অর্ধেক আলো ও তিনটি জীবন

শীতের কবলে বান্দিপোরা

১৪ ফেব্রুয়ারি। দিনটি বিশ্বের কাছে প্রেমের, কিন্তু উত্তর কাশ্মীরের বান্দিপোরা সেক্টরে এটি ছিল কেবলই হাড়কাঁপানো এক লড়াইয়ের প্রস্তুতি। আকাশ থেকে চুঁইয়ে পড়া কুয়াশা যেন বাতাসের গায়ে বরফের চাদর জড়িয়ে দিয়েছে। ৪৫তম ব্যাটালিয়নের অস্থায়ী ক্যাম্পের ভেতর কমান্ড্যান্ট অর্জুন সেন ম্যাপের ওপর ঝুঁকে ছিলেন।

টর্চের আলোটা মৃদু কাঁপছে। ইনটেল বা গোয়েন্দা তথ্য বলছে—গ্রামের প্রান্তে এক পরিত্যক্ত কাঠের গুদামে লস্কর-ই-তৈবার তিনজন কট্টর জঙ্গি আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু অর্জুনের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ অন্য কারণে। সোর্স জানিয়েছে, ভেতরে স্থানীয় এক বৃদ্ধ এবং তার আট বছরের নাতিকে জিম্মি করা হয়েছে।

অর্জুন তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ডকে বললেন, "রাহুল, অপারেশন ক্লিন চাই। কিন্তু মনে রেখো, ভেতরে একটা শিশু আছে। কোল্যাটারাল ড্যামেজ যেন শূন্য হয়।"

মৃত্যুর নিস্তব্ধতা

রাত ২টো। বরফের ওপর দিয়ে নিঃশব্দে এগোচ্ছিল কমান্ডো দলটি। প্রতিটি নিশ্বাস ধোঁয়ার মতো বেরিয়ে আসছে। কাঠের বাড়িটার সামনে পৌঁছে অর্জুন থামলেন। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু দূরে একটা তুষার চিতা ডাকল কি না বোঝা গেল না।

অর্জুন লাউডহেলার হাতে নিলেন। তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধতা চিরে দিল, "তোমরা চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে আছো। শিশুদের ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করো।"

কোনো উত্তর নেই। জানালার ভাঙা কাঁচ দিয়ে চুঁইয়ে আসা মৃদু আলোর আভা এক অশুভ সংকেত দিচ্ছিল। হঠাৎ একটা কর্কশ হাসির শব্দ শোনা গেল ভেতর থেকে, আর তার পরেই—গুড়ুম!

রক্তের আল্পনা

প্রথম গ্রেনেডটা ফাটল অর্জুনের থেকে দশ ফুট দূরে। বরফের শুভ্রতা মুহূর্তে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল। শুরু হলো 'ফায়ার ফাইট'। দুই পক্ষ থেকেই গুলির বৃষ্টি। কাঠের দেওয়ালে গুলির আঘাত লাগার শব্দটা যেন কোনো এক বীভৎস বাদ্যযন্ত্রের মতো শোনাচ্ছিল।

মাঠের এক কোণে পজিশন নিয়ে অর্জুন দেখছিলেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে। জঙ্গিরা মরিয়া। হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় ভেসে এলো এক ক্ষীণ কণ্ঠ। কোনো যোদ্ধার হুঙ্কার নয়, এক নিষ্পাপ শিশুর আর্তনাদ। "দাদু! ভয় লাগছে!"

অর্জুনের হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তিনি জানতেন, ওপর থেকে ভারী শেলিং করলেই ঘরটা উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু ওই শিশুটি?

একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত

"কেউ ফায়ার করবে না!" অর্জুন ওয়্যারলেসে গর্জে উঠলেন। "আমি ভেতরে ঢুকছি। আমাকে কভার দাও।"

রাহুল চিৎকার করে উঠল, "স্যার, ওটা সুইসাইডাল হবে! ওরা ভেতরে বোমা পেতে রেখেছে।"

অর্জুন কানে নিলেন না। তার চোখে তখন নিজের ছেলের মুখটা ভাসছিল, যে কলকাতায় বসে হয়তো বাবার ফেরার দিন গুনছে। যুদ্ধের ময়দানে কমান্ড্যান্ট হওয়ার চেয়েও বড় পরিচয়—তিনি একজন মানুষ।

নরকের প্রবেশদ্বার

লাথি মেরে দরজাটা ভেঙে অর্জুন ভেতরে ঢুকলেন। ঘরটা ধোঁয়ায় অন্ধকার। বারুদ আর কাঁচা রক্তের গন্ধে দম আটকে আসছে। এক কোণে বৃদ্ধ দাদু তার নাতি আকাশকে আগলে বসে আছেন। আকাশের চোখে যে আতঙ্ক, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন।

সামনে দুজন জঙ্গি। একে-৪৭ উঁচিয়ে তারা ট্রিগার চাপল। অর্জুন চোখের পলকে স্লাইডিং করে পজিশন নিলেন। তার সার্ভিস রিভলভার থেকে তিনটি বুলেট নিখুঁত লক্ষ্যে বিদ্ধ হলো দুই জঙ্গির বুকে। কিন্তু তৃতীয়জন ছিল ছাদের কড়িকাঠের আড়ালে。

আলোর বিদায়

অর্জুন যখন আকাশকে কোলে তুলে নিয়ে দরজার দিকে দৌড় শুরু করেছেন, ঠিক তখনই ছাদ থেকে একটি গুলির ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল। বুলেটটা অর্জুনের হেলমেটের পাশ দিয়ে এসে তার ডান চোখে বিদ্ধ হলো।

প্রচণ্ড এক যন্ত্রণায় অর্জুনের পৃথিবীটা দুলে উঠল। কিন্তু তিনি আকাশকে ছাড়লেন না। শরীরের সব শক্তি দিয়ে শিশুটিকে বাইরে ছুড়ে দিলেন রাহুলের দিকে। তারপর এক হাত চোখে চেপে অন্য হাতে শেষ গ্রেনেডটার পিন খুললেন অর্জুন। এক বিকট বিস্ফোরণ, আর অর্জুনের পৃথিবীটা চিরতরে অন্ধকারে ডুবে গেল।

প্রতীক্ষার প্রহর

কলকাতার সল্টলেকের বাড়ি। মালতী সেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কপালে সিঁদুর পরার সময় হাতটা কেঁপে উঠল। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। ওপার থেকে ব্যাটালিয়ন অ্যাডজুট্যান্টের গলা—অর্জুন বেঁচে আছেন, কিন্তু...。

হাসপাতালের করিডোরে মালতী যখন পৌঁছালেন, সাদা ব্যান্ডেজে মোড়া অর্জুনের মুখ দেখে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। ডাক্তার বললেন, "আমরা ওর প্রাণ বাঁচাতে পেরেছি, কিন্তু ডান চোখটা আর নেই। মাথায় স্প্লিন্টার ঢুকেছিল, স্মৃতিভ্রম বা অন্য জটিলতা হতে পারে।"

মালতী অর্জুনের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। কানে কানে বললেন, "তুমি ফিরবে বলেছিলে, ফিরেছো। অর্ধাঙ্গিনী হয়ে আমি তোমার অর্ধেক আলোতেই পুরো পৃথিবী দেখে নেব।"

দশ বছর পর

দশ বছর কেটে গেছে। অর্জুন এখন অবসরপ্রাপ্ত। তার ডান চোখের ওপর একটা কালো প্যাচ। আয়নায় তাকালে এখন আর তার কষ্ট হয় না। তিনি এখন শিশুদের একটা প্যারা-মিলিটারি ট্রেনিং সেন্টারে ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কাজ করেন।

একদিন এক দীর্ঘদেহী যুবক তার সামনে এসে দাঁড়াল। যুবকের নাম আকাশ। দশ বছর আগেকার সেই ছোট্ট শিশুটি আজ বড় হয়েছে। সে অর্জুনের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।

আকাশ বলল, "স্যার, আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছি। কিন্তু আমি লড়তে চাই না, আমি আপনার মতো প্রাণ বাঁচাতে চাই।"

অর্জুন তার একমাত্র সচল চোখে জল নিয়ে হাসলেন। তিনি বুঝলেন, সেদিন তার হারানো চোখটা বিফলে যায়নি। সেই ত্যাগের জমিতেই আজ এক নতুন দেশপ্রেমিক জন্ম নিয়েছে।

সমাপ্তি ও দর্শন

কাশ্মীরের সেই পোড়া বাড়িটা এখন আর নেই। সেখানে এখন আপেল বাগান। ১৪ ফেব্রুয়ারি আসে, চলেও যায়। অর্জুন এখন রাতে বারান্দায় বসে যখন এক চোখে আকাশের তারা দেখেন, তিনি অনুভব করেন—আলো আসলে চোখের মণি দিয়ে দেখা যায় না, আলো দেখতে হয় কর্ম দিয়ে।

তিনটি জীবন—অর্জুন, মালতী এবং আকাশ। একজন হারিয়েছিলেন, একজন আগলে রেখেছিলেন, আর একজন নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছিলেন। এই তিনটি জীবনের সুতোয় গাঁথা এক ইতিহাস, যা চিৎকার করে বলে—যুদ্ধ কেবল সংহার নয়, যুদ্ধ কখনো কখনো রক্ষা করার মহান ব্রত।