আত্মসম্মানের ডানা: সংযুক্তার ফিরে আসার গল্প

চিরকালের শান্ত, জড়সড় মেয়েটিকে বন্ধুদের মাঝে এভাবে প্রাণখুলে হাসতে দেখে আমি সত্যিই অবাক হলাম। সংযুক্তা আজ মুক্ত, তার আত্মসম্মানের ডানা মেলে সে উড়ছে নিজের আকাশে।

গত সপ্তাহের একটা সাধারণ দুপুর। কলিগদের সাথে লাঞ্চ করতে একটা রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলাম। চারপাশের গুঞ্জন আর চেনা খাবারের সুবাসের মাঝেই হঠাৎ চোখটা আটকে গেল উল্টোদিকের একটা টেবিলে। সেখানে বসে মনের আনন্দে হাসছে একদল ছেলেমেয়ে। সবার বয়স ওই তিরিশের আশেপাশেই হবে—হয়তো কোনো বন্ধুদের গ্রুপ। কিন্তু আমার চোখ আটকে রইল সেই গ্রুপের ঠিক মাঝখানে থাকা মেয়েটির দিকে। এ তো সংযুক্তা!

সংযুক্তা আমার আগের অফিসের জুনিয়র কলিগ ছিল। প্রায় বছর छয়েক আগের কথা। তখন আমাদের সম্পর্কটা বেশ ভালোই ছিল। যতদূর মনে পড়ে, সে সময় ও কখনো এভাবে বন্ধুদের সাথে আউটআউটিংয়ে যেত না। এমনকি অফিসের কলিগরা মিলে কোনো প্ল্যান করলেও ও বারবার এড়িয়ে যেত; বলত, "আমার এসব একদম ভালো লাগে না।" সবসময় কেমন যেন একটা গুটিয়ে থাকা, চুপচাপ স্বভাব ছিল ওর। সেই চিরকালের শান্ত, জড়সড় মেয়েটিকে বন্ধুদের মাঝে এভাবে প্রাণখুলে হাসতে দেখে আমি সত্যিই অবাক হলাম।

খানিকটা সময় পর সংযুক্তার চোখ পড়ল আমার দিকে। আমাকে দেখেই ও হাসিমুখে উঠে এলো আমাদের টেবিলের কাছে। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা আরও একধাপ বাড়ল। ওর পরনে জিনসের প্যান্ট আর বেশ আধুনিক ডিজাইনের একটা টপ। অথচ আগে ওকে কখনো আমি এমন পোশাকে দেখিনি। সবসময় কুর্তি নয়তো সালোয়ার কামিজ পরে আসত। আমরা কোনোদিন অন্য কিছু পরার কথা বললে ও কিছুতেই রাজি হতো না।

ওর সাথে কুশল বিনিময়ের পর আমি আর কৌতুহল চেপে রাখতে পারলাম না। বলেই ফেললাম,

> "তুই তো অনেক বদলে গেছিস রে! বেশ ভালো লাগছে এখন। আগে কেমন যেন সবসময় সিঁটিয়ে থাকতিস।"

ও আমার কথায় আলতো করে হাসল। তারপর ঘাড় দুলিয়ে বলল, "এখন যাই গো, বন্ধুরা ওয়েট করছে। পরে তোমায় ফোন করব।"

• --

ভাঙা সম্পর্কের অন্তরালে

গতকাল সত্যিই সংযুক্তা ফোন করেছিল। সাধারণ কিছু খবরাখবরের পর আমি জিজ্ঞেস করলাম,

"বিতান কেমন আছে? কবে বিয়ে করছিস তোরা?"

প্রশ্নটা শুনতেই ফোনের ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো। ও একটু চাপা স্বরে বলল,

"বিতান আমার জীবনে আর নেই দিদি। দু-বছর হলো আমরা আলাদা হয়ে গেছি।"

আমি আঁতকে উঠলাম, "সেকি রে! কেন? তোদের তো অনেক বছরের সম্পর্ক। কেন ব্রেকআপ করল বিতান?"

ও শান্ত গলায় উত্তর দিল, "ও নয় দিদি। আমিই আর ওর সাথে এগোতে চাইলাম না সম্পর্কটা নিয়ে।"

আমি আকাশ থেকে পড়লাম, "হোয়াট? কী বলছিস? তুই তো ওকে ভীষণ ভালোবাসতিস। আমি নিজে দেখেছি তুই ওকে নিয়ে কতটা সিরিয়াস ছিলি!"

"না গো দিদি, সম্পর্কটা হয়তো ঠিকই ছিল, কিন্তু ভালোবাসাটা বোধহয় ছিল না," সংযুক্তা বলতে শুরু করল। "বিতানের সব অপিনিয়ন আমায় মেনে চলতে হতো। ওর মডার্ন ড্রেস পছন্দ নয়, তাই আমি সেসব পরতে পারতাম না। ওর ভালো লাগে না আমি এমন কোন বন্ধুদের বা কলিগদের গ্রুপে যাই যেখানে ছেলেরা আছে—তাই আমি কোন আউটিংয়ে যেতাম না। এরকম আরও অজস্র বিষয় ছিল। অথচ আমার কোন অধিকার ছিল না ওর ব্যাপারে কথা বলার। ও রাত অবধি পাবে বসে ড্রিংক করতে পারে, হাজার গণ্ডা মেয়ে বান্ধবী নিয়ে আউটিংয়ে যেতে পারে, কিন্তু আমি সে সব নিয়ে কথা বলতে গেলেই জুটত কেবল অপমান আর গালিগালাজ।"

ও একটু থামল, তারপর আবার বলতে লাগল, "শুধু এটুকুই নয়, বিতান কথায় কথায় মেল ইগো দেখাতো। কথায় কথায় রাগ দেখানো, কথা বন্ধ করে দেওয়া, পান থেকে চুন খসলেই সম্পর্ক ভেঙে দেবার হুমকি দেওয়া—এসব ছিল ওর রোজকার স্বভাব। আর এসবের পরও প্রতিবারই আমাকেই গিয়ে ওকে 'সরি' বলে মেটাতে হতো। কারণ আমার কষ্ট হতো ও রেগে থাকলে।"

• --

আত্মসম্মানের নতুন সূর্যোদয়

"তবে দিনের পর দিন এভাবে চলতে চলতে আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম, জানো তো দিদি?" সংযুক্তার গলায় এবার এক দায়িত্বশীল সুর। "বারবার মনে হচ্ছিল—সম্পর্কে তো রয়েছি, কিন্তু সে সম্পর্কে কি আদৌ কোনো ভালোবাসা আছে? আমার প্রতি ওই মানুষটার বিন্দুমাত্র সম্মান আছে? যে সম্পর্কে একজনকে কেবল দ্বিতীয় জনের সব কথা মেনে চলতে হয়, অন্যজন কেবলই নিজের মর্জিমত চলে—সেটা আর যাই হোক, ভালোবাসা হতে পারে না। যে সম্পর্কে রোজ আমায় নিজেকে প্রমাণ করতে হয়, আত্মসম্মানের সাথে আপোষ করতে হয়, সে সম্পর্ক থাকার চেয়ে না থাকাই বোধহয় ভালো। কারণ এ সম্পর্ক জীবনে আমায় কোনোদিন ভালো রাখতে পারবে না।"

আমি চুপ করে শুনছিলাম। ও বলে চলল, "আমি এই ব্রেকআপটা করার পর অনেকে আমায় বলেছিল, 'এতদিনের সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে ভুল করলি।' কিন্তু আমি একেবারেই মনে করি না যে কোনো ভুল করেছি। কোনো সম্পর্ক কেবল বেশিদিনের বলেই ভুল জেনেও সেটাকে টিকিয়ে রাখতে হবে? এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। যে ভালোবাসার সম্পর্কে সহমর্মিতা থাকে না, সম্মান থাকে না, বিশ্বাস থাকে না, তা আমায় ভালো রাখবে কী করে সারাজীবন? আমি জানি অনেক মেয়েই হয়তো এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তারা ভয় পায় বিচ্ছেদের সাময়িক কষ্টটাকে। কিন্তু ওই কষ্টটুকু এড়াবার জন্য সারাজীবনের যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানোও তো ভুল। তাই না বল দিদি? এখন আমি অনেক ভালো আছি। নিজের ইচ্ছে মতো চলতে পারি। কথায় কথায় কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না, নিজেকে প্রমাণও করতে হয় না। ভয়ে ভয়ে ভালোবাসার ভিক্ষাও চাইতে হয় না।"

• --

একটি অনুভূতির শেষ কথা

সংযুক্তার মুখে শোনা কথাগুলো এখনো আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সত্যিই তো, কত মেয়ে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত নিজের ভালো থাকাটুকু আর আত্মসম্মানটুকু স্যাক্রিফাইস করে দেয় শুধু সম্পর্কের দোহাই দিয়ে। সম্পর্ক হয়তো টিকে যায় ঠিকই, কিন্তু তাদের ভালো থাকাটা আর কোনোদিন হয় না।

সংযুক্তার মতো মনের জোর ঈশ্বর সকল মেয়েকে দিন—এই প্রার্থনাই করি। তাহলেই হয়তো সত্যি সত্যি জিতে যাবে আমাদের চারপাশের সব 'খারাপ থাকা' মেয়েগুলো, কোনো একদিন।


সংগৃহীত