বিশ্বাসের মূল্য
ছোটবেলায় শেখা নীতি আর বাস্তব জীবনের কঠিন সত্যের মাঝে যে তফাত, তা শেখায় জীবন নিজেই। বিশ্বাস যেখানে আঘাত পায়, সেখান থেকেই শুরু হয় মানুষের নতুন করে বেঁচে থাকার পথ। 🌱✨
ছোটবেলা থেকেই অনিকের মাথায় একটা কথাই ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তার দাদু—"তুই যদি কারো ক্ষতি না করিস, তবে ভগবান তোর ক্ষতি হতে দেবেন না। মানুষের ভালো করলে সেই ভালো একদিন না একদিন নিজের কাছে ফিরে আসেই।" সরল মনের অনিক এই নীতিকেই জীবনের সবচেয়ে বড় মূলমন্ত্র বলে মেনে নিয়েছিল। স্কুলেই হোক কিংবা কলেজে, কাউকে কোনো বিপদে দেখলে সে কখনো পিছপা হতো না।
পড়াশোনা শেষ করে অনিক যখন একটি করপোরেট সংস্থায় কাজ শুরু করল, তখনও তার স্বাভাব বদলায়নি। সেখানে তার আলাপ হয় সৌভিকের সাথে। সৌভিক কাজের জায়গায় নতুন ছিল এবং ক্রমাগত কাজের চাপে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিল। অনিক তাকে নিজের ভাইয়ের মতো মনে করে আগলে রাখতে শুরু করল। দেরিতে কাজ শেষ হলে নিজে জেগে সাহায্য করা, প্রোজেক্টের বড় কাজগুলো সৌভিকের নামে তুলে দিয়ে তাকে বসের কাছে ভালো প্রজেক্টে তুলে ধরা—সবকিছুতেই অনিক নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে এসেছিল। অনিক ভাবত, সৌভিকের ভালো হওয়া মানেই দলের ভালো হওয়া।
কিন্তু বাস্তব যে কতটা নিষ্ঠুর, তা বুঝতে অনিকের বেশিদিন সময় লাগেনি।
কয়েক মাস পর সংস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোমোশনের সুযোগ আসে। সেই সময় কোম্পানির একটি প্রধান প্রোজেক্টে কিছু কারিগরি ভুল দেখা দেয়। আশ্চর্যজনকভাবে, সেই ভুলের সমস্ত দায়ভার অনিকের ওপর গিয়ে পড়ে। অনিক অবাক হয়ে শোনে, বসকে এই বিষয়ে গোপন রিপোর্ট দিয়েছে স্বয়ং সৌভিক! যে সৌভিককে অনিক কাজ শিখিয়েছিল, রাতের পর রাত জেগে যার কাজ গুছিয়ে দিয়েছিল—সেই সৌভিকই নিজের প্রোমোশন নিশ্চিত করতে অনিকের বিরুদ্ধে জাল নথিপত্র আর মিথ্যে অভিযোগ সাজিয়ে বসের কাছে পেশ করেছে।
যে দিন অনিক জানতে পারল সত্যিটা, সে দিন তার মনে হয়েছিল পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেছে। দাদুর বলা সেই ছোট্টবেলার মিষ্টি শিক্ষাটা একমুহূর্তে চুরমার হয়ে গেল। তার মনে বারবার একটা কথাই বাজতে লাগল—“আমি তো কখনো কারো ক্ষতি চাইনি, তবে আমার সাথেই কেন এমন হলো? আমি তো যার সবচেয়ে ভালো চেয়েছিলাম, সে-ই কেন সবার আগে ছুরিটা বসালো?”
অনিক সেদিন কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি করেনি, সৌভিকের সাথে তর্কও করেনি। শুধু নীরবে তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে অনিক দেখল—একটি ছোট মেয়ে নিজের টিফিনের শেষ রুটিটুকু রাস্তার একটা আশ্রয়হীন কুকুরকে খাইয়ে দিচ্ছে। কুকুরটি পরম কান্নামাখা আনন্দে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ছে।
সেই দৃশ্য দেখে অনিকের চোখের জল আর ধরে রাখা গেল না। সে বুঝল, মানুষ স্বার্থপর হতে পারে, সমাজ নিষ্ঠুর হতে পারে—কিন্তু তাই বলে নিজের ভেতরের ভালোমানুষিটাকে মেরে ফেলা যাবে না। পৃথিবীর সব মানুষ হয়তো ভালো চাওয়ার প্রতিদান ভালোবাসায় দেবে না, কিন্তু ভালো থাকার আর ভালো করার ইচ্ছাটাই মানুষের আসল শক্তি।
বাস্তব অনিককে শক্ত হতে শিখিয়েছে, অন্ধবিশ্বাস ছেড়ে চোখ খুলে চলতে শিখিয়েছে—কিন্তু তার ভেতরের করুণা আর দয়াকে কেড়ে নিতে পারেনি। সে বুঝেছে, আঘাত আসবেই, তবে সেই আঘাত সামলে নিয়ে নিজের বিবেক পরিষ্কার রেখে বেঁচে থাকার নামই জীবন।
সংগৃহীত