হারানো নামের খোঁজে: এক নিঃসঙ্গ মায়ের আত্ম আবিষ্কারের গল্প
নিঃসঙ্গতার বেড়াজাল ভেঙে নিজের অস্তিত্বকে ফিরে পাওয়ার এক অনুপম লড়াইয়ের কাহিনি
জেবুন্নেসা জুঁই। উনত্রিশ বছর ধরে তিনি নিজের নামটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন। জীবনের একাকীত্ব আর পরিবারের উপেক্ষা থেকে আত্মসম্মানের নতুন আকাশে ডানা মেলার এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প।
১. ঝড়ের পূর্বাভাস
"আম্মু, তুমি নাকি শুক্রবার বাসায় থাকবে না?"
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ল্যাপটপে কী একটা হিসাব করছিল বাদল। মায়ের দিকে না তাকিয়েই বেশ গম্ভীর গলায় প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল সে।
জেবুন্নেসা জুঁই তখন নিজের ঘরে বিছানায় বসে ফোনের স্ক্রিনে উঁকি দিচ্ছেন। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, "থাকব না কেন বাবা, শুধু বিকেলের দিকে কয়েক ঘণ্টার জন্য একটু বাইরে যাব। আমাদের গ্রুপের একটা প্রোগ্রাম আছে, প্রিয়াকে তো আগেই বলে রেখেছিলাম। কিন্তু কেন বল তো?"
বাদল এবার ল্যাপটপটা সামান্য নামিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি, "কিসের প্রোগ্রাম তোমার আম্মু? তুমি ইদানীং কী শুরু করেছ বলো তো? আমি বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি তুমি রাতদিন এখন ফোন নিয়ে বসে থাকো। কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলো গ্রুপের কাজ করি। কী কচুর গ্রুপ তোমার?"
ছেলের মুখের এমন তীব্র আর তাচ্ছিল্যভরা আক্রমণে জুঁই ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। হাতের ফোনটা শক্ত করে ধরে রইলেন তিনি। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। এই মুহূর্তে তিনি আসলেই ফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। চলতি মাসের 'সেরা সক্রিয় সদস্য' বাছাইয়ের কাজটা আজ রাতের মধ্যে শেষ করতে হবে। প্রতি মাসে যে সদস্য গ্রুপে সবচেয়ে বেশি মননশীল ও সক্রিয় থাকে, তার জন্য গ্রুপের পক্ষ থেকে একটা সুন্দর সম্মাননা ব্যানার তৈরি করা হয়। এছাড়া সেরা লেখা, সেরা কবিতা, সেরা হস্তশিল্প, ফটোগ্রাফি—মাসজুড়েই কতশত আয়োজন থাকে এই গ্রুপে।
বয়সের দিক থেকে জুঁই এই মডারেটর টিমের সবচেয়ে সিনিয়র সদস্য। তাই স্বভাবতই দায়িত্বের একটা বড় অংশ তাঁর কাঁধেই বর্তায়। নিজের লেখার পাশাপাশি অন্য তরুণরা ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, কোন মানহীন পোস্ট গ্রুপে চলে যাচ্ছে কিনা—সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে এপ্রুভ করতে হয়। এই কাজের জন্য আগের চেয়ে ফোনটা একটু বেশি ব্যবহার করতে হয় ঠিকই, কিন্তু এই ব্যস্ততা জুঁইকে এক অদ্ভুত আনন্দ দেয়।
তিনি জেবুন্নেসা জুঁই। অথচ এই নামটা তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন সেই কবে! উনত্রিশ বছর আগে জুঁই থেকে হয়েছিলেন 'বিপুলের বউ'। তারপর বিপুল চলে যাওয়ার পর এবং সন্তানরা বড় হওয়ার পর হলেন 'বিপাশা আর বাদলের আম্মু'। আর এখন তো পরিচয় আরও সংকুচিত হয়ে এসেছে—'প্রিয়মের দাদি'। কত যুগ পর, অনলাইনের এই একঝাঁক তরুণী মডারেটরের কাছে তিনি আবার নিজের নামে ফিরে এসেছেন। ওরা ওনাকে 'জুঁই আপু' বলে ডাকে, ভীষণ সম্মান করে। গ্রুপের যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত, যা ওরা নিজেরা নিলেও পারত, শুধু ওনার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে ওনাকে জিজ্ঞেস না করে চূড়ান্ত করে না। এই সম্মান, এই নিজের নামে পরিচিত হওয়া—এর মূল্য জুঁইয়ের কাছে অনেক।
• --
২. পার্কের বিকেল এবং এক নতুন দিগন্ত
বেশিদিন আগের কথা নয়, এই তো মাস তিনেক আগে। উত্তরা বারো নম্বর সেক্টরের যে পার্কটায় জুঁই রোজ বিকেলে নাতি প্রিয়মকে নিয়ে যান, সেখানেই একদিন পরিচয় হয়েছিল আমেনা আপার সাথে। আটান্ন বছর বয়সী আমেনা আপা বিকেলে পায়ে স্নিকার্স পরে চমৎকার ফিট হয়ে পার্কে হাঁটেন। জুঁইয়ের মতো হাঁটুর ব্যথায় কাবু নন তিনি।
কথায় কথায় জুঁই জানতে পারেন আমেনা আপা একসময় স্কুল শিক্ষক ছিলেন। এখন অবসর নিয়ে পুরো সময়টা লেখালেখির পেছনে দিচ্ছেন। সেদিনই আপার অনুরোধে ওনার লেখা দুটি কবিতার বই সংগ্রহ করেছিলেন জুঁই। রাতে বিছানায় শুয়ে বহুদিন পর আবার কবিতার বই হাতে নিয়ে পড়ার সময় জুঁইয়ের বুকের ভেতর সুপ্ত থাকা এক পুরোনো ইচ্ছে মোচড় দিয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, "আমিও কি আবার লিখতে পারি না?"
পরদিন পার্কে আমেনা আপাকে নিজের ইচ্ছের কথা বলতেই তিনি প্রায় জড়িয়ে ধরে উৎসাহ দিলেন। সেই থেকে জুঁই আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে গেলেন। আলমারির কোণ থেকে একটা ডায়েরি খুঁজে বের করে টুকটাক কবিতা লিখতে শুরু করলেন। একদিন ওনার পুত্রবধূ প্রিয়া খাটের পাশে ডায়েরিটা দেখে কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, "মা, কী লিখেন এত?" জুঁই খুব আগ্রহ আর পরম মমতা নিয়ে প্রিয়াকে ওনার লেখা কয়েকটা কবিতা পড়তে দিয়েছিলেন। প্রিয়া কোনো মন্তব্য না করে মৃদু হেসে চলে গিয়েছিল।
আসল ধাক্কাটা এল সেদিন রাতে, খাওয়ার টেবিলে। প্রিয়া হাসতে হাসতে বাদলকে বলল, "জানো, মা নাকি আজকাল লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লিখছেন!"
হঠাৎ এই বয়সে মা কবিতা লিখছেন শুনে বাদলও চামচটা বাটিতে রেখে এক অদ্ভুত, তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হেসে উঠল, "এই বয়সে এসে আম্মুর আবার নতুন শখ জেগেছে নাকি!"
দের সেই সম্মিলিত হাসিতে জুঁইয়ের ভেতরের উৎসাহের প্রদীপটা দপ করে নিভে গিয়েছিল। এর দুদিন পর জুঁই দেখলেন ওনার ডায়েরিটা খাটের পাশে নেই। সারা ঘর আতিপাতি খুঁজে অবশেষে ওটা পাওয়া গেল তিন বছরের নাতি প্রিয়মের ঘরে। প্রিয়ম ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে মেঝেতে বসে কাগজের নৌকা বানাচ্ছিল। প্রিয়া আর বাদল ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিল, সব দেখেও ওরা বাচ্চাটাকে আটকায়নি। সেদিন জুঁইয়ের চোখে জল চলে এসেছিল। ওনার এত যত্নের লেখা, ওনার মনের অনুভূতিগুলো ওদের কাছে এতটাই সস্তা আর তাচ্ছিল্যের বস্তু!
জেবুন্নেসা জুঁই ভেবেছিলেন আর কখনো কলম ধরবেন না। কিন্তু আমেনা আপা ছাড়ার পাত্রী নন। পার্কে যেদিন জুঁই মন খারাপ করে বললেন যে তিনি আর লিখবেন না, আমেনা আপা রীতিমতো একটা কড়া ঝাড়ি দিলেন, "ওদের কথায় নিজের সত্ত্বাকে মেরে ফেলবেন না জুঁই। ওরা বুঝবে না।" সেদিনই আমেনা আপা ওনাকে এক নতুন মাধ্যমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বলতে গেলে, এই ছাপান্ন বছর বয়সে এসে জুঁই যেন এক সম্পূর্ণ নতুন নিজের খোঁজ পেলেন।
• --
৩. অতিত এবং অন্তর্জাল
জুঁই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন। একসময় লেখক হওয়ার কত আকাশকুসুম স্বপ্ন ছিল ওনার। কিন্তু অনার্স পড়াকালীনই বিপুল মিয়ার সাথে বিয়ে, পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই পিঠাপিঠি দুই সন্তানের জন্ম, আর একান্নবর্তী সংসারের বিশাল দায়িত্ব—সবকিছু মিলে স্বপ্নটা ডায়েরির পাতার মতোই ধুলোবালি মেখে আলমারির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। একসময় গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ডায়েরিতে দু-এক লাইন কবিতা লিখতেন, সংসারের জাঁতাকলে তাও একদিন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
আমেনা আপাই ওনাকে অনলাইনের লেখার প্ল্যাটফর্ম আর ফেসবুক সাহিত্য গ্রুপের খোঁজ দিলেন। নাতি যখন পার্কের মাঠে অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলত, জুঁই তখন পার্কের বেঞ্চে বসে আমেনা আপার কাছে স্মার্টফোনে অভ্র দিয়ে বাংলা টাইপ করা শিখতেন। এতদিন যে স্মার্টফোনটা কেবল ছেলের পাঠানো ছবি দেখা আর কল রিসিভ করার কাজে লাগত, সেটা হঠাৎ ওনার চোখের সামনে একটা বিশাল দুনিয়ার দরজা খুলে দিল।
আপার হাত ধরে ওনার ফোনেই ডাউনলোড হলো কয়েকটি লেখার অ্যাপ। 'সঞ্চিতা', 'কবিতা গুচ্ছ'—এমন বিভিন্ন গ্রুপে জুঁই নিজের ছোট ছোট কবিতা পোস্ট করতে শুরু করলেন। আর কী আশ্চর্য! সম্পূর্ণ অচেনা সব পাঠকেরা ওনার লেখার নিচে চমৎকার সব মন্তব্য করতে লাগল, উৎসাহ দিতে লাগল। জুঁইয়ের মনে হতে থাকল, শেষ বয়সে এসে কি তবে ওনার সেই হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে?
সেই থেকে শুরু। এখন অবসর পেলেই জুঁই নিয়মিত লেখেন। শুধু কবিতা নয়—ছোটগল্প, স্মৃতিকথা, নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতাও গল্প আকারে তুলে ধরেন। পাঠকপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় একটি নামী প্রকাশনী ওনার লেখার গুণগত মান দেখে নিজ দায়িত্বে এগিয়ে এসেছে। আগামী বইমেলায় সম্পূর্ণ প্রকাশনীর খরচে জুঁইয়ের প্রথম একক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। জুঁই ভেবে রেখেছিলেন, চুক্তিপত্র সই হয়ে সবকিছু চূড়ান্ত হলে তবেই পরিবারের সবাইকে এই খুশির খবরটা দিয়ে চমকে দেবেন। অথচ আজ ছেলের মুখে এই তাচ্ছিল্যভরা কথা শুনে ওনার বুকটা ভেঙে গেল। এরা ওনার মনের খোরাককে, ওনার সৃষ্টিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয় না!
• --
৪. সংঘাত ও সিদ্ধান্ত
জুঁই নিজেকে সামলে নিয়ে বাদলের দিকে সোজা হয়ে তাকালেন। স্পষ্ট গলায় বললেন, "বাদল, তুমি জানো না এটা কিসের গ্রুপ? আমি যে 'স্বপনে সাহিত্য' নামক একটা অনলাইন গ্রুপে কাজ করি, এটা তো তোমরা ভালো করেই জানো।"
বাদল ল্যাপটপটা দপ করে বন্ধ করে মায়ের দিকে এগিয়ে এল, "আম্মু, তোমার বয়স হয়েছে। আব্বু আজ চার বছর হলো জীবিত নেই। এই বয়সে তুমি তসবিহ হাতে নিয়ে আল্লাহ খোদার নাম নিবা, নামাজ কালাম পড়বা, তা না করে তুমি কী শুরু করেছ? বাচ্চা মেয়েদের মতো ফেসবুক গ্রুপে প্রেমের কবিতা লেখা, ন্যাকামি মার্কা গল্প লেখা—এইসব আচরণ কি এই বয়সে তোমাকে মানায়? মানুষ শুনলে হাসবে।"
ছেলের মুখে এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শুনে জুঁইয়ের ফর্সা মুখটা অপমানে লাল হয়ে উঠল। তিনি শক্ত গলায় বললেন, "আমি গল্প-কবিতা লিখলে তোমাদের কী সমস্যা, আমি তো সেটাই বুঝলাম না বাদল? আর লেখালেখির সাথে আমার ধর্ম পালনের কী বিরোধ পাচ্ছ তুমি? আমি আমার নামাজ, কালাম, পর্দা—সবই ঠিকঠাকভাবে করি। আর মনে রেখো, নামাজ শুধু বয়স্কদের জন্য নয়, নামাজ সবার জন্য ফরজ। আগামী শুক্রবার গ্রুপের একটা গেট-টুগেদার আয়োজন করা হয়েছে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে, আমি মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য সেখানে যাব। এতে তোমার এত তীব্র আপত্তির কারণটা কী?"
"আপত্তি হবে না?" বাদল হাত নেড়ে চেঁচিয়ে উঠল, "তুমি একা একা এই বয়সে কোথায় না কোথায় যাবা, শেষে ওসব ফেক গ্রুপের মানুষজন তোমার সবকিছু লুট করে রাস্তায় অজ্ঞান করে ফেলে রেখে যাবে। দিন-দুনিয়ার কোনো খবর রাখো তুমি? তুমি কোথাও যাবে না, এটাই ফাইনাল।"
মাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বাদল হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ঠিক তখনই জুঁইয়ের হাত থাকা ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল মেয়ে বিপাশার নাম। জুঁই ফোনটা ধরলেন না। তিনি নিশ্চিত, বিপাশাও ভাইয়ের সুরে সুর মিলিয়ে ওনাকে চারটে জ্ঞান দিতেই ফোন করেছে। জুঁই ফোনটা বিছানায় রেখে জানালার বাইরে তাকালেন। বিকেলের আলো তখন নিভে আসছে। জুঁইয়ের মনে হলো, এতদিন তিনি সবার ইচ্ছের পুতুল হয়ে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু আজ তিনি বুঝতে পেরেছেন, ওনার নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ওনার নিজেরও আছে। আর সেই সিদ্ধান্ত তিনি মনে মনে নিয়ে ফেলেছেন।
• --
৫. বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সেই বিকেল
আজ শুক্রবার। চারপাশের সব বাধা উপেক্ষা করেই জুঁই এসে পৌঁছেছেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের চমৎকার আলো-আঁধারি ঘেরা আড্ডার ঘরটিতে। গ্রুপের নিয়মিত প্যানেল মেম্বারদের জন্য হালকা চা-নাস্তার ব্যবস্থা করেছেন তরুণ এবং সফল প্রকাশক জামিল ভাই। পাশাপাশি আজ একটি বিশেষ লেখক সম্মাননারও আয়োজন করা হয়েছে।
আসলে, 'স্বপনে সাহিত্য' গ্রুপে যারা নিয়মিত লিখতেন, তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত নতুন দশজন লেখকের লেখা নিয়ে প্রকাশনী থেকে একটা যৌথ গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছিল—'দশটি প্রেমের গল্প সংকলন'। পরীক্ষামূলকভাবে প্রকাশিত এই বইটি বাজারে আসার পর থেকেই আশাতীত সাড়া ফেলেছে। সেই সফলতার ধারাবাহিকতায় আজ এই সংকলনের পরবর্তী খণ্ড নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ঠিক হয়েছে, এখন থেকে নিয়মিত বিরতিতে গ্রুপের সেরা গল্পগুলো নিয়ে এমন সংকলন বের করা হবে।
প্রকাশক জামিল সাহেব সবার উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। তিনি জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন, "জুঁই আপা, আমাদের পরবর্তী সংকলনটি কোন বিষয়ের উপর করলে ভালো হয় বলে আপনার মনে হয়? আপনি যদি আপনার মূল্যবান মতামত দেন।"
এত মানুষের সামনে, এত নামী একজন প্রকাশক যখন ওনার মতামত চাইলেন, জুঁইয়ের চোখ দুটো আবেগে ভিজে উঠল। যে মানুষটাকে নিজের ঘরে এক ফোঁটা সম্মান দেওয়া হয় না, তাকে বাইরে কতখানি মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে!
জুঁই চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বললেন, "জামিল ভাই, এবার তো আমরা প্রেম নিয়ে করলাম। পরের বার হয়তো 'থ্রিলার' বা রহস্য ঘরানার গল্প নিয়ে করা যায়। এরপর ধীরে ধীরে আমরা সামাজিক, ভৌতিক কিংবা সায়েন্স ফিকশন—সব ধরনের লেখা নিয়েই কাজ করতে পারি।"
জামিল সাহেব হাততালি দিয়ে উঠলেন, "চমৎকার আইডিয়া! তাহলে জুঁই আপার কথাই থাকল। সামনের বইমেলায় আমরা থ্রিলার সংকলন নিয়ে কাজ করব। এবার সেরা দশটি নয়, সেরা পনেরটি গল্প বাছাই করা হবে। আর জুঁই আপা, আপনি মডারেটর টিমকে সাথে নিয়ে সেরা পনেরটি গল্প বাছাইয়ের মূল দায়িত্বটা পালন করবেন।"
জুঁই মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলেন। দুপুর বারোটার এই মিলনমেলা যখন শেষ হতে চলল, ঘড়িতে তখন বিকেল তিনটা। বহু বছর পর জুঁই কোনো অনুষ্ঠান এতটা মন থেকে উপভোগ করলেন। এটা শুধু কোনো সাহিত্য আড্ডা ছিল না, এখানে কোনো ভারী ভারী অলঙ্কারিক আলোচনাও হয়নি। বরং বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন পেশার কিছু মানুষ আজ একত্রিত হয়েছিল মনের টানে। জীবনের সব টানাপোড়েন ভুলে সবাই এই কয়েকটা ঘণ্টা হাসি আর গল্পে মেতে উঠেছিল। প্রত্যেকে যার যার ব্যক্তিগত দুঃখগুলোকে অন্তত তিন ঘণ্টার জন্য একপাশে সরিয়ে রাখতে পেরেছিল—এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
• --
৬. মুখোশের আড়ালে একাকীত্ব
আড্ডা শেষে জুঁই খেয়াল করলেন, আপাতদৃষ্টিতে এই গ্রুপের সবার জীবন বাইরে থেকে কত গোছানো মনে হয়, যেন কোনো সমস্যাই নেই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকেই কোনো না কোনো মনোকষ্টের বিশাল পাহাড় বয়ে বেড়াচ্ছে।
যেমন এই গ্রুপের কনিষ্ঠ সদস্য টয়া। ইডেন কলেজে বাংলায় অনার্স পড়ছে, সবসময় হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল একটা মেয়ে। অথচ কেউ খুব কাছ থেকে না মিশলে জানতে পারবে না ও কত বড় ক্ষত বুকে নিয়ে ঘোরে। টয়ার যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স, তখন ওর বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়। দুজনেই যার যার মতো আবার বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন, আর টয়া বড় হয়েছে নানা বাড়িতে। বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত, অন্যের বাড়িতে আশ্রিত সেই কষ্টের অতীত আজও মেয়েটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
আবার মল্লিকা দিদি। ওনার স্বামী পরনারীতে আসক্ত। মল্লিকা দিদি তীব্র মানসিক যাতনা সহ্য করেও সমাজের ভয়ে একই ছাদের নিচে কোনো রকম টানহীন, মৃত একটা সম্পর্ক বছরের পর বছর টেনে নিয়ে যাচ্ছেন।
এমনকি প্রকাশক জামিল ভাই—বাইরে থেকে এত সফল মানুষ, অথচ অল্প বয়সে ছন্নছাড়া জীবন কাটানোর ফলে ওনার প্রথম সংসার টেকেনি। রোজকার মনোমালিন্য থেকে অবধারিতভাবে বিচ্ছেদ আসে, আজ ছেলেমেয়েরাও ওনাকে পছন্দ করে না। ওনাকে দেখলে কেউ বুঝবে না যে ভেতরে ভেতরে মানুষটা কতটা নিঃসঙ্গ।
আর এই ভিড়ে জুঁই নিজের জীবনের দিকে তাকালেন। স্বামীর রেখে যাওয়া মিরপুরের তিন বেডরুমের ফ্ল্যাটে তিনি ছেলে, ছেলের বউ আর নাতিকে নিয়ে থাকেন। মেয়ে বিপাশা থাকে মাত্র এক গলি পিছনের বাসায়। আত্মীয়-স্বজন সবাই বলে, জুঁই হলেন একদম হাত-পা ঝাড়া, টেনশনমুক্ত একজন সুখী মানুষ! বিপুল মারা গিয়েছেন আজ চার বছর হতে চলল।
জুঁইয়ের ছেলে বাদল আর পুত্রবধূ প্রিয়া—দুজনই স্বনামধন্য ব্যাংকার। মেয়ে বিপাশা একটা নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিকা, আর মেয়ের জামাই মাহফুজ গ্রিন রোডে বড় টাইলসের শোরুমের মালিক। ওনার মেয়ের ঘরেরও একটা নাতনি আছে, যার বয়স মাত্র দুই বছর। আর বাদলের ছেলের বয়স তিন।
সকালে আটটার মধ্যে বাদল আর প্রিয়া অফিসের জন্য বেরিয়ে যায়। বিপাশার ক্লাস থাকে ডে শিফটে, ও বের হয় এগারোটার দিকে। মাহফুজের ব্যবসার কাজে দম ফেলার সময় থাকে না। ফলে অবধারিতভাবেই, দুই নাতি-নাতনিকে দেখার পুরো দায়িত্বটা এসে পড়ে জুঁইয়ের ওপর। ছোট বাচ্চা দুটো এখনো স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। হ্যাঁ, বাসায় কাজের জন্য বুয়া আছে, যে ঘর মোছা বা থালাবাসন ধোয়ার কাজ করে। কিন্তু রান্নাবান্না তদারকি করা আর এই দুই শিশুকে চোখে চোখে রাখার মূল দায়িত্বটা জুঁইকেই সামলাতে হয়।
কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্যটা হলো—জুঁই সবাইকে দেখেশুনে রাখলেও, জুঁইকে দেখেশুনে রাখার মতো কেউ নেই। ছেলে বা মেয়ে, কারও মনে কখনো এই প্রশ্নটা জাগে না যে—মা সারাদিন এই চার দেয়ালের মাঝে কতটা নিঃসঙ্গ বোধ করেন! ছুটির দিনে ওদের নিজেদের ফ্রেন্ডস সার্কেলের কোনো পার্টি থাকলে বাচ্চাদের নির্দ্বিধায় মায়ের কাছে রেখে চলে যায়। কোনো পারিবারিক বড় দাওয়াত হলে জুঁইকে সাথে নেয় ঠিকই, কিন্তু সেখানেও জুঁই একাকী। ছেলে এসে হয়তো বলে, "আম্মু, এখানে সব আমার অফিসের কলিগ আর তাদের তরুণ ছেলেমেয়েরা। তুমি বসলে তোমার সময় কাটবে না, তুমি বরং একপাশে চেয়ারে গিয়ে বসো বা বাসায় চলে যাও। কিছু লাগলে কল দিও।"
জুঁইয়ের তখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, "বাবা, আমার তোদের কোনো কলিগকে লাগবে না, আমার তোদের লাগবে! তোরা আমার আশেপাশে থাক, আমার সাথে দুটো কথা বল।" কিন্তু কথাগুলো গলায় আটকে যায়, বলা আর হয় না। ছেলে-মেয়ে দুটোই নিজেদের ক্যারিয়ার আর আভিজাত্য নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, তারা শুধু মায়ের ওপর নিজেদের অধিকার খাটানোই শিখেছে, कर्तव्य পালনের কথা ভুলে গেছে।
আজকাল মানুষ এই ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে কত নেতিবাচক কথা বলে। বলে যে এটা নাকি মানুষকে সমাজবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। কথাটা হয়তো আংশিক সত্য, কিন্তু জুঁইয়ের মতো কিছু নিঃসঙ্গ মানুষের জন্য এই অন্তর্জাল যেন এক আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। স্বামীর মৃত্যুর পর যে জুঁই কথা বলার একটা মানুষ পাচ্ছিলেন না, একাকীত্বের এক অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি এই ইন্টারনেটের কল্যাণেই আবার নতুন করে বাঁচতে শিখেছেন। এখন ওনার অবসর সময়টা শুধু পুরোনো দিনের হা-হুতাশ করে কাটে না। তিনি লেখেন, লেখাগুলো শেয়ার করেন, একটা ভার্চুয়াল পরিবারের সাথে যুক্ত আছেন, যা ওনাকে কোনো আর্থিক লাভ না দিলেও ওনার হারিয়ে যাওয়া নাম আর কর্মের সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছে। অবসরে এখন তিনি বিদেশে থাকা বোনকে ভিডিও কল দিয়ে গল্প করেন। ওনার চোখের সামনে এখন ওনার লেখার কাল্পনিক চরিত্ররা ঘোরে, নতুন নতুন গল্পের প্লট মাথায় আসে।
• --
৭. আদালতের কাঠগড়ায় মা এবং একটি মহাকাব্যিক জবাব
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শেষ করে যখন জুঁই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, ততক্ষণে রাস্তায় তীব্র জ্যাম লেগে গেছে। মিরপুর থেকে শাহবাগের এই পথটুকু পাড়ি দিয়ে যখন তিনি বাসায় ফিরলেন, ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা।
ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই জুঁই অবাক হয়ে গেলেন। সেখানে শুধু বাদল আর প্রিয়া নয়, মেয়ে বিপাশা এবং মেয়ের জামাই মাহফুজও গম্ভীর মুখে বসে আছে। যেন কোনো জরুরি বৈঠক চলছে।
পায়ের জুতো খুলতে খুলতে জুঁই সহজ গলায় বললেন, "আরে! তোমরা সবাই এই অসময়ে একসাথে? কী ব্যাপার?"
বাদল সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বেশ কড়া গলায় বলল, "আম্মু, তুমি আগে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো। আমাদের তোমার সাথে একটা জরুরি কথা বলা দরকার।"
"ঠিক আছে, আসছি।" জুঁই মাহফুজের দিকে তাকিয়ে বললেন, "মাহফুজ, চা-নাস্তা কিছু খেয়েছ বাবা?"
মাহফুজের উত্তর দেওয়ার আগেই বাদল অত্যন্ত বিরক্ত মুখে বলে উঠল, "কে দেবে আম্মু? তুমি কি আজকাল বাসায় থাকো নাকি? তোমার তো আমাদের দিকে, এই সংসারের দিকে কোনো মনই নেই!"
নিজের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েও জুঁই থমকে দাঁড়ালেন। ওনার ভেতরের সুপ্ত আত্মসম্মানবোধ এবার যেন ফুঁসে উঠল। তিনি রুমে না গিয়ে বেসিনে গেলেন, হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে, মুখ মুছে ড্রয়িংরুমের সোফায় এসে বসলেন। বাইরের শাড়িটা পরেই বসলেন, ওটা পরেও পাল্টানো যাবে, আগে ছেলের অভিযোগটা মন দিয়ে শোনা দরকার।
জুঁই শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন, "বাদল, আমার বাসায় থাকা না থাকার সাথে তোমাদের চা খাওয়ার কী সম্পর্ক বাবা? নাস্তা তো ফ্রিজে সবসময় বানানোই থাকে, শুধু ভেজে নিলেই হয়। আর একটা শুক্রবার বিকেলের চা তোমরা চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজেরা বানিয়ে খেতে পারো না?"
বাদলের হয়ে প্রিয়া চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দিল, "না মা, আসলে সবসময় তো আপু আর দুলাভাই আসলে আপনিই চা-নাস্তা বানিয়ে দেন। আজ আপনি ছিলেন না, তাই বাদল বলছিল..."
"প্রিয়া, আমি বাসায় থাকি তাই আমি খুশিমনে দেই।" জুঁই প্রিয়ার দিকে তাকালেন, "কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমি একদিন বাসায় না থাকলে তোমরা কেউ এক কাপ চা করে খাওয়ার যোগ্যতা রাখো না।"
"তুমি এতক্ষণ কই ছিলে আম্মু?" বিপাশা এবার জেরা করার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল।
"বিপাশা, তোমরা সবাই খুব ভালো করেই জানো আমি কোথায় ছিলাম। আর সেই অপরাধেই কি আজ তোমরা সবাই এক হয়ে এখানে আমার বিচার করতে বসেছ?" জুঁইয়ের কণ্ঠস্বর এবার আরও চড়ল।
মাহফুজ পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বলল, "না আম্মা, বিচার হবে কেন? তবে এই বয়সে একটা জিনিস মানানসই হওয়া ভালো। দিনকাল তো ভালো না, কে কেমন মানুষ বোঝা যায় না। আব্বুর মৃত্যুর পর আমাদেরই তো দায়িত্ব আপনার দেখাশোনা করার, তাই আমরা একটু গাইড করি আর কি। তাছাড়া ইদানীং আপনি ফেসবুকে আর ইন্টারনেটে বড্ড বেশি সময় দিচ্ছেন। এগুলো তো এই বয়সে ভালো দেখায় না।"
জুঁই মাহফুজের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে শীতল হাসলেন, "আমার তো তোমাদের এই গাইডের কোনো প্রয়োজন নেই বাবা। বিপাশা, তুমি নিজের সংসারটা সামলাও, সেটাই যথেষ্ট। আর আমি ইন্টারনেটে ততটুকুই সময় দেই, যতটুকু আমার জন্য দরকার ও শোভনীয়। তোমরা যে বলছ আমি সংসারে মন দিই না—তোমরা তো কেউ দুপুরে বাসায় থাকো না। সকাল থেকে শুরু করে দুপুরের পুরো রান্নাটা আমি ওই বুয়াটাকে নিয়ে নিজেই সামলাই। শুধু এই বাসার জন্য রান্না করি না বিপাশা, তোমার বাসার জন্যও প্রায়ই বক্সে করে খাবার পাঠিয়ে দিই, যাতে স্কুল থেকে ফিরে তোমাকে বাড়তি খাটতে না হয়।"
বিপাশা আমতা আমতা করে বলল, "আমিও তো এই জন্য এই বাসায় প্রায়ই বাজার করে আনি আম্মু, যাতে ভাইয়ার ওপর বাজারের চাপ না পড়ে..."
"আমি বাজারের টাকার কথা বলছি না বিপাশা।" জুঁই মেয়েকে থামিয়ে দিলেন, "আমি দুপুরের সব কাজ সামলাই, বাচ্চাদের দেখি। কিন্তু রাতের দায়িত্বটা কেন তোমরা নিজেরা সামলে নিতে পারো না? সেটাও কেন বুড়ো মায়ের ওপর ছেড়ে দিতে হবে? বিকেল থেকে শুরু করে বাচ্চার নাস্তা বানানো, ছুটির দিনে তোমাদের সংসারের যত বাড়তি কাজ—সব কেন ধীরে ধীরে আমার কাঁধে এসে চাপল? এই যে আজ একটা শুক্রবার বিকেল আমি বাসায় ছিলাম না বলে তোমাদের সবকিছু মাথায় উঠে গেল, আর তোমরাই নাকি আমার দেখাশোনা করো? হাস্যকর!"
ড্রয়িংরুমের পিনপতন নীরবতার মাঝে জুঁইয়ের কণ্ঠস্বর এবার আরও দীপ্ত হয়ে উঠল, "তোমরাই বলো যে তোমরা আমার দেখাশোনা করো। কিন্তু তোমরা যে রোজ দুটি ছোট বাচ্চা আর এই পুরো সংসার আমার ওপর ফেলে নিশ্চিন্তে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে চলে যাও, তখন কি একবারও তোমাদের মনে হয় না যে আম্মুর কোনো কষ্ট হচ্ছে কিনা? হাঁটুর ব্যথাটা বাড়ছে কিনা? না, মনে হয় না। বরং তোমরা এটাকে তোমাদের অধিকার ভেবে নিয়েছ। নিজের দুই নাতি-নাতনিকে আদর করতে বা দেখাশোনা করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তোমরা ছুটির দিন শুক্রবারের কয়েকটা ঘণ্টাও আমাকে নিজের মতো বাঁচতে দিতে চাও না! তোমরা ভুলে গেছ যে, তোমাদের ছেলেমেয়েকে বড় করার মূল দায়িত্বটা তোমাদের, আমার নয়। আমি বড়জোর সাহায্য করতে পারি। আর বিনিময়ে তোমরাও আমাকে সাহায্য করা উচিত ছিল।"
জুঁই এবার সোফায় হেলান দিয়ে চারজনের মুখের দিকে একে একে তাকালেন, "তোমরা পুরো সপ্তাহ চাকরি করো বলে ছুটির দিনে তোমাদের বিনোদন দরকার, তোমাদের রেস্ট দরকার। আর আমি যে পুরো সপ্তাহ এই চব্বিশ ঘণ্টার চাকর বাকরের মতো খাটুনি খাটি, আমার কি কোনো অবসরের দরকার নেই? একটা দিন এই বাসার রান্না, বাচ্চাদের মলমূত্র পরিষ্কার আর সংসারের ঘানি টানা থেকে আমারও ছুটি দরকার। আর সেই ছুটি যদি আমি "
তিনি বললেন, "প্রিয়া, আজ থেকে এই সংসারের দায়িত্ব তুমি বুঝে নাও। তোমাকে আমি টুকটাক সাহায্য করব, কিন্তু মূল কাজ তোমার। তোমরা সবাই অফিস থেকে ফেরার পর বাসার ছোটখাটো কাজগুলো নিজেরাই করে নিতে শেখো, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে thেকো না। আর বিপাশা, নিজের সংসারে মন দাও। আমি যদি এই বয়সে এসে একা দুই বাসার রান্নাবান্না তদারকি করতে পারি, তবে তুমি একা কেন নিজের বাসার কাজ করতে পারবে না? হ্যাঁ, যেটুকু সময় তোমরা বাইরে কাজে থাকবে, আমি অবশ্যই নাতি-নাতনিদের দেখে রাখব। কিন্তু বাকি সময় নিজেদের কাজ নিজেদেরই করতে হবে। তোমরা বাইরে গিয়ে টাকা আয় করো বলে শুধু তোমাদের কাজটাই কাজ, আর আমি বাসায় থাকি বলে আমার খাটুনির কোনো মূল্য নেই—এই মানসিকতা আজ থেকে ঝেড়ে ফেলো।"
রুমে যাওয়ার আগে জুঁই শেষবারের মতো ঘুরে তাকালেন, "আমার লেখালেখিকে তোমরা ন্যাকামি বা যে চোখেই দেখো না কেন, আমি আমার কাজ ছাড়ছি না। সামনের বইমেলায় আমার নিজের একক বই তো আসছেই, পাশাপাশি আরও কয়েকটি সংকলন বই নিয়ে আমি কাজ করছি। তাই আগামী দিনগুলোতে তোমাদের অফিস টাইমের বাইরে বাসার অন্য কোনো কাজের জন্য আমার ওপর নির্ভর করে থাকবে না। একটা কথা আজ পরিষ্কার মনে রেখো—তোমাদের জন্য আজ পর্যন্ত আমি যা কিছু করেছি বা করছি, তা আমার ভালোবাসা থেকে করেছি, আমার কোনো আইনি দায়িত্ব থেকে নয়। কিন্তু ভালোবাসা যখন অবহেলা হয়ে ফিরে আসে, তখন মানুষ নিজের সীমানা টেনে নিতে বাধ্য হয়।"
আর একটি মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে জেবুন্নেসা জুঁই নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেলেন। ওনার পায়ের প্রতিটি পদক্ষেপ আজ অত্যন্ত দৃঢ়, মেরুদণ্ড একদম সোজা। ড্রয়িংরুমের চারটে মানুষ তখনো পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তারা হয়তো আজ প্রথম বুঝতে পারল—যে মা এতদিন শুধু সয়ে গেছেন, তিনিও আসলে এক অনন্য অপরাজেয় নারী, যার একটি নিজস্ব আকাশ আছে।
সংগৃহীত