ছোট্ট ঘরেই লুকিয়ে থাকে জীবনের আসল সুখ

দুই কামরার ছোট্ট, ছিমছাম ফ্ল্যাট। এই সংসারে বিলাসিতা বলতে বসার ঘরে রাখা একটা বড় স্ক্রিনের টেলিভিশন। পর্দায় তখন চলছে ‘টম অ্যান্ড জেরি’। আট বছর বয়সী মৌ পরম মনোযোগ দিয়ে কার্টুন দেখায় মগ্ন।

সুতপা আজ অনেকদিন পর এসেছে। নিউ মার্কেট চষে মেয়ের জন্য কত কী যে কিনে এনেছে সে—রঙবেরঙের হালফ্যাশনের জামা, ঘড়ি, আধুনিক খেলনা। প্যাকেট থেকে একটা একটা করে জিনিস বের করে সে মৌকে ডাকছে, "দেখ তো মৌ, তোর জন্য কী এনেছি!"

মৌ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে উদাসীন চোখে জিনিসগুলো দেখল, তারপর আবার টিভিতে চোখ ফিরিয়ে নিল। নির্বিকার গলায় বলল, "আমার তো অনেক খেলনা আছে।"

সুতপার সাজানো মুখটা এক নিমেষে মলিন হয়ে গেল। পাশেই অর্পিতা তার ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে দোল খাওয়াচ্ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে মৌকে বুঝিয়ে বলল, "এইভাবে কথা বলে না সোনা। মাম্মাম এত কষ্ট করে এনেছে, একবার ভালো করে দেখ জিনিসগুলো!" "দেখলাম তো! ভালোই," মৌয়ের গলায় কোনো হেলদোল নেই।

সুতপা আহত গলায় বলল, "তা বলে একটু হাত দিয়ে দেখবিও না?" মৌ এবার ঠোঁট ফুলিয়ে মায়ের দিকে তাকাল, "মা, তুমিই তো বলো—যেটা দরকার নেই, সেটা নিতে নেই। আমার এসবের কোনো দরকার নেই।"

মেয়ের মুখের এই স্পষ্ট জবাবে সুতপার বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠল। অবহেলা আর দূরত্বের এই দেওয়াল সে ভাঙবে কী করে? অর্পিতা এবার মৌয়ের কাছে এসে বসল, "আচ্ছা, টিভিটা এবার একটু অফ কর তো সোনা!" "না মা, এরপর আর তুমি আমাকে টিভি দেখতে দেবে না," টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই মৌ প্রতিবাদ করল, "তুমিই তো নিয়ম করেছ—পাঁচটা থেকে ছটা, সারাদিনে এই একবারই টিভি দেখার টাইম। এরপর এক মিনিটও তুমি অ্যালাউ করবে না। একটু পরেই তো পড়তে বসতে বলবে!" অর্পিতা হেসে বলল, "সে তো রোজকারের নিয়ম। আজ মাম্মাম এসেছে, আজ ওর সাথে একটু গল্প কর, কাল আবার দেখিস।"

অনিচ্ছা সত্ত্বেও মৌ রিমোট টিপে টিভিটা বন্ধ করল। সুতপার দিকে তাকিয়ে বলল, "তোমাকে তো বলেছি, আমার চাই না এসব জিনিস। আমার অনেক জামা, ঘড়ি, খেলনা আছে। বাবি কিনে দিয়েছে।"

মেয়ের মুখে 'বাবি কিনে দিয়েছে' শুনে সুতপার মনের ভেতর এক তীব্র জ্বালা ধরে গেল। সুতপা খুব ভালো করেই জানে, আবীরের ওই সামান্য বেতনের চাকরিতে এত দামি খেলনা বা ফ্যাশনেবল জামাকাপড় কিনে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা যদি থাকত, তবে এই ফ্ল্যাটের অর্ধেক মালিকানা আজ অন্য কারও হতো না। তাই সুতপা চেয়েছিল নিজের টাকায় মেয়েকে প্রাচুর্য দিতে, কিন্তু মেয়েটা তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না!

সুতপা চোখ ঘুরিয়ে ঘরটা দেখতে লাগল। মনে মনে ভাবল—‘এসবই অর্পিতার চাল। ও-ই মেয়েটাকে এসব শিখিয়েছে। নিজেকে কী মনে করে কে জানে! এই দুই বছরে সবকিছু কেমন বদলে ফেলেছে। শোবার ঘরের পুরোনো খাটটা বদলে নতুন খাট আর এই টিভি—নতুন বলতে তো এই দুটো জিনিসই কেনার ক্ষমতা হয়েছে আবীরের! বাকি সব তো একই আছে।’

কিন্তু আসবাব একই থাকলেও, ঘরের পরিবেশটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। আসবাবের ওপরের ঢাকনা, কুশন কভার, ফুলদানির তাজা ফুল, পর্দার কাপড়—সবকিছুতেই এখন অর্পিতার সুরুচিপূর্ণ পছন্দের ছোঁয়া। এমনকি মৌয়ের চেহারাটাও কেমন বদলে গেছে। আগে সবাই বলত মেয়ে নাকি হুবহু মায়ের মতো দেখতে হয়েছে, আর এখন মৌকে দেখলে শুধু আবীরের প্রতিচ্ছবি মনে হয়。

নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার একটা মরিয়া চেষ্টা করল সুতপা। হাত বাড়িয়ে বলল, "আয় মৌ, তোর চুলটা একটু বেঁধে দিই।" মৌ মাথা নাড়ল, "না, রাতে মা বেঁধে দেবে।" "কেন? আমি কি পারব না?" সুতপার গলার স্বরে এবার কিছুটা ক্ষোভ। মৌ অবাক হয়ে তাকাল, "পারবে না কেন? পারবে তো। কিন্তু মা রোজ বেঁধে দেয়, ওর হাতের বাঁধনই আমার ভালো লাগে।"

সুতপা জোর করে একটা শুষ্ক হাসি হাসল। মনে মনে রি রি করে উঠল তার—‘মা... মা... মা! এমনভাবে বলছে যেন অর্পিতাই ওকে পেটে ধরেছে!’

ইতিমধ্যে অর্পিতা তার ছোট ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে শোবার ঘরে শুইয়ে দিয়ে এল। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। "আবীর এল বোধহয়!" অর্পিতা এগিয়ে গেল।

দরজা খুলেই আবীর স্বভাবসুলভ উৎসাহে চিৎকার করে উঠল, "এই শুনছ! আজ কিন্তু তোমাদের জন্য একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে!" মৌ এক লাফে দৌড়ে গেল বাবার কাছে, "কী এনেছ বাবি?" "তোর জন্য দই ফুচকা, আর তোর মায়ের জন্য ঝাল চুরমুর!" "ইয়েস!" মৌ আনন্দে নেচে উঠল, "মা! আমি বলেছিলাম না, আজ আমার ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে!" অর্পিতা হেসে বলল, "তোমার বাবার কাছে সব খবর কীভাবে যে আগে থেকে পৌঁছে যায়, কে জানে!"

কিন্তু ঘরে ঢুকেই আবীরের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। সোফায় সুতপাকে বসে থাকতে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। অর্পিতার দিকে ইশারায় তাকিয়ে অনুচ্চ স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কতক্ষণ?" অর্পিতা কোনো উত্তর না দিয়ে আবীরের কাঁধ থেকে অফিস ব্যাগটা নামিয়ে সোজা শোবার ঘরের দিকে চলে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে, সুতপার এভাবে হঠাৎ না বলে চলে আসাটা আবীর একদম পছন্দ করে না।

স্মৃতির পাতা ওলটালে মনে পড়ে, তিন বছর আগে এক বাসস্ট্যান্ডে আলাপ হয়েছিল অর্পিতা আর আবীরের। তখন অর্পিতার জীবনটাও ছিল এক চরম লড়াইয়ের নাম। বাবার ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে রোজ তাকে হাসপাতালে ছুটতে হতো। একটা পার্লারে উদয়াস্ত খাটত সে, ছুটি পাওয়া ছিল স্বপ্নের মতো। মা-হারা অর্পিতার জীবনে বাবাই ছিল একমাত্র আশ্রয়。

আর আবীর? সে তখন পাঁচ বছরের এক মাতৃহীন মেয়েকে নিয়ে একা লড়াই করছিল। রোজ সকালে মেয়েকে কোলে নিয়ে অফিসের বাসে ওঠা, যাওয়ার পথে স্কুলে নামিয়ে দেওয়া, আবার চারটের সময় স্কুল ছুটির পর পাড়ার এক কাকিমার ভরসায় মেয়েকে রেখে দেওয়া—এই ছিল আবীরের রোজনামচা। অফিসের কাজে যেদিন দেরি হতো, লজ্জায় আর অপরাধবোধে আবীরের মাথা কাটা যেত।

বাসস্ট্যান্ডের সেই চেনা-পরিচিতি থেকেই অর্পিতার মন গলেছিল ওই ছোট্ট মেয়েটার প্রতি। মাঝে মাঝে সে নিজের হাতে টিফিন বানিয়ে মৌয়ের হাতে দিত। মৌও অর্পিতার সাথে খুব অল্পদিনেই আপন হয়ে উঠেছিল। আবদার করত, "তুমি প্যানকেক বানাতে পারো? একদিন বানিয়ে দেবে?" অর্পিতা আদর করে বলত, "হ্যাঁ সোনা, কালই বানিয়ে দেব। তোমার যা খেতে ইচ্ছে করবে আমাকে বলবে।" আবীরের খুব লজ্জা লাগত এভাবে সাহায্য নিতে, সে বলত, "আহ মৌ, আন্টিকে রোজ রোজ এভাবে বিরক্ত কোরো না!"

আসলে সুতপা কোনোদিনই আবীরের সীমিত আয়ের সাধারণ সংসারে সুখ খুঁজে পায়নি। বিয়ের আগে যে আবীরকে ভালো লেগেছিল, বিয়ের পর তার মধ্যবিত্ত মানসিকতা আর ছোট ফ্ল্যাট সুতপাকে দমবন্ধ করে তুলত। মৌ জন্মানোর পরও সেই অশান্তি কমেনি। এর মাঝেই সুতপার জীবনে ফিরে আসে তার এক পুরোনো প্রেমিক, যে এখন সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। সেই বিলাসী জীবনের হাতছানি আর আর্থিক সচ্ছলতার লোভ সুতপাকে সংসার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়。

আবীর মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক অপমান সহ্য করেছিল, সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু সুতপা একদিন স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে ডিভোর্স চায় এবং সে নতুন জীবন শুরু করবে। এমনকি মেয়ে মৌয়ের দায়িত্ব নিতেও সে অস্বীকার করেছিল। সেদিন মিউচুয়াল ডিভোর্সের পর আবীর একাই হয়ে উঠেছিল মৌয়ের বাবা এবং মা।

পরবর্তীতে অর্পিতার আগমন ওদের জীবনে এক টুকরো বটগাছের ছায়ার মতো কাজ করেছিল। একদিন আবীর অর্পিতাকে হেসেই বলেছিল, "আপনার বিরুদ্ধে একটা বড় অভিযোগ আছে। আপনি আমার মেয়েকে এত আদর করছেন যে ও এখন প্রতিদিন আপনার হাতের টিফিন খোঁজে। আপনি যদি একদিন হঠাৎ চলে যান, ও বাঁচবে কী করে? সত্যি বলতে, শুধু ওই নয়... আমিও বোধহয় আপনার ওপর বড্ড অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি।" অর্পিতা সেদিন মাথা নিচু করে মৃদু হেসে বলেছিল, "সেই সিদ্ধান্ত তো আমি একা নিতে পারব না, আমার বাবার সাথে কথা বলতে হবে।" সেদিনই আবীর মৌকে নিয়ে অর্পিতার বাবার কাছে গিয়ে অর্পিতার হাত চেয়ে নিয়েছিল। তারপর থেকে শুরু হয়েছিল এক নতুন পথচলা। আজ তারা চারজন—আবীর, অর্পিতা, মৌ আর তাদের ছোট ছেলে।

আজ সুতপা যখন তার ফেলে যাওয়া সংসারে এসে দাঁড়ায়, মেয়ের এই চরম উদাসীনতা আর আবীর-অর্পিতার সহজ, নিখাদ সুখী গৃহকোণ দেখে তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। যে ঘরটা একদিন তার কাছে অসম্পূর্ণ, দরিদ্র মনে হয়েছিল, সেই ঘরেই আজ অন্য এক নারী পূর্ণতার আনন্দ খুঁজে পেয়েছে।

অর্পিতার এই স্বাভাবিক আতিথেয়তা, তার আত্মবিশ্বাস আর ঠোঁটের কোণের নির্ভার হাসি সুতপার মনে এক অদৃশ্য ঈর্ষার আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। মনে মনে সে নিজেকেই প্রশ্ন করে—‘এইটুকু স্যাঁতসেঁতে ঘরে অর্পিতা কী এমন সুখ পায়? কেন আবীর বা মৌ একটা দিনের জন্যও আমার অভাব বোধ করে না?’ কিন্তু কোনো উত্তর মেলে না।

অর্পিতা পরিবেশ হালকা করতে সুতপাকে জিজ্ঞেস করল, "সুতপাদি, আপনাকে ফুচকা দেব নাকি চুরমুর?" সুতপা কিছু বলার আগেই আবীর গম্ভীর অথচ হালকা চালে বলে উঠল, "ওকে এসব দিতে যেও না অর্পিতা। ও এখন অনেক বড়লোক মানুষ। রাস্তার ধারের খাবার খেয়ে যদি শরীর খারাপ হয়! এই ছোট্ট, অগোছালো বাড়িটাও তো ওর কোনোদিন পছন্দ ছিল না।"

এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সুতপা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ধীরে ধীরে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, "আমি চলি।" মৌ এবার টিভি বন্ধ থাকা অবস্থায় মুখ তুলে তাকাল, "আবার আসবে তো?" সুতপা মেয়ের দিকে চেয়ে মলিন হাসল, "যদি তুই ডাকিস, তবে আসব।"

দরজার কাছে গিয়ে সুতপা শেষবারের মতো একবার পেছন ফিরে তাকাল। ছোট্ট একটা ঘর। বাতাসে ফুচকার টক-ঝাল গন্ধ। মেয়ের চিলতে হাসি। আবীর আর অর্পিতার চোখের কোণের নীরব খুনসুটি। একটা অতি সাধারণ, মধ্যবিত্ত সংসার—যে সংসারটাকে একদিন সে বড্ড ছোট মনে করে লাথি মেরে চলে গিয়েছিল, আজ যেন সেই সংসারটাই আকাশের মতো বড় হয়ে গেছে。

আর সুতপা? সে আজ দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে... একেবারে বাইরে। তার বিলাসবহুল গাড়ি তাকে নিয়ে যাবে সেই বিশাল অট্টালিকায়, যাকে সে একদিন ‘সুখ’ ভেবেছিল। কিন্তু সে ভালো করেই জানে, সেই বিশাল বাড়ির নিস্তব্ধতায় আজ আর কেউ তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বসে থাকে না।

সংগৃহীত