মুখোমুখি
রক্ষণশীলতার গণ্ডি পেরিয়ে- রূপোলী পর্দায়
অভিনেত্রী অনিন্দিতা সোম
"নিজের শর্তে বাঁচা আর যোগ্যতায় ওড়ার আনন্দই আলাদা"
সাক্ষাৎকারে: রিক্তা বিশ্বাস
চন্দননগরের গণ্ডি থেকে রুপোলী পর্দা, কিডজির ব্ল্যাকবোর্ড থেকে ক্যামেরার সামনে — মানে শিক্ষিকা থেকে অভিনেত্রী। বাড়ির অ-মতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে মেলে ধরার জার্নি। আজ আমাদের সাথে আছেন অভিনেত্রী অনিন্দিতা সোম — জানবো তাঁর এই জার্নির গল্প। সঙ্গে অপরাজিতা ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি রিক্তা বিশ্বাস।
প্রশ্নঃ তোমার জন্ম ও ছোটবেলা কোথায় কেটেছে?
উত্তরঃ আমার সবটা হুগলিতেই কেটেছে, হুগলির চন্দননগরে।
• পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের আকাশ ছোঁয়ার গল্পঃ স্বপ্নের খোঁজে একলা আকাশ
"অন্যের দেওয়া স্ক্রিপ্টে অভিনয় করা যায়, কিন্তু নিজের জীবনটা বাঁচা যায় না"
প্রশ্নঃ বিনোদন জগতে আসার কথা কবে মনে হলো তোমার?
উত্তরঃ বিনোদন জগতে আসার ইচ্ছেটা আসলে আমার মনে ছোটবেলা থেকেই ছিল। কিন্তু চাইলেই তো সবটা পাওয়া যায় না; আমার পরিবার ভীষণ রক্ষণশীল হওয়ায় তাঁরা কখনোই এই রূপোলী দুনিয়ার ক্যারিয়ারের বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তাই পরিবারের মন রাখতে এবং তাঁদের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে প্রথমে আমি আমার নিজের স্বপ্নের কথা একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিলাম। তাঁদের কথামতোই একটা কিডজি (Kidzee) স্কুলে শিক্ষিকার চাকরি শুরু করি এবং বেশ কিছুদিন সেখানে শিক্ষিকা হিসেবে কাজও করি।
এই করে জীবনের অনেকটা বছর চলে গেল, কিন্তু জীবনের সেই চেনা ছকে চলতে চলতেও ভেতর থেকে একটা ডাক আসত। কিছু বছর চাকরি করার পর হঠাৎ একদিন আমার মনে হলো—সবার ইচ্ছে তো পূরণ করলাম, কিন্তু আমার নিজের যে একটা স্বপ্ন ছিল, তার কী হবে? নিজের স্বপ্নের কথাটাও তো একবার ভাবা দরকার! সেই মুহূর্তেই আমি মনে মনে একটা মস্ত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম; নিজেকে বললাম যে অন্যের ইচ্ছায় বাঁচা অনেক হয়েছে, এইবার নিজের স্বপ্নের পেছনে দৌড়ানোর সময় এসেছে।
তখন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে হলো। একদিন এক বুক ভয় আর তার চেয়েও বড় এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে আমি ঘর ছাড়লাম। চেনা আস্তানা, চেনা মুখগুলো পেছনে ফেলে পা বাড়ালাম এক অজানা, অনিশ্চিত কিন্তু নিজের তৈরি পথের দিকে এবং এই ভাবেই অবশেষে আমি আমার স্বপ্নের দিকে ডানা মেলেছি।
• শেকল ভাঙা ডানার গল্প: ঘর ছেড়ে আজ নিজের স্বপ্নের মুখোমুখি
"যতক্ষণ না নিজে মাঠে নামছ, ততক্ষণ লড়াইয়ের আসল কৌশল শেখা যায় না — থিয়েটার আমার শুরু, ওয়ার্কশপ শিক্ষা, আর স্বপ্নই আমার গন্তব্য।"
প্রশ্নঃ বাড়ি থেকে বেরিয়ে একদম একা কলকাতায়, শুধুমাত্র স্বপ্নের জন্য — কতটা কঠিন ছিল কোনো রকম ব্যাক-আপ ছাড়া বিনোদন জগতে প্রবেশ করাটা?
উত্তরঃ ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্তটা নেওয়া যতটা কঠিন ছিল, তার পরের পথ চলাটা ছিল আরও কয়েক গুণ বেশি দুর্গম। কোনো চেনা মানুষ নেই, মাথার ওপর চেনা ছাদ নেই — আছে শুধু স্বপ্ন পূরণের জেদ। কিন্তু স্বপ্ন দেখলেই তো আর তা হাতের মুঠোয় চলে আসে না, তাকে তাড়া করতে হয়। আমার সেই স্বপ্নের প্রথম আশ্রয় হয়েছিল 'থিয়েটার'।
হ্যাঁ, আমার নতুন জীবনের শুরুটা হয়েছিল থিয়েটারের সেই আলো-আঁধারিতে ঘেরা মঞ্চ থেকে। প্রথম প্রথম যখন থিয়েটারের সাথে যুক্ত হলাম, চারপাশের পরিবেশ দেখে মনে হতো সবকিছু শিখে নিই। কিন্তু অভিনয়ের জগতে পা রেখে খুব দ্রুত একটা বড় সত্য উপলব্ধি করলাম — এই শিল্পটা আসলে মুখস্থ করে বা বই পড়ে শেখা যায় না। অভিনয়ের ব্যাকরণ হয়তো জানা যায়, কিন্তু চরিত্রকে জীবন্ত করার বিষয়টা আসে একদম ভেতর থেকে, নিজের তাগিদ থেকে।
"যতক্ষণ না তুমি নিজে মাঠে নামছ, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি লড়াইয়ের আসল কৌশলটা কখনোই শিখতে পারবে না।" — এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত মতামত। আমার বিশ্বাস, সাঁতার শিখতে হলে যেমন জলে নামতেই হয়, ঠিক তেমনি একজন প্রকৃত শিল্পী হতে হলে নিজেকে ময়দানে সঁপে দিতে হয়। ভাঙতে হয়, গড়তে হয় এবং প্রতি মুহূর্তে ভুল থেকে শিখতে হয়। মঞ্চের সেই কাঠের তক্তাগুলোই ছিল আমার আসল ক্লাসরুম।
থিয়েটারের সেই শুরুর দিনগুলোর পর বিভিন্ন নামী এবং ভালো ভালো জায়গায় 'ওয়ার্কশপ' (Workshop) করতে শুরু করলাম। পাশাপাশি মডেলিং এবং কিছু বিজ্ঞাপন শুট করলাম। কিন্তু আমার লক্ষ্য মডেলিং নয়, আমি অভিনেত্রী হতেই চেয়েছিলাম, এখন কাজও করছি বিনোদন জগতে, ভবিষ্যতেও বিনোদন জগতেই কাজ করতে চাই। বিভিন্ন গুণী মানুষের সান্নিধ্যে এসে, তাঁদের কাজ দেখে এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে আমার ভেতরের শিল্পীসত্তাটা ডানা মেলতে শুরু করল।
এভাবেই, ছোট ছোট পদক্ষেপে, থিয়েটারের মঞ্চ আর ওয়ার্কশপের হাত ধরে আমি প্রবেশ করলাম আমার বিনোদন দুনিয়ায়। যে পথটার স্বপ্ন আমি ছোটবেলা থেকে দেখতাম, আজ আমি সেই পথের একনিষ্ঠ যাত্রী। লড়াই এখনও শেষ হয়নি, তবে শুরুটা অন্তত নিজের শর্তে করতে পেরেছি — এটাই আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।
• দানব থেকে ফাতেমা: থিয়েটারের ময়দান পেরিয়ে বড় পর্দায় নিজেকে মেলে ধরেছেন
প্রশ্নঃ এখন পর্যন্ত করা কিছু কাজের নাম?
উত্তরঃ 'ফাতেমা', 'দানব' এবং 'বানসারা'র মতো চমৎকার কিছু প্রজেক্টে কাজ করার পর, এবার খাতার পাতায় যুক্ত হলো আরও একটা নতুন সিনেমা। হ্যাঁ, সম্প্রতি আরও একটি চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করলাম। তবে ছবিটির ব্যাপারে এখনই এর চেয়ে বেশি কিছু বা নাম প্রকাশ করতে পারছি না, কারণ সিনেমাটি এখনও মুক্তি পায়নি (একটু হেসে)। দর্শক হিসেবে আপনাদের জন্য সারপ্রাইজটা তোলা থাক।
• যোগ্যতার লড়াইয়ে আপস নয় — নিজের সততা আর আত্মবিশ্বাসই আমার আসল শক্তি
প্রশ্নঃ কম্প্রমাইজ যেটা খুব কমন বিষয় বিনোদন জগতে — এই বিষয়টা কতটা ফেস করতে হয়েছে তোমাকে?
উত্তরঃ প্রচুর ফেস করতে হয়েছে। ক্যামেরার সামনের ঝকঝকে দুনিয়াটার পেছনে যে কতটা অন্ধকার আর কঠিন বাস্তব লুকিয়ে থাকে, তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এই পথ চলায় আমাকে প্রচুর নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে অনেক নোংরা মানসিকতা। মূলত এই কারণেই আজ আমি মেগা সিরিয়াল বা টেলিভিশনের পর্দায় কাজ করতে পারছি না।
ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার জন্য অনেকেই অনেক কিছুর সাথে আপস করে নেয়, কিন্তু আমার কাছে নিজের আত্মসম্মান এবং নীতিটাই সবার উপরে। এই বিষয়টা আমার কাছে জলছবির মতো পরিষ্কার যে, কোনো বড় বা ভালো কাজের সুযোগ পাওয়ার বিনিময়ে আমি কখনোই কোনো অনৈতিক বা নোংরা প্রস্তাব মেনে নিতে পারিনি, আর ভবিষ্যতেও কোনোদিন পারব না। কাজ না পেয়ে ঘরে বসে থাকতে হলেও রাজি, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বিক্রি করে সস্তা সাফল্য আমার চাই না।
আমি বিশ্বাস করি, যদি আমার মধ্যে সত্যি প্রতিভা থাকে, তবে নিজের যোগ্যতাতেই একদিন ঠিক কাজ পাব। কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করে নয়, বরং মাথা উঁচু করে নিজের যোগ্যতার জোরেই আমি আমার চেনা জগৎ তৈরি করতে চাই।
অনিন্দিতা সোমের এই পথ চলা শুধু একজন অভিনেত্রী হয়ে ওঠার গল্প নয়, এ হলো নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পাওয়ার লড়াই। রক্ষণশীলতার চেনা গণ্ডি, সমাজের তৈরি করা ছক আর একটা নিরাপদ চাকরি পেছনে ফেলে যিনি শুধু নিজের প্রতিভার জোরে আজ আলোর বৃত্তে, তিনি প্রমাণ করেছেন — স্বপ্ন যদি খাঁটি হয়, তবে ডানা মেলতে কোনো ব্যাক-আপের প্রয়োজন পড়ে না। আপসহীন সততা আর আত্মবিশ্বাসের এই চেনা জেদ আগামী দিনে তাঁকে আরও অনেক দূর নিয়ে যাবে, সেই শুভকামনা রইল — অপরাজিতা ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে।