পূর্বাশা দেবনাথ

নাচ ও অভিনয় এই দুটোকে সাথে নিয়ে পথচলা। শিল্পের আলোয় ভাস্বর এক জীবন — নাচ এবং অভিনয় — এই দুই ভিন্ন ধারার শিল্পকে সঙ্গী করে টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের এক অনন্য জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন প্রতিভাবান অভিনেত্রী পূর্বাশা দেবনাথ। আমরা জানবো তাঁর অভিনেত্রী হওয়ার জার্নি কেমন ছিল? এই ইন্ডাস্ট্রিতে আসার জন্য কতটা স্ট্রাগল করতে হয়েছে তাঁকে। শৈশব, অভিনয় জীবনের স্ট্রাগল, সেটের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের অনেক অজানা কথা জেনে নেব আমরা পূর্বাশার কাছ থেকে, সঙ্গে অপরাজিতা ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি রিক্তা বিশ্বাস

প্রশ্নঃ তোমার ছোটবেলা কোথায় কেটেছে?

উত্তরঃ আমার বাড়ি হাওড়াতে। তবে আমার মামার বাড়ি টালিগঞ্জে। ছোটবেলা আমার হাওড়াতেই কেটেছে। স্কুল আমার হাওড়াতেই ছিল, তবে কলেজ ছিল শিয়ালদহ তে।

পূর্বাশা দেবনাথ ১

প্রশ্নঃ অভিনয় জগতে আসলে কীভাবে?

উত্তরঃ আসলে আমার জার্নিটা শুরু দাদাগিরির সিজন-১ থেকে। বাকি সবার মতো আমিও দাদাগিরিতে অডিশন দিই এবং সুযোগ পাই অংশগ্রহণ করার। তারপর সেখান থেকেই শুরু। তখন আমি দশম শ্রেণীতে পড়াশোনা করি। তাই সেই সময় আমি পড়াশোনাতে বেশি মন দিই ও তার সাথে সাথে নাচও করতাম। বেশকিছু দিন পর আমি থিয়েটার করা শুরু করলাম। আর তারপর আমি সুযোগ পাই সিরিয়ালে অভিনয় করার।

পূর্বাশা দেবনাথ ২

প্রশ্নঃ শুরু থেকে এখন ও পর্যন্ত করা কিছু ধারাবাহিকের নাম ?

উত্তরঃ আমি 'বিজয়িনী'তে তুতুলের চরিত্রে অভিনয় করেছি। 'রুদ্রানী' সিরিয়ালে পলার চরিত্র করি। 'রানি রাসমণি'তে পেসন্নের চরিত্রে অভিনয় করি। তারপর 'প্রতিদান'-এ শ্যামার চরিত্র, 'জয়ী'তে মালতীর চরিত্রে অভিনয় করেছি। এবং কিছুদিন আগে, 'ছদ্মবেশী' সিনেমার শুটিং শেষ হলো। সেখানে আমি সুপ্রিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেছি। তারপর রামপ্রসাদ, মা শীতলা, বুলেট সরোজিনী, রাজ রাজেস্বরী রানি ভবানী, এখন চলছে সংসারে সংকীর্তন ।

পূর্বাশা দেবনাথ ৩

অভিনয় ও নৃত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের স্বকীয়তা প্রমাণ করেছেন অভিনেত্রী পূর্বাশা দেবনাথ, যাঁর বহুমুখী প্রতিভাকে এককথায় ‘রূপে লক্ষ্মী ও গুণে সরস্বতী’ বলে অভিহিত করা যায়। হাওড়ার মেয়ে হলেও তাঁর শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে মামারবাড়ি টালিগঞ্জে এবং পরবর্তীকালে কলকাতার শিয়ালদহের কলেজে পড়াশোনা করার সুবাদে সংস্কৃতির পীঠস্থানের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগটা ছিল অত্যন্ত নিবিড়। অত্যন্ত সাধারণ এক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে এসে আজ তিনি বিনোদন জগতের এক পরিচিত মুখ। কোনো গডফাদার ছাড়া অত্যন্ত সাধারণ এক পটভূমি থেকে উঠে আসা পূর্বাশার এই রূপালী পর্দার যাত্রাটি মোটেও সহজ বা মসৃণ ছিল না। যখন তিনি দশম শ্রেণীর ছাত্রী, ঠিক তখনই ‘দাদাগিরি সিজন-১’-এর অডিশনে অংশ নিয়ে সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমেই তাঁর গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের প্রথম দরজাটি খোলে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নিজেকে থিয়েটার এবং নৃত্যের চর্চায় ব্যস্ত রাখতেন, যা তাঁর অভিনয় দক্ষতাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে।

পূর্বাশা দেবনাথ ৪

প্রশ্নঃ প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

উত্তরঃ ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পর আমি কখনোই ভয় পাইনি। জানি না কেন, কিন্তু আমার বরং স্টেজ শো করার সময় একটু নার্ভাস অনুভব হতো। ক্যামেরার সামনে কখনোই নার্ভাস অনুভব করিনি।

প্রথমবার ক্যামেরার মুখোমুখি হওয়ার মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি সম্পূর্ণ নির্ভীক ছিলেন এবং স্টেজে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো জড়তা বা নার্ভাসনেস অনুভব করেননি। এই অদম্য আত্মবিশ্বাসের জোরেই তিনি একের পর এক জনপ্রিয় মেগা সিরিয়ালে সুযোগ পান; ‘বিজয়িনী’ ধারাবাহিকে তুতুল চরিত্র, ‘রুদ্রাণী’, ‘রানী রাসমণি’-তে পেসন্নের চরিত্র, ‘প্রতিদান’-এ শ্যামা এবং ‘জয়ী’ ধারাবাহিকে মালতীর মতো বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রতিটি ঘরে ঘরে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। ছোট পর্দার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ‘ছদ্মবেশী’ নামক চলচ্চিত্রে সুপ্রিয়া নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে বড় পর্দাতেও নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। তারপর রামপ্রসাদ, মা শীতলা, বুলেট সরোজিনী, রাজ রাজেস্বরী রানি ভবানী, এখন পূর্বাশার বর্তমান ধারাবাহিক চলছে সংসারে সংকীর্তন ।

পূর্বাশা দেবনাথ ৫

পূর্বাশার বর্তমান ধারাবাহিক চলছে সংসারে সংকীর্তন । টেলিভিশন পর্দার জনপ্রিয় ধারাবাহিক 'সংসারে সংকীর্তন'-এর সেট থেকে অত্যন্ত মজার এবং একই সঙ্গে ভীষণ গর্বের এক টুকরো স্মৃতি ভক্তদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন অভিনেত্রী পূর্বাশা দেবনাথ। তিনি জানান, বহু বছর পর এই ধারাবাহিকের সূত্র ধরেই সহ-অভিনেতা হিসেবে তিনি পাশে পেয়েছেন আমাদের বিনোদন জগতের অত্যন্ত পরিচিত, গুণী এবং সিনিয়র অভিনেতা পরান বন্দ্যোপাধ্যায়-কে। বর্ষীয়ান এই অভিনেতার স্মৃতিশক্তি এবং অমায়িক ব্যবহারে রীতিমতো মুগ্ধ পূর্বাশা। ঘটনাটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অভিনেত্রী আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, অনেক বছর আগে তিনি যখন বয়সে অনেক ছোট ছিলেন, তখন একটি নৃত্য অনুষ্ঠানে প্রথমবার পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এত বছর পর চলতি ধারাবাহিকের সেটে দেখা হতেই পূর্বাশা যখন প্রবীণ এই অভিনেতাকে সেদিনের সেই নাচের অনুষ্ঠানের কথা সামান্য মনে করিয়ে দেন, তখন অলৌকিক এক কাণ্ড ঘটে! পরান বাবু কেবল ঘটনাটি মনেই করেননি, বরং দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ছোট্ট পূর্বাশার সেই স্মৃতি হুবহু অবিকলভাবে নিজের মনের মণিকোঠায় ধরে রেখেছেন এবং নিজেই বিস্তারিত সবটা গড়গড় করে বলে দেন। একজন কিংবদন্তি অভিনেতার কাছ থেকে পাওয়া এমন অবিশ্বাস্য স্বীকৃতি ও স্নেহ যেন পূর্বাশার অভিনয় জীবনের অন্যতম এক পরম প্রাপ্তি।

পূর্বাশা দেবনাথ ৬

প্রশ্নঃ পর পর এত গুলো কাজ করছ, তোমার বিনোদন জগতের জার্নি-টা কি এত টাই সহজ ছিল? যেভাবে আমরা তোমাকে পর পর কাজ করে যেতে দেখেছি। নাকি এর পেছনে দর্শকের নাজানা অনেক-টাই স্ট্রাগল লুকিয়ে আছে?

উত্তরঃ জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রের মতো এখানেও স্ট্রাগল বা লড়াই তো অবশ্যই আছে, আর ভবিষ্যতেও থাকবে। প্রত্যেক টা মানুষ-ই তো আমরা স্ট্রাগল করেই বাঁচি। আমরা প্রত্যেক দিন ঘুমাই একটা স্ট্রাগল শেষ করে আবার পরের দিন নতুন স্ট্রাগল শুরু হয়। সুতরাং আমার ক্ষেত্রে ও তাই। সেইভাবে আমি স্ট্রাগল-টাকে আলাদা করে দেখি না, কারন চ্যালেঞ্জিং না থাকলে কিন্তু জীবন-টা একঘেয়ে আর সাদা মাটা হয়ে যায়, তাই চ্যালেঞ্জস-গুলো সামলাতে আমার বেশ ভালোই লাগে। আর আমার মনে হয়, বিনোদন জগতে শুধু কাজ পেয়ে যাওয়াটাই শেষ কথা নয়; আমি ঠিক কী ধরনের কাজ পাচ্ছি বা কী কাজ করতে চাইছি, সেটাও একটা বড় ব্যাপার। আমার কাছে যে কাজের প্রস্তাব আসছে, সেই চরিত্রটি আদেও আমি মন থেকে করতে চাই কি না—তা নিয়ে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে। মাঝেমধ্যে নিজের পছন্দমতো বেছে বেছে কাজ পাওয়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, আবার কখনও কখনও কোনো বিকল্প না থাকায় না চাইতেও অনেক কাজ-এ হ্যাঁ বলতে হয়, তো এই টাও কিন্তু কোথাও না কোথাও একটা স্ট্রাগল বা চ্যালেঞ্জেস।

পূর্বাশা দেবনাথ-এর মতে--- জীবন সাদামাটা হলে চলে না, চ্যালেঞ্জ থাকলেই ভালো লাগে। চ্যালেঞ্জ না থাকলে জীবন একঘেয়ে মনে হয়। বিনোদন জগতের সংগ্রাম নিয়ে পূর্বাশার মত স্পষ্ট—চ্যালেঞ্জ না থাকলে জীবন একঘেয়ে ও সাদামাটা হয়ে যায়। তবে মাঝেমধ্যে নিজের পছন্দমতো সিলেক্টিভ কাজ পাওয়ার জন্য যেমন দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, তেমনি বিকল্প না থাকায়, না চাইতেও অনেক কাজে ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়। "আমরা প্রতিদিন একটা স্ট্রাগল শেষ করে ঘুমাই, পরদিন নতুন লড়াই শুরু করি- এই-টাই তো জীবন ।

পূর্বাশা দেবনাথ ৭

প্রশ্নঃ কোন চরিত্রে অভিনয় করতে বেশি ভালো লাগে? পসিটিভ/নেগেটিভ ?

উত্তরঃ বেশীর ভাগ আমি নেগেটিভ চরিত্র করেছি কিন্তু আমার না ওরকম ব্যাপার নেই জানো তো, আমার শুধু একটা কথাই মনে হয় , এই চরিত্র টা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ যে নতুন কিছু করতে পারলাম কিনা। আমি নতুন কি দিতে পারছি দর্শক-দের সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার কাছে। আমার মনে হয় চরিত্রে গুরুত্ব থাকা টা খুব জরুরি, চরিত্রে গুরুত্ব থাকলে আমি যেকোনো চরিত্র-ই করতে পারবো।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে চরিত্রটি আমি করছি তার মাধ্যমে দর্শকদের নতুন কিছু উপহার দিতে পারছি কি না। প্রতিটি নতুন কাজের সাথে নিজেকে ভাঙা এবং দর্শকদের সামনে একদম ভিন্নভাবে নিজেকে মেলে ধরার চ্যালেঞ্জটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। আমার মনে হয়, কোনো চরিত্রের ভালো বা মন্দ দিকটার চেয়েও গল্পে তার গুরুত্ব বা গভীরতা কতটা, সেটাই আসল। যদি কোনো চরিত্রে অভিনয়ের যথেষ্ট সুযোগ থাকে এবং সেটি গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী হয়, তবে আমি যেকোনো ধরণের চরিত্রই ফুটিয়ে তুলতে পুরোপুরি প্রস্তুত। এককথায়, চরিত্রের ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক নয়, বরং তার ভেতরের গুরুত্ব এবং নতুন কিছু করার সুযোগটাই আমার কাছে অভিনয় জীবনের মূল চাবিকাঠি।

প্রশ্নঃ কম্প্রমাইস- এই কথা টা বিনোদন জগতের সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জরিয়ে থাকে, এই ব্যাপারে তোমার কি মতামত? কোনও ঘটনা তোমার সাথে ঘটেছে ?

উত্তরঃ সত্যি বলতে কম্প্রমাইস- এই কথাটা বিনোদন জগতের সঙ্গে জরিয়ে আছে ঠিকই , কিন্তু এখানে না কেউ তোমাকে জোর করবে না। যদি তুমি না বলে সেখান থেকে সরে যাও, তাহলে এরকম না কেউ টানা টানি করবে । আমার সাথে এই টা হয় নি , আমি এই টা দেখিনি। তবে কারোর সাথে হয় নি সেটা বলবো না , আবার অনেকে যারা এই ধরণের তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন, তারা যে মিথ্যা বলছেন—তা একেবারেই নয়; নিশ্চিতভাবেই তাদের জীবনে তেমনটা ঘটেছে। সেটা কখনই বলবো না। কিন্তু আমাকে যদি জিজ্ঞেস করো , হ্যাঁ বলেছে , কেউ সরা সরি বলেছে , কেউ ঘুরিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। আমি তখন না বলেছি, তো সেখানে আমাকে কেউ জোর করে নি , টাই আমি বলবো তুমি যদি না চাইছ তো সরিয়ে নাও নিজেকে। সেই কারনে হয়তো আমি কাজ কম পেয়েছি বা যেটা হয়তো ২ বছরে হতো সেটা অনেক বছর লাগছে। কিন্তু আমি মনে করি আগে নিজেকে ঠিক করতে হবে আমি কি চাই জীবনে, কেউ যদি মনে করে যেকোনো উপায়েই হোক তাকে ওপরে উঠতে হবে, সেটা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, আর যদি চাই যে না আমি আমার ডিগনিটি বজায় রেখে কাজ করবো সেটা একরকম।

পূর্বাশা মনে করেন - সাফল্যের শর্টকাট নয়, আত্মসম্মান আর পরিশ্রমই হোক পথচলার শক্তি । গ্ল্যামারের আলোতেও হারাননি নিজের নীতি। ডিগনিটি বজায় রেখে ধীর পায়ে এগিয়ে যাওয়ার নামই তো আসল অপরাজিতা!

× Zoomed Image