গর্ভধারিণী

মায়ের ত্যাগ আর সন্তানের শ্রদ্ধার এক অনন্য দলিল: "মায়ের আঁচল থেকে প্রফেসরের চেয়ার"

মোবাইলের দোকানে বেশ ভিড় ছিল সেদিন। কাঁচের কাউন্টারের ওপাশে দাঁড়ানো ছেলেটি একের পর এক দামী মোবাইল সেট বের করে দেখাচ্ছিল। তার চোখেমুখে একজন ভালো ক্রেতা পাওয়ার চকমকে ভাব। মায়ের হাত ধরে আমি দোকানে ঢুকেছিলাম। ছেলেটি একটি উনিশ হাজার আটশো টাকার স্মার্টফোন দেখিয়ে উৎসাহের সাথে বলল, "স্যার, এই সেটটা নিতে পারেন। দারুণ ফিচার্স, ক্যামেরা অসাধারণ, আর ইন্টারনাল মেমোরিও অনেক বেশি।"

আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "মা, এটা পছন্দ তোমার?"

আমার কথা শেষ হতেই দোকানের ছেলেটির মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। সে কিছুটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কার জন্য মোবাইল নেবেন?"

"আমার মায়ের জন্য," আমি সহজভাবে উত্তর দিলাম।

ছেলেটি যেন আকাশ থেকে পড়ল। একটু অপ্রস্তুত হয়ে লজ্জিত স্বরে বলল, "ও আচ্ছা! আগে তো বলবেন মায়ের জন্য। আমি ভাবলাম আপনি নিজে ইউজ করবেন। আমি ওই হাজার তিনেক টাকার মধ্যে একটা সেট দিয়ে দিচ্ছি। আসলে স্যার, অনেক কাস্টমার আসে তো, বয়স্ক মা-বাবার জন্য যখন মোবাইল নেন, সবাই সব থেকে কম দামীটাই বার করতে বলেন। সরি স্যার, কিছু মনে করবেন না।"

তার কথা শুনে আমার মনটা ভারী হয়ে উঠল। মায়ের হাতে যখন দামী মোবাইলটা কিনে দিলাম, তাঁর মুখের সেই চিলতে হাসি আর চোখের আনন্দ কোনো টাকা দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। অথচ, সমাজের ধারণা—বাবা-মাকে এত দামী জিনিস দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এমনকি আমার পাশের বাড়ির এক দাদাও একদিন টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন, "এত দামী মোবাইল মাকে দিয়েছিস, তোর মা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারবে তো? শুধু কথা বলার জন্য এত টাকা খরচ করার কী দরকার ছিল?"

সেদিন সেই দাদাকে আমি সোজা ভাষায় বলেছিলাম, "আমার মায়ের জন্য খরচ করাটা ফালতু খরচ হয় কী করে? মা ব্যবহার করতে পারবে না এ কথা কে বলল? একজন স্বল্পশিক্ষিত মা যদি একা হাতে তাঁর ছেলেকে প্রফেসরের চেয়ারে বসাতে পারেন, তবে তিনি সামান্য একটা মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন না?"

মায়ের অবদান ও কলেজ ক্যাম্পাসের জলছবি

আসলে, আমার জীবনে মায়ের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। বাবাকে আমি খুব ছোটবেলাতেই হারিয়েছি। মা একাই লড়ে গেছেন সমস্ত ঝড়-ঝাপটার বিরুদ্ধে। আমার মনে পড়ে, যেদিন আমি কলেজে প্রফেসর হিসেবে জয়েন করতে যাই, মাকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। বিশাল কলেজ ক্যাম্পাস দেখে মা চারদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে আমাকে বলেছিলেন, "এত বড় কলেজ! তুই এত বড় কলেজে পড়াবি বাবা? আমি তো ভাবতেই পারছি না!"

সেদিন কলেজের অনেকেই মাকে দেখে শ্রদ্ধাভরে বলেছিলেন, "স্যারের মা"। ওই দুটো শব্দ যখন মায়ের কানে পৌঁছাল, দেখলাম মায়ের চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছে। মা আড়াল করে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে নিলেন। আমি তাকাতেই একটু হেসে বললেন, "চোখে কী একটা পড়েছে রে, তাই জল এল।" মা সারাজীবন নিজেকে এভাবেই আড়াল করে গেছেন, নিজের কষ্ট বুঝতে দেননি। কলেজ থেকে বেরোনোর সময় বারবার পিছন ফিরে দেখছিলেন আর বিড়বিড় করে বলছিলেন, "আজ যদি তোর বাবা বেঁচে থাকত, তবে এই আনন্দটা ওঁর সাথে ভাগ করে নিতাম।"

মায়ের সেই কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটাও মুচড়ে উঠেছিল। আমার যত সার্টিফিকেট, যত মার্কশিট—তাতে আমার নাম লেখা থাকলেও, তার আসল প্রাপক তো আমার মা।

মায়ের ত্যাগের কথা ভাবলে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের সেই দিনটার কথা মনে পড়ে। আমার ছোট মামার বিয়ে ছিল। বাড়ি শুদ্ধু সবাই আনন্দে মেতে উঠেছিল। আমি যাতে মন দিয়ে পড়তে পারি, তাই মা বারবার বলা সত্ত্বেও সেই বিয়েতে যাননি। নিজের ভাইয়ের বিয়ে, অথচ ছেলের ভবিষ্যতের জন্য নিজের আনন্দটাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন হাসিমুখে।

শিক্ষার প্রসার ও সম্মান

চাকরি পাওয়ার পর প্রথম দুর্গাপুজোয় যখন মাকে কুড়ি হাজার টাকা দিয়ে বলেছিলাম, "তোমার যা পছন্দ কিনে নাও," মা তখন বলেছিলেন, "শোন বাবা, একটা শূন্য কেটে যেটা হবে (অর্থাৎ দু'হাজার টাকা) ওটাই আমাকে দিস। আর বাকি টাকাটা দিয়ে আশেপাশের গরীব মানুষদের জন্য পুজোয় কিছু কিনে দে। কুড়ি হাজার টাকার শাড়ি আলমারিতেই বন্দি থাকবে, তার চেয়ে ওই টাকায় গরীব মানুষগুলো পুজোয় আনন্দ পাক।" মায়ের থেকে পাওয়া এই শিক্ষার কারণেই আজ পাঁচ বছর ধরে প্রতি পুজোয় আমরা দুজনে মিলে দুঃস্থ মানুষদের পাশেড়াই।

আজ আমার মা শুধু স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না; ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব—সবকিছুতেই তিনি পারদর্শী। আমি মাকে বাড়ির কম্পিউটারেও বসিয়েছি। মা ছয় মাসের একটা বেসিক কম্পিউটার কোর্স করে এখন নিজেই কম্পিউটার চালাতে পারেন, এমনকি শরীর চর্চার জন্য জিমেও যান।

বাবা-মা আমাদের জন্য সারাজীবন যা করেন, তার ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারব না। কিন্তু আমাদের সদিচ্ছা থাকলে, তাঁদের জীবনের শেষবেলাটুকু আমরা আনন্দে আর সম্মানে ভরিয়ে দিতেই পারি। মায়েদের শুধু একটু সময় আর সুযোগ দেওয়ার অপেক্ষা, বাকিটা ইতিহাস।

"মায়েদের শুধু একটু সময় আর সুযোগ দেওয়ার অপেক্ষা, বাকিটা ইতিহাস।"

সংগৃহীত