ছাইচাপা আগুন

১. তপ্ত পিচঢালা পথ ও হৃদয়ের দহন

ঢাকার ফ্যামিলি কোর্টের সামনের তপ্ত পিচঢালা রাস্তাটা তখন দুপুরের কড়া রোদে আগুনের মতো পুড়ছে। ঠিক মীরার বুকের ভেতরের দহনটার মতোই। দীর্ঘ পাঁচ বছরের একটা সাজানো সংসার আজ কাগজের এক টুকরো আইনি দলিলে ধুলোয় মিশে গেছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন আর প্রতিনিয়ত পাওয়া মানসিক নির্যাতন আজ একটা চূড়ান্ত বিচ্ছেদে রূপ নিয়েছে।

কোর্ট বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি দিয়ে নামতেই মীরার পথ আগলে দাঁড়ালেন তার প্রাক্তন শাশুড়ি মিসেস চৌধুরী। তিনি তার দামী শিফন শাড়ির আঁচলটা নাটকীয় ভঙ্গিতে ঠিক করতে করতে এক চিলতে বাঁকা হাসলেন। মীরার সাধারণ সুতির কামিজ আর হাতে ধরা ছোট সাধারণ সুটকেসটার দিকে তাকিয়ে তিনি অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন,

—"আমার ছেলেকে ছাড়া এখন তো তোর ঘরের বিদ্যুতের বিল দেওয়ারও ক্ষমতা নেই, মীরা! এতদিন বড় লোকের অন্ন ধ্বংস করেছিস, এখন বুঝবি অভাব কাকে বলে। রাজপ্রাসাদ থেকে এবার তোকে ওই চেনা নর্দমাতেই ফিরে যেতে হবে।"

মীরা চুপ করে রইল। একটা শব্দও তার মুখ থেকে বের হলো না। তার এই দীর্ঘদিনের নীরবতাকে আরিয়ান আর তার মা সবসময় 'দুর্বলতা' বা 'ভয়' ভেবে এসেছে। তারা ভেবেছে মীরা নিরুপায়, তাই সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে।

২. আভিজাত্যের অহংকার ও বিষাক্ত বাণ

মীরার প্রাক্তন স্বামী আরিয়ান তার ব্র্যান্ডের দামী ঘড়িটার স্ট্র্যাপ ঠিক করতে করতে মায়ের কথায় সুর মেলাল। তার চোখে-মুখে তখন এক চরম অহংকার। সে বলল,

—"মা ঠিকই বলেছেন। আমাদের এই আভিজাত্য, আমাদের স্ট্যাটাস—এসব তোমার মতো সাধারণ ঘরের মেয়ের জন্য ছিলই না। তোমাকে যে দয়া করে বিয়ে করে রাজপ্রাসাদে রেখেছিলাম, সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। যাক, বাঁচা গেল! কাঁধ থেকে একটা মস্ত বড় বোঝা নামল।"

আরিয়ানের কাজিনরা আর তার ছোট বোন রিমি তখন নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে হাসাহাসি করছিল। মীরাকে অপমান করার এই সুযোগটা তারা হাতছাড়া করতে চাইল না। রিমি কিছুটা এগিয়ে এসে তাচ্ছিল্যভরে বলল,

—"বড় ভাইয়া ওকে উদ্ধার করেছিল ওই সস্তা গলি থেকে, এখন আবার ওখানেই ফিরে যাচ্ছে। আচ্ছা মীরা ভাবি, এখন থেকে কি আবার লোকাল বাসে ঝুলে ঝুলে যাতায়াত শুরু করবে? আমাদের গাড়িগুলোর এসি হাওয়া তো আর গায়ে লাগবে না!"

অপমানের প্রতিটি তির মীরার কানে এসে তিরের মতো বিঁধছিল। এই পাঁচ বছর সে এই পরিবারকে শুধুই দিয়ে গেছে। নিজের ভালোবাসা, যত্ন আর আত্মসম্মান—সবই বিলিয়ে দিয়েছে চৌধুরীদের বংশের আভিজাত্য রক্ষা করতে। মিসেস চৌধুরী মাঝে মাঝে চোর সন্দেহে মীরার ব্যাগ তল্লাশি করতেন, যেন সে কিছু চুরি করে বাপের বাড়ি না পাঠায়। অথচ মীরা কোনোদিন টু শব্দটিও করেনি। সব সহ্য করেছে এক বুক চাপা কষ্ট নিয়ে。

৩. লিফটের নীরবতা এবং একটি রহস্যময় দাওয়াত

কোর্টের লিফটের দরজাটা যখন খুলল, মীরা শান্ত পায়ে ভেতরে ঢুকল। তবে লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগে সে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন অশ্রু নয়, ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। সে একবার স্থির দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকাল।

—"একটা বিষয়ে তোমরা ঠিক," মীরা ধীরস্থির কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বলল। "কে কাকে ছাড়া টিকে থাকতে পারে, সেটা বোঝার জন্য ত্রিশ দিনই যথেষ্ট। ক্ষমতার দাপট তোমাদের চোখে ছানি ফেলে দিয়েছে, আরিয়ান।"

আরিয়ান উচ্চস্বরে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। —"এখন কি মেকি মোটিভেশনাল স্পিচ দিচ্ছ নাকি? নাকি অভাবের তাড়নায় মাথাটা এখনই বিগড়ে গেল?"

মীরা মৃদু হাসল—যে হাসিতে লুকিয়ে ছিল প্রচ্ছন্ন এক রহস্য, যা চৌধুরীরা ধরতে পারল না। সে বলল,

—"না। আমি শুধু তোমাদের আগামী রোববার আমাদের বাড়িতে একটা সাধারণ খাবারের দাওয়াত দিচ্ছি। অন্তত শেষবার দেখে যেও তোমাদের দয়া আর টাকা ছাড়া আমি কেমন আছি।"

মিসেস চৌধুরীর চোখে ক্রুর আনন্দ ঝিলিক দিয়ে উঠল। তিনি ব্যঙ্গ করে বললেন, —"তা কোন রাস্তার ধারের ঝুপড়িতে দাওয়াত দিচ্ছ মা? নাকি কোনো সস্তা মেসের বারান্দা ভাড়া করে নাটক সাজাবে? চৌধুরীরা কিন্তু ডাল-ভাত খায় গোলাপি না, সেটা মনে রেখো।"

— "ঠিকানা যথাসময়ে পৌঁছে যাবে,"—এইটুকু বলে মীরা লিফটের বোতাম চাপল। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল, আড়াল হয়ে গেল মীরার শান্ত মুখাবয়ব।

৪. খোলস বদল: 'মীরা চৌধুরী' থেকে 'মীরা খান'

কোর্ট বিল্ডিং থেকে বেরোতেই রাস্তার মোড়ে একটা কালো চকচকে দামি প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। সাধারণ পথচারীরা গাড়িটার রাজকীয়তা দেখে আড়চোখে তাকাচ্ছিল। মীরা গাড়িটার দিকে এগিয়ে যেতেই ইউনিফর্ম পরা এক প্রবীণ ড্রাইভার অত্যন্ত সসম্মানে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিল।

— "ম্যাডাম মীরা, আমরা কি বনানীর বাসায় যাব?" ড্রাইভার বিনম্র সুরে জিজ্ঞেস করলেন।
— "হ্যাঁ, মতিন সাহেব। সব চুকেবুকে গেছে। চলুন এবার নিজের বাসায় ফিরি।"

গাড়ির এসির ঠান্ডা বাতাসে বসে মীরা জানালার বাইরে তাকাল। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সে আজ বুক ভরে মুক্ত শ্বাস নিল। যেন বুকের ওপর চেপে বসা কোনো বিশাল হিমালয় পর্বত আজ নেমে গেছে। 'মীরা চৌধুরী' নামের সেই অবহেলিত, লাঞ্ছিত অস্তিত্বটা আজ থেকে মৃত। মীরা খান —যাকে চেনার বা জানার চেষ্টা আরিয়ান বা তার পরিবার কোনোদিন করেনি—আজ সে নিজের আসল পরিচয়ে, নিজের রাজত্বে ফিরে যাচ্ছে।

৫. আইভরি কার্ডের চমক ও চৌধুরীদের পরিকল্পনা

তিন সপ্তাহ পরের কথা। চৌধুরীদের ড্রয়িংরুমে তখন একটা হুলস্থুল পড়ে গেছে। তাদের হাতে একটা দামী আইভরি কাগজের ওপর সোনালী হরফে লেখা আমন্ত্রণপত্র। কার্ডের মান, রুচি আর রাজকীয়তা দেখে আরিয়ান কিছুটা ভড়কে গেল।

— "মা, এটা কি আসলেই মীরা পাঠিয়েছে? এই কার্ডটার যা দাম, ও রাজকীয় কোনো প্রিন্টিং প্রেস ছাড়া তৈরি অসম্ভব। এই একটা কার্ডের খরচে ওর তিন মাসের চলার কথা!" আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল।

মিসেস চৌধুরী কার্ডটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। —"আরে রাখ তোর কার্ড! নিশ্চয়ই কোনো নতুন শিকার ধরেছে। কোনো বুড়ো ধনকুবেরের আন্ডারে পিএ বা কোনো কাজ জুটিয়ে হয়তো নিজেকে বড় দেখানোর চেষ্টা করছে। ও আমাদের অপমান করার ফন্দি এঁটেছে, আর কিছু না।"

আরিয়ানের ছোট বোন রিমি উত্তেজিত হয়ে বলল, —"চলো না মা, আমরা সবাই যাই। পুরো গুষ্টি নিয়ে যাব। দেখি ও কত বড় লোক হয়েছে। ওর ওই সস্তা নাটকের পর্দা আমরা সবার সামনেই ফাঁস করে দেব। আর দেখে আসব কোন মেসের রুমে ও থাকে।"

সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোববারের বিকেলে চৌধুরী বংশের প্রায় ত্রিশ জন আত্মীয়স্বজন তাদের সবচেয়ে দামী পোশাক আর অলঙ্কার পরে হাজির হলো। তাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মীরার 'দরিদ্র দশা' দেখে একচোট হাসাহাসি করা এবং তাকে সামাজিকভাবে চূড়ান্ত অপমান করা।

৬. খান ম্যানশনের রাজকীয়তা ও স্তব্ধ চৌধুরী পরিবার

কিন্তু যখন তাদের দামী গাড়িগুলোর বহর বনানীর সেই সংরক্ষিত অভিজাত এলাকার এক বিশাল কালো লোহার গেটের সামনে এসে পৌঁছাল, সবার চোখ কপালে উঠল। গেটের ওপর বড় বড় পিতলের হরফে জ্বলজ্বল করছে—'খান ম্যানশন'।

সিকিউরিটি গার্ডরা তাদের পথ রোধ করল। আরিয়ান জানালার কাঁচ নামিয়ে অহংকারের সুরে চিৎকার করে বলল, —"আমরা মীরার মেহমান, গেট সরাও!"

সিকিউরিটি গার্ডটি ইন্টারকমে ভেতরের কারো সাথে কথা বলল, তারপর অত্যন্ত গম্ভীর ও পেশাদার স্বরে বলল, —"মীরা খানের ব্যক্তিগত বাসভবনে আপনাদের স্বাগতম। গাড়ি ভেতরে পার্ক করুন।"

ভেতরে ঢোকা মাত্রই চৌধুরী পরিবারের সবার মুখ চুন হয়ে গেল। অনেকটা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত সবুজ মখমলের মতো লন, মাঝখানে রাজকীয় ফোয়ারা থেকে জলবিন্দু ঠিকরে পড়ছে, আর সামনে দাঁড়িয়ে শ্বেতপাথরের তৈরি এক বিশাল রাজপ্রাসাদ। আরিয়ান থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে তো জানত মীরা এক এতিম, সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। কিন্তু এই অতুলনীয় সম্পদ, এই আভিজাত্য তো তাদের চৌধুরী পরিবারের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি!

মিসেস চৌধুরী কাঁপা গলায় বললেন, —"ভুল করছি না তো আমরা? এটা কি আসলেই সেই মীরার বাড়ি?"

ঠিক তখনই প্রাসাদের বিশাল সদর দরজাটা খুলে গেল। আর সেখান থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন এক নারী। পরনে দামী সিল্কের শাড়ি, গলায় হীরের নেকলেস—যার দ্যুতিতে রোববারের বিকেলের সোনালী রোদও যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

সে আর কেউ নয়—মীরা। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসী, তেজস্বী মীরাকে তারা কেউ চেনে না।

মীরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় বলল,

—"আপনারা আসতে বেশ দেরি করে ফেললেন। আজ তো আমার ঘর থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করার দিন ছিল। তবে যাক, আপনারা যখন এসেছেনই, শেষ দৃশ্যটা দেখেই বিদায় হোন।"

আরিয়ান বিড়বিড় করে বলল, —"মীরা... এসব কী? তুমি কে?"

মীরা ঠোঁটের কোণে হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো মমতা ছিল না, ছিল প্রতিশোধের আগুন। সে বলল, —"আরিয়ান, তুমি ফ্যামিলি কোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলে না চৌধুরী বংশের ক্ষমতা কত? এখন নিজের চোখে দেখো, সেই ক্ষমতার ভিতটা আসলে কত নড়বড়ে ছিল।"

(চলবে...)


সংগৃহীত