ফিরে আসার ঠিকানা

"যে হাত একদিন হাঁটতে শিখিয়েছিল, সে হাত কি বৃদ্ধ বয়সে ভারী হয়ে যায়? মা-বাবার ভালোবাসা কখনো বয়সের সমীকরণে বাঁধা পড়ে না..." 👵❤️


বৃদ্ধাশ্রমের লোহার ভারী গেটটার সামনে এসে গাড়িটা থামল। বিকালের রোদ তখন আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে আসছে।

রাহুল গাড়ি থেকে নেমে পেছনের দরজাটা খুলে দিল। ভেতর থেকে ধীর পায়ে নেমে এলেন সুচরিতা দেবী। বয়সের ভারে শরীর কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে, চুলে সাদার প্রাচুর্য, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত নীরবতা। হাতে ধরা একটা পুরোনো চামড়ার ব্যাগ, যার ভেতর তাঁর সারাজীবনের সম্বল—কয়েকটা শাড়ি, কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ আর একটা ধুলো জমা ছবির অ্যালবাম।

রাহুল মায়ের হাত ধরে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। আশ্রমের কেয়ারটেকার হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এলেন। পরিবেশটা বেশ শান্ত, প্রবীণ মানুষদের আনাগোনা চারপাশে।

রাহুল কিছুটা ইতস্তত করে মায়ের দিকে তাকিয়ে অপরাধীর সুরে বলল,

"এখানে তোমার ভালো লাগবে মা, সবাই তোমার বয়সী!"

কথাটা শুনে সুচরিতা দেবী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক হালকা, বিষাদময় মৃদু হাসি। পরম মমতায় ছেলের মাথায় হাত রেখে সুচরিতা দেবী বললেন—

"তোর বয়স যখন মাত্র একবছর ছিল খোকা, আমি কিন্তু তখন তোর সমবয়সী খুঁজতে যাইনি..."

কথাটা যেন একঝটকায় কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো রাহুলের বুকে এসে বিঁধল। তার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেল।

Ref: সুচরিতা দেবীর চোখের সামনে ভেসে উঠল ছাব্বিশ বছর আগের সেই দিনগুলোর কথা। রাহুলের বাবা যখন হঠাৎ মারা গেলেন, তখন রাহুল মাত্র এক বছরের শিশু। আত্মীয়স্বজন, সমাজ—সবাই বলেছিল আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে। কিন্তু সুচরিতা দেবী রাজি হননি। তাঁর সমস্ত পৃথিবীটা আটকে গিয়েছিল ওইটুকু একটা শিশুর হাসিমুখের মাঝে।

এক বছরের শিশু যখন আধো আধো বোলে মা বলে ডাকত, তখন কি সুচরিতা দেবী তার সাথে কথা বলার জন্য কোনো সমবয়সী খুঁজেছিলেন? না। তিনি নিজেই শিশু হয়ে গিয়েছিলেন। রাহুলের খেলায় সঙ্গী হয়েছেন, রাতে ঘুম পাড়ানি গান গেয়েছেন, তার ছোট্ট ছোট্ট কান্না আর হাসির ভাষা একাই বুঝেছেন। নিজের যৌবন, নিজের শখ, নিজের আরাম—সবকিছুর বিনিময়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন রাহুলের ভবিষ্যৎ।

আজ সেই রাহুল মস্ত বড় অফিসার। সুন্দর সংসার, ব্যস্ত জীবন। কিন্তু সেই জীবনে এত বড় বাড়ি থাকা সত্ত্বেও বৃদ্ধা মায়ের এক চিলতে জায়গা হলো না। 'সময় দিতে পারি না', 'মা একা একা বোর হয়'—এমন হাজারো অজুহাতে আজ তাকে নামিয়ে দিয়ে যাওয়া হচ্ছে এক অজানা ঠিকানায়।

সুচরিতা দেবী ধীরে ধীরে আশ্রমের কেয়ারটেকারের সাথে ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগলেন। একবারও পিছন ফিরে তাকালেন না, পাছে ছেলের চোখে নিজের জলটুকু ধরা পড়ে যায়।

গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল রাহুল। মায়ের ওই শেষ কথাটি—"আমি কিন্তু তখন তোর সমবয়সী খুঁজতে যাইনি..."—তার কানের কাছে বার বার প্রতিধ্বনি হতে লাগল। তার মনে হলো, যে মা সারাজীবন তার জন্য নিজের বয়স, নিজের ইচ্ছেকে বিসর্জন দিলেন, আজ সেই মাকে সে বয়সের বাহানায় দূরে ঠেলে দিল?

রাহুলের বুকের ভেতরটা এক অজানা অপরাধবোধে দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে, সে দৌড়ে আশ্রমে ঢুকল। মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে কেঁদে ফেলে বলল,

"ভুল হয়ে গেছে মা... আমায় ক্ষমা করে দাও। চল, বাড়ি চল।"

সুচরিতা দেবী পরম মমতায় ছেলের চোখের জল মুছে দিলেন। মায়েরা বোধহয় এমনই হয়, সন্তানের হাজার ভুলও এক নিমিষে ক্ষমা করে দিতে পারে। গেটের বাইরের সাঁঝের আলোয় মা আর ছেলে আবার একসঙ্গে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো—এবারের গন্তব্য কোনো বৃদ্ধাশ্রম নয়, নিজের ভালোবাসার ঘর।


সংগৃহীত