মফস্বলের গণ্ডি পেরিয়ে গ্ল্যামার দুনিয়ায় নিজের শর্তে বাঁচার গল্প
রিপ্তা দে
মফস্বলের সাধারণ গণ্ডি পেরিয়ে গ্ল্যামার দুনিয়ায় নিজের শর্তে বাঁচার নামই তো আসল ‘অপরাজিতা’
সাক্ষাৎকারে: রিক্তা বিশ্বাস
“মফস্বলের সাধারণ গণ্ডি পেরিয়ে গ্ল্যামার দুনিয়ায় নিজের শর্তে বাঁচার নামই তো আসল ‘অপরাজিতা’। কোনো সমঝোতা বা সর্টকাটের কাছে মাথা নত না করে, নিজের যোগ্যতা আর সততাকে অস্ত্র করে যেভাবে রিপ্তা এগিয়ে চলেছে, তা সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক।হুগলীর মফস্বল শহর থেকে শুরু হয়েছিল যে স্বপ্ন, আজ তা ডানা মেলেছে কলকাতার টালিগঞ্জে। মাত্র ১১ বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে বিনোদন জগতে পা রাখা, তারপর সময়ের হাত ধরে অভিনয় থেকে মডেলিংয়ের গ্ল্যামার দুনিয়ায় নিজেকে মেলে ধরা। চারপাশের মানুষের হাজারো কটাক্ষ আর মফস্বল থেকে কলকাতায় যাতায়াতের কঠিন স্ট্রাগল—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি রিপ্তা দে-কে। "সময়ের মোড় তাঁকে বিনোদন জগত থেকে ফ্যাশন জগতে নিয়ে এসেছে..."মফস্বলের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে নিজের জায়গা তৈরি করাটা সহজ ছিল না। কিন্তু ভেতরের জেদ আর ফ্যাশনের প্রতি ভালোবাসা থাকলে যে সব বাধা পার করা যায়, তা প্রমাণ করেছেন রিপ্তা । মায়ের স্বপ্নকে নিজের চোখে মেখে আজ তিনি টালিগঞ্জের একজন লড়াকু মডেল ।মফস্বলের শান্ত পরিবেশ থেকে কলকাতার এই ঝকঝকে আলো তে নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি । আজ জানবো রিপ্তা দে-এর ফ্যাশন জার্নির এক্সক্লুসিভ গল্প! সঙ্গে অপরাজিতা ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি রিক্তা বিশ্বাস।
১।তোমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কোথায়?
:- আমি হুগলীর মেয়ে, আমার সবটাই ওখানে। তবে এখন আমি টালিগঞ্জে থাকি।
২।হুগলী মানে তো একদমই মফস্বল অঞ্চল, সেখানে থেকে হটাত গ্ল্যামার দুনিয়ায় আসার ইচ্ছে কিভাবে মাথায় আসলো তোমার ?
:- একদম-ই ছোটবেলার কথা বলি, আমার ইচ্ছের থেকে ও বেশি ইচ্ছে ছিল আমার মা-এর। আর আমি খুব একটা এইসব বিষয়ে জানতাম না , কিন্তু ভালোবাসতাম গ্ল্যামার দুনিয়া-টাকে। ভালো ভালো আর্টিস্ট কে দেখতাম কাজ করতে, আমার খুব ভালো লাগতো, সেখান থেকেই আমার প্রথমে ইচ্ছে ছিল অভিনেত্রী হবার। আমার আসা এই প্রফেশন-এ তখন আমার বয়স ১১ বছর।
৩।মফস্বল অঞ্চল থেকে এই ফ্যাশন জগতে আসার জার্নিটা কতটা কঠিন ছিল ?
:- হ্যাঁ, মফস্বল থেকে এই গ্ল্যামার দুনিয়ায় আসাটা সহজ ছিল না। এই প্রথম প্রথম যাতায়াত করা, কলকাতার লাইফস্টাইলের সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং অডিশনগুলোর খোঁজ রাখাটা বেশ কঠিন ছিল। মফস্বলের একটা সাধারণ মেয়ে যখন মডেলিংয়ের স্বপ্ন দেখে, তখন চারপাশের মানুষ সেটা সহজে মেনে নিতে পারে না। অনেকেই অনেক কথা শুনিয়েছে। কিন্তু আমার ভেতরের জেদ আর ফ্যাশনের প্রতি ভালোবাসাই আমাকে টেনে এনেছে এবং তার সাথে সাথে পরিবারের ভীষণ সাপোর্ট ছিল। আজ কাজের সুবিধার্থেই আমি টালিগঞ্জে থাকি, তবে আমার শুরুটা কিন্তু ওই হুগলীর মফস্বল থেকেই।
৪।ইচ্ছে ছিল অভিনেত্রী হবার, তাহলে অভিনয় ছেড়ে মডেলিং কেন?
:- অভিনয় করার ইচ্ছেটা আমার সবসময়ই ছিল,কিন্তু সময়ের মোর আমাকে বিনোদন জগত থেকে ফ্যাশন জগত-এ নিয়ে এসেছে। অভিনেত্রী হওয়ার পেছনে বা অ্যাক্টিংয়ের পেছনে আমি জীবনের বহু বছর সময় দিয়েছি। আমার বাবা-মাও অনেক টাকা-পয়সা খরচ করেছেন আমার এই স্বপ্নটার পেছনে। কিন্তু এত কিছুর পরও, আমার সেই অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্নটা এখনও পর্যন্ত স্বপ্নই থেকে গেছে।"তারপর সময়ের মোর আমাকে ফ্যাশন জগত-এ নিয়ে এসেছে।
৫। এত বছর ধরে এত স্ট্রাগল করলে তুমি অভিনয়ের জন্য, তারপরও স্বপ্ন পূরণ হলো না! এই বিষয়ে ভেঙে পড়োনি কখনো?
:- সত্যি বলতে, ভেঙে পড়িনি বললে একদমই মিথ্যা বলা হবে। যখন জীবনের এতটা মূল্যবান সময়, এনার্জি আর আমার বাবা-মায়ের কষ্টার্জিত টাকা একটা স্বপ্নের পেছনে ঢালার পরও সেটা অধরা থেকে যায়, তখন ভেতর থেকে একটা চরম হতাশা আর কষ্ট আসাই স্বাভাবিক। কিন্তু ওই যে বললাম, আমার মা সবসময় আমার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন আর আমার নিজের ওপর একটা জেদ ছিল। আমি নিজেকে বুঝিয়েছি যে একটা রাস্তা বন্ধ হয়েছে মানেই জীবন শেষ হয়ে যায়নি। অভিনয় হয়তো আমায় ফিরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু গ্ল্যামার দুনিয়ার প্রতি আমার ভালোবাসা তো কমেনি। সেই অপূর্ণ স্বপ্নের কষ্টটাকেই আমি শক্তিতে রূপান্তর করেছি এবং সময়ের হাত ধরে যখন মডেলিংয়ের সুযোগ এলো, আমি সেটাকে আঁকড়ে ধরেছি। আজ আমি খুশি যে আমি থমকে যাইনি, বরং একটা নতুন মঞ্চে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার লড়াই চালাচ্ছি এবং এখনও আমি নিজেকে তৈরি করছি যাতে আমার পুরনো স্বপ্ন টাকে পুরো করতে পারি তার ও চেষ্টা চলছে। (একটু হেসে)
৬। অভিনয় থেকে বেরিয়ে এই যে মডেলিংয়ে আসা, এই জার্নিটা কি খুবই সহজ ছিল ?
:- না, একদমই না। অভিনয় থেকে মডেলিংয়ের এই রূপান্তরটা বা জার্নিটা মোটেও সহজ ছিল না। আমি বহু বছর অ্যাক্টিংয়ের পেছনে সময় দিয়েছি, আমার বাবা-মাও অনেক টাকা-পয়সা খরচ করেছেন আমার এই স্বপ্নটার পেছনে; তারপরও আমার অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে গেছে। সেই অপূর্ণ স্বপ্নের জায়গা থেকে বের হয়ে নতুন করে মডেলিং জগতে নিজের মাটি শক্ত করাটা ছিল একটা মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। এখানেও তীব্র কম্পিটিশনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি প্রথম আমার দিদির মডেল হিসেবে কাজ করি, তখন তো আমি কিছুই জানতাম না, ফোন দেখে সব টা শিখতাম, তারপর আমি মডেলিং নিয়ে গভির ভাবে জানতে শুরু করি । কিন্তু প্রথম আমার দিদির হাতধরে মডেলিং জগতে আসা, কারন আমার দিদি একজন মেক আপ আর্টিস্ট । কিন্তু জানই তো এই জগতে ও কম্পিটিশন তো অনেক বেশি । তাই কোনো কিছুই আমি সহজে পাইনি, প্রতিটা কদম আমাকে লড়াই করে, নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে অর্জন করতে হয়েছে এবং নিজের যোগ্যতা-তেই আমি বরাবর কাজ করতে চাই।
৭। কখনো কম্প্রোমাইজ করার অফার পাওনি? এই প্রফেশনে তো এটা খুবই কমন একটা বিষয়!
:- হ্যাঁ, এসেছিল। আমি লুকাব না, এই প্রফেশনে এই ধরনের প্রপোজাল বা অফার আসাটা দুর্ভাগ্যবশত খুবই সাধারণ একটা বিষয়। কিন্তু আমি কখনোই সেইসব অফার বা প্রপোজাল মেনে নিতে পারিনি। আমার স্পষ্ট কথা—যে কাজটা আমি আমার নিজস্ব যোগ্যতা, দক্ষতা আর পরিশ্রম দিয়ে পেতে পারি, সেটার জন্য কেন আমি অন্য কোনো উপায়ে কম্প্রোমাইজ করব? আমি মডেলিং পেশাটাকে ভীষণ ভালোবাসি, তাই ভালোবেসেই সততার সাথে কাজটা করতে চাই। কোনো সর্টকাট বা নোংরামির আশ্রয় নিয়ে সাকসেস পাওয়ার চেয়ে, নিজের সততা বজায় রেখে স্ট্রাগল করাটাও আমার কাছে অনেক বেশি সম্মানের।
৮। ভবিষ্যতের কী ইচ্ছে—অ্যাক্টিং নাকি মডেলিং?
:- সত্যি বলতে, অভিনয় করার ইচ্ছেটা তো আমার ছোটবেলার, ওটা আমার মনের খুব কাছের একটা জায়গা। তবে সময়ের মোড় আমাকে আজ মডেলিংয়ে নিয়ে এসেছে এবং এই জগতটাকে ও আমি মন থেকে ভালোবেসে ফেলেছি। তবে হ্যাঁ, আমি নিজেকে আরও গ্রুম করে অভিনয়ের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবো, মডেলিং এর সাথে সাথে। ভবিষ্যতে আমি ২-টো জগতকে নিয়েই এগোতে চাই, কারন ২ টো জগত-এই আমি ভালো বেসে কাজ করতে চাই। অনেক ভালো কাজ করার স্বপ্ন আছে আমার। (একটু হেসে)
মফস্বলের সেই ১১ বছরের মেয়েটি আজ নিজের যোগ্যতায় দুই গ্ল্যামার জগত জয় করার স্বপ্ন দেখছে। পর্দার অভিনয় হোক বা মডেলিং রিপ্তা তাঁর প্রতিভার আলো ছড়াতে থাকুক সর্বত্র। তাঁর এই মিষ্টি হাসি আর লড়াইয়ের গল্প এভাবেই অনুপ্রাণিত করুক আমাদের।“অভিনয় আর মডেলিং—দুই দুনিয়াকেই ভালোবেসে, নিজের সততা ও যোগ্যতার জোরে আগামী দিনে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাক রিপ্তা। তাঁর এই আপসহীন লড়াই এবং ইতিবাচক মানসিকতা আগামী দিনে আরও হাজারো মফস্বলের মেয়েকে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাক। ‘অপরাজিতা’ ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে রিপ্তার আগামী দিনের সমস্ত স্বপ্নের জন্য রইল অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।”