রুমি মুখার্জী

পথ চলা শুরু সহকারী পরিচালক থেকে কিন্তু ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল অভিনেত্রী হবার, কারন তার রক্তেই আছে অভিনয়। বাবা ও মা দুজনেই ছিলেন যাত্রা শিল্পী। তারপরে ও কেন তাকে নিজের স্বপ্ন–এর সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছিল ? সবার প্রথমেই যার অভিনয় জগতে আসার কথা ছিল, তাকে কেন সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল ? এরকম তো হবার কথা ছিল না, ছোট বেলা থেকেই যে অনেক সিনিয়র অভিনেতা, অভিনেত্রীর সঙ্গ পেয়ে বড় হয়েছে, তার সাথে কি এমন হয়েছিল বা এমন কি পরিস্থিতি-তে পরে তাকে এতগুলো বছর স্ট্রাগল করতে হল ক্যামেরার সামনে আসার জন্য? আজ হয়তো আমরা অনেকেই কম বেশি তাকে জানি একজন অভিনেত্রী হিসেবে কিন্তু তার সাথে সাথে সে একজন সফল সহকারী পরিচালক ও। আজ আমরা জানবো যে কিভাবে একটি মেয়ে, নিজের ও বাবা-মা এর স্বপ্ন পুরনের জন্য ক্যামেরার পেছনে এত- গুলো বছর স্ট্রাগল করেছে, ক্যামেরার সামনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। সহকারী পরিচালক থেকে অভিনেত্রী হবার এই যে লম্বা জার্নি টা কত টা কঠিন ছিল, সেই লড়াই-এর গল্প জানবো অভিনেত্রী রুমি মুখার্জী –এর থেকে, সঙ্গে অপরাজিতা ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি রিক্তা বিশ্বাস

১। তোমার ছোট বেলা কোথায় কেটেছে?

:- আমার বাড়ি শ্যাম নগর-এ। ছোট বেলা ওখানেই কেটেছে। তবে এখন আমি দমদম-এ থাকি।

রুমি মুখার্জী

২। তোমার বাবা ও মা দুজনেই শিল্পী, তো সেই কারনে কি তোমার অভিনয় জগতে আসা?

:- এই কথা টা পুরোটা সত্যি না হলে ও কিছুটা তো সত্যি বটেই। বাবা,মা-এর অভিনয় দেখেই বড় হয়েছি আমি। তাই ছোট থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল অভিনেত্রী হবো। মা-ও তাই চাইতেন, বাবা প্রথমে একটু আপত্তি করে ছিলেন, কারন অভিনেত্রী বা শিল্পী যাই বলও না কেন তাদের জীবনে তো স্ট্রাগল টা অনেক বেশি, এবং কখনও কাজ আছে কখনও কাজ নেই। বাবা একজন শিল্পী হিসেবে সেই সমস্যা-গুলোর সম্মখিন হয়েছেন, তাই তিনি চাইতেন না আমি ও সেই সমস্যা-গুলোর সম্মখিন হই, কিন্তু বেশ কিছু দিন পরে তিনি ও মেনে নিয়েছিলেন।

রুমি মুখার্জী

৩। বাবা ও মা দুজনেই কম বেশি চাইতেন যে তুমি অভিনয় জগতে আসো, তাহলে এত গুলো বছর অভিনেত্রী না হয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে ক্যামেরার পেছনে কেন?

:- সত্যি বলতে এই কারণ-টা অনেক-টাই বড়। পরিস্থিতি মানুষ কে অনেকটাই পরিবর্তন করে এবং অনেক কাজ ইচ্ছে না থাকলেও পরিস্থিতির চাপ-এ পড়ে মানুষ করতে বাধ্য হয় বলতে পারো। আমার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কারণটা কিছুটা । আমার অভিনয়-এর জার্নি-টা শুরু মা-এর হাত ধরে, মা আমাকে স্টুডিও তে নিয়ে যেতেন। থিয়েটার থেকে শুরু করেছিলাম আমি অভিনয় শেখা, তারপর আমার প্রথম কাজ হচ্ছে পুলিশ ফাইলস-এ, প্রচুর কাজ করেছি সেখানে। অনেকে আছে যারা পুলিশ ফাইলস-এর কাজ-টা বলতে চায় না, কিন্তু আমি মনে করি মানুষ-এর কখনই প্রতিষ্ঠিত হবার পরে ও জার্নি-র শুরু-টা ভুলে যাওয়া উচিত না। এই ভাবেই শুরু আমার অভিনয় জগতে আসা। আমি হটাৎ করেই ১৮ বছর বয়সে আমার পাপা (বাবা) কে হারাই, যেটা আমার জন্য মেনে নেওয়া খুব-ই অসম্ভব হয়ে পরেছিল, কিন্তু আমার জীবনে এরকম ও দিন গেছে আমার বাবা মারা যাওয়ার পর ও, সেদিন ও আমি শুটিং-এ যাওয়ার জন্য তৈরি ছিলাম, কারন আমার মনে হয় আমার বাবা ও একজন শিল্পী ছিল, তাই তিনি ও আমার কাজ দেখেই খুশি হবেন।(গর্বের সাথে একটু হেসে)। সহকারী পরিচালক-এর জার্নি-টা বলার আগে একটা ঘটনা বলি, একদিন আমির খান-এর একটা ইন্টারভিউ দেখছিলাম, সেখানে তিনি বলেন, ভালো অভিনেতা বা অভিনেত্রী হতে গেলে, আগে ক্যামেরার পেছনে কি হচ্ছে সেটা জানা-টাও খুব জরুরি। তখন থেকেই আমি ঠিক করি, সহকারী পরিচালক-এর কাজ-টাও শিখবো। একরকম নিজের ইচ্ছে-তেই শুরু করে ছিলাম বলতে পারো। সেই সময়ে ভগবানের মত আমার জীবনে আসেন অনিন্দ্য সরকার, ওনার সাথেই আমার সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করা শুরু। বাবা, মা-এর পরে আমি ওনাকে ভগবানের মত আমার পাশে পেয়েছিলাম সেই সময়ে, কিন্তু তখন-ও ভাবিনি যে এই ভালো বাসার কাজ টা একদিন বাধ্য হয়ে করতে হবে আমাকে। (দুঃখ প্রকাশ করে)

রুমি মুখার্জী

৪। সহকারী পরিচালক থেকে অভিনেত্রী-র জার্নিটা কি খুব সহজ ছিল?

:- একদমই না। বরং একজন সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার জন্য আমাকে কোথাও কাস্ট করা হতো না। বেশীর ভাগ সবাই বলত যে না ও তো সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করে ও ঠিক পারবে না। অথচ আমি অনেক লিড এর কাজ করেছি পুলিশ ফাইলস –এ, তখন কিন্তু আমি সহকারী পরিচালক ছিলাম না। যাদের কোনও রকম অভিজ্ঞতা নেই অভিনয়ে, তারা সুযোগ পাচ্ছে, আর আমি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলাম বলে, আমি অভিনয় করার সুযোগ টা পেতে পারি না কেন? আমি ও মনে করি যে একজন ভালো অভিনেত্রী হতে গেলে ক্যামেরার পেছনে কি হচ্ছে সেটা জানাটা ও খুব জরুরি, কারন লাইট, ক্যামেরার পসিশন বুঝতে অনেক সুবিধা হয়। অনেক বছর আমি কাজ পাচ্ছিলাম না অভিনয় জগতে, তখন এক প্রকার বাধ্য হয়েই আমাকে সহকারী পরিচালক এর কাজ টা করে যেতে হয়। কারন আমি একদম-ই মধ্যবিত্ত এবং ছাপসা পরিবারের মেয়ে, আমার বাবা, মা দুজনেই যাত্রা করতেন। তো আমাকে ও তো কিছু না কিছু করতে হবে তাই না, চুপ করে বসে তো থাকতে পারি না, তবে আমার পরিবার খুব ই সাপোর্ট করেছেন আমাকে, নাহলে হয়তো পারতাম না। একরকম হটাৎ করেই একদিন পরিণীতা সিরিয়াল থেকে আমার কাজ এর জন্য অফার আসে,আমাকে পরিণীতা সিরিয়াল-এর কাজ এর সুযোগ-টা দেন সৌভিক চক্রবর্তী, এই মানুষ-টা না থাকলে আমার পরিণীতা সিরিয়াল-এর মধ্যে দিয়ে কাম ব্যাক টা হয়তো সম্ভব হতো না কখনই। আমাকে বলা হয়েছিল কিছু দিন-এর জন্যই হবে আমার কাজটা। কিন্তু চরিত্র-টা ছিল তোতলা একটা মেয়ের, খুব-ই ভয় পাচ্ছিলাম প্রথমে, অনেক বছর পর আবার অভিনয় তে ফিরব, তারওপর আবার চ্যালেঞ্জিং চরিত্র, পারবো কিনা ভাবছিলাম, কিন্তু পরিণীতা-র পুরো টিম এবং ডিরেক্টর( কৃশ দা) সবাই খুব সাপোর্ট করেছেন। তারপর আমি পরিণীতা-র কাজ টা করে চলে আসি। যেহেতু কিছু দিন এর জন্যই হবে বলে ছিল কাজ টা, তাই আমি তখন ও সহকারী পরিচালক-এর কাজ টা ছাড়ি নি। কিন্তু তারই মধ্যে পরিণীতা-র প্রোমো দেখে সবাই জেনে গেছিল যে আমি অভিনয় করছি আবার, তখন খুব ই ঝামেলা হতে থাকে, যে কেন আমি সহকারী পরিচালক-এর সাথে সাথে আবার অভিনয় করছি সেটা নিয়ে। ঠিক তখন ই জানি না আমার সাথে অবাক ভাবেই একটা মিরাক্কেল হল, যে পরিণীতা থেকে আমার কাছে কল আসে, আমাকে বলা হয়, আমার কাজ খুব ভালো লেগেছে সবার, আমার ট্র্যাক টা বারানো হবে। তখন আমি কোনও কিছু না ভেবেই, সহকারী পরিচালক-এর কাজ টা ছেড়ে দিয়েছিলাম, আর বলেছিলাম কখনই আমি আর এই কাজ টা করব না। তারপর নিজের মধ্যে একটু ভেঙ্গে পরেছিলাম, এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিলাম, ঠিক করলাম না ভুল করলাম বুঝতে পারছিলাম না, তখন আমার পরিবার এবং হাসব্যান্ড তখন সে (উড বি) ছিল, তারা প্রত্যেকেই তখন আমাকে বলে যে, অনেক বছর তো নিজের স্বপ্নের সাথে কম্প্রোমাইজ করলে, আর না, এই বার নিজের স্বপ্ন টা কে পুরন করো, কোনও কিছু না ভেবে, যেই সুযোগ টা এসেছে সেটা কে নিয়ে এগিয়ে চলো, তারপর যা হবে দেখা যাবে। তো এই ভাবেই শুরু আবার নতুন করে অভিনয় জগতে ফেরা, তারপর আস্তে আস্তে অনেক গুলো সিরিয়াল করি। (কৃষ্ণকলী, বিজয়িনী, পরিণীতা, তুই আমার হিরো, লক্ষ্মী ঝাঁপি)

রুমি মুখার্জী

৫। অভিনেত্রীর সাথে সাথে একজন সফল সহকারী পরিচালক ও তুমি, ভবিষ্যতের চিন্তা ভাবনা কি? কোন টাকে নিয়ে এগোতে চাও?

:- এখানে চিন্তা ভাবনার কোনও প্রশ্নই নেই, কারন আমি শুধু মাত্র অভিনয় টা নিয়েই এগোতে চাই, কারন কখনও কখনও কাজ না থাকলে আমি হয়তো ভেঙ্গে পড়ি আজ ও, কিন্তু আমার হাসব্যান্ড ভীষণ ভাবেই আমার পাশে থাকেন এবং আমাকে বলে যেন আমি কখনও অভিনয় ছাড়া আর কিছু নিয়ে না ভাবি। আজ কাজ নেই তো কি হয়েছে, কাল কাজ আসবে।আমার শ্বশুর, শাশুড়ি খুব-ই সাপোর্ট করেছেন আমাকে অভিনয় জগতে কাজ করার জন্য। আমি একটু নেগেটিভ চিন্তা ভাবনার মানুষ বলতে পারো কিন্তু আমার হাসব্যান্ড খুবই পসিটিভ একজন মানুষ সব বিষয়ে।

রুমি মুখার্জী

৬। আগামী দিনে যদি কখনও ভালো কোনও সিনেমা তে তোমার সুযোগ আসে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার, তখন ও কি এই একই ভাবনা চিন্তা থাকবে নাকি কাজ টা করবে?

:- ভালো কাজ করার ইচ্ছে তো সবার ই থাকে, কিন্তু সত্যি বলতে আমার সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার ইচ্ছে ভবিষ্যতে ও নেই, মেগা সিরিয়াল এ তো একদমই করব না, কিন্তু যদি তুমি সিনেমার কথা বলও, তাহলে বলবো কৌশিক গাঙ্গুলির যদি কোনও সিনেমা তে আমি কাজ করার সুযোগ পাই, সেটা যেকোনো হতে পারে, অভিনেত্রী বা সহকারী পরিচালক হিসেবে আমি সেটা অবশ্যই করবো। আমি আসলে এই মানুষ টার সাথে কাজ করতে চাই, অনেক কিছু শেখার আছে ওনার থেকে। ওনার সাথে কাজ করাটা এখন ও একটা স্বপ্ন বলতে পারো আমার কাছে।

× Zoomed Image