ক্যামেরার সামনেই কেটেছে শৈশব - আজ সেই আলোতেই ডানা মেলেছে এক বড় শিল্পী সিঞ্চনা সরকার
সাক্ষাৎকারে: রিক্তা বিশ্বাস
বিনোদনের ঝলমলে দুনিয়ায় মাত্র পাঁচ বছর বয়সে একজন ড্যান্সার হিসেবে যাত্রা শুরু করে তারপর একজন সফল শিশু অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে মালদার মিষ্টি মেয়ে সিঞ্চনা সরকার। সিঞ্চনা সরকার-এর পথচলার গল্প জানাবো আজ আপনাদের, সঙ্গে অপরাজিতা ম্যাগাজিন-এর প্রতিনিধি রিক্তা বিশ্বাস।
এক খুদে শিল্পী থেকে আজ সফলতার রূপকথা:
মালদা শহরের এক চিলতে রোদমাখা ঘর থেকে শুরু হয়েছিল গল্পটা। তখন ওর বয়স মাত্র পাঁচ বছর। যে বয়সে আর পাঁচটা সাধারণ শিশু পুতুলখেলা, কার্টুন আর রূপকথার রাজপুত্রের গল্পে মেতে থাকে, সেই বয়সেই ছোট্ট মেয়েটি ঘুঙুর বেঁধেছিল পায়ে। প্রথমে বাড়িতে সবাই চেয়েছিলেন সে গান করুক কিন্তু ছন্দ আর তালের এক অদ্ভুত জাদু ছিল তার শরীরে। নাচের সেই সহজাত প্রতিভাই তাকে একদিন টেনে নিয়ে এলো ‘বিন্দাস ডান্স’ রিয়ালিটি শো-এর মঞ্চে। আর ঠিক সেখান থেকেই শুরু হলো বিনোদনের এক নতুন ঝলমলে অধ্যায়। স্টুডিওর বড় বড় কড়া লাইট, ক্যামেরার লেন্স আর মানুষের করতালির মাঝে সেই ছোট্ট মেয়েটি—সিঞ্চনা সরকার—পা রাখল বিনোদন জগতের এক মায়াবী দুনিয়ায়।
শৈশব থেকেই নাচে অসাধারণ পারদর্শী সিঞ্চনা- ‘বিন্দাস ডান্স’ রিয়ালিটি শো-এর মঞ্চে সিঞ্চনার সেই চপলতা আর প্রতিভার স্বাক্ষর চোখ কেড়েছিল টলিউডের পরিচালকদের। সুযোগ এলো স্টার জলসার অত্যন্ত জনপ্রিয় মেগা ধারাবাহিক ‘পটল কুমার গানওয়ালা’-তে। চরিত্রের নাম ‘তুলি’। নিখুঁত অভিনয়, কারন সেটা ছিল একদমই নেগেটিভ একটি চরিত্র, সেখানে তাঁর মিষ্টি সংলাপ আর এক অদ্ভুত চাউনি দিয়ে প্রথম ধারাবাহিকেই সে বাংলার লাখো দর্শকের ড্রয়িংরুমে নিজের জায়গা করে নিল। অভিনয়ের পাশাপাশি চমৎকার গান গাইতে পারা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই খুদে শিল্পী অবশ্য শুধু তুলি চরিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরবর্তীতে সে ‘গোপাল ভাঁড়’, ‘কেশব’ এবং ‘কপালকুণ্ডলা’-র মতো একের পর এক জনপ্রিয় মেগা ধারাবাহিকে অভিনয় করে নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। তারপরে শুটিংয়ের ব্যস্ত শিডিউলের প্রয়োজনে মালদা ছেড়ে কলকাতার নাকতলায় বসবাস করলেও, এত ছোট বয়সে গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের চটকদার জীবন এবং পড়াশোনার মতো দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎকে একসাথে সামলানো সিঞ্চনার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। শৈশবের ক্যামেরার সামনে থেকে আজ এক পরিপক্ক, বড় শিল্পী হয়ে ওঠার পথচলাটা কোনো রূপকথার চেয়ে কম ছিল না। তবে স্কুলের অকুন্ঠ সহযোগিতা, নিজের প্রবল একাগ্রতা আর মেধার জোরে সে অভিনয়ের পাশাপাশি স্কুলের পরীক্ষাতেও সবসময় দুর্দান্ত ফলাফল করে এসেছে। এই দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ে সিঞ্চনার সবচেয়ে বড় শক্তি ও গাইড হলেন তার মা, যিনি একাধারে তার জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং মেন্টর; আর শুটিং ও পড়াশোনার ক্লান্তিকর ব্যস্ততার মাঝে মায়ের হাতের এক প্লেট গরম বিরিয়ানি কিংবা সমুদ্রের পাড়ে কোলাহলমুক্ত হাওয়া যেন এই খুদে তারকার সব ক্লান্তি এক নিমেষে দূর করে দেয়।
শৈশবের ক্যামেরার সামনে থেকে আজ এক পরিপক্ক বড় শিল্পী হয়ে ওঠার পথচলাটা দেখতে যতটা ঝলমলে, এর পেছনের দীর্ঘ বছরের স্ট্রাগল বা লড়াইটা কিন্তু ততটাই কঠিন। একজন শিশুশিল্পী যখন মাত্র কয়েক বছর বয়সে বিনোদন জগতে পা রাখে, তখন তার শৈশব আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো হয় না। যেখানে সমবয়সী ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলছে বা কার্টুন দেখছে, সেখানে তাকে কড়া লাইটের নিচে দাঁড়িয়ে স্ক্রিপ্টের ডায়ালগ মুখস্থ করতে হয়। এই দীর্ঘ বছরের যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা ইমেজের পরিবর্তন। দর্শক যাকে এতদিন একটা মিষ্টি, ছোট বাচ্চা হিসেবে ভালোবেসে এসেছে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেতা বা অভিনেত্রী হিসেবে মেনে নিতে সময় নেয়। এই ট্রানজিশন বা পরিবর্তনের সময়টাতে অনেক শিল্পী কিন্তু হারিয়ে যায়। কিন্তু যারা টিকে থাকে, তাদের লড়াইটা প্রতিদিনের। বছরের পর বছর ধরে পড়াশোনা, পরীক্ষা এবং শুটিংয়ের শিডিউল একসাথে সামলানো, ঘুমের খামতি, এবং বয়সের সাথে সাথে অভিনয়ের গভীরতা বাড়ানোর জন্য নিজেকে প্রতিনিয়ত ভেঙে নতুন করে গড়া—এই সবকিছুই জন্য প্রয়োজন এক অদম্য মানসিক শক্তি। দীর্ঘ এতগুলো বছর গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের চড়াই-উতরাই, সাফল্য ও ব্যর্থতাকে খুব কাছ থেকে দেখে একজন শিশুশিল্পী আজ যখন একজন বড় ও পরিণত শিল্পী হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের পাকাপাকি জায়গা তৈরি করে, তখন তা আর শুধু অভিনয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ সাধনা ও ত্যাগের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণামূলক মহাকাব্য।
সিঞ্চনার মতে: সিঞ্চনা অভিনয়টা করতে ছোট থেকেই ভীষণ ভালোবাসতেন কারন তিনি ছোটবেলা থেকেই নাচ শিখতেন, তারপর বিনোদন জগতে প্রবেশ, এতগুলো বছর ধরে তিনি বিনোদন জগতে কাজ করে চলেছেন সেটা কখনই স্ট্রাগল না তাঁর কাছে এবং খুব মজা করে ও ভালোবেসেই তিনি কাজটা করেন। বয়স বেড়েছে, চরিত্র বদলেছে; কিন্তু অভিনয়ের প্রতি সেই জেদ আর ভালোবাসা আজও একই আছে, এবং ক্যামেরার ফ্রেমের পেছনের সেই ছোট্ট আমিটা আজও একই আছি (একটু হেসে)।
সিঞ্চনার অভিনীত বেশ কিছু ধারাবাহিক (ছোট বেলা থেকে এখনও অব্দি): পটল কুমার গানওয়ালা, গোপাল ভাঁড়, কেশব, কপালকুণ্ডলা, চুনি-পান্না, দুই শালিক, মোহর ইত্যাদি। বর্তমানে সিঞ্চনা একটু বিরতি নিয়েছেন তাঁর এক্সাম এর জন্য, খুব শীঘ্রই আবার আপনারা তাঁকে দেখতে পাবেন ক্যামেরার ওপারে।
স্বপ্ন পূরণের পথে সিঞ্চনা আজ প্রতিটা লড়াকু মানুষের কাছে এক বিরাট অনুপ্রেরণা:
সবশেষে বলা যায়, সিঞ্চনা সরকার-র এই দীর্ঘ পথচলা কেবল একজন সফল অভিনেত্রীর গল্প নয়, বরং এটি নিজের স্বপ্নের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা এবং ভালোবাসার এক জীবন্ত উদাহরণ। যে বয়সে কঠিন পরিশ্রমকে মানুষ ‘স্ট্রাগল’ বা বোঝা মনে করে, সেই বয়সে দাঁড়িয়ে সিঞ্চনা তাঁর কাজকে ভালোবেসেছেন, আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন প্রতিটা চরিত্রে। ‘পটল কুমার গানওয়ালা’-র নেগেটিভ চরিত্র ‘তুলি’ থেকে শুরু করে ‘চুনি-পান্না’, ‘দুই শালিক’ কিংবা ‘মোহর’-এর মতো একের পর এক জনপ্রিয় ধারাবাহিকে তাঁর এই রাজকীয় উপস্থিতি প্রমাণ করে যে—যদি ভেতরে জেদ আর সততা থাকে, তবে কোনো বাধাই আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে চরিত্রের খোলস বদলেছে ঠিকই, কিন্তু ক্যামেরার পেছনে থাকা সেই পাঁচ বছরের ছোট্ট, প্রাণবন্ত মেয়েটি আজও একই রকম রয়ে গেছে। আজ যারা জীবনের শুরুর দিনগুলোতে দাঁড়িয়ে লড়াই করছেন বা নিজেদের স্বপ্ন পূরণের পথ খুঁজছেন, তাদের জন্য সিঞ্চনা এক বিরাট অনুপ্রেরণা। খুব শীঘ্রই এই প্রতিভাবান শিল্পী আবার ফিরছেন ক্যামেরার ওপারে, নতুন কোনো রূপে, নতুন কোনো গল্প নিয়ে। সিঞ্চনা ও তাঁর মায়ের এই যৌথ সাধনার গল্প আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যায়—পরিবারের পাশে থাকা আর নিজের কাজের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাই পারে জীবনের যেকোনো কঠিন ট্রানজিশনকে জয় করে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের আলো ছাড়িয়ে সিঞ্চনার এই পজিটিভ মানসিকতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটা স্বপ্নদেখা মানুষের মনে।