"
৩. এক পবিত্র দায়িত্বের সূচনা
তিমির প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় পড়ল। কিন্তু মেয়েটার নিঃসংকোচ এবং পবিত্র চোখের দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত জড়তা কেটে গেল। সে অত্যন্ত সাবধানে শঙ্খের মাথা থেকে ওড়নাটা সরাল। তারপর চুলের ক্লিপ আর ভারী গলার হারটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। ভারী গয়না আর সাজগোজের আড়াল থেকে যখন মেয়েটা বেরিয়ে এল, তিমিরের মনে হলো—এ তো কোনো নতুন বউ নয়, এ যেন এক সদ্য ফোটা শিউলি ফুল, যার গায়ে এখনো ভোরের শিশির লেগে আছে।
মেয়েরা নাকি কাঁচা মাটির মতো হয়। তাকে যে ছাঁচে ফেলা যাবে, সে সেই রূপই ধারণ করবে। তিমির বুঝতে পারল, নিয়তি তার কাঁধে কোনো পাকা গৃহিণীকে তুলে দেয়নি, দিয়েছে একটা পবিত্র দায়িত্ব। এই কঠিন, স্বার্থপর পৃথিবীর কোনো কালির দাগ এখনো শঙ্খের মনে লাগেনি। সুবর্ণা চলে গিয়ে তিমিরকে যে আঘাত দিয়েছিল, শঙ্খের এই নিষ্পাপ উপস্থিতি যেন সেই ক্ষততে এক অদ্ভুত প্রলেপ লাগিয়ে দিল।
গয়নাগুলো খুলে দিতেই শঙ্খ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বিছানায় রাখা বালিশটা টেনে নিয়ে পেটের নিচে চেপে ধরে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সে।
—"বাঃ! এবার কত হালকা লাগছে। আচ্ছা তিমির বাবু, কাল সকালে কি আমাকে রান্না করতে হবে? আমি কিন্তু শুধু ডিম ভাজতে পারি, আর কিচ্ছু পারি না।"
তিমির মৃদু হেসে বলল, —"না, তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না। মা আছে তো।"
৪. বাসর রাতের ঘুমপাড়ানি গান
শঙ্খ চোখ দুটো বন্ধ করতে করতে বলল, —"টিভি-তে দেখেছিলাম বাসর রাতে নাকি ঘুমাতে নেই। কিন্তু আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি যদি ঘুমিয়ে যাই, আপনি রাগ করবেন না তো?"
তিমির শঙ্খের মাথার কাছে বসল। আলতো করে তার এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল, —"না, আমি রাগ করব না। তুমি ঘুমাও।"
—"মা প্রতিদিন ঘুমানোর আগে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আপনি একটু দেবেন?" শঙ্খের গলাটা তখন ঘুমে জড়িয়ে আসছে।
তিমির নিঃশব্দে মেয়েটার মাথায় হাত বোলাতে লাগল। বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বাঁশঝাড়ের পাতার খসখস শব্দ। গ্রামীণ রাতের সেই নিস্তব্ধতায়, একটা ১৪ বছরের শহুরে মেয়ে সমস্ত ভয় আর অচেনা পরিবেশ ভুলে এক লহমায় বিশ্বাস করে নিল ২৫ বছরের এক যুবককে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শঙ্খ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। তার ঠোঁটের কোণে লেগে রইল এক চিলতে নিশ্চিন্তের হাসি।
তিমির জানালার দিকে তাকাল। রাতের আকাশভরা তারাগুলো যেন ঘরের ভেতর আলো ফেলছে। এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে দিয়ে যে রাতের শুরু হয়েছিল, ভোরের আলো ফোটার আগেই তা এক গভীর মায়ায় রূপ নিল। তিমির মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এই কাঁচা মাটির পুতুলটিকে সে কোনোদিন ভাঙতে দেবে না। পৃথিবীর সমস্ত নোংরামি থেকে সে আগলে রাখবে তার এই ছোট্ট 'শঙ্খ'কে।
সংগৃহীত