বিপত্তারিণী

"দেবী তো কোনো প্রতিমার ফ্রেমে বাঁধা থাকেন না, তিনি কখনো কখনো অবাক চোখের মমতায় আর ছোট্ট দুটো হাতের পরম আশ্রয়ে নেমে আসেন ধরাতলে..."

বর্ষার এক মেঘলা দুপুরে এক খুদে স্কুলপড়ুয়া, এক গৃহহীন মা-কুকুর আর তার ছানাদের বেঁচে থাকার অলৌকিক উপাখ্যান। আজ বিপত্তারিণী পুজো, কিন্তু সত্যিকারের বিপত্তারিণী কে?


ভোর থেকেই আকাশটার মুখ ভার হয়ে ছিল। দুপুর গড়াতেই সেই কালো মেঘ ভেঙে এক্কেবারে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। গলিরাস্তাগুলো ততক্ষণে খানাখন্দে টলমল, জমা জলে ভেসে যাচ্ছে আশপাশের প্লাস্টিকের টুকরো আর ঝরা পাতা।

স্কুলটা আজ হাফ ডে ছিল। কাঁধে ভারী ব্যাগ আর হাতে ফুটফুটে একটা ছাতা নিয়ে গলি পথ ধরে ফিরছিল ছোট্ট মেয়েটি—পায়েল। ঠিক তার পাশেই, ছাতার তলায় আধো-ভিজে গায়ে হেঁটে চলছিলাম আমি। বৃষ্টির তোড় এতটাই বাড়ল যে খালি চোখে সামনের পথ দেখাই দায়। বাধ্য হয়েই রাস্তার পাশের একটা পুরোনো টিনের শেডের নিচে আমরা দু'জনে এসে আশ্রয় নিলুম। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে যেন এক অদ্ভুত সুর বাজছে。

হঠাৎই টিনের খটখট শব্দের ফাঁক দিয়ে একটা ক্ষীণ আওয়াজ কানে এল—‘কুঁইকুঁই...’।

পায়েল আমার জামার হাতা টেনে ফিসফিস করে বলল, "কাকু, দেখো তো ওখানে কে!"

শেডের কোণে, একটা ভাঙা কাঠের বাক্সের আড়ালে গুটিসুটি মেরে শুয়ে রয়েছে একটা পথচলতি মা-কুকুর। আর তার পেটের উষ্ণতায় জড়িয়ে রয়েছে তুলতুলে তিনটি সদ্যোজাত ছানা। গায়ের লোমগুলো জলে ভিজে একাকার, শীতে ও ভয়ে থরথর করে কাঁপছে পিচ্চিগুলো। মা-কুকুরটির চোখে এক গভীর উৎকণ্ঠা। সে তার ছানাদের এই টিনের চালা থেকে পাশের চালায় নিয়ে যেতে চায়—হয়তো সেখানেই তার আসল আস্তানা, যেখানে অন্তত জল কম পড়ছে। কিন্তু মাঝের ওই পথটুকু পার হওয়া এই মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠেছে। মা-কুকুরটি জলভরা চোখে একবার বাইরের দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার ছানাগুলোর দিকে।

ঘটনাটা বুঝতে পায়েলের এক মুহূর্তও সময় লাগল না।

কোনো কিছু না ভেবে, নিজের কাঁধের ব্যাগটা একটা শুকনো কোণে রেখে দিল সে। তারপর তার সেই ছোট্ট ছাতাটা পরম স্নেহে মেলে ধরল মা-কুকুর আর তার ছানাদের মাথার ওপর। পরম মমতায়, এক এক করে ছানাগুলোকে শেডের শুকনো দিকটাতে পার করে দিতে সাহায্য করতে লাগল। মা-কুকুরটিও যেন অলৌকিক এক শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়েটির এতটুকুন হাত দুটো যেন ওই চারটে প্রাণীকে বৃষ্টির তান্ডব থেকে আড়াল করার জন্য পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে উঠল।

সবকটি ছানাকে নিরাপদে ওপারে পৌঁছে দেওয়ার পর, মা-কুকুরটি একবার পিছু ফিরে তাকাল।

ওহ্! সে কী অদ্ভুত দৃষ্টি! সেই চোখের জল আর বৃষ্টির জল মিশে একাকার হয়ে গেছে। এক ঝলকে যেন মনে হলো, পুরো পশ্চিমবঙ্গের আষাঢ়-শ্রাবণের বর্ষাটাই লুকানো রয়েছে মা-কুকুরটির ওই কাতর অথচ কৃতজ্ঞ দুটি চোখের ভেতর! ওই দৃষ্টিতে কোনো ভাষা ছিল না, কিন্তু ছিল এক অদ্ভুত আশীর্বাদ।

আজ ক্যালেন্ডারের পাতায় বিপত্তারিণী পূজা। চারপাশের প্যান্ডেলে মন্দিরে শাঁখ বাজছে, লাল ধাগা বাঁধা হচ্ছে হাতে, মায়ের পুজো হচ্ছে মহাধুমধামে। কিন্তু এই ভিজে যাওয়া স্যাঁতসেঁতে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আমার মনে এক গভীর উপলব্ধি জাগল—দেবী কখন, কার রূপে, কীভাবে যে ধরা দেন, তা কি সত্যি কেউ আগে থেকে জানতে পারে?

লাল চেলিতে মোড়ানো প্রতিমা নয়, আজ বৃষ্টিভেজা দুপুরে এই নিষ্পাপ খুদে মেয়েটির মমতাই তো হয়ে উঠল ওই অসহায় প্রাণগুলোর সত্যিকারের ‘বিপত্তারিণী’


সংগৃহীত