বিশ্বাসঘাতকতার ফুলশয্যা:
দেবদূতের মুখোশে এক প্রতারক
অসহায় রাত্রির বিনিদ্র রজনী
বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে রাত্রি। চোখে এক ফোঁটাও ঘুম নেই। আর কোনোদিন ঘুম আসবে কি না, তা ঈশ্বরই জানেন। আজ রাত্রির জীবনের সবচেয়ে নির্মম রজনী। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না যে শ্রেয়ান সত্যিই অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসতে পারলো! যে মানুষটাকে সে নিজের সর্বস্ব ভেবেছিল, সে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে?
আজ শ্রেয়ানের ফুলশয্যা। রাত্রি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে—শ্রেয়ান তার নতুন বউকে বুকে জড়িয়ে ভালোবাসার কথা বলছে। আর নতুন মেয়েটি? সেও নিশ্চয়ই পরম আহ্লাদে স্বামীর বুকে মাথা গুঁজে সোহাগ উপভোগ করছে। এই দৃশ্যটা মনে আসতেই রাত্রির সারা শরীর রাগে ও যন্ত্রণায় রি রি করে উঠলো। ইচ্ছে করছে সেই মেয়েটাকে শেষ করে দিতে! পরক্ষণেই অভিমানে চোখ ফেটে জল চলে এলো রাত্রির। পুরনো স্মৃতিগুলো এক এক করে ভিড় করতে লাগলো তার মনের কোণে।
অতীতের সেই সোনালী খাঁচা
রাত্রির মা সন্ধ্যা ছিল মহুয়া সান্যালের প্রাণের বান্ধবী। মহুয়া সান্যাল এক বনেদি বড়লোক বাড়ির বউ, আর রাত্রির মা সন্ধ্যা ছিল এক চরিত্রহীন মাতালের বিধবা স্ত্রী। দুজনের সামাজিক অবস্থানে আকাশ-পাতাল তফাত থাকলেও ছোটবেলা থেকেই রাত্রির যাতায়াত ছিল এই বড়লোক বাড়িতে। শৈশবে এই বাড়িতে এলে রাত্রির চোখ ধাঁধিয়ে যেত। এত বড় বাড়ি, এত দামি আসবাবপত্র, চমৎকার সব খাবারদাবার! রাত্রি তখন মনে মনে ভাবতো, কেন ঈশ্বর তাকে এমন ভাগ্য দিয়ে পৃথিবীতে পাঠালেন না? কেন তাকে বড়লোক বাড়ির আশ্রিতা হয়ে থাকতে হচ্ছে?
রাত্রি যখন দ্বাদশ শ্রেণী (Class 12) পাস করলো, ঠিক তখনই এক মরণজ্বরে তার মা মারা গেল। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেল রাত্রির। তিনকূলে কেউ না থাকা একটা মেয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে গেল। সেদিন যদি মহুয়া মাসি ছাতার মতো এগিয়ে এসে তাকে সান্যাল বাড়িতে আশ্রয় না দিতেন, তবে হয়তো বেওয়ারিশ জোয়ান মেয়েটাকে শিয়াল-কুকুরে টেনে ছিঁড়ে খেতো।
আশ্রিতা বনাম পরগাছা
সান্যাল বাড়িতে আশ্রয় পেলেও রাত্রি সবসময় একটা তীব্র আতঙ্কে দিন কাটাতো। প্রতিটি মুহূর্তে তার মনে হতো, যদি কোনো ভুলত্রুটি হয়ে যায় এবং এই শেষ সম্বল আশ্রয়টুকুও হারিয়ে যায়! মহুয়া মাসি ছাড়া এই বাড়ির আর কোনো সদস্য রাত্রির অস্তিত্বকে মেনে নিতে পারেনি। সবাই তাকে প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দিত যে সে একটি 'উড়ে এসে জুড়ে বসা পরগাছা'। অপমান আর গঞ্জনা বুকে চেপে রাতের পর রাত বালিশ ভিজিয়ে কাঁদতো রাত্রি।
হঠাৎ করেই একদিন একটা ঘটনা সবকিছু বদলে দিল। মহুয়া মাসির ননদ (মেসোর বোন) সেদিন বাড়িতে এসেছিলেন। রাত্রি তাকে চা দিতে গেলে অসাবধানতাবশত তার হাত থেকে কাপটা উল্টে চা গিয়ে পড়ে ভদ্রমহিলার গায়ে। ব্যস! মুহূর্তে রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন তিনি। হিংস্র গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
"অসভ্য, অশিক্ষিত মেয়ে! ঠিক করে একটা চায়ের কাপ ধরতে পারো না? বিনা পয়সায় অন্যের বাড়িতে খেয়ে খেয়ে খুব মজা পেয়ে গেছো না? লজ্জা করে না এখানে পরগাছার মতো পড়ে থাকতে?"
অপমানের তীব্রতায় সেদিন রাত্রি মাটির সাথে মিশে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু অসহায় এক আশ্রিতা মেয়ে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারতো!
হিরোর মতো শ্রেয়ানের প্রবেশ
ঠিক সেই মুহূর্তে সগর্বে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলো শ্রেয়ান—মহুয়া মাসির একমাত্র ছেলে, যে সদ্য বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিরেছে। সে তার পিসির মুখের ওপর কড়া ভাষায় বলে উঠলো,
"না পিসি, তুমি ভুল করছো। রাত্রি অশিক্ষিত নয়, ও ক্লাস টুয়েলভ অবধি পড়েছে। খুব শিগগিরই কলেজেও ভর্তি হবে। আর ও এই বাড়ির ঝিও নয় যে খাওয়া-দাওয়ার বিনিময়ে চাকরের মতো কাজ করবে। ও মায়ের বন্ধুর মেয়ে। আজ ও অসহায় হতে পারে, কিন্তু ওরও একটা সম্মান আছে। ওকে অসম্মান করার অধিকার আমাদের কারোরই নেই।"
শ্রেয়ানের মুখে এই কথাগুলো শুনে রাত্রি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন আচমকাই রাত্রির মনে হলো, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো অন্তত একজন মানুষ আছে। শ্রেয়ানকে সে মনে মনে ভগবানের আসনে বসিয়ে দিল।
শ্রেয়ানের উদ্যোগেই রাত্রি কলেজে ভর্তি হলো। শ্রেয়ান তার মাকে কথা দিল যে রাত্রির পড়াশোনার সমস্ত খরচ সে নিজেই বহন করবে। শ্রেয়ান হয়তো জানতেও পারেনি, সেদিন থেকেই রাত্রি তাকে নিজের মনের মনিকোঠায় ঈশ্বরের মতো পুজো করতে শুরু করেছিল। রাত্রি তাকে প্রেমিক হিসেবে পাওয়ার কথা কোনোদিন কল্পনাও করেনি, কিন্তু শ্রেয়ান নিজেই একদিন সেই দাবি নিয়ে এসে দাঁড়ালো।
অধিকার ও ভালোবাসার মায়াজাল
রাত্রি যখন কলেজের ফাইনাল ইয়ারে, তখন মহুয়া মাসি তার জন্য একটা ভালো বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এলেন। রাত্রির কোনো আপত্তি ছিল না, কিন্তু শ্রেয়ান এই বিয়েতে ঘোরতর আপত্তি তুললো। সে তার মাকে বলল,
"আরে, নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে কেউ বিয়ে করে নাকি! আজকালকার ছেলেদের কোনো বিশ্বাস আছে? আগে ও কলেজ পাস করুক, একটা চাকরি পাক, তারপর বিয়ে।"
রাত্রি সেদিন বুঝতে পারেনি শ্রেয়ান কেন তার বিয়েতে বাধা দিচ্ছে। যদিও শ্রেয়ানের সাথে তার খুব একটা কথা হতো না, তবুও তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল।
উত্তর পেতে বেশিদিন সময় লাগেনি। একদিন রাত্রি যখন নিজের ঘরে বসে পড়াশোনা করছিল, হঠাৎ চৌকাঠের বাইরে শ্রেয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।
রাত্রি অবাক হয়ে বলল, "একি শ্রেয়ান দা! কিছু বলবে?"
শ্রেয়ান সরাসরি প্রশ্ন করলো, "তুই চাস এই বিয়েটা করতে?"
রাত্রি মাথা নিচু করে বলল, "হ্যাঁ মানে, মাসি তো বলছে... নিজের সংসার কে না চায়!"
শ্রেয়ানের চোখ দুটো তখন রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে হিংস্র গলায় বলে উঠলো, "আর আমি? এই যে বুক দিয়ে আগলে নিয়ে বেড়াই তোকে, কেউ তোর দিকে যাতে আঙুল তুলতে না পারে সেই চেষ্টা করি, তার কোনো দাম নেই?"
রাত্রি তাজ্জব হয়ে বলল, "তুমি তো আমার ভগবান শ্রেয়ান দা!"
শ্রেয়ান গর্জে উঠলো, "শা*লা নিকুচি করেছে তোর ভগবান এর! কে চায় তোর ভগবান হতে? বুঝিস না তুই আমি কী চাই? আমি তোকে চাই, তোকে নিজের করে পেতে চাই।"
বলেই দড়াম করে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল শ্রেয়ান। পাগলের মতো ছুটে এসে রাত্রিকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। রাত্রি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারেনি। যে মানুষটা তার জীবনের ত্রাতা, তার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিতে তার কোনো দ্বিধা ছিল না। শ্রেয়ান সেদিন রাত্রিকে বুকে জড়িয়ে আলতো স্বরে বলেছিল,
"যে সংসার তুই চাস, সেটা তোকে আমিই দেব রাত্রি। বিয়ে করবি তো আমায়?"
রাত্রি কথা দিয়েছিল এবং সে কথা রেখেওছিল। কিন্তু শ্রেয়ান? সে যে এত বড় প্রতারক, তা রাত্রি ভাবতেও পারেনি।
অন্ধকারের নিস্তব্ধতা
স্মৃতির জটলা থেকে বাস্তবে ফিরে এলো রাত্রি। সে বিছানা থেকে নেমে নিঃশব্দে ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হলো। চূপিসারে গিয়ে দাঁড়ালো শ্রেয়ান আর তার নবপরিণীতা স্ত্রী জয়িতার ঘরের বাইরে। চারদিক নিঝুম, সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন।
রাত্রি ঘরের দরজায় কান পাতলো। কিন্তু দরজার ওপার থেকে কোনো শব্দ আসছে না। কোনো প্রেমালপ বা নুপুরের আওয়াজ নেই। সব নীরব, নিথর। আলো নিভে গেছে নবদম্পতির ফুলশয্যার ঘরে। রাত্রি ঠিক বুঝতে পারলো না—ওরা কি ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি এই নিস্তব্ধতার আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য? রাত্রি দরজার বাইরে একলা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যার উত্তর হয়তো শুধু আগামী সময়ই দিতে পারবে।
সংগৃহীত