স্টুডিওর চক্কর থেকে হইচই-এর পর্দা: এক ব্যতিক্রমী সফর
অর্ণা ধর
সহানুভূতি নয় - নিজের মেধা আর পরিশ্রমেই বিশ্বাসী
সাক্ষাৎকারে: রিক্তা বিশ্বাস
স্বপ্নের ডানায় হাওড়ার মেয়ে অর্ণা: গ্ল্যামার দুনিয়ায় নিজের মাটি খোঁজার গল্প । হাওড়ার মেয়ে অর্ণা ধর-এর জন্ম এবং ছোটবেলা—সবটাই কেটেছে গঙ্গার ওপারের এই চেনা শহরেই। ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতির আবহে বড় হওয়া অর্ণা আজ টলিউডের অভিনয় জগতের এক পরিচিত মুখ। তবে গ্ল্যামার দুনিয়ায় পা রাখার এই পথটা কিন্তু আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই ছিল পরিশ্রমে ভরা। যদিও অর্ণা নিজে একে ‘স্ট্রাগল’ বা লড়াই বলতে একেবারেই নারাজ। তাঁর মতে, যে কাজটাকে মানুষ মন থেকে ভালোবাসে, সেটার জন্য রাত-দিন এক করে পরিশ্রম করাটা কখনোই স্ট্রাগল হতে পারে না; বরং সেটা ভালোবাসারই একটা অংশ। সহানুভূতি নয়, নিজের মেধা আর পরিশ্রমেই বিশ্বাসী অর্ণা ধর। আজ 'অপরাজিতা' ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি রিক্তা বিশ্বাস-এর মুখোমুখি হয়ে অর্ণা অকপটে শোনালেন তাঁর চেনা-অচেনা সেই জীবনের গল্প, কীভাবে সমস্ত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি নিজেকে মেলে ধরলেন অভিনয় জগতের এই আলো-ঝলমলে দুনিয়ায়।
প্রশ্নঃ তোমার জন্ম ও ছোট বেলা কোথায় কেটেছে ?
উত্তরঃআমার সবটাই হাওড়া তে।
প্রশ্নঃ অভিনয় জগতে আসার স্ট্রাগল-টা কতটা ছিল ?
উত্তরঃ প্রথমেই বলি এইটা আমার কাছে স্ট্রাগল মনে হয় না কখনই, কারন আমি মনে করি, যে কাজ টা করতে আমি ভালবাসি, সেটার জন্য পরিশ্রম করাটা কখনই আমার কাছে স্ট্রাগল না। কারন মানুষ যেটা কে ভালো বাসে সেটার জন্য তো অনেক কিছুই করতে পারে, তো তাই জন্য এই ব্যাপার টা কোনও দিন-ই আমার স্ট্রাগল মনে হয় নি। তবে হ্যাঁ কোনও কিছুই তো খুব সহজে বা খুব তারা তারি পাওয়া যায় না, তাই আমাকে ও অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে,আমাকে ও অনেক স্টুডিও তে ঘুরতে হয়েছে, তারপর নিজের প্রোফাইল আপডেট করা,ডিরেক্টর-দের ফোন করে অ্যাঁপ্রোচ করা যে আমি কাজ করতে চাই , তারপর গিয়ে আমি সুযোগ-টা পেয়েছি। তবে এই পুরো ব্যাপার টাকে আমি স্ট্রাগল মনে করি না আর ভবিষ্যতে যদি কখনও আবার আমাকে এই পরিশ্রম গুলো করতে হয় , সেটা কেও আমি স্ট্রাগল মনে করবো না কখনই।
প্রশ্নঃ প্রথম কাজ এর সুযোগ টা কিভাবে পেলে তুমি?
উত্তরঃ ফেসবুক থেকে পেয়েছি। একজন আমাকে বলল যে তোমার প্রোফাইল টা আমি একজায় জায়গায় পাঠিয়েছি একটা প্রোজেক্ট এর জন্য , তোমার সঙ্গে কন্টাক্ট করতে পারে,তুমি যদি করতে চাও তো কথা বলে নিও ওনার সঙ্গে। সেটা ছিল একটা শর্ট ফিল্ম । তো এই ভাবেই শুরু আমার অভিনয় জগতে আসা।
প্রশ্নঃ এখনও পর্যন্ত করা কিছু কাজ-এর নাম?
উত্তরঃ ১ম কাজ আমার শর্ট ফিল্ম থেকে শুরু, তারপর স্টার জলসা তে গুড্ডি, তারপর মধুর হাওয়া তে আমি লিড চরিত্র করেছি, তারপর থেকে আমি সিনেমা , সিরিস করছি। যেমন বোধন ২ তে আছি আমি, কারমা কোর্মা হইচই-এর একটা প্রোজেক্ট সেটা তেও আমি আছি। আরও কিছু কাজ চলছে, কিন্তু এখনও সেটা রিলিজ হয় নি তাই নাম গুলো বলতে পারবো ছুটি। বেশ কিছু মিউজিক ভিডিও আসছে।
- অভিনয় জগতে অর্ণার প্রথম সুযোগটা এসেছিল আজকের যুগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম—ফেসবুক থেকে। একদিন চেনা এক পরিচিত ব্যক্তি জানান যে অর্ণার প্রোফাইলটি একটি প্রজেক্টের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং পছন্দ হলে তারা যোগাযোগ করবে। এর কিছুদিন পরেই তিনি সুযোগ পান নিজের জীবনের প্রথম শর্ট ফিল্মে অভিনয় করার, আর এভাবেই শুরু হয় তাঁর রূপোলী পর্দার সফর। সেই প্রথম শর্ট ফিল্মের পর অর্ণাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। স্টার জলসার অত্যন্ত জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘গুড্ডি’-তে কাজ করার পর তিনি ‘মধুর হাওয়া’ নামক প্রজেক্টে লিড বা প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন। এরপর থেকে ছোট পর্দার গণ্ডি পেরিয়ে ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম এবং সিনেমাতেও নিয়মিত কাজ করছেন তিনি। এর মধ্যে হইচই (Hoichoi)-এর জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘বোধন ২’ এবং ‘কারমা কোর্মা’-তে তাঁর অভিনয় বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়াও তাঁর বেশ কিছু মিউজিক ভিডিও এবং নতুন কিছু সিনেমার কাজ চলছে, যা রিলিজ না হওয়া পর্যন্ত সারপ্রাইজ হিসেবেই রাখতে চান তিনি।
প্রশ্নঃ ফেসবুক থেকে তুমি প্রথম কাজ টা পেয়েছিলে, তারপর থেকে এখন ও অব্দি অনেক কাজ করছ, ব্যাপার টা কি এত টাই সহজ ছিল সব সময়? কখনও কি ওঠা পরা যায় নি তোমার জীবনে ?
উত্তরঃ সেটা তো একদমই না , কোনও ব্যাপার টাই এত টা সহজ ছিল না,জীবনে ‘উঠা-পড়া’ না থাকলে আসলে মানুষের আসল মেধা আর মানসিক শক্তিটা চেনা যায় না। কিন্তু কি বলতো আমি কখনই আমার ভেঙ্গে পরার গল্প সবার সামনে আনতে চাই না , কারন আমি মনে করি সেটা আমার কাছে নতুন করে নিজেকে তৈরি করার একটা শিক্ষা এবং এই জার্নিটার প্রতিটা মুহূর্তের জন্য আমি কৃতজ্ঞ!
আর ভবিষ্যতে যদি কখনও আবার আমাকে এই জার্নিটা নতুন করে করতে হয় , সেটা কেও আমি ভেঙ্গে পরা মনে করতে চাই না কখনই।
- ফেসবুক থেকে প্রথম ব্রেক পাওয়া এবং আজ এতগুলো কাজ করা দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে যে অর্ণার জীবনটা বোধহয় খুব সহজ ছিল। কিন্তু অর্ণা স্পষ্ট জানান যে, কোনো কিছুই এতটা সহজ ছিল না। সাধারণ মানুষের মতোই তাঁর জীবনেও প্রচুর উত্থান-পতন বা ‘উঠা-পড়া’ এসেছে। কিন্তু অর্ণার বিশেষত্ব হলো, তিনি কখনই নিজের ভেঙে পড়ার বা কান্নার গল্প সবার সামনে এনে সহানুভূতি কুড়াতে চান না। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, জীবনের খারাপ সময়গুলো আসলে নিজেকে নতুন করে তৈরি করার এক একটি বড় শিক্ষা। উত্থান-পতন না থাকলে মানুষের ভেতরের আসল মেধা আর মানসিক শক্তিটা কখনোই চেনা যায় না। এই চড়াই-উতরাইয়ের জার্নিটার প্রতিটা মুহূর্তের জন্য অর্ণা ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং এই অদম্য জেদকে সম্বল করেই তিনি আগামী দিনে আরও বহুদূর এগিয়ে যেতে চান।
প্রশ্নঃ কম্প্রমাইস এই কথা টা খুব ই কমন বিষয়, এই বিনোদন জগতে। তোমার সাথে এরকম কোনও ঘটনা ?
উত্তরঃ অর্ণা সোজা সাপটা বিশ্বাস করেন যে, কাজ পাওয়ার জন্য কোনো নোংরা বা অনৈতিক আপস করার মানসিকতা তাঁর কোনোদিন ছিল না, আর ভবিষ্যতেও থাকবে না। তিনি এটাও বলেন যে ভবিষ্যতে কোনও বড় কাজ এর বিনিময় তেও এই বিষয়টা কখনই মেনে নেবেন না বা এই পথে হাঁটবেন না তিনি।
- অর্ণা মনে করেন, ইন্ডাস্ট্রিতে যেমন খারাপ মানুষ আছে, তেমনি ভালো মানুষের সংখ্যাও অনেক বেশি। তিনি শুরু থেকেই ঢাল হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিজের মেধা আর পরিশ্রমকে। তাঁর মতে, শর্টকাটে বা অন্যায়ের হাত ধরে হয়তো চটজলদি কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু সেই সাফল্য কোনোদিন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দিনশেষে নিজের যোগ্যতার ওপর ভরসা রাখলে কোনো কুৎসিত ‘কম্প্রমাইজ’ করার প্রয়োজন পড়ে না।
- অর্ণার স্পষ্ট বার্তা: "যারা নিজের মেধা আর কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাস রাখে, তাদের অন্য কোনো সস্তা উপায়ের প্রয়োজন হয় না। মাথা উঁচু করে কাজ করতে এসেছি, আর নিজের যোগ্যতার জোরেই মাথা উঁচু করে কাজ করে যাব।"
প্রশ্নঃ অনেক মানুষ আছেন যারা অনেক দূর থেকে কলকাতা আসেন বিনোদন জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং অনেক বছর ধরে স্ট্রাগল করছেন। তাদের জন্য কি বলতে চাও?
উত্তরঃ পরিশ্রমকে 'বোঝা' নয়, 'ভালোবাসা' ভাবুনঃ প্রথমেই বলব, আপনারা যে লড়াইটা করছেন, সেটাকে ‘কষ্ট’ বা ‘স্ট্রাগল’ ভেবে মন খারাপ করবেন না। আপনি যদি অভিনয় বা এই মাধ্যমটাকে মন থেকে ভালোবাসেন, তবে এর জন্য খাটুনি খাটতে হওয়াটা কোনো শাস্তি নয়। যে কাজকে ভালোবাসা যায়, তার পেছনের পরিশ্রমটাও আসলে আনন্দের। এই মানসিকতা রাখলে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার ধৈর্যটা ভেতর থেকে আসবে।এই গ্ল্যামার দুনিয়ায় রিজেকশন বা প্রত্যাখ্যান আসবেই। অনেক সময় মনে হবে সব শেষ, কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতেই ভেঙে পড়ার গল্প শুনিয়ে মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করবেন না। প্রতিটি খারাপ সময়, প্রতিটি রিজেকশন আসলে নিজেকে নতুন করে তৈরি করার এবং নিজের খামতিগুলো শুধরে নেওয়ার একটা বড় শিক্ষা। উত্থান-পতন না থাকলে আপনার ভেতরের আসল মানসিক শক্তিটা কিন্তু কোনোদিনও প্রকাশ পাবে না।
- যারা দূর থেকে কলকাতায় এসে প্রতিদিন অডিশন দিচ্ছেন, লড়ছেন—তারা প্রত্যেকেই একেকজন লড়াকু যোদ্ধা। ধৈর্য হারাবেন না, নিজের প্রতি বিশ্বাস আর সততা ধরে রাখুন; সঠিক সময় এলে আপনার মেধার মূল্যায়ন এই শহর ঠিকই করবে!