বাবার শেষ উপহার
কলমে: নমিতা (পর্ব-১)
"টাকা, বাড়ি, গাড়ি আর গয়নাতেই কি বাবার আসল স্মৃতি লুকিয়ে থাকে? নাকি অবহেলিত একটা ভাঙা কাঠের আলমারি বদলে দিতে পারে একটা গোটা পরিবারের ভাগ্য? সম্পত্তি ভাগের দিনে সবাই যখন কোটি টাকার মোহে অন্ধ, তখনই বেরিয়ে এলো এক অদ্ভুত গোপন সত্য..."
📖 পড়ুন এক অবহেলিত ছেলের জীবনের সত্য উপলব্ধি নিয়ে লেখা এক অসাধারণ গল্প— বাবার শেষ উপহার - পর্ব-১
বাবার মৃত্যুর ঠিক চল্লিশ দিন পার হয়েছে আজ। চারপাশের কান্নাকাটি আর শোকের আবহটা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। আজ ঢাকাগামী মিরপুরের পৈতৃক বাড়িতে জড়ো হয়েছেন আমাদের আত্মীয়-স্বজন সবাই। উদ্দেশ্য একটাই—বাবার রেখে যাওয়া কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা করা।
ড্রয়িংরুমের can-মাঝখানে মা একটি লোহার বাক্স এনে রাখলেন। সেই বাক্সের ভেতরেই বন্দি ছিল বাবার জীবনের সব সঞ্চয়: ধানমন্ডির বিলাসবহুল বাড়ি, তাঁর প্রিয় টয়োটা অ্যালিয়ন গাড়ি, ব্যাংকে জমা থাকা বিপুল পরিমাণ টাকা এবং দাদীর রেখে যাওয়া খাঁটি সোনার গয়না।
সোফায় বসে বড় ভাই রাশেদ আর তার স্ত্রী তানিয়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। অন্য পাশে বড় বোন নীলা আর তার স্বামী সোহেল যেন আগে থেকেই মনে মনে হিসেব কষে বসে আছে। আর আমি? ড্রয়িংরুমের এক কোণে একটা পুরোনো সোফায় চুপচাপ বসে রইলাম—যেখানে ছোটবেলা থেকেই যেকোনো পারিবারিক আলোচনায় আমাকে বসিয়ে রাখা হতো। যেন এই ঘরের আলো-বাতাসে আমার কোনো অধিকার নেই, আমি এই পরিবারের কেউ নই।
মা একে একে বাক্স থেকে দলিল আর চাবি বের করতে লাগলেন। এক মুহূর্তের মধ্যে বাবার ধানমন্ডির কোটি টাকার বাড়ি চলে গেল বড় ভাই রাশেদের নামে। মা বললেন, "রাশেদের সংসারের খরচ বেশি। বাড়িটা ওই পাবে।" রাশেদ শুধু মাথা নাড়ল, যেন সে আগে থেকেই জানত এটা তারই হতে চলেছে।
এরপর মা গাড়ির চাবি আর কাগজ তুলে দিলেন নীলার হাতে, বললেন, "তোর বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেওয়া করতে সুবিধা হবে।" নীলা তৃপ্তির হাসি হাসল।
ব্যাংকের টাকার হিসেবও নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। আট লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা রাশেদের, আর চৌদ্দ লাখ টাকা দেওয়া হলো নীলাকে। এমনকি দাদীর সোনার গয়নাগুলোও নীলার ঝুলিতেই গেল। মুহূর্তের মধ্যে দুই কোটিরও বেশি টাকার সম্পত্তি ভাগ হয়ে গেল, কিন্তু কেউ একবারের জন্যও আমার নাম উচ্চারণ করল না।
সবশেষে মা আমার দিকে তাকালেন। ঘরের একদম কোনায় আঙুল দেখিয়ে অত্যন্ত শীতল গলায় বললেন, "ওটাই তোর জন্য আছে।"
আমি তাকিয়ে দেখলাম—বাবার সেই পুরোনো, জরাজীর্ণ, লাল রঙের কাঠের আলমারিটা। রঙ চটে গেছে বহু বছর আগে। একটা পা ভাঙা, তাই নিচে একটা ইট দিয়ে কোনোমতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
আমার ভাবি তানিয়া হেসেই খুন, "ওটা তো নামাতে গেলেই ভেঙে যাবে!"
নীলা মুখ বাঁকিয়ে বলল, "ওটা বাসায় নিলে তো ঘরটাই নষ্ট লাগবে।"
মা আমার দিকে সেই চেনা দৃষ্টিতে তাকালেন, যে দৃষ্টিতে ছোটবেলা থেকেই আমাকে কম দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় তাকাতেন। মা বললেন, "তুই তো ছোট ছেলে। এত লোভ করিস না।"
'লোভ'? শব্দটা শুনে আমার নিজের ভেতরেই হাসি পেয়ে গেল।
রাশেদ ছিল এই বাড়ির গর্ব, আর নীলা সবার আদরের মেয়ে। আর আমি? আমি ছিলাম সবসময় সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেওয়া এক উপজাত মানুষ। রাশেদের জন্য দামি কোচিং, নীলার জন্য নতুন নতুন জামাকাপড়; আর আমি পড়াশোনা করেছি পুরোনো বই কিনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছি। এমনকি চাকরি পাওয়ার পর নিজের জমানো টাকা থেকে রাশেদকে ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্টের জন্য টাকা ধার দিয়েছিলাম। আজ আট বছর হয়ে গেছে, সে একটা টাকাও ফেরত দেয়নি। যখনই প্রতিবাদ করেছি, মা একটাই কথা বলেছেন—"পরিবারে কেউ হিসাব রাখে না।"
কিন্তু আজ আমি মনে মনে হিসেব করলাম। ধানমন্ডির বাড়ি রাশেদের, গাড়ি-টাকা-গয়না নীলার, আর আমার ভাগে রইল এই ভাঙা আলমারি। সবাই যখন আমার এই 'উত্তরাধিকার' দেখে হাসাহাসি করছে, আমি শুধু হেসে বললাম, "আলমারিটাই আমি নেব।"
আমি ধীরে ধীরে আলমারিটার কাছে গেলাম। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম তার ক্ষয়ে যাওয়া লাল রঙ। এই আলমারিটাকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি। বাবার পাঞ্জাবি, পুরোনো লুঙ্গি, কিছু যন্ত্রপাতি আর পুরোনো খবরের কাগজ—সবকিছু এখানেই থাকত। ভেতরে কিছু ছোট ছোট বাক্সও ছিল, যেগুলো কেউ কখনো খুলে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি।
আমি নিকু হয়ে ভাঙা পায়ের নিচের ইটটা সরাতেই আলমারিটা কেঁপে উঠল। এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা আমার চাচা কামাল কপাল কুঁচকে তাকালেন। নীলা তখনো ফোনে স্ক্রল করছে, আর তানিয়া ভাবি আবার হেসে উঠল।
কিন্তু... আমি মায়ের দিকে তাকাতেই থমকে গেলাম। এক মুহূর্তের জন্য মায়ের মুখের অভিব্যক্তি পুরোপুরি বদলে গেল। সেটা বিরক্তি ছিল না, রাগও ছিল না। ওটা ছিল স্পষ্ট 'ভয়'!
ঠিক তখনই আমার মনের ভেতর একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমি বুঝতে পারলাম—এই জরাজীর্ণ আলমারির সাথে এমন কিছু গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে, যা মা কোনোভাবেই চান না আমি বা অন্য কেউ জানতে পারি।
আমি সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। ঘরের সবাইকে একবার দেখে নিয়ে একদম শান্ত গলায় বললাম, "আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাব না। এটাই আমার প্রাপ্য।"
আসলে, অনেক সময় মানুষ যেটাকে সবচেয়ে মূল্যহীন মনে করে অবহেলা করে, সেটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার। আর অনেক সময় একটা পুরোনো ভাঙা আলমারিই লুকিয়ে রাখে এমন এক গোপন সত্য—যা পুরো পরিবারের জীবন ওলটপালট করে দিতে পারে!
(চলবে...)
সংগৃহীত