জানালার ওপারে ছায়ামূর্তি

একজন নারীর শরীরের ওপর থেকে একজন পুরুষ নেমে গেল। পুরুষটা যে সন্তুষ্ট সেটা তার মুখ দেখেই নারীটি তা উপলব্ধি করতে পারছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরুষটি ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। শোওয়া অবস্থাতেই নারীটি এপাশ থেকে ওপাশে ঘুরল। হঠাৎ তার চোখ গেল জানালার দিকে। কাঁচের জানালার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে বলে তার মনে হল। অবয়বটা কোনো এক নারীর। সাথে সাথেই শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। কেননা, দোতলার ওপরে জানালার বাইরে কোনো মানুষের দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। তাহলে কে দাঁড়িয়ে আছে?

মনে মনে কথাগুলো ভেবে গায়ের শাড়িটি ঠিক করে নিয়ে, জানালার কাছে এগিয়ে গেল। যতই জানালার কাছে এগিয়ে যাচ্ছে, ততই কপাল জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘামগুলো জমছে। নিস্তব্ধ পরিবেশে নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দও যেন সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। জানালার সামনে যেতেই সে থমকে দাঁড়াল। জানালার বাইরে এখনও সেই অবয়বটা দৃশ্যমান। মনে মনে ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে জানালার দিকে হাত বাড়াল। কাঁপা কাঁপা হাতে জানালার কাঁচ যেই খুলতে যাবে ওমনি ভেসে আসল ঝংকারের শব্দ। মনে হল, কেউ খুব কাছ দিয়ে নুপুর পরে দৌড়ে গেল। নারীটি পেছনে ঘুরতেই দেখে...

সকালবেলা,

"অভিজা, এই অভিজা, তোমার কী হয়েছে? এভাবে নিচে কেন ঘুমাচ্ছো তুমি? অফিসে যেতে হবে তো। এই অভিজা ওঠো।"

অনিমেষের ডাকে অভিজার ঘুম ভাঙলো। চোখ খুলতেই দেখে, সে নিচে শুয়ে আছে। উঠে বসতে নেবে, কিন্তু কোমরটা ধরে গেছে। মনে হয়, সারারাত মেঝেতে শোওয়ার জন্য। মাথাটাও হালকা ব্যথা করছে। হয়তো সর্দিও লাগতে পারে। অনিমেষের দিকে হাত বাড়িয়ে অভিজা বলল, "আমাকে একটু ধরে ওঠাও না! কোমরটা খুব ব্যথা করছে।"

অনিমেষ অভিজার হাত ধরে তুলল। তারপর বিছানায় বসিয়ে দিয়ে আবারও একই প্রশ্ন করল। অভিজা নিচে কেন শুয়েছে? অভিজা গতকাল রাতের ঘটনা মনে করার চেষ্টা করল। গতকাল রাতে ও জানালার পাশে গিয়েছিল। তারপর নুপুরের ঝংকার কানে আসতেই ও পেছনে ঘোরে। তারপর ঠিক কী ঘটেছে, ওর কিছু মনে নেই। কিন্তু অনিমেষকে এসব কথা বললে বিশ্বাস করবে না। আসলে বিজ্ঞানের যুগে ভূত প্রেতে কেউ খুব একটা বিশ্বাস করে না। তাই অভিজা উত্তর দিল, "প্রচণ্ড গরম লাগছিল কালকে। তাই আমি অল্প সময়ের জন্য নিচে শুয়েছিলাম। কিন্তু কখন যে সকাল হয়ে গেছে, আমি তা টেরই পাই নি।"

অনিমেষ অভিজার কথা কতটুকু বিশ্বাস করল, সেটা সে নিজেই জানে। অভিজার কথা শেষ হতেই সে বলল, "ঠিক আছে। তুমি তাহলে আজ বিশ্রাম নাও। আজকে তোমার অফিসের যাওয়ার দরকার নেই। মায়ের কাছে ব্যথার স্প্রে আছে। আর যদি মেডিসিনের প্রয়োজন পড়ে, তাহলে অখিলকে বলো। ও এনে দেবে। আমি ওকে যাওয়ার সময় বলে রাখব। আমি এখন নিচে গিয়ে কাজের মাসিকেও বলে দিচ্ছি জল গরম করতে। মায়ের ঘর থেকে ব্যথার মলম আর হট ব্যাগ নিয়ে আসছি। হট ব্যাগের সেক নিলে বেশ আরাম লাগবে তোমার।"

অভিজা মুচকি হাসল। আজ দশ দিন হয়েছে, সে এই বাড়িতে বৌ হয়ে এসেছে। ভালোবেসেই দুজন দুজনকে বিয়ে করেছে। সারা জীবন একসাথে থাকবে বলে। অনিমেষের এই জিনিসগুলোই অভিজার ভালো লাগে। খুব যত্নবান ও। আর ঠিক এই কারণেই ওকে ভালোবেসেছিল। প্রত্যেক নারী তো এমন স্বামীই চায়। যে কিনা খুব যত্নবান হবে। অনিমেষ সবসময় খেয়াল রাখে, অভিজার কখন কী লাগবে না লাগবে। অভিজার কপালে চুম্বন দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। অভিজা একটু ভালো করে শোয়।

গতকাল রাতের ঘটনাটা আবার মনে করতে থাকে। তারপর ঠিক কী ঘটেছে? মস্তিষ্কে একটু জোর দিতেই ওর হালকা হালকা মনে পড়ে যায়। গতকাল রাতে ও যখন পেছন ঘুরল, তখন দেখে, একটা নারীর ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। নারীর পুরো দেহ ছায়ার মতো দেখা গেলেও পায়ের ঘুঙুরটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছিল। প্রথমে ও শব্দ শুনে বুঝেছিল, ওটা নুপুরের ঝংকার। কিন্তু পরে লক্ষ্য করল, ওটা ঘুঙুর। সেই কারণেই শব্দের গাঢ়ত্বটা একটু বেশি ছিল। অভিজা দেখল, নারীটি একটু একটু করে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। এক মুহূর্তের জন্য অভিজা শ্বাস নিতে ভুলে যায়। ভয়ে সে সাথে সাথেই চোখ বন্ধ করে ফেলে। চোখ খুলতেই দেখে,,,,

"অভিজা, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?" -অনিমেষের ডাক কানে আসতেই অভিজার চিন্তা ভগ্ন হয়। অনিমেষ হাতে হট ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাগটা পাশে রেখে অভিজাকে উপুড় করে শুইয়ে দেয়। তারপর কোমরের ঠিক যেখানে অভিজার ব্যথা শেখানে বাম লাগিয়ে মালিশ করে দেয়। যেহেতু শাড়ি পরা ছিল তাই অনিমেষের কোনো অসুবিধা হল না, অভিজার কোমরে মালিশ করতে। অনিমেষ বেশ ভালো ভাবে মালিশ করে দিচ্ছে। অভিজাও আরাম পেয়ে চুপ করে আছে। তারপর অভিজাকে বসিয়ে দেয়। ওর পেছনে বালিশ দিয়ে দেয় হেলান দেওয়ার জন্য। তারপর হট ব্যাগটা রেখে অভিজাকে হেলান দিয়ে বসিয়ে দেয়। আরামে অভিজার দুচোখ বন্ধ হয়ে আসে। কিছুটা বাম নিয়ে অভিজার নাকের ওপরে ও কপালে লাগিয়ে দেয়。

অভিজা চোখ বন্ধ অবস্থাতেই দরজার শব্দ পেল। তার মানে অনিমেষ স্নানে ঢুকেছে। ভাগ্যিস সরকারি অফিসে চাকরি করে। তাই সাড়ে দশটার দিকে গেলেও কোনো ব্যাপার না। নিজের ভাবনার জগতে অভিজা আবারও হারিয়ে যায়। গতকাল রাতে যখন সে চোখ খুলেছিল, তখন ছায়া মূর্তিটিকে আর সামনে দেখে না। সামনে আর নারীর অবয়বটি ছিল না দেখে বেশ অবাক হয়েছিল অভিজা। তবে কী সে ভুল দেখেছিল?

কথাটা মনে হতেই সে জানালার দিকে ফিরে তাকায়। বাইরেও এখন আর কোনো অবয়ব দেখা যাচ্ছে না। কাঁচটা এখন পরিষ্কার লাগছে। তাহলে কী সত্যিই কেউ ছিল? সত্যিটা জানার জন্য মনটা ব্যাকুলও হয়ে উঠেছে, সেই সাথে ভয়ও লাগছে। জানালার কাঁচটা এবার সাহস করে খুলেই ফেলল। সত্যি কেউ নেই এখন। তার মানে তখন কেউ ছিলোই। কথাটা ভেবে দ্রুত জানালাটা আটকাতে যাবে, কিন্তু আটকাতে পারে না। জানালাটা জাম হয়ে আছে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে অভিজার গায়ে লাগে। চোখে ধুলোকণা ঢুকতে পারে দেখে চোখটা বন্ধ করে নেয়। অভিজার হঠাৎ মনে হল, ওর কানে কানে কেউ বলছে, "তুই বাঁচবি না। তুই মরবি।"

কোনো এক নারী কন্ঠ শুনে অভিজা তাড়াতাড়ি করে চোখ খোলে, কিন্তু আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে না দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে যায়। দরজাও তো বন্ধ তাহলে ওকে কথাগুলো বলল কে? ভয়টা সে এতোই পেয়ে যায় যে, সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়।

অনিমেষ অফিস থেকে ফিরে এসে দেখে অভিজা এখনও একইভাবে শুয়ে আছে। যেরকম সে যাওয়ার সময় দেখেছিল। বাড়ির সকলে বলল, অভিজা নাকি ঘর থেকেই বের হয় নি। খাওয়ার জন্য কয়েকবার ডাকতে এসেছিল। কিন্তু ঘুমিয়ে আছে দেখে ওরা ফিরে যায়। অনিমেষ অভিজার কপালে হাত রেখে দেখল, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। অনিমেষের বুঝতে বাকি নেই, অভিজা জ্বরের দাপটে নিজের জ্ঞান হারিয়েছে। চিৎকার করে মা'কে ডাকতে লাগল, "মা, ও মা, অভিজার জ্বর এসেছে। আর তোমরা ওর একবারও খেয়াল রাখলে না? ওর তো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। হুঁশটাও নেই ওর।"

অনিমেষের চিৎকারে মা বিন্দু দেবী, বাবা অমিতাভ বাবু, ভাই অখিলেশ এবং বোন অনুজা ছুটে আসল। অভিজার এমন অবস্থা দেখে সকলের চোখে মুখেই চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। বিন্দু দেবী অভিজার কপালে হাত দিয়ে বললেন, "আমি তো কিছুক্ষণ আগেও এসে ওকে দেখে গিয়েছিলাম। তখন তো ওর এমন অবস্থা ছিল না। ওর কপাল তো সাংগাতিক রকমের গরম হয়ে আছে। যেন এক্ষুনি ফেটে যাবে। দুপুরেও ও কথা বলেছে আমাদের সাথে। শুধু শরীরটা খারাপ দেখে খাবারটা খায় নি। আমার ভীষণ ভয় লাগছে বড়ো খোকা। বৌমার আবার কিছু হবে না তো?"

স্মৃতিপর্ণা দেবনাথ