দুই হাত
আত্রেয়ী চন্দ্র
"পৃথিবীর সব অর্জনের চেয়েও মূল্যবান হলো সেই দুটো হাত, যে হাত আপনার জন্য প্রার্থনা করে, অপেক্ষা করে আর নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে।" 💖
কর্মব্যস্ত জীবনের ইঁদুরদৌড়ে আমরা অনেক সময়ই হারিয়ে ফেলি আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়কে। মায়ের বারংবার ফোন, সেই চেনা খোঁজখবর নেওয়া—যা একদিন বিরক্তির কারণ মনে হতো, সময়ের স্রোতে সেটাই যে জীবনের সবচেয়ে বড় পরম প্রাপ্তি, তা বুঝতে বুঝতে হয়তো অনেকটা দেরি হয়ে যায়। আত্রেয়ী চন্দ্রের কলমে 'টুবাই' আর তার মায়ের এই আবেগঘন গল্পটি আজ আমাদের সবার চোখ খুলে দেওয়ার মতো। গল্পটি পড়ুন এবং শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন ভালোবাসার এই অমোঘ বার্তা।
টুবাইয়ের ফোনটা আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—"মা কলিং..."
অফিসে মিটিংয়ের মাঝখানে প্রায়ই এমন হয়। টুবাই চরম বিরক্ত হয়ে ফোনটা সাইলেন্ট করে দিল। মা দিনে তিন-চারবার ফোন করেন। কখনো জানতে চান খাওয়া হয়েছে কিনা, কখনো জিজ্ঞেস করেন বাড়ি ফিরতে দেরি হবে কিনা, কখনো বা বলেন ছাতা নিয়েছিস তো? এত প্রশ্ন, এত ফোন—টুবাইয়ের কাছে ইদানীং এই ব্যাপারগুলো বড্ড অসহ্য লাগত। বন্ধুদের কাছে সে প্রায়ই ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলত, "এই বয়সেও কেউ এত চিন্তা করে নাকি?"
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা যেন আরও বেশি 'টুবাই টুবাই' শুরু করেছিলেন। মা প্রতিদিন সকালে টিফিনের বাক্স হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতেন, আর টুবাই রেগে বলত, "মা, অফিসে ক্যান্টিন আছে, এত ঝামেলা কোরো না।" কিন্তু পরদিন সকালে আবার সেই একই টিফিন বাক্স হাতে মায়ের চেনা মুখটা দেখা যেত। টুবাই বুঝত মায়ের একাকীত্ব, কিন্তু তবুও নিজের ব্যস্ততার মাঝে তার চরম বিরক্তি হতো।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরেই টুবাই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বসেই বলে ফেলল, "মা, প্লিজ! আমাকে একটু নিজের মতো থাকতে দাও। এত ফোন করো কেন? আমি ছোট বাচ্চা তো নই! নিজেরটা বোঝার ক্ষমতা আছে আমার।"
কথাগুলো শুনে মা কিছুক্ষণ একদম চুপ করে রইলেন। তাঁর চোখের কোণটা হয়তো একটু ভিজে উঠেছিল। তারপর শুধু শান্ত গলায় বললেন, "ঠিক আছে বাবা। আর বিরক্ত করব না।"
সেদিনের পর সত্যি সত্যিই সবকিছু বদলে গেল। মা আর ফোন করতেন না। সকালে অ্যালার্ম বাজার আগে ডেকে দিতেন না, অফিসে পৌঁছাল কিনা জানতে চাইতেন না, রাতে দেরি হলে দরজার দিকে তাকিয়ে আর অপেক্ষাও করে বসে থাকতেন না।
প্রথম প্রথম কদিন টুবাইয়ের খুব স্বস্তি লাগল। মনে হলো, অবশেষে একটা স্বাধীনতা এলো! সারাক্ষণ টিকটিক করার মতো কেউ নেই, কাজের মাঝে কেউ ডিস্টার্ব করার নেই। কিন্তু মাত্র কয়েকটা দিন যেতে না যেতেই একটা অদ্ভুত, নিরেট শূন্যতা তাকে গ্রাস করতে লাগল।
সকালে ঘুম ভাঙলে সামনে মা থাকেন না। "উঠেছিস? উঠলি? দেরি হয়ে যাবে অফিসের।"—এই চেনা তাগাদাগুলো আর আসে না। অনেক সময় অ্যালার্ম বেজে বন্ধ হয়ে যায়, আর পাঁচ মিনিট ঘুমোনোর চক্করে অফিসের দেরি হয়ে যায়। মা দলা করে ভাত মুখে তুলে দেন না। প্রায়ই খালি পেটে অফিসে যায় টুবাই, মা আর রাগও করেন না।
দুপুরে অফিসে কাজের ফাঁকে ফোন আসে না—"খেয়েছিস? আগে খেয়ে নে, শরীর সুস্থ থাকলে তবেই তো কাজে মন বসবে!" নাহ্, কেউ বলে না। রাতে বাড়ি ফিরলে কেউ আর দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে না, "এত দেরি কেন? বাবু, এত রাত করিস না, আমার চিন্তা হয়।"
হঠাৎ করেই টুবাই বুঝতে পারল, যে প্রশ্নগুলোকে সে এতদিন 'বিরক্তি' ভাবত, সেগুলো আসলে ভালোবাসারই অন্য নাম। একটা অভ্যাস, যা না থাকলে চারপাশটা কেমন ফাঁকা আর নিঃস্ব লাগে।
একদিন অফিসে কাজ করতে করতে হঠাৎ মনে হলো, অনেকদিন মা ফোন করেননি। 'আমিই না হয় করে দেখি' ভেবে টুবাই মায়ের নম্বরে ডায়াল করল। কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে এল—ফোন বন্ধ। আবার করল, তাও বন্ধ।
উদ্বিগ্ন হয়ে সে দ্রুত office থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরল। দেখল, পাশের বাড়ির কাকিমা বাড়ির সামনে বসে আছেন, তাঁর চোখে জল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, "তোর মা দুপুরে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।"
টুবাই চমকে উঠে বলল, "আমাকে কেউ জানায়নি কেন?"
কাকিমা উত্তর দিলেন, "তোর মা-ই তো মানা করল! বলল, কিছু না, গ্যাসের জন্য হয়ত। এখন ওকে ডিস্টার্ব কোরো না, ব্যস্ত আছে হয়ত। আমার কিছু হয়েছে শুনলে অস্থির হয়ে দৌড়ে আসবে। ডাক্তার সেরকম কিছু বললে, তখন না হয় ডেকো।"
টুবাইয়ের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। হাসপাতালে পৌঁছে দেখল, মা বেডে শুয়ে আছেন, মুখটা ফ্যাকাসে। মাকে এতটা দুর্বল আর অসহায় সে আগে কখনো দেখেনি। চোখ খুলেই ছেলেকে সামনে দেখে মা দুর্বল গলায় বললেন, "তোকে কে খবর দিল? আমি একদম ঠিক আছি। খেয়েছিস তো??"
টুবাই আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল তার। যে মানুষটাকে সে একদিন বলেছিল "বিরক্ত কোরো না", সেই মানুষটাই আজ নিজের চরম অসুস্থতার মাঝেও তার খাওয়ার চিন্তা করছে! সেদিন হাসপাতালের করিডোরে বসে টুবাই একটা খাঁটি সত্য বুঝতে পেরেছিল।
পৃথিবীতে অনেক মানুষ আপনার সাফল্যে হাততালি দেবে। অনেক মানুষ আপনার টাকাপয়সা, গাড়ি, বাড়ি দেখে পাশে আসবে। কিন্তু খুব কম মানুষ আছে যারা সত্যি সত্যি জানতে চায়—"আজ তুমি খেয়েছো তো?", "ওষুধটা নিয়েছো?", "ভালো আছো তো?" কারণ এই প্রশ্নগুলোর পেছনে কোনো স্বার্থ থাকে না, থাকে শুধু নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
কয়েক দিন পর মা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। এখন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে টুবাই নিজেই মায়ের ঘরে উঁকি মারে। বলে, "মা, আমি বেরোলাম।"
মা বলেন, "ছাতাটা নিয়েছিস তো? আজ কিন্তু বৃষ্টি হতে পারে।"
আগে এই কথায় বিরক্ত হতো টুবাই, এখন হেসে উত্তর দেয়, "হ্যাঁ মা, নিয়েছি।"
দুপুরে মায়ের ফোন আসে—"খেয়েছিস?" টুবাই মিটিংয়ের মাঝেও এখন আর ফোন কাটে না। শুধু মৃদুস্বরে বলে, "খাচ্ছি মা। তুমি ওষুধ খেয়েছ তো?" ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা থাকে। মা হয়তো বুঝতে পারেন না, কখন তাঁর ছোট্ট ছেলেটা এত বড় হয়ে গেল। আর টুবাইও বুঝতে পারে না, কখন সে আবার মায়ের সেই ছোট্ট ছেলেটা হয়ে গেছে।
একদিন ছুটির বিকেলে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে টুবাই মাকে জিজ্ঞেস করল, "তুমি রাগ করেছিলে মা? আমি তো দুষ্টু ছেলে, তা সব সময় বলো। তুমিও কিন্তু কম দুষ্টু নও। এতদিন ইচ্ছে করেই চুপ করে ছিলে তাই না! আচ্ছা, তোমার পেট ফেটে যেত না... মানে খাবার হজম হতো আমার পেছনে চিৎকার না করে, আমি খেয়েছি কিনা জিজ্ঞেস না করে?"
মা হেসে ছেলের মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে ওলটপালট করে দিয়ে বললেন, "দুষ্টু ছেলে! তোর যখন সন্তান হবে তখন বুঝবি, মা-বাবাদের জীবনে চিন্তার একটাই জায়গা থাকে—তাদের সন্তান। বারবার ফোন করে রোজ এক কথা বলে কি শুধু খেয়েছিস জানতে চাই? গলাটা শুনে বুঝতে চাই, তুই ঠিক আছিস তো!!"
টুবাই চুপ করে মায়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। হাত দুটো কেমন যেন শুকিয়ে গেছে, শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। সময়ের ছাপ পড়েছে স্পষ্ট।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, এই হাতই তাকে ধরে প্রথম হাঁটতে শিখিয়েছিল। এই হাতই জ্বরের রাতে সারারাত কপালে জলপট্টি দিয়েছিল। এই হাতই পরীক্ষার আগে মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিল। এই হাতই প্রতিদিন ঈশ্বরের কাছে তার ভালো থাকার প্রার্থনা করেছে।
সে ধীরে ধীরে মায়ের হাতের ওপর মাথা রাখল। মা অবাক হয়ে বললেন, "কী হলো রে?"
টুবাই মৃদু হেসে বলল, "কিছু না। শুধু ভাবছিলাম, পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা কোথায়। মা, তুমি প্রতিদিন জিজ্ঞেস করবে। বারবার জিজ্ঞেস করবে। আমি আর কোনোদিন বিরক্ত হব না।"
মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আর টুবাই বুঝল, মানুষ যত বড়ই হোক, যত সফলই হোক, পৃথিবীর সব অর্জনের চেয়েও মূল্যবান হলো সেই দুটো হাত, যে হাত তার জন্য প্রার্থনা করে, অপেক্ষা করে, উদ্বিগ্ন হয়, আর নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে। কারণ টাকা হারালে টাকা ফিরে পাওয়া যায়, সময় হারালে কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু যে দুটো হাত প্রতিদিন আপনার জন্য ঈশ্বরের কাছে মাথা নত করে, যে দুটো চোখ আপনার ফেরার অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারা যতক্ষণ আপনার কাছে আছে, সেই হাতদুটো সব সময় আপনার মাথার ওপর আছে।
সেই দুটো হাত একবার সরে গেলে, পৃথিবীর কোনো সম্পদ দিয়েই তাদের আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যায় না।
সংগৃহীত