ভাঙা আয়নায় নিজের মুখ: এক অপরাজেয় মনের উপাখ্যান
প্রত্যাখ্যানের বিষণ্ণতা পেরিয়ে আত্মআবিষ্কার ও ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য গল্প
ছেলেমেয়েদের কাছে অবহেলা আর কটু কথা শোনার পর মায়ের মনে যে তীব্র আঘাত লেগেছিল, তা কীভাবে বদলে দিল ওনার চিন্তাধারা? অপরাজিতা ম্যাগাজিনের একটি পোস্ট ও নিজের মনের জোরকে পুঁজি করে কীভাবে তিনি হলেন অপরাজেয়?
১. শূন্যতার মুখোমুখি
বিকেলের ম্লান আলোটা যখন ড্রয়িংরুমের কাঁচের জানালায় এসে আছড়ে পড়ছিল, তখন পুরো ঘরটায় এক থমথমে নীরবতা। জেবুন্নেসা জুঁই তখনো সোফায় সোজা হয়ে বসে আছেন। একটু আগেই ছেলে বাদল, ছেলের বউ প্রিয়া আর মেয়ে বিপাশা ও জামাই মাহফুজের সাথে ওনার জীবনের এক মহাকাব্যিক লড়াই হয়ে গেছে। নিজের দীর্ঘদিনের জমানো একাকীত্ব, অবহেলা আর সন্তানদের শুধু "অধিকার" আদায়ের মানসিকতার বিরুদ্ধে আজ তিনি স্পষ্ট ভাষায় নিজের সীমানা টেনে দিয়েছেন।
দৃপ্ত পায়ে নিজের শোবার ঘরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে ভেজাতেই জুঁইয়ের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ড্রয়িংরুমে সন্তানদের সামনে নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে অতটা শক্ত হতে পারলেও, ঘরের এই নির্জনতায় আসতেই ওনার ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা লাগতে শুরু করল।
তিনি বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিলেন। স্ক্রিন অন করতেই ওনার প্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম 'স্বপনে সাহিত্য' গ্রুপের নোটিফিকেশনগুলো ভেসে উঠল। কিন্তু অদ্ভুত বিষয়, আজ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের অত বড় সফল সাহিত্য আড্ডা, নিজের প্রথম একক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সুসংবাদ—কোনো কিছুই যেন ওনার মনকে পুরোপুরি শান্ত করতে পারছে না। বাদলের সেই তীব্র অবমাননাকর কথাগুলো ওনার কানে বাজছিল: *“এই বয়সে এসে কী শুরু করেছ? বাচ্চা মেয়েদের মতো প্রেমের কবিতা লেখা, ন্যাকামি মার্কা গল্প লেখা... মানুষ শুনলে হাসবে।”*
নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানের কাছ থেকে পাওয়া এই মানসিক প্রত্যাখ্যান বা রিজেকশন জুঁইয়ের ভেতরের ছাপান্ন বছর বয়সী শান্ত মানুষটাকে ওলটপালট করে দিচ্ছিল।
• --
২. রিজেকশনের সেই চিরচেনা ক্ষত
জুঁই চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে খাটে হেলান দিলেন। ওনার মনে হলো, এই যে বাদল আর বিপাশা ওনার ভেতরের লেখক সত্ত্বাকে, ওনার ভালো লাগাকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিল, "না" বলে দিল ওনার ইচ্ছের প্রকাশকে—এই কষ্টটা শুধু একটা তর্কের কষ্ট নয়। এটা এক ধরণের সামাজিক প্রত্যাখ্যান (Social Rejection)।
হঠাৎ করেই জুঁইয়ের মনে পড়ল ওনার প্রিয় ফেসবুক পেজ **'অপরাজিতা ম্যাগাজিন'**-এর একটা লেখার কথা। গতদিনই ওনার টাইমলাইনে লেখাটি এসেছিল। সেখানে চমৎকার করে বলা ছিল—
> "কেউ আপনাকে Reject করলে এত কষ্ট লাগে কেন? সে 'না' বলেছে। হয়তো ভদ্রভাবে, হয়তো হঠাৎ করেই, হয়তো কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই। কিন্তু তারপরও বুকের ভেতর এমন একটা ব্যথা শুরু হয়, যেন আপনি শুধু একজন মানুষকে হারাননি—নিজের একটা অংশও হারিয়েছেন।"
কথাটা কতটা ধ্রুব সত্য! জুঁই ভাবলেন, আজ সন্তানরা ওনার মনের খোরাককে তুচ্ছ করায় ওনার আত্মসম্মান, নিরাপত্তাবোধ এবং নিজের সম্পর্কে ধারণাই বদলে যেতে বসেছিল। সন্তানরা যখন ওনার রান্নাবান্না বা নাতি-নাতনিকে সামলানোর কাজকে হাসিমুখে গ্রহণ করত, তখন ওনার মনে হতো—*"আমি গুরুত্বপূর্ণ, আমি মূল্যবান।"* আর আজ যখন ওনার ভেতরের সৃজনশীল সত্ত্বাটাকে ওরা প্রত্যাখ্যান করল, তখন মনের অবচেতনে বার্তা তৈরি হলো—*"তবে কি আমার মধ্যেই কোনো সমস্যা আছে? এই বয়সে এসে আমি কি সত্যিই মানহীন কিছু করছি?"*
কিন্তু পরক্ষণেই জুঁইয়ের মনে হলো অপরাজিতা ম্যাগাজিনের সেই অমোঘ সান্ত্বনা: **"বাস্তবে Rejection সবসময় আপনার মূল্য নির্ধারণ করে না। আমরা প্রায়ই অন্যের সিদ্ধান্তকে নিজের পরিচয়ের সাথে মিশিয়ে ফেলি। সেখানেই কষ্টটা আরও বড় হয়ে যায়।"**
• --
৩. নিজের সত্ত্বার পুনরুত্থান
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক প্রত্যাখ্যান মস্তিষ্কের সেই অংশগুলোকে সক্রিয় করতে পারে, যেগুলো শারীরিক ব্যথার সাথে জড়িত। জুঁই ওনার হাঁটুর ব্যথার চেয়েও আজ বুকের ভেতরের সেই তীব্র ব্যথাটা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিলেন। কিন্তু তিনি তো আর সেই পুরোনো, দুর্বল জুঁই নন। তিন মাস ধরে আমেনা আপার হাত ধরে, অন্তর্জালের দুনিয়ায় হাজারো পাঠকের ভালোবাসায় তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।
আজকের দিনটাই তো ওনার জন্য এক মস্ত বড় উদাহরণ। নিজের ঘরে যে মা আজ অবহেলিত, "ন্যাকামি" করার অপবাদে অভিযুক্ত; বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আলো-আঁধারি ঘরে স্বনামধন্য প্রকাশক জামিল ভাই থেকে শুরু করে ইডেন কলেজের তরুণী টয়া—সবাই ওনার মতামতকে কতটা শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করেছে! জামিল ভাই ওনাকে সামনের বইমেলার মূল সংকলনটির গল্প বাছাইয়ের প্রধান দায়িত্ব দিয়েছেন।
জুঁই বিছানা থেকে উঠে ডায়েরি আর কলমটা হাতে নিলেন। অপরাজিতা ম্যাগাজিনের পাতায় পড়া কথাগুলো ওনার মনে জেদ আনিয়ে দিল—*"যে বইটা একজন পাঠকের ভালো লাগেনি, সেটাই আরেকজনের প্রিয় বই হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টা ঠিক তেমন। বাদল বা প্রিয়া আমার লেখার মূল্যায়ন করতে পারেনি মানেই আমার লেখা মূল্যহীন নয়।"*
তিনি টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে লিখতে বসলেন। ওনার চারপাশের কাল্পনিক চরিত্ররা আবার ওনার কলমের ডগায় এসে ভিড় জমাতে লাগল। নিজের একাকীত্ব, দুঃখ আর সন্তানদের দেওয়া রিজেকশনকে তিনি আজ ওনার শক্তির জ্বালানি বানিয়ে নিলেন।
• --
৪. এক নতুন সকালের সুরভী
পরদিন সকাল। প্রতি সপ্তাহের শনিবারের মতো আজ আর জুঁই সাত সকালে উঠে রান্নাঘরে ছোটেননি। তিনি নিজের ঘরে বসে আরাম করে এক কাপ চা খাচ্ছিলেন।
বাইরে তখন প্রিয়া আর বাদলের ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে। প্রতিদিন যে মা সকাল আটটার আগেই সবার টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে দেন, আজ সাড়ে আটটা বাজলেও ওনার ঘরের দরজা বন্ধ। প্রিয়াকে আজ বাধ্য হয়েই রান্নাঘরে ঢুকতে হয়েছে। বাদলকে নিজের অফিসের কাপড়ের জন্য আলমারি হাতড়াতে হচ্ছে। জুঁই ঘর থেকে বের না হলেও বুঝতে পারছিলেন—ওনার একটা মাত্র মৃদু সিদ্ধান্ত এই সংসারের অভ্যস্ত নিয়মকে এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছে।
একটু পর জুঁই ড্রয়িংরুমে এলেন। ওনার পরনে সুন্দর একটা সুতি শাড়ি, চোখে চশমা। ওনাকে দেখে বাদল কিছুটা অপরাধী চোখে তাকাল, কিন্তু ওনার মুখের গাম্ভীর্য দেখে কিছু বলার সাহস পেল না।
প্রিয়া ডাইনিং টেবিল থেকে বলল, "মা, নাস্তা টেবিলে দেওয়া হয়েছে। খাবেন আসুন।"
জুঁই শান্ত গলায় বললেন, "তোমরা খেয়ে নাও মা। আমি আজ একটু আমেনা আপার বাসায় যাব। ওখান থেকে প্রকাশনীতে একটা দরকারি কাজ আছে।"
বাদল এবার আমতা আমতা করে বলল, "আম্মু... কাল আসলে অফিসের কাজের প্রেশারে মেজাজটা গরম ছিল। তাই ওভাবে বলে ফেলেছিলাম। তুমি একা কেন যাবা? মাহফুজকে বলব গাড়ি নিয়ে আসতে?"
জুঁই ছেলের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসলেন। এই হাসিতে কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল এক পরম উদাসীনতা। তিনি বললেন, "না বাবা, লাগবে না। আমি একাই যেতে পারব। নিজের দেখাশোনা আমি নিজেই করতে পারি।"
• --
৫. কিছু 'না' আসলে সুরক্ষা
বাসা থেকে বের হয়ে রিকশায় চড়তেই জুঁইয়ের মাথা থেকে যেন এক বিশাল বোঝা নেমে গেল। সকালের তাজা বাতাস ওনার চোখে-মুখে এসে লাগছিল। তিনি ফোনের ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আবারও সেই অপরাজিতা ম্যাগাজিনের পোস্টটির শেষ লাইনে এসে থমকে দাঁড়ালেন:
> "আপনার মূল্য আপনার ভেতরেই আছে। আর আল্লাহর কাছে আপনার মূল্য কোনো প্রত্যাখ্যান কমিয়ে দিতে পারে না। আজ যে 'না' শুনে আপনার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে, হয়তো একদিন সেই 'না'-এর জন্যই আপনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করবেন। সব হারানো সুযোগ ক্ষতি নয়। কিছু 'না' আসলে সুরক্ষা।"
জুঁই আকাশটার দিকে তাকালেন। ওনার মনে হলো, বাদল আর বিপাশা যদি ওনার লেখাকে সহজে মেনে নিত, তবে হয়তো তিনি চিরকাল এই সংসারের চার দেয়ালের মাঝেই আটকে থাকতেন। ওদের সেই "না" এবং অবহেলাই আজ ওনাকে বাধ্য করেছে নিজের একটা স্বাধীন জগত তৈরি করতে। সন্তানদের এই প্রত্যাখ্যানই ওনাকে ঘর থেকে বের করে এনেছে, ওনাকে "জেবুন্নেসা জুঁই" নামে পুনর্জন্ম দিয়েছে।
সামনের বইমেলায় ওনার নিজের নামের বই আসবে। এবার আর তিনি সেই খবর লুকিয়ে রাখবেন না। কেউ ওনার পাশে থাকুক বা না থাকুক, ওনার নিজের সৃষ্টি, ওনার পাঠক আর ওনার ভেতরের অদম্য আত্মবিশ্বাস ওনার সাথে আছে। প্রত্যাখ্যানের বিষণ্ণতাকে জয় করে জুঁই আজ সত্যি এক "অপরাজিতা" নারী।
সংগৃহীত