কাটোয়া থেকে কলকাতা - স্বপ্ন ছোঁয়ার নাম মৌলী দত্ত
সাক্ষাৎকারে: রিক্তা বিশ্বাস
সবেমাত্র অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই কাটোয়া থেকে কলকাতা-তে এসে অভিনেত্রী। মানে ভাবা যায়, যখন আমরা খেলা-ধূলা নিয়েই মেতে থাকতাম, তখন সম-বয়সী একটি মেয়ে কাটোয়া থেকে কলকাতা-তে আসতো অভিনয় করার জন্য। আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন না সেই অষ্টম শ্রেণীর মেয়েটি হল অপরাজিতা অপু সিরিয়ালের বর্ষা মানে মৌলী দত্ত। যাকে এখন আমরা সবাই চিনি। আজ হয়তো তাকে দেখতে আমাদের সবারই খুব ভাল লাগে, কিন্তু এত-টাও কি ভালো বা সহজ ছিল তার এই জার্নি-টা? জানবো এই জার্নি-র গল্প মৌলী দত্ত-এর থেকে, সঙ্গে অপরাজিতা ম্যাগাজিন-এর প্রতিনিধি রিক্তা বিশ্বাস।
১। তোমার ছোটবেলা কোথায় কেটেছে ?
:- আসলে আমি কাটোয়া-র মেয়ে , এখানকার নই, মানে কলকাতার নই। আমার স্কুল, কলেজ সবটাই ওখানে ।
২। কাটোয়া থেকে কলকাতা-তে এসে, অভিনয় জগতে আসার জার্নি-টা কেমন ছিল ?
:- এই জার্নি-টার কথা বলে শেষ করা যাবে না। অনেকটাই লম্বা জার্নি বলতে পারো। আসলে আমার বাবা, মা চাইতেন, আমি নাচ করি, অভিনয় করি। মানে বলতে পারো আমার প্রফেশন-টা আগে থেকেই ওনারা ঠিক করে দিয়েছিলেন আমাকে (একটু হেসে)। ছোটবেলা থেকেই আমাকে নাচ শেখানো হয়, ক্লাস ৮-এ ওঠার আগে থেকেই আমি ব্যাকআপ ডানসার হিসেবে কাজ করি। আর তাছাড়া তখনকার দিনে এখনের মত এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না এবং এই ইন্ডাস্ট্রি-তে আমার কোনও ব্যাকআপ ও ছিলনা, তো সেই কারনে আমার জার্নি-টা অনেক-টাই কঠিন ছিল। সবার প্রথমে বাবা আমাকে এখানের একটা অ্যাক্টিং স্কুল-এ ভর্তি করায়, কিন্তু যেখানে কোনও কাজ-এর কাজ হয় না। তো সেখানে ১ বছরের একটা কোর্স করার পরে আমাদের একটা সার্টিফিকেট দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমি কাটোয়া-তে থিয়েটার করতাম। একদিন আমার-মা দেখতে পায় রূপসী বাংলা চ্যানেলে একটা কলিং যায় অভিনয়-এর জন্য, তো আমি সেখানে অডিশান দেওয়ার জন্য কলকাতা আসি। কিন্তু মজার ব্যাপার হল আমি তখন অডিশান-এর অ-জানতাম না, আমাকে যেই স্ক্রিপ্টটা দেওয়া হয়েছিল আমি শুধু নিজের মত করে বলে দিয়েছিলাম (হেসে)। পরে জানতে পারি সেখানে প্রায় ৩হাজার জনের ছবি জমা পড়েছিল, তার মধ্যে কিছুজন-কে ডাকা হয়। আমাকে প্রথমে প্রফুল্ল সিরিয়ালটা-তে প্রফুল্ল-র চরিত্রটা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাড়ি থেকে বলল, পড়াশোনা তে অনেকটা ক্ষতি হবে, তো তারপর আমায় ২য় চরিত্রটা দেওয়া হল, যেটার নাম ছিল নয়ন তারা। তো-এই ভাবেই শুরু, কিন্তু তখন আমাকে বেশীর ভাগ সময়েই হাওড়া স্টেশন-এই রাত কাটাতে হত, কারন তখন আমার কলকাতা-তে থাকার কোনও জায়গা ছিলনা। আত্মীয়রা এক দিন পর পর নতুন নতুন বাহানা দিত। বলতে পারো হাওড়া স্টেশন-টাই তখন আমার ২য় বাড়ি ছিল।
৩। তুমি পুরো পুরি ভাবে কলকাতা তে কবে শিফট করলে ?
:- আমি কলকাতা-তে পুরো পুরি ভাবে থাকতে শুরু করি ২০১৪ থেকে।
৪। এখন ও পর্যন্ত তুমি কি কি কাজ করেছ ?
:- শুরু প্রফুল্ল (নয়ন তারা) থেকে, তারপর তুমি রবে নীরবে করার পর, আমি পরীক্ষার জন্য এক-মাসের একটা ব্রেক নিয়েছিলাম। তারপর খোকা বাবু (মিনু), মিঠাই (প্রজ্ঞা), আলতা ফড়িং (অর্চনা), মা মনসা (দেবী গঙ্গা), অপরাজিতা অপু (বর্ষা), বাংলা মিডিয়াম (ইরা), কোন গোপনে মন ভেসেছে (ছায়া), তুই আমার হিরো (লায়লা) আর এখন চলছে পরিণীতা (মিলি)।
৫। এই ইন্ডাস্ট্রি-তে আমরা একটা কথা এখন খুব-ই শুনি, যে নানা রকমের খারাপ প্রস্তাব পায় অনেকেই, মানে বলতে পারো গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি। তুমি কি এখন ও অব্দি এরকম কিছু পেয়েছো ?
:- এই ব্যাপারটা এখন খুব-ই কমন হয়ে গেছে বলতে পারো, কিন্তু আমি যেহেতু অনেক ছোট থেকে কাজ করছি, তো সেরকম কোনও প্রস্তাব আমি পাইনি ঠিক-ই, কিন্তু তার জন্য স্ট্রাগল-টা বেশি করতে হয়। কারন যারা এই জিনিসগুলো মেনে নিয়ে চলছে তারা অনেক তাড়াতাড়ি সাকসেস পাচ্ছে। আর আমি এত বছর ধরে এখন-ও স্ট্রাগল করছি। আর আমার-ই দেখা অনেকে ১-২ বছরের মধ্যে বাড়ি, গাড়ি করে নিয়েছে। আর আমি এখন-ও গাড়ি নিতে পারিনি, সবে নিজের একটা ফ্ল্যাট করেছি (হেসে)।
৬। আমরা তোমাকে পসিটিভ আর নেগেটিভ দুরকমের চরিত্র-তেই দেখেছি, তোমার কোন চরিত্র-তে অভিনয় করতে বেশি ভালো লাগে ?
:- সত্যি বলতে অভিনেত্রী হিসেবে যেই চরিত্র-টাই আমরা করি, সেটাই খুব মন থেকে এবং ভালো বেসে করি। তবে এই দুটোর মধ্যে বলতে গেলে নেগেটিভ-টা করতে বেশি ভালো লাগে, কারন যখন বাইরে কোনও শো করতে যাই, তখন সবাই উঠে দাঁড়িয়ে সেই নেগেটিভ চরিত্র-টা নিয়ে কথা বলে। সেই ব্যাপার-টা বেশ এঞ্জয় করি বলতে পারো, ভালো লাগে।
৭। তুমি এত স্ট্রাগল করে আজকে-এই জায়গাতে পৌঁছেছো। এরকম অনেকে আছে যারা ও অভিনেতা বা অভিনেত্রী হবার স্বপ্ন নিয়ে অনেক দূর থেকে কলকাতা-তে আসে। তুমি তাদের উদ্দেশ্যে কি বলবে ?
:- আমি তাদের-কে সবার আগে একটা কথা বলব, কোথাও কোনও রকম টাকা-পয়সা দেবে না কাজ-এর জন্য। কারন তুমি যেখানেই কাজ-এ যাবে, তারা তোমাকে টাকা দেবে, এরকম ভাবে প্রচুর লোক ঠকানো হচ্ছে। এই সব-এর থেকে একদম-ই দূরে থাকো। তোমরা যদি সত্যি কাজ করতে চাও, তাহলে ষ্টুডিও-তে গিয়ে ফটো জমা দাও। কলকাতা-তে প্রচুর ষ্টুডিও আছে। সেখানে গিয়ে ফটো জমা দাও, ওরা কল করে ডেকে নেবে অডিশান-এর জন্য, কিন্তু ওই যারা বলে এত টাকা দাও, তোমাকে ভালো চরিত্র দেবো-এগুলো সব ভুল ভাল, এগুলো থেকে দূরে থাকো।